সাফল্যের সন্ধানে -পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম

জীবনে সবাই সাফল্য অর্জন করতে চায়, সফল হতে চায়। সাফল্যের জন্য হন্যে হয়ে ছুটেও বেড়ায়। সাফল্য অর্জনের উপায় কী, তা তাদেরকে হাতরে ফিরতে দেখা যায় অহরহ। সবাই সাফল্য লাভের একই লক্ষ্য নিয়ে ছুটলেও সবাই একই দিকে ছুটে না। যে যেটাকে সাফল্য বলে মনে করে, সেদিকেই হয় তার চলার রোখ; মানুষ সাফল্য বলতে যা বুঝে, সে অনুসারেই সে পথ চলে। তবে প্রচেষ্টা শেষে সবাই কিন্তু সাফল্যের সাক্ষাৎ পায় না। যার মূল কারণ হচ্ছে, সবাই আসলে সঠিক লক্ষ্যটাই নির্ধারণই করতে পারে না। লক্ষ্য নির্ধারণটাই যখন ভুল হয়, আর সে ভুল দিকেই যখন চলা হয়, তখন সঠিক লক্ষ্যপানে পৌঁছবে কিভাবে! সেজন্য, সাফল্যের প্রকৃত সংজ্ঞা আগে বুঝা দরকার, আর সে মোতাবেক পথ চলা দরকার দৃঢ়তার সাথে। সে চিন্তা থেকেই এ রচনা, ‘সাফল্যের প্রকৃত সংজ্ঞায়ন’।
বড় বড় ডিকশনারি বা অভিধান খুঁজে তাদের সংজ্ঞাকে একত্রিত করলে ‘সাফল্য’ মানে যা পাওয়া যায় তাহলো, লক্ষ্য বাস্তবায়ন, লক্ষ্যে পৌঁছানো, লক্ষ্য অর্জন করতে পারা। যেমন- বাংলা একাডেমির ডিকশনারিতে সাফল্যের অর্থ লেখা হয়েছে ‘কৃতকার্যতা’। তথা যেকোনো লক্ষ্যে ঠিকমত পৌঁছতে পারা। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে সাফল্য তথা Success এর অর্থ করা হয়েছে ‘The accomplishment of an aim or purpose. ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে Success এর সংজ্ঞা লিখা হয়েছে ‘the achieving of the results wanted or hoped for’.
কিন্তু সাফল্যের সংজ্ঞা এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সঠিক সংজ্ঞায়নটা হবে না এবং সে সংজ্ঞা মোতাবেক চলতে থাকলে মানুষ সব সময় সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারবে না। তাই আরো একটু পরিশুদ্ধ সংজ্ঞায়ন করা দরকার। সে সংজ্ঞায়ন ভালোমত বুঝার জন্য চলুন একটি উদাহরণ দেখে আসি।
ধরি, আপনি এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। আপনি রাজশাহীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সে মোতাবেক সময়মত ঠিকঠাক রাজশাহীতে পৌঁছে গেলেন। তাহলে, পূর্বোক্ত সংজ্ঞা অনুসারে আপনি সফল।
চলুন এবার আরেকটি উদাহরণ দেখি। আপনি এখন ঢাকায় আছেন। আপনার শিক্ষক আপনাকে আগামীকাল সকালের মধ্যে কোনো একটি কাজে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। আপনি শিক্ষকের কথা না বুঝে অথবা না শুনে অথবা মানতে অস্বীকার করে সকালে রাজশাহী গিয়ে বসে থাকলেন। শিক্ষক পরদিন সকালে আপনাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন যে আপনি কোথায়। আপনি জানালেন, আপনি রাজশাহীতে পৌঁছে গিয়েছেন। তাহলে, বলুনতো, আগেরবার রাজশাহীতে পৌঁছে আপনি সফল হলেও এবার কি রাজশাহীতে পৌঁছে সফল হবেন? নিশ্চয়ই উত্তর হবে, না, আপনি সফল হননি। তাহলে, খেয়াল করে দেখুন, একই জায়গায় পৌঁছে আগেরবার সফল হলেও পরের বার সফল হননি কেন? দুইবারের মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য হলো, আগেরবার আপনার টার্গেট ছিল রাজশাহী এবং সে মোতাবেক রাজশাহীতেই পৌঁছেছিলেন আর এবার টার্গেট কক্সবাজার হলেও আপনি নিজে নিজে ভুল টার্গেট হিসেবে রাজশাহীকে নির্ধারণ করে নিয়ে রাজশাহীতে পৌঁছেছেন। অর্থাৎ দ্বিতীয়বার টার্গেট নির্ধারণ করাটাই ঠিক হয়নি। তাই সে টার্গেটে পৌঁছালেও আপনি সফল হতে পারেননি।
তাহলে এপর্যায়ে এসে, সাফল্যের সংজ্ঞায়নে কিছুটা পরিবর্তন আনা দরকার। সেটি হচ্ছে, সঠিকভাবে নির্ধারণকৃত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারার নাম সাফল্য। এবারে ‘সঠিকভাবে নির্ধারণকৃত’ কথাটি ‘লক্ষ্য’ শব্দটির আগে যুক্ত করতে হয়েছে।
এবার চলুন, আরো একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি এখন ক্লাস নাইনে পড়ছেন। ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষা দিলেন। জিপিএ ৫ পেলেন। ধরি, গোল্ডেন ৫ই পেলেন। তাহলে, এ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আপনাকে সফল হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এবার আপনি এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা দিলেন এবং তাতে জিপিএ ৫ পেলেন। তাহলে, এ পর্যায়েও আপনি সফল। এবার এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দিলেন। রেজাল্ট প্রকাশিত হলো। আপনি তাতে ধরি, অকৃতকার্য হলেন। তাহলে এই পর্যায়ে এসে আপনাকে ব্যর্থ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে; এবং মাত্র কয়েক মাস আগে যে টেস্ট পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন, তা আর বিবেচ্য হবে না। তাহলে, বলা যেতে পারে, সর্বশেষ বা চূড়ান্ড স্টেজ বা ধাপে সফল হলে সেটাই সফলতা, আগে ক্লাস নাইনে বা টেস্ট পরীক্ষায় যদি কিছুটা খারাপ রেজাল্টও করে থাকতেন সেটাও বিবেচ্য হতো না বা ক্লাস নাইন অথবা টেস্ট পরীক্ষায় প্রস্তুতি নেয়ার জন্য অনেক বেশি পরিশ্রম আর কষ্ট হলেও সেটা নিশ্চয়ই আর মনে থাকত না। আর চূড়ান্ত ধাপে ব্যর্থ হওয়ায় আগেরটাসহ ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
চতুর মানুষ এ ক্ষেত্রে কী করবে? এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষার কথা মাথায় না রেখে ক্লাস নাইনে যেকোনো উপায় অবলম্বন করে জিপিএ ৫ পাওয়ার চেষ্টা করবে বা টেস্ট পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে হয়ত জিপিএ ৫ পাওয়ার চেষ্টা করবে। যার কারণে তার যথার্থ প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় সে ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করবে। সে যতই চতুর হোক না কেন, আসলে সে বোকা হিসেবেই প্রমাণিত হবে শেষ পর্যন্ত। অপরপক্ষে সত্যিকারের চালাক মানুষ ক্লাস নাইন বা টেস্ট পরীক্ষায় কষ্ট করে হলেও এমনভাবে প্রস্তুতি নেবে যেন সে তখনও সফল হতে পারে আবার এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষায়ও জিপিএ ৫ পেতে পারে। এ রেজাল্ট পাওয়ার জন্যে হয়ত তাকে সব স্তরেই অনেক বেশি কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হবে। আপাত কষ্ট হলেও দিনশেষে তথা শেষ পর্যন্ত সে কিন্তু সফলই হল এবং সত্যিকারের চালাক মানুষ হিসেবেই প্রমাণিত হলো।
আরেকটু বোঝার স্বার্থে ধরি, আপনি এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষায়ও জিপিএ ৫ পেলেন। এরপর এইচএসসি প্রথম বর্ষ পরীক্ষায় ৫ পেলেন, টেস্ট পরীক্ষায় ৫ পেলেন এমনকি এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষাতেও জিপিএ ৫ই পেলেন। এ পর্যায়ে আপনি সফল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই চান্স পেলেন না। তাহলে, এ পর্যায়ে আপনি কি সফল না ব্যর্থ? নিশ্চয়ই ব্যর্থ। তবে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেলেন। তাহলে, এবার? এইখানে দাঁড়িয়ে আপনার সাফল্য ব্যর্থতা বিবেচনা করলে আপনি কিন্তু সফল হলেন এবং আগের ব্যর্থতা হয়ত মনে রাখা হবে না। এভাবে করে পড়ালেখা শেষ করলেন। ভালো বিয়ে করলেন। ভালো বাচ্চা-কাচ্চা হলো। এরপর আপনার সেসব বাচ্চা-কাচ্চা পড়ালেখা শুরু করল। তাহলে বাচ্চা-কাচ্চাসহ আপনার জীবন চলা শুরু হলো। বাচ্চা-কাচ্চার এসএসসি, এইচএসসি, চাকরি, বিয়ে, তাদের বাচ্চা-কাচ্চার জন্ম তথা আপনার নাতি-পুতির জন্ম হলো। এদের সবাইকে নিয়ে আপনার জীবনের চলাচল চলতে থাকল। এভাবে করে করে এক সময় আপনার দুনিয়ার জীবনের সর্বশেষ স্টেজ সম্পন্ন হবে। সেটা কী? সেটা হলো- মৃত্যু। এখানে এসে কিন্তু আর কোন সেকেন্ড টাইম পাওয়া যাবে না! আবার এই মৃত্যু কখন আসবে, সেটাও আমাদের জানা নেই। তাহলে এতক্ষণ ধরে যেসব উদাহরণ দিলাম, সেগুলো মাথায় নিয়ে বলুন তো, এই স্টেজে যদি আপনি সফল হন, তাহলে আপনার জীবন সফল হবে না ব্যর্থ হবে? নিশ্চয়ই সফল হবে। আর যদি এই স্টেজে এসে ব্যর্থ হন, তবে গোটা জীবনটাই ব্যর্থ হবে। তাই নয় কি? আর এইখানে এসে সফল হওয়া মানে জান্নাত পাওয়া আর ব্যর্থ হওয়া মানে জাহান্নাম পাওয়া। তাহলে, এক কথায় বলা যায়, জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য মানে হচ্ছে জান্নাত প্রাপ্তি। এটি হলে আখিরাতের জীবনতো সফল হবেই দুনিয়ার জীবনও সাফল্যম-িত হবে। আর এইখানে ব্যর্থ হলে, তথা জাহান্নাম পেলে, আখিরাতের জীবনতো ব্যর্থ হবেই, দুনিয়ার জীবনও ব্যর্থ হিসেবেই বিবেচিত হবে, তা দুনিয়ার জীবনের বিভিন্ন স্টেজে সে যতই সুখে থাকুক আর যশখ্যাতি পেয়ে থাকুক।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যকে সংজ্ঞায়ন করেছেন আল কুরআনের মধ্যে।
“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আছে জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় নির্ঝরিণীসমূহ। এটাই মহাসাফল্য।” (সূরা আল-বুরুজ : ১১)
“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আদেশমত চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হল বিরাট সাফল্য।” (সূরা আন-নিসা : ১৩)
“আল্লাহ বললেন : আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য উদ্যান রয়েছে, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে; তারা তাতেই চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।” (সূরা আল-মায়েদা : ১১৯)
“যার কাছ থেকে ঐদিন এ শাস্তি সরিয়ে নেয়া হবে, তার প্রতি আল্লাহর অনুকম্পা হবে। এটাই বিরাট সাফল্য।“ (সূরা আল-আনআম : ১৬)
“আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণ। তারা সেগুলোরই মাঝে থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিই হলো মহান কৃতকার্যতা।” (সূরা আত-তাওবা : ৭২)
“যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখ ভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে বলা হবে : আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে-এটাই মহাসাফল্য।” (সূরা আল-হাদিদ : ১২)
এ সংক্রান্ত আয়াত কুরআনে কারীমে আরো রয়েছে। এখানে মহাসাফল্য মানে হচ্ছে চূড়ান্ত সাফল্য, ফাইনাল সাফল্য, Ultimate Success। এই সাফল্য পাওয়া মানেই হচ্ছে, জীবনটা সাফল্যম-িত হওয়া। উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা জান্নাত প্রাপ্তিকেই চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনকে সাফল্যম-িত করার তৌফিক দিন। আমিন। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply