সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে সমাজের দায় । মু. বেলাল হোসাইন

সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে সমাজের দায় । মু. বেলাল হোসাইনসংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয় বহন করে। একটি জাতি নৈতিক দিক থেকে কতটা উন্নত, কতটা রুচিশীল তা নির্ভর করে তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। সুস্থ সংস্কৃতি সুন্দর ও মননশীল সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার।
সংস্কৃতি শব্দটি মূলত সংস্কৃত ভাষার শব্দ, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হল culture (কালচার) এবং আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আস্ সাকাফাহ’। ‘আস্ সাকাফাহ’ শব্দের অর্থ হলো উপলব্ধি করা, জানা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া ইত্যাদি। পরিশীলিত মার্জিত ও রুচিশীল ব্যক্তিকে বলা হয় মুসাক্কফ বা সংস্কৃতমনা ব্যক্তি। পারিভাষিক অর্থে সংস্কৃতি হলো সমাজবদ্ধ কিছু মানুষের চিন্তা- চেতনা, রীতি-নীতি, লেনদেন ও ব্যবহারিক জীবনের আচার আচরণের সমষ্টি।

সংস্কৃতির প্রকারভেদ
সংস্কৃতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
ইসলামী সংস্কৃতি: ইসলামী সংস্কৃতি যা সুস্থ ও নৈতিকতাসমৃদ্ধ সমাজ গঠনের সহায়ক। ইসলামী সংস্কৃতির ভিত্তি হলো কোরআন ও সুন্নাহ। তাওহিদ, রেসালাত ও আখিরাতের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাই ইসলামী সংস্কৃতি। অন্যকথায় যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাওহিদ, রেসালাত ও আখিরাতের মূলনীতি অনুসরণ করা হয় তাকেই ইসলামী সংস্কৃতি বলা হয়।

জাহেলি সংস্কৃতি: যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সমাজে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা ও অবাধ যৌনতা বিস্তার লাভ করে তাকে জাহেলি সংস্কৃতি বলে। অর্থাৎ যে সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মনুষ্যত্ব বিবর্জিত হয়, জবাবদিহিতার অনুভূতি ধ্বংস হয়, সাময়িক আনন্দ বিনোদনকে জীবনের চরম এবং পরম পাওয়া মনে করে ভোগ বিলাসে মত্ত হয় তাকে জাহেলি সংস্কৃতি বলে।

সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও নারীসমাজ
মুসলিম জাতি হিসেবে আবহমানকাল ধরে আমরা লালন করে আসছিলাম এক গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মহান আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি সীমাহীন বিশ্বাস, রাসূলে আকরাম (সা)-এর আদর্শের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পরকালের কঠিন জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে গড়ে উঠেছিল মুসলিম সংস্কৃতি। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। আজ হতে প্রায় পনেরো শত বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা) সে নীতিমালার আলোকে যে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন যার ফলশ্রুতিতে অল্প সময়ের ব্যবধানে সমাজ ও রাষ্ট্র হতে সব ধরনের অপরাধ কার্যক্রম বন্ধ হয়েছিল। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে সংস্কৃতির নামে যে অপসংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল যার বিষাক্ত ছোবলে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল আরবের প্রতিটি জনপদ, হাজারো জুলুম নির্যাতনে নিষ্পেষিত জনগণ যখন আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করেছিল ‘রাব্বানা আখরিজনা মিন হাজিহিল করইয়াতিজ জ্বালিমি আহলুহা ওয়া জাআললানা মিল্লাদুনকা ওয়ালিয়্যাও ওয়া জাআললানা মিল্লাদুনকা নাসিরা….
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষাবলম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও।” (সূরা নিসা : ৭৫)
ঠিক সেই সময়ে শান্তির সুমহান বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করলেন মানবতার মুক্তিদূত সাইয়্যিদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ (সা), যার ঐতিহাসিক আগমনে শত শত বছরের জাহেলি সভ্যতা-সংস্কৃতির (তাহজিব-তমদ্দুন) মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে সমাজে নারী নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ইজ্জত ও সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে যে নারী জাতি ছিল সদা ভীত-সন্ত্রস্ত, ইসলামের আগমনে সে নারী জাতি পেল মায়ের মর্যদা। শত শত বছরের দাসত্বের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেল তারা। সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হলো নারী জাতি। যে সমাজে নারীর ছিল না কোন পারিবারিক অস্তিত্ব, বিবাহ সংস্কৃতির মাধ্যমে সে নারীর হাতে তুলে দেয়া হলো পরিবার রক্ষণাবেক্ষণের মূল চাবিকাঠি, যে জাহেলি সংস্কৃতির বলির পাঁঠা হয়েছিল হাজার হাজার অবুঝ কন্যা সন্তান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই যাদের জীবিত কবরে পুঁতে ফেলা হতো। ইসলাম এসে ঐসব কন্যা সন্তানকে কবর হতে তুলে সমাজের অন্যান্যদের মতো বাঁচার সুযোগ করে দিল।
কাল কেয়ামতের দিন ঐসমস্ত হত্যাকারীকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, কোন অপরাধে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। (সূরা তাকভীর : ৮-৯)
কন্যাসন্তান জীবিত হত্যার জঘন্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আল্লাহ রাব্বুল আমিন কুরআনুল কারিমে ঘোষণা করেন,
“তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদের হত্যা কর না, তাদের এবং তোমাদের পানাহার আমিই দিয়ে থাকি। জেনে রাখ যে সন্তান হত্যা একটি জঘন্য অপরাধ।
জাহেলি সংস্কৃতির সমস্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলাম নারীকে তিন ধরনের মর্যাদা দান করেছে-
প্রথম মর্যাদা কন্যা রূপে: কন্যা রূপে ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা দান করেছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যে ঘরে প্রথম কন্যাসন্তান হয় সে ঘর বরকতময়।’ আল্লাহর নবীকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এক মেয়ে। রাসূল (সা) বললেন, তোমার এক জান্নাত। আরেক ব্যক্তি বললেন আমার দুই মেয়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন তোমার দুই জান্নাত।
এরপর নারী যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন যে তার মেয়েকে সঠিকভাবে লালিত পালিত করে ভালো জায়গায় পাত্রস্থ করবে তার জন্য আল্লাহর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় মর্যাদা স্ত্রী হিসেবে: স্ত্রী হিসেবে নারীকে ইসলাম যে মর্যাদা দিয়েছে পৃথিবীতে অন্য কোন ধর্ম কিংবা সভ্যতা দিতে পারেনি। আমার আলোচনার বিষয় যদিও ভিন্ন তারপরও ইসলামী সংস্কৃতি বুঝাতে গিয়ে দুনিয়ার অন্যান্য ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য সম্পর্কেও প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করতে হচ্ছে। হিন্দু ধর্মে যেখানে সতীদাহ প্রথার মত অমানবিক, নিষ্ঠুর ও পাশবিক সংস্কৃতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে জীবন্ত চিতায় স্বামীর সাথে পুড়ে মরতে হয়েছে হাজারও রমণীকে, খ্রিস্টান ধর্মে যেখানে নারীকে সকল পাপের মূল মনে করা হতো, সেখানে ইসলাম একজন বিবাহিত স্ত্রীকে স্বামীর সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে স্বামী হলো স্ত্রীর পোশাক আর স্ত্রী হলো স্বামীর পরিচ্ছদ। স্বামীকে বলা হয়েছে সে যা খাবে এবং পরবে তার স্ত্রীকে তাই খাওয়াবে এবং পরাবে। রাসূলুল্লাহ (সা:) আরও বলেছেন, সেই পুরুষ উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। অতঃপর এই নারী যখন গর্ভবতী হয়, ইসলাম বলে যে নারী গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদের মর্যাদা পায়।

তৃতীয় মর্যাদা মা হিসেবে: মায়ের সম্মান ও ইজ্জত আল্লাহ এতো বৃদ্ধি করে দিয়েছেন যে পৃথিবীর সকল মানুষের জান্নাত আল্লাহ মায়ের পদতলে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। সূরা বনি ইসরাইলের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, তোমার রব ফায়সালা করে দিয়েছেন তোমরা কারো ইবাদত কর না, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। আর তোমাদের পিতা- মাতার সাথে ভালো ব্যবহার উত্তম ব্যবহার কর। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোন একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদের উহ পর্যন্ত বল না এবং তাদের ধমকের সুরে জবাব দিও না বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো এবং দোয়া করতে থাকো হে আমাদের রব তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।
পিতা-মাতার প্রতি শিষ্টাচারের এমন নমুনা কেবল ইসলামই দেখাতে পেরেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আধুনিক সভ্যতার ধ্বজাধারী একশ্রেণীর শিক্ষিত মানুষরূপী পশু বাবা-মার সাথে অত্যন্ত নির্মম নির্দয় আচরণ করে থাকে। মায়ের ছোট্ট উদরে সন্তানের জায়গা হলেও সন্তানের বিশাল ফ্ল্যাটে বাবা-মায়ের জায়গা হয় না। নিজের স্ত্রীকে খুশি করতে গিয়ে এহেন কোন খারাপ আচরণ নাই যা বাবা-মায়ের সাথে করা হয় না। এর একমাত্র কারণ হলো পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনার অনুসরণ এবং ইসলামী অনুশাসন না মেনে চলা।
আজ নারীরা তাদের এই সম্মান ও ইজ্জতের কথা ভুলে গিয়ে পাশ্চাত্যের অশ্লীল সংস্কৃতির নোংরা সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। প্রগতি ও নারী স্বাধীনতার নামে আজ পুরুষের ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে তারা। আধুনিকতার নামে অত্যাধুনিক সেজে এমন পোশাক পরিধান করছে যে পোশাক দেখলে সামাজিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী যেকোনো মানুষ লজ্জা পায়। ইসলাম মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদ ও চলাফেরাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যে গাইডলাইন দিয়েছে তা মানার মধ্যেই নারীজাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের নারীসমাজ আজকে ইসলামী নীতিমালা ও রাসূলের সুন্নাত ভুলে গিয়ে আত্মহননের পথকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। সংস্কৃতি ও ইন্টারটেইনমেন্টের নামে নিজের দেহ মন বিলিয়ে দিচ্ছে সমাজের কিছু বখাটের হাতে। প্রেম-পিরিতি ও ভালোবাসার নামে যৌন খেলায় মেতে উঠেছে এদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ তরুণী। লিভ টুগেদারের নামে পুকুর পাড়ে, নদীর ঘাটে, বনে জংগলে ও পার্কগুলোতে কী হয় তা হয়তো আর খুলে বলার অপেক্ষা রাখে না। মুসলিম অধ্যুষিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আজ নাস্তিকদের চিন্তা চেতনাই প্রতিফলিত হতে যাচ্ছে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আমদানি করে তারা এদেশের তরুণ-তরুণী যুবক-যুবতীদের লজ্জার সর্বনিম্ন স্তরের নিচে নামিয়ে দিয়েছে। বিয়ের আগেই গর্ভবতী হচ্ছে এদেশের শত শত প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে। প্রেম ও ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে অসংখ্য যুবক-যুবতী। শুধু তা-ই নয়, বাঙালি সংস্কৃতি, ভারতীয় সংস্কৃতি পশ্চিমা সংস্কৃতির মিশ্র প্রতিক্রিয়ার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর শত শত অপহরণ, অপহরণের পর ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন, জোরপূর্বক ধর্ষণ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ, ২২ মাসের শিশু থেকে ৭০ বছরে বৃদ্ধাকে পর্যন্ত ধর্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরও অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে ঘটছে। আমাদের রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসন ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা যত যুক্তিই সাপ্লাই দেন না কেন এর প্রকৃত ও আসল কারণ যে অপসংস্কৃতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও আমাদের যুবসমাজ
যুবসমাজ একটি দেশ ও জাতির মেরুদণ্ডস্বরূপ। যে দেশের যুবসমাজ যত সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও আদর্শবান হবে; সে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি ততো উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হবে। পৃথিবীতে কোন বিপ্লব যুবসমাজ ব্যতীত কল্পনা করা যায় না। এদেশের ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাই যুবকদের রয়েছে এক যুগান্তরকারী ভূমিকা। আজকের তরুণ ও যুবকরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। অর্থাৎ যুবকরাই পারে শত বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে দেশের সকল মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে। তাই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য যুবক বয়সের জয়গান গাইতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন,
“পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে
এ দেশের বুকে তাই আঠারো আসুক নেমে।”
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম আল ইসলামেও যুবকদের অনেক সম্মান ও মর্যাদার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে সুন্দর কথাটি বলেছেন নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। তিনি বলেছেন, আল্লাহর কাছে দু’টি জিনিস সবচাইতে প্রিয়। এক হলো শহীদের রক্ত আর দুই হলো যুবকদের চোখের পানি। রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন, কাল কেয়ামতের দিন যেদিন আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে আল্লাহ আরশের ছায়ায় স্থান দান করবেন। তার মধ্যে একটা শ্রেণী হলো ঐ যুবক যার কাছে কোন সুন্দরী রমণী ব্যভিচারের দিকে আহবান করলে সে বলে আমি আল্লাহকে ভয় করি।
ইসলামে আল্লাহ ও রাসূল (সা) এভাবেই যুবকদের সম্মানিত করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ইসলাম না মানার কারণে আমাদের যুবসমাজকে আজ ঘুণে ধরেছে। খুন, গুম, হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ হাজারো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে আমাদের যুবসমাজ। অবক্ষয়ের অতল তলে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে মুসলিম জাতি আজ হতাশায় নিমজ্জিত, গভীর সঙ্কটে নিপতিত হতে চলছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নেমে আসবে চরম দুঃখ, দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা।


সাংস্কৃতিক অবক্ষয় মানেই হল একটি পরিবারের অবক্ষয়, একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয়। সর্বোপরি একটি জীবনের অবক্ষয়। যে অবক্ষয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ঝরে যাচ্ছে অনেক যুবক-যুবতীর আকাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার। সেই সাথে পিছিয়ে পড়ছে আমাদের দেশ, পিছিয়ে পড়ছে দেশের অর্থনীতি। একবিংশ শতাব্দীর সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যার্থ হচ্ছে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলো যখন রকেট ও পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতা করছে আমার দেশে তখন চলছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অসুস্থ প্রতিযোগিতা


অবক্ষয়ের কারণ
আমাদের দেশে যুবসমাজ নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। অবক্ষয়ের প্রধান কারণগুলো হলো-

১) মূল্যবোধের অভাব: জীবনকে সৎ ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করতে কতগুলো গুণের প্রয়োজন হয়। আর ঐসব গুণকেই সাধারণত মূল্যবোধ বলা হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় এসব মূল্যবোধ মানুষকে মানবিক, রুচিশীল, সত্যপ্রিয়, মানবদরদি, পরোপকারী, ন্যায়পরায়ণ ও অপরের কল্যাণকামী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো পরিবার থেকে শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত কোন স্তরেই ঐসব মূল্যবোধের চর্চা না থাকার কারণে আমাদের যুবসমাজ শুধু নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একধরনের স্বার্থান্বেষী ও হিংস্র মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠছে।

২) রাজনৈতিক প্রভাব: যুবসমাজের অবক্ষয়ের পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অনেকাংশে দায়ী। রাজনীতি যখন দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য না হয়ে শুধুমাত্র ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করার জন্য হয়ে থাকে তখন রাজনীতির সেই ধ্বজাধারীরা এহেন কোন পন্থা নাই যা, তারা অবলম্বন করে না। আর এসব পদ্ধতির অন্যতম হলো বিরোধী দল ও মতকে যেকোন মূল্যে কুপোকাত করা। এজন্য সর্বপ্রথম তারা একশ্রেণীর যুবককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দেয় মদ, গাঁজা, টাকা, অস্ত্র, নারী ও গাড়ি এমনকি জানমালের নিরাপত্তা ও গ্যারান্টি। এসব লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা অপরাধ করেও সব জায়গা হতে ছাড় পেয়ে যায়। বিপরীতে ভিকটিম বা নির্যাতিতরাই উল্টো আইনের ফাঁকে ফেঁসে যায়। আজকে উঠতি বয়সের লাখ লাখ তরুণ যুবক এসব নোংরা রাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে এক একজন যেন মানব নামের দানবে পরিণত হচ্ছে। যাদের ভয়ে সর্বদা আতঙ্কে থাকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। জাতি গড়ার এই মহান কারিগর যুবসমাজকে এসব অপরাজনীতি ও অসৎ রাজনীতিবিদের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

৩) অর্থনৈতিক প্রভাব : যুবসমাজের অবক্ষয়ের পেছনে আরও যে কারণটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তাহলো অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। যার স্বাধীন হওয়ার প্রায় ৪৭ বছর পার হয়ে গেলেও আমরা আজও অর্থনৈতিক মজবুতি অর্জন করতে পারিনি। পারি নাই আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে। অফুরন্ত দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। সারাদেশে শিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত লক্ষ লক্ষ বেকার দেশের সম্পদ না হয়ে এক ধরনের বোঝায় পরিণত হয়েছে। নিরাশার কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে অনেকের ভবিষ্যৎ জীবন। অবশেষে যৌবনের উচ্ছ্বাস, পারিবারিক পিছুটান, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন হয়ে নেশার জগতে পাড়ি জমাচ্ছে হাজারো যুবক। সেই সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে অনেক পিতা-মাতার রঙিন স্বপ্ন। এবতাবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করার জন্যে এবং যুবসমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে বেশি বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

৪) অপসংস্কৃতির প্রভাব : যুবসমাজ ধ্বংসের সবচেয়ে মেজর যে সমস্যাটি আমার কাছে মনে হয়েছে তা হলো অপসংস্কৃতির বিস্তার লাভ। অপসংস্কৃতি নামক ঘুণ আমাদের আমাদের প্রত্যেক তরুণ ও যুবসমাজের মাঝে প্রবেশ করেছে। ঘুণেধরা ফার্নিচার যতই সুন্দর হোক না কেন সময়ের ব্যবধানে যেভাবে ভঙ্গুর হয়ে যায়, অপসংস্কৃতির কুপ্রভাবে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। তাদের চারিত্রিক সৌন্দর্য নষ্ট হবে, ঈমানী শক্তি ধ্বংস হবে। সর্বোপরি মুসলিম জাতি হিসেবে আমরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবীর ঐতিহাসিক উক্তিটি হলো, “যুদ্ধ ছাড়া কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম সে জাতির তরুণ প্রজন্মের মাঝে নগ্নতা ও অশ্লীলতা স্বাভাবিক করে দাও।” আর সে জন্যই মুসলমানদের চরম ও পরম দুশমন ইহুদি খ্রিস্টানরা মুসলমানদের সেই ঈমানী শক্তিকে দুর্বল করার জন্য নগ্নতা ও অশ্লীলতার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছে।
ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, গুগল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুবসমাজকে যৌন উন্মাদ বানানোর জমকালো আয়োজন করা হয়েছে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মুসলিম ও অমুসলিম সংস্কৃতি একাকার হয়ে গেছে। মুসলমানদের ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক জীবন এবং অমুসলিমদের ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, থার্টি ফার্স্ট নাইট, জন্মদিন, গায়ে হলুদ, এপ্রিল ফুল, বিবাহবার্ষিকী, মঙ্গল শোভাযাত্রা, হলিখেলা প্রভৃতি বিজাতীয় সংস্কৃতি হলেও আমাদের দেশেও তা ধুমধামের সাথেই পালিত হয়। আধুনিক সংস্কৃতির নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির উত্তাল তরঙ্গে গা ভাসিয়ে দিয়ে মুসলিম সভ্যতা ইহুদি-খ্রিস্টানদের সাথে একাকার হয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে জাতি হিসেবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজকে ম্লান হতে চলছে। ভারতসহ পশ্চিমা সংস্কৃতির বস্তাপচা নোংরা গান, অশ্লীল ভিডিও, পর্নোগ্রাফি ও বিভিন্ন সেক্সুয়াল শর্টফিল্ম দেখে দেখে উঠতি বয়সের হাজারো তরুণ তরুণী, যুবক-যুবতীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গুম, খুন, হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ ও ইভটিজিংয়ের মতো শত শত অপরাধ। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত হয়ে মাতালের জগতে প্রবেশ করছে হাজারো কোমলমতি শিক্ষার্থী। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে তিলে তিলে ধ্বংস হতে চলছে আমাদের যুবসমাজ।

যুবসমাজ অবক্ষয়ের হাত থেকে মুক্তির উপায়
১. সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার
২. কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হতে যাবতীয় অশ্লীল পেজ ও সাইট বন্ধ করা।
৪. ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করা।
৫. বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হতে দেশকে মুক্ত করা।
৬. রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতি দমনে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ।
৭. যাবতীয় নেশা জাতীয় দ্রব্যের উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি-রফতানি কঠোর হস্তে দমন করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৮. চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও গঠনমূলক ও নৈতিক মানে উন্নীত করণ।
৯. ইলেট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ যাবতীয় প্রচার মাধ্যম হতে সব ধরনের নগ্ন ও অশ্লীল সম্প্রচার বন্ধ করা।
১০. পারিবারিক জবাবদিহির ব্যবস্থাকে জোরদার করা।

পরিশেষে বলতে চাই সাংস্কৃতিক অবক্ষয় মানেই হলো একটি পরিবারের অবক্ষয়, একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয়। সর্বোপরি একটি জীবনের অবক্ষয়। যে অবক্ষয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ঝরে যাচ্ছে অনেক যুবক-যুবতীর আকাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার। সেই সাথে পিছিয়ে পড়ছে আমাদের দেশ, পিছিয়ে পড়ছে দেশের অর্থনীতি। একবিংশ শতাব্দীর সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলো যখন রকেট ও পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতা করছে আমার দেশে তখন চলছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ইউরোপ, আমেরিকায় যখন চলছে মঙ্গল গ্রহ জয় করার প্রতিযোগিতা; তখন আমার দেশের যুবক-যুবতীরা কোন গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ডের মন জয় করার তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারপরও আশা রাখি এই দেশ ও জাতি আবার কোন একদিন ঘুরে দাঁড়াবে। ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ইসলামের সুমহান ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করবে। অপসংস্কৃতির অশ্লীলতাকে কবর দিয়ে সুস্থ ও নান্দনিক সংস্কৃতি চর্চা করবে। সেই সাথে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধনে নিজেকে নিয়োজিত করবে।

লেখক : বিশিষ্ট গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply