সাম্প্রদায়িকতা আমদানি ও সীমান্ত হত্যা

তানভীর আহমেদ

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ গত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। শেখ হাসিনা গত মেয়াদে যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি অর্থব্যয়ে এদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কিত পুস্তিকা ছাপিয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ দূতাবাস মারফত বিতরণ করা হয়েছিল। এসব প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২০০০ সালে বাংলাদেশ সফরে এলে নিরাপত্তাজনিত কারণে রাজধানীর পাশে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যেতে পারেননি। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ সেই প্রচারণা অব্যাহত রেখেছিল।
আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই নানারকমভাবে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার রাষ্ট্রটি নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য সারা বিশ্বে বিশেষ পরিচিতি লাভ করলেও উল্টো তারাই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী জঙ্গিবাদী, সাম্প্রদায়িক ও অকার্যকর দেশ হিসেবে চিত্রিত করার জন্য সর্বপ্রকারে চেষ্টা করে থাকে। এদেশে ভারতীয় শাসকশ্রেণীর ঘনিষ্ঠতম মিত্র আওয়ামী লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার শেষ উপায় হিসেবে দিল্লির ব্যবহৃত কৌশলই যে পুনর্বার গ্রহণ করেছে, সেটা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পেছনে কারা প্রকৃত দায়ী, সে বিতর্কে না গিয়ে একথা পরিষ্কারভাবেই বলা যায় যে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষ নতুন মাত্রা লাভ করেছে। পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন লাভের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির প্রচারণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে লাভবান হয়েছে। আমাদের দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বকালীন মাথাচাড়া দিলেও, অপরাধীদের দমনে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের প্রথম দিকের সিদ্ধান্তহীনতা দ্বারা আওয়ামী লীগই উপকৃত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে এদেশে নব্বইয়ের দশকে সৃষ্ট সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সংসদে সরকারদলীয় হুইপ মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শায়খ আবদুর রহমান, বাংলাভাই ও তাদের সহযোগীদের চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। জেনারেল মইন ও ড. ফখরুদ্দীনের যৌথ নেতৃত্বাধীন ছদ্মবেশী সামরিক জান্তা পূর্ববর্তী সরকারের বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসি কার্যকর করে। তবে কিছু ব্যক্তিকে ফাঁসি দেয়া হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর আজ পর্যন্ত অজানা রয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি জেলায় প্রায় একই সময়ে এতগুলো বোমা স্থাপন এবং বিস্ফোরণ ঘটানোয় দেশী-বিদেশী মদতদাতা কারা ছিল? বোমার সরঞ্জাম কোন্ দেশ থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল? জঙ্গিগোষ্ঠীর অর্থায়নের পেছনেই বা কারা ছিল? বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সরকার তাদের শাসনের প্রায় চার বছরে সেসব রহস্য উদঘাটনে কোনোরকম উৎসাহ না দেখিয়ে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অব্যাহতভাবে দেশে-বিদেশে জঙ্গিতত্ত্ব ফেরি করে চলেছে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গত পৌনে চার বছরের দুর্নীতি, জুলুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা হরণসহ সার্বিক অপশাসনে গণবিচ্ছিন্ন মহাজোটকে তাই আবারও জঙ্গির গল্পেই ফিরে যেতে হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য ইসলামী জঙ্গিবাদের দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন। পশ্চিমাদের কাছে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন। শেখ হাসিনার বক্তৃতা দেয়ার সময় যে গুটিকয়েক রাষ্ট্রের প্রতিনিধি অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন, তারা বিএনপি-জামায়াতকে ঠিকমত না চিনলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার কল্যাণে জেনে গেলেন যে ষোলো কোটি মানুষের এই দেশটি জঙ্গিবাদের ঘাঁটি!
পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকারপ্রধান বিশ্বসভায় যখন নিজ দেশের প্রশংসা করেছেন, সে সময় শেখ হাসিনা দেশকে ডুবিয়ে কেবল নিজ পরিবারের গুণকীর্তনে ব্যস্ত ছিলেন। তার বক্তৃতার মর্মার্থ হচ্ছে, বাংলাদেশে একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তিগতভাবে তার পক্ষেই ইসলামী জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুতরাং, তার সরকার অব্যাহতভাবে লুটপাট করে দেশের সর্বনাশ সাধন করলেও ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমা শাসকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় তাকেই সমর্থন করা আবশ্যক। ২০০৮ সালে অন্তরাল থেকে ভারত যেভাবে নানারকম প্রচারণা চালিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে শেখ হাসিনার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল, একমাত্র তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো গেলেই গাজীপুরমার্কা নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে মহাজোটকে আরও অন্তত পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় রাখা নিশ্চিত হয়। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা দেয়ার দু’দিনের মধ্যেই এদেশে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের প্রাথমিক বাস্তবায়ন দেখা গেল।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কয়েকটি স্থানে যে চরম নিন্দনীয় সাম্প্রদায়িক অশান্তির সূত্রপাত হলো, তার পেছনে ক্ষমতাসীনদের কারসাজি এবং বিদেশী শক্তির উসকানি সমভাবে দায়ী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গত পৌনে চার বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরআন শরীফ এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-কে অবমাননা করার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এক ব্যক্তি কুরআন শরীফ পরিবর্তনের আবদার নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করার ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছে। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ সেখান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিউৎসাহী, আওয়ামী সমর্থক শিক্ষকবৃন্দ ছাত্রীদের বোরকা পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কথিত জঙ্গি দমনের নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা, গুম, রিমান্ডে নির্যাতন, বিনাবিচারে কারাবাসের রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়েছে।
এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গেলে রাজপথে নামতেই দেয়া হচ্ছে না আলেম সমাজকে। অপরদিকে সরকার সমর্থক মাওলানাদের মিছিল করতে কোনো রকম বাধা না দিয়ে রীতিমত পুলিশ প্রহরায় তাদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হচ্ছে।
সরকারের কৌশল এখানে অতি পরিষ্কার। আলেমদের মধ্যকার একাংশকে সরকারের পক্ষভুক্ত করে ভিন্নমতাবলম্বীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের নির্যাতন করার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এভাবেই সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা। পটিয়া ও রামুর সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্যেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে।
মহানবী (সা)-কে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম অবমাননাকর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বে যখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সে অবস্থায় ৯০ শতাংশ মুসলমানের আবাসস্থল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণের ফেসবুকে আল্লাহ, কাবা শরীফ এবং কুরআন অবমাননাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উত্তম কুমার বড়–য়া নামের ওই তরুণ তার ধৃষ্টতার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সেটা বুঝতে পারেনি, একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর কর্তৃক প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতকে ত্বরিত দোষারোপ করায় সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কেই প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য তার উপরিউক্ত মন্তব্য প্রদানের পর ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত না হতেই তিনি বায়বীয় মৌলবাদ এবং অসহায় রোহিঙ্গাদের ওপর এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং বাড়িঘরে প্রায় সারা রাত ধরে আক্রমণ চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং মৎস্যজীবী লীগের নেতাকর্মীরাই মূলত এই তাণ্ডব চালিয়েছে।
পৌনে চার বছরের মহাজোট সরকারের শাসন পদ্ধতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ অভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলেই সচেতন নাগরিকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে উক্তি করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে রাতারাতি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়েছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণের চরম উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের আগেই দুর্ভাগ্যজনক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য সরকার বিরোধী দলকে দায়ী করে যেভাবে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে সরকারের ভূমিকাই অধিকতর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
আজ ধর্মরক্ষার নামে যারা বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দিয়েছে, ভাঙ্চুর করেছে, তাদের আর যা-ই হোক, ইসলামের প্রকৃত অনুসারী বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন পন্থায় ও কৌশলে আগ্রাসন চালাচ্ছে। দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে হবে।

অতিসম্প্রতি ঢাকায় প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই বৈঠক শেষে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান ইউ কে বানসাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার বাহিনী কর্তৃক সীমান্তে নির্বিচারে অসহায় বাংলাদেশীদের হত্যা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন উঠলে তিনি হত্যার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমার দাবি করেছিলেন। বিএসএফ প্রধান সেদিন আরও বলেছিলেন যে, তার বাহিনী নাকি অনন্যোপায় হয়ে কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই বাংলাদেশীদের মেরে থাকে।
অসহায় কিশোরী ফেলানী আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং তার খুনে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের জন্য কী ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল কিংবা তার লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখে ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনীর কথিত আত্মরক্ষায় কী সুবিধা হয়েছে, সে প্রশ্ন উপস্থিত সাংবাদিকদের কেউ করেছিলেন কিনা, জানা নেই। ইউ কে বানসাল ঢাকা ছেড়েছেন মাসখানেক হচ্ছে। মাত্র এই ক’দিনের মধ্যে বিএসএফ আরো প্রায় ৭ জন বাংলাদেশীকে হত্যা, কয়েক ডজনকে আহত এবং ডজনেরও অধিক অপহরণ করেছে। অপহরণকৃতদের মধ্যে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। এ কয়দিনে বিএসএফ সীমান্তে যে নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, সেটা আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এই সময়ের মধ্যে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং বেধড়ক পিটিয়ে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা এবং আহত করা হয়েছে। বিএসএফের মহাপরিচালক ঢাকা বৈঠক থেকে সীমান্ত হত্যা কমানোর পরিবর্তে নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর লাইসেন্স আদায় করে গেছেন কি-না, সঙ্গত কারণেই সে সম্পর্কে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা এলে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ না করে উপায় থাকে না। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান দুই স্তম্ভ বিডিআর এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একসঙ্গে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রথমে বিডিআর সৈনিকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে নির্যাতন ও হত্যা করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। পরবর্তীকালে সেই করুণ ও ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করেই বিডিআরের নাম-নিশানা পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মুছে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর সদস্যদের আবেগকে মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিডিআর নাম পরিবর্তন করে রহস্যজনকভাবে মহাজোট সরকার বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) আমদানি করেছে। বিডিআর নামের প্রতি এই আক্রোশ কোনো প্রকৃত বাংলাদেশীর অন্তরে লালন করার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধ্বজাধারীদের প্রকৃতই সেই চেতনার প্রতি কোনোরকম আনুগত্য অথবা শ্রদ্ধাবোধ থাকলে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি দেশপ্রেমিক, লড়াকু বাহিনীর নাম এভাবে পরিবর্তিত হতো না। সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে শতকরা কতজন বিডিআরের নাম পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন, সে তথ্য না থাকলেও যারাই পক্ষে থাকুন না কেন, তারা আবেগতাড়িত হয়ে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের কূট কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছেন বলেই মনে হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সীমান্ত রক্ষায় বিডিআর অতুলনীয় বীরত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। ২০০০ সালে পাদুয়া এবং রৌমারীতে বিএসএফের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিডিআর সদস্যদের সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার বীরত্বপূর্ণ কাহিনী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। আজ বিডিআরের পরিবর্তে বিজিবি নামকরণে যারা কলকাঠি নেড়েছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঐতিহ্যকেই পদদলিত করেছেন।
যখন বিডিআর সদর দফতরে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছিল, সেই সময়ই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দানকারীদের একাংশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, মধ্যাহ্নের আহার গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে তৎকালীন সেনাপ্রধান, এক-এগারোর দোর্দণ্ড প্রতাপ জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সহকর্মীদের রক্ষার কোনো রকম পদক্ষেপ গ্রহণ না করে বিস্ময়করভাবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে বসে থেকে কালক্ষেপণ করেছেন। আজ অনেকটা আকস্মিকভাবে এক-এগারো নিয়ে সেই অসাংবিধানিক সরকারের সর্বাপেক্ষা সুবিধাপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর নেতিবাচক মন্তব্য শুনলে বিস্ময়ের কোনো সীমা থাকে না। বিডিআর বিদ্রোহ ঘটার পর সেনাবাহিনী তাদের মতো করে সেই বিদ্রোহের বিচার করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ আইনে ফৌজদারি মামলাও চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার দেশী-বিদেশী চক্রান্তের রহস্য অদ্যাবধি অনুদঘাটিত রয়ে গেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপদেষ্টাদের ভারত সফরের ধুম পড়ে গেছে। গড় হিসাব কষলে মহাজোটের রাষ্ট্র পরিচালনার ৪৬ মাসের প্রতি মাসেই হয়তো অন্তত একজন হোমরা-চোমরার দিল্লি সফরের বৃত্তান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে। এদের মধ্যে দেশে ফিরে যারাই ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের জয়গানকল্পে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের কাছ থেকে প্রতিবার একই গল্প শোনা গেছে। এখন থেকে সীমান্তে আর বাংলাদেশীদের হত্যা করা হবে না, বুলেটের পরিবর্তে বিএসএফ রাবার বুলেট ছুড়বে- এ জাতীয় কথা শুনতে শুনতে আমাদের কান ঝালাপালা হয়েছে। কিন্তু হত্যাযজ্ঞে কোনো রকম ভাটা পড়েনি। সীমান্তে দেশের অসহায় নাগরিকদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে।

SHARE

Leave a Reply