সামাজিক অবক্ষয় : আমাদের দায় । প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মূলত মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণার কারণেই মানুষ অন্য প্রাণী থেকে আলাদা। রীতিনীতি, মনোভাব এবং সমাজ অনুমোদিত আচার-আচরণের সমন্বয়ে মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়।মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মূলত মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণার কারণেই মানুষ অন্য প্রাণী থেকে আলাদা। রীতিনীতি, মনোভাব এবং সমাজ অনুমোদিত আচার-আচরণের সমন্বয়ে মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়। যেসব ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সংকল্প মানুষের আচার-আচরণ এবং কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোর সমষ্টিই হলো মূল্যবোধ। যেমন-বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ছোটদের প্রতি স্নেহ, মায়া মমতা প্রভৃতি সামাজিক মূল্যবোধের উদাহরণ। এই মূল্যবোধের অবনতিই সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যা সামাজিক অসঙ্গতির মূল কারণ। সুতরাং মূল্যবোধকে মানুষ থেকে পৃথক করলে তার মধ্যে জীবের বৈশিষ্ট্য থাকবে বটে কিন্তু মনুষ্য কোন বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। মূল্যবোধ এবং মনুষ্যত্ব একটি অপরটির পরিপূরক। যার মূল্যবোধ নেই তার মনুষ্যত্বও নেই। আজকে আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জীবন- সর্বক্ষেত্রেই মূল্যবোধহীনতা আর অনৈতিকতার অবাধ চর্চা আমাদের পারিপার্শ্বিকতাকে দারুণভাবে কলুষিত করে তুলেছে।
আজকের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে দৈহিক এবং অর্থনৈতিক বিবেচনায় আমরা একে অপরকে মূল্যায়ন করছি। প্রকৃত মানবিক বিবেচনা সেখান অনুপস্থিত থাকছে। জাতীয়ভাবেও অন্যায়, স্বার্থপরতা এবং সুবিধাবাদী কর্মকাণ্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। ফলে মূল্যবোধের চর্চা ক্রমান্বয়ে নি¤œমুখী। অপরদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও যদি লক্ষ্য করা যায় ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতির অবাধ চর্চা। যেটা পশু সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে; কোনোভাবেই মানবীয় বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এর ফলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বেড়ে উঠতে দেখছি মানবীয় বৈশিষ্ট্যহীন আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, অসহিষ্ণু, নৈতিকতা বিরোধী এক একজন যন্ত্রমানব হিসেবে। ফলে সর্বত্র আজ অনৈতিকতার ছড়াছড়ি। সামাজিক অবক্ষয় এত মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে কখনো কখনো তা ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে অথবা তার সমান্তরালে অবস্থান করছে। আমাদের সমাজে এ ভয়াবহ অবক্ষয়ের কিছু কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি-

পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া
মূলত পরিবারই হলো পৃথিবীর আদি শিক্ষালয়। ইসলামী সমাজে পরিবার প্রথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পরিবার থেকেই একজন মানুষের মূল্যবোধের ধারণা লাভ হয়; তার ব্যক্তিত্বের গঠন হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ পরিবার প্রথার মূলে আঘাত হানা হয়েছে। ফলে এর বন্ধন ও রক্ষাকবজগুলো ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হতে চলেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুসলিম সমাজে এখনও তুলনামূলকভাবে পরিবার প্রথা বেশি লালন হয় বলেই সমগ্র মুসলিম জাহান এখনো অবক্ষয়ের কিছু ক্ষেত্রে পরিবার প্রথাহীন পাশ্চাত্যের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। কেননা নৈতিকতার বীজ বপিত হয় ঐ পরিবারেই যার বিকল্প নেই বললেই চলে।

ধর্মীয় শিক্ষার যথাযথ রূপ অনুপস্থিত
গবেষণায় প্রমাণিত যে, ধর্মচর্চা মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চেতনা সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ধর্ম শিক্ষার প্রকৃত রূপ আমাদের সমাজে অনুপস্থিত। বরং খণ্ডিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত রূপে ধর্মকে আমরা দেখতে পাই। ফলে পরস্পর বিরোধী চেতনাধারী হয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। তারা যখন দেখতে পায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনকারী একটি সমাজ দুর্নীতিতেও চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে; তখন ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে তারা বিরূপ ধারণা নিয়ে বিকশিত হবে এটি স্বাভাবিক। আমরা ধর্মকে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব একটি বিষয়ে পরিণত করে ফেলছি, অথচ ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম শুধুমাত্র এমন আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে একমাত্র ধর্মই। কিন্তু আমাদের সমাজ ধর্মের এই সহজাত রূপকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষের কথা দূরে থাকুক শিক্ষিত সমাজের একটি বিরাট অংশের চরম অনৈতিক কর্মকাণ্ড! মূল্যবোধহীনতার অবাধচর্চা তাদেরকে নির্লজ্জ-বেহায়া বানিয়েছে। যার কারণে প্রকাশ্যে ঘুষ-চাঁদাবাজি, অপরের অধিকার হরণ আজ আর অপরাধ মনে হয় না তাদের কাছে। ‘আগুন যখন সর্বগ্রাসী হয় তখন দেবালয়ও বাদ যায় না’-ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড যেন সে কথারই প্রমাণ বহন করে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থীর গণটুকাটুকির দৃশ্য আমাদেরকে তাই চরমভাবে আহত করে। তারা ধর্মের শিক্ষাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে রূপায়ণের শিক্ষা লাভে ও দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ধর্মের চিরন্তন শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে উপস্থাপনে তারা সক্ষম হচ্ছেন না।

রাষ্ট্রীয় দৈন্যতা
একজন সুনাগরিক তৈরির জন্য রাষ্ট্রের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্র যদি ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয় নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করে তবে সেখানে কোনভাবেই উন্নত সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। বরং অবক্ষয়ের ভয়ঙ্কর রূপ সেখানে ঘুণে পোকার মত তৎপরতা চালায়। উপরন্তু আমরা দেখতে পাই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী সর্বগ্রাসী রূপ থেকে কোন কিছুই রক্ষা পায় না। আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়ঙ্কর অধঃপতনের অন্যতম একটি কারণ হলো এই রাষ্ট্রীয় অনাচার ও দায়িত্বহীনতা। ধর্মীয় অনুশাসন এবং নৈতিকতা চর্চার ক্ষেত্রগুলো যেভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার কথা সেটাতো আমাদের মত দেশে পাওয়া যায়ই না; বরং অসৎ উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করতে দেখা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্ম চর্চা তথা নৈতিকতার চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। ধর্ম ও ধর্মের শিক্ষাকে মসজিদের মধ্যেই গণ্ডিভূত করতে দেখা যায়। সমাজে যদি অন্যায় কাজ করে কেউ পার পেয়ে যায় তাহলে অন্যরাও তাতে উদ্বুদ্ধ হয় বা উৎসাহিত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আমরা এরই বাস্তবায়ন দেখছি! এখানে একটি বড় অংশ অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে; বহাল তবিয়তে মাথা উঁচু করে বসবাস করছে। এমনকি অন্যায়কারীরা সমাজের অনেক বড় স্তরে বসে আছে। সেইসব অন্যায়কারী সমাজের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরা নীতির কথা বলে যখন নীতিবিরোধী কাজ করেন তখন তার কথা তো আর কার্যকর হতে পারে না। আমাদের সমাজে আজ অন্যায়কারীরা তিরস্কারের পরিবর্তে পুরস্কৃত হচ্ছে আর যারা ন্যায়ের পথে চলতে চান, নীতি-নৈতিকতার চর্চা করতে সচেষ্ট তারা প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটি ভয়ংকর একটি ব্যাপার, এইরূপ সমাজে গুণী জন্মাতে পারেন না!

তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার
বর্তমানে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে প্রযুক্তিনির্ভর একটি জেনারেশন গড়ে উঠেছে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক অসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাচারিতার ফলে এ তথ্যপ্রযুক্তির চরম অপব্যবহার সামাজিক অবক্ষয়ের এক অন্ধকার দিকের সূচনা করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই অন্ধকার দিকটি সংক্রামক ব্যাধির মতো যুব শ্রেণীর চরিত্র ধ্বংস করে চলেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নতুন প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গেম/পর্ণ আসক্তিতে জড়িয়ে শুধু ভয়ানক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে না; নিজেদের সমস্ত সম্ভাবনাকে তারা ধ্বংস করে চলেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের ভবিষ্যৎকেই যেন শেষ করে ফেলছে।

মাদকের ভয়াল ছোবল যুবসমাজকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। মাদকের ভয়াবহতা
মাদকের ভয়াল ছোবল যুবসমাজকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের উদাসীনতা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে যুবকদের বুদ করে রাখার মানসিকতার ফলে সমগ্র দেশ আজ মাদকের করাল গ্রাসের শিকার। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা নিজের অজান্তে, আবার কখনো পরিস্থিতির চাপে এ অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে চলেছে। ফলে অসুস্থ এক প্রজন্ম গড়ে উঠেছে যারা মাদক এর জন্য যে কোন ভয়ংকর কর্মে জড়াতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে মাদকের জন্য বাবা-মাকে পর্যন্ত খুনের ঘটনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ রূপ তুলে ধরেছে।
উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে সহজে বলা যায় যে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আমাদের সমাজ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে। জাতির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি যুবকদের চরিত্র হননের মাধ্যমে একটি সেবাদাস পঙ্গু জাতিগঠনের হীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অত্যন্ত সুকৌশলে এ সমস্ত মানবতাবিরোধী ও ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এ সমস্ত কিছুর অবতারণা বলে সচেতন মহল মনে করেন। একটি আত্মভোলা, দিক-নির্দেশনাহীন জাতি গঠনের জন্যই সুপরিকল্পিত এ ষড়যন্ত্র।
আমরা যত দ্রুত এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারবো আমাদের ততোই মঙ্গল। এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি; এখনো সবকিছু ঢেলে সাজিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। সামাজিক অবক্ষয় বা নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য আমাদের সবাইকে ভূমিকা পালন করতে হবে। এখানে সমাজের ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পারিবারিক বন্ধন জোরদার করে পরিবার থেকে বাচ্চাদের ছোট থেকেই ধর্মচর্চা ও নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। এরপর স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে এসব বিষয়কে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এ ছাড়া সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে সৎকাজের; আর মন্দ কাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ ঘটাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একমাত্র ধর্মীয় অনুশাসনের যথাযথ চর্চাই এ থেকে আমাদের মুক্ত করতে পারে। পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা ও মূল্যবোধের চর্চার দিকটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ পরিমণ্ডলে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং
সদস্যসচিব, শত নাগরিক, রাজশাহী

SHARE

Leave a Reply