সাইবার অপরাধ : আমাদের সচেতনতা । অ্যাডভোকেট আল মামুন রাসেল

সাইবার অপরাধবিশ্বায়নের যুগে আমাদের সচেতন জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। মনের ভাব প্রকাশ করেন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইন পত্রিকায়। এ বিষয়ে জনসাধারণের কথা চিন্তা করে সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) প্রকাশ হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এ আইন প্রয়োগ করা হলে নাগরিকরা ইন্টারনেটে কোন বিষয়ে স্বাধীনভাবে তাদের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে চরম বাধাগ্রস্ত হবে। আইন পেশায় থাকার কারণে জেনেছি, আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ও জনসাধারণকে সংশ্লিষ্ট অপরাধের আক্রমণ হতে মুক্তি দিতে। কিন্তু প্রণীত আইন যদি জনগণের মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হয় কিংবা শুধু ঐ আইন রাষ্ট্রের অনুকূলে আর জনগণের প্রতিকূলে প্রণীত হয়ে থাকে তবে তা হবে নিশ্চয়ই সংবিধান পরিপন্থী। যতই আমরা বাকস্বাধীনতা অথবা সংবিধান পরিপন্থী বলি। যেহেতু এটি প্রয়োগ হওয়া শুরু হয়েছে সেহেতু দেশের প্রতিটি নাগরিকের এই আইন সম্পর্কে ভালো করে জানা উচিত।

সাইবার অপরাধ কী?
The use of computer technology to commit crime কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন করাকে বলা হয় সাইবার অপরাধ।
সাধারণ অপরাধগুলো যেমন তথ্যচুরি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থচুরি এইগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে করা হলে সেগুলোকে সাধারণ ভাষায় সাইবার অপরাধ বলে।
যেমন-
সরাসরি টাকা চুরি না করে তার পরিবর্তে কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ব্যাংকের সার্ভারে ঢুকে অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নেয়া।
কারো রুমে ফাইল চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তার কম্পিউটারে ঢুকে ফাইল চুরি করে নেয়া।
এছাড়া কারো ঘরে আগুন দিয়ে সকল ফাইল জ্বালিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ভাইরাস ঢুকিয়ে কম্পিউটার ক্রাশ করে দেয়া।
এই অপরাধের দ্রুত বিচার সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল হয়েছে তা হলো ‘‘সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত’’। এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার প্রথম দশ মাসে অভিযোগ জমা পড়ে ৬ হাজার, দেড় বছরে তা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। ৭৫ শতাংশ অভিযোগ ফেসবুক সম্পর্কিত। যারা অপরাধ সংঘটিত করেছেন তাদের অধিকাংশই সঠিক জ্ঞানের অভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

সাইবার সন্ত্রাস সম্পর্কিত আইন
সাধারণত সাইবার টেরোরিজম বা সাইবার সন্ত্রাস হলো নিম্নরূপ:
১. ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যাহত করা।
২. ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক অবকাঠামোকে সরাসরি আক্রমণ।
বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইমের পরিচিতি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ দমনের সংশ্লিষ্ট আইনটি অনেকের জানা নেই। তা হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ পরবর্তিতে সংশোধিত আইন হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) আইন ২০১৩। ২০১৩ সালের আইনে শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ন্যূনতম ৭ এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের আইনে ১০ বছর বিধান রাখা হয়েছিলো। সংশোধিত আইন অনুযায়ী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সংক্রান্ত অপরাধে পুলিশ ৪টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে বিনা পরোয়ানায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং এসব অপরাধ জামিন অযোগ্য করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর কিছু ধারা আমাদের জানা খুবই জরুরি এবং আবশ্যক
১. ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা, অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে ইচ্ছুক হতে পারে অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা আঘাত করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়। তাহলে এই কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে।
২. ৫৭ ধারা উপধারা ২তে বলা হয়েছে: এমন কোন ব্যক্তি কম্পিউটার সার্ভার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করার মাধ্যমে এর ক্ষতি সাধন করেন যিনি মালিক বা দখলদার নন, তাহলে তার এই কাজ হবে একটি হ্যাকিং অপরাধ, তার শাস্তি অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা এক কোটি টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন বা উভয়দণ্ডে।

সাইবার অপরাধ যে যে ভাবে হয়
১. ভিন্ন নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে সরকার ও ব্যক্তির নামে মিথ্যা প্রচারণা চালানো।
উদাহরণস্বরূপ একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই : কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে আমাদের কাছে একটা মামলা এসেছে- অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন কলেজছাত্র, ফেসবুকে ভিন্ন নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন উসকানিমূলক দেশ ও সরকারবিরোধী পোস্ট করতো। পরবর্তীতে তার আইডিটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে পড়ে। তারা অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়ার জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নেয় কারণ প্রত্যেকটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একটা মোবাইল নম্বর বা ই-মেলআইডি দিয়ে ভেরিফাইড করতে হয়। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ঐ নম্বরটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রদান করে। গোয়েন্দা সংস্থা ঐ নম্বরটি কোন ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা তা বের করে। দেখা যায় ঐ ব্যক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তির ভগ্নিপতি। গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করে তার নম্বরটি তার শ্যালক ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে তার মাধ্যমে অভিযুক্তকে (তার শ্যালক) আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। যদিও আমরা তাকে জামিন করেছি কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন ৭ বছর সর্বোচ্চ ১৪ বছর শাস্তি হবে।

২. নিজের নাম ও ছবি ব্যবহৃত আইডি থেকে সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী, বা কোন ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় অথবা ধর্মীয় অনুভূর্তিতে আঘাত করে বা আঘাত করতে পারে এমন কিছু পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার করা বা লাইক দেয়া।
অন্য আরেকটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই: ভোলা জেলা থেকে একটি মামলা আসে, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন মাদ্রসা শিক্ষক। তিনি ফেসবুক ব্যবহার করতে পারতেন না। গ্রেফতার হওয়ার ২ মাস আগে তার সহপাঠী এক হিন্দু শিক্ষকের মাধ্যমে ফেসবুক আইডি খুলে নেন। এই হিন্দু শিক্ষক বিভিন্ন সময় তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহারপদ্ধতি শিখিয়ে দিতেন চালাক কুমতলবাজ এই শিক্ষক। মাদ্রাসা শিক্ষকের মেসেঞ্জার থেকে প্রধানমন্ত্রীর একটি বিকৃত ছবি তার মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে রাখে। দুই মাস পর যখন এই হিন্দু শিক্ষকের সাথে মনোমালিন্য হয় তখন সে পুলিশকে ডেকে এনে বলে এই ছবিটি তার মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে বলে গ্রেফতার করিয়ে দেয়। উক্ত অভিযুক্ত শিক্ষক ৩ মাস হাজতে ছিল। আমরা জামিন করিয়েছি কিন্তু যদি অভিযোগটি প্রমাণিত হয় তবে ন্যূনতম ৭ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড হবে।

৩. মোবাইল বা কম্পিউটার মেমোরিতে সরকার বা রাষ্ট্র বিরোধী কোন ভিডিও অথবা ছবি রাখা।
উদাহরণস্বরূপ: বরিশাল থেকে একটি মামলা এসেছে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে দেখা যায় তার মোবাইলে একটি ভিডিও গান, যেটি সরকারকে ব্যঙ্গ করে করা। পরবর্তীতে তাকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ২০০৬ এর ৫৭ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। যদিও সে এখন জামিনে আছে কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম ৭ বছর থেকে ১৪ বছর জেল হবে। আরো যে যে কাজ সাইবার টেরোরিজম বা সাইবার সন্ত্রাস নামে পরিচিতি:
» কারো নামে ফেসবুক বা ব্লগে মিথ্যা প্রচারণা চালানো।
» ভুয়া পরিচয়ে ই-মেইল বা ফোনের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে বিপদে ফেলানো।
» ফেসবুক ওয়েবসাইট বা মেইল হ্যাক করা।
» ইন্টারনেট নিষিদ্ধ বস্তুর প্রচার করা যেমন : পর্নগ্রাফি বা মাদকের বিজ্ঞাপন দেয়া।
সবশেষে বলা প্রয়োজন সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে নাগরিকদের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। তাই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মতপ্রকাশের ক্ষমতা কোনো কিছুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তবে এর পাশাপাশি নাগরিকদেরও মনে রাখা উচিত সব কিছু মাথায় এলেই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা ঠিক হবে না। ফেসবুকে পোস্ট করার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি আইন সম্পর্কে ধারণা রেখে পোস্ট বা শেয়ার করা উচিত। আর যার যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে ভালো জ্ঞান নেই তাদের এটা ব্যবহার না করাই ভালো, করলেও দর্শক হিসেবে থাকা উচিত। অপর দিকে সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ধারা- ৩৯(২)ক) সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করে সরকার এই আইনটি যথাযথভাবে সংশোধন করবে এমনটি সকলে প্রত্যাশা করেন।

লেখক : চিফ ডিরেক্টর, লিগ্যাল সার্ভিস ফর চিলড্রেন (এলএসসি)

SHARE

Leave a Reply