সার্নের গবেষণায় ঈশ্বরকণার সন্ধান

গোলাপ মুনীর

চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে অনুসন্ধানী গবেষণার পর সার্নের গবেষক-বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞানের সেই সোনার হরিণÑ হিগস বোসন। সার্নের বিজ্ঞানীরা গত ৪ জুলাই, ২০১২ ঘোষণা দিয়েছেন এরা একটি নতুন অতি পারমাণবিক কনা বা সাব অ্যাটোমিক পার্টিকলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। আর এই নতুন কণা ইতোমধ্যেই সুপরিচিত হয়ে ওঠা ‘ঈশ্বরকণার’ সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে এই কণাকে ‘হিগস বোসন কণা’ হিসেবে দাবি না করলেও সার্ন নামের ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থাটি বলছে, এর কাঠামো ও আচরণ হিগস বোসন কণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হিগস বোসন কণা বিশ্বের সৃষ্টি রহস্যসহ অনেক প্রশ্নের সমাধান দিতে পারে। এই আবিষ্কারকে তাই মানব সভ্যতার জন্য এক মাইলফলক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিগ ব্যাং নামের মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্বের সূচনা পর্বে মহাবিশ্ব গঠনে যে কণাটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সেটি হচ্ছে এই হিগস বোসন কণা। আর এর নাম দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগসের নামের শেষাংশ এবং বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের নামানুসারে।
গড পার্টিকল বা ঈশ্বকণার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত জানা গেলে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর কিভাবে মহাবিশ্ব, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ তৈরি হয়েছিল, এমনকি কিভাবে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিলÑ সেসব রহস্যের উদঘাটন সম্ভব হবে, এসব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এই কণার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাননি। হিগস বোসন কণাকে পদার্থের ভারের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। ভর না থাকলে পরমাণু ও যে কোনো বস্তু গঠনকারী মৌলিক কণাগুলো আলোর গতিতে ছুটে বেড়াতো। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কোনো বস্তু সন্নিবদ্ধ থাকত না। কণা পদার্থবিদ্যা বা পার্টিকল ফিজিক্সে বোসন হচ্ছে দুই ধরনের মৌলিক অতি পারমাণবিক কণার একটি। আর হিগস বোসন হচ্ছে কণা পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে বর্ণিত অনুমিত (সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত) প্রাথমিক কণা।
জেনেভার কাছাকাছি ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে রয়েছে ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র সার্ন (ঈঊজঘ)। এ সার্ন মাটির নিচে সুরঙে বিগ ব্যাংয়ের ‘মিনি সংস্করণ’ সৃষ্টির চেষ্টায় আলোর গতির কাছাকাছি অতি উঁচু মাত্রায় কণিকাগুলোর সংঘর্ষ ঘটায়। সার্ন বিজ্ঞানীরা দুই দফায় তাদের এই পরীক্ষা চালান। সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডরের ২৭ কিলোমিটার ডিম্বাকৃতির সুড়ঙ্গপথে আলোর গতির কাছাকাছি ১ ন্যানো সেকেন্ডে ৭ বিলিয়ন বিলিয়ন (৭০০০০০০০০০,০০০০০০) ইলেকট্রন ভোল্ট ক্ষমতায় এই পরীক্ষা চালানো হয়। দুই দফা এই পরীক্ষা চালানো সার্ন গবেষকদলের মুখপাত্র জো ইনকান্ডেলা জেনেভার সার্নে গত ৪ জুলাই এই নতুন কণা আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটি প্রাথমিক ফলাফল। তবে আমরা মনে করি এ ফলাফল যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। এই কণা আসলেই হিগস বোসন না সম্পূর্ণ নতুন কোনো কণা এ বিষয়ে এখনো সার্ন বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন। যদি দ্বিতীয়টি সঠিক হয়, তা হলে মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আবার নতুন করে ভাবতে হবে। পিটার ওয়ার হিগস ১৯৬৪ সালে এ কণার ধারণাগত ভিত্তি প্রকাশ করেছিলেন। নতুন এ আবিষ্কারের খবরে তিনি উল্লসিত। এক বিবৃতিতে ৪ জুলাই, ২০১২ তিনি বলেছেন, ‘আমি কখনোই প্রত্যাশা করিনি আমার জীবদ্দশায় এটি ঘটবে।’
হিগস বোসনের অস্তিত্ব আবিষ্কার পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে বৈধতা দিতে পারে। মহাবিশ্ব কিভাবে চলছে, সে বিষয়টি ব্যাখ্যায় এই মডেল একটি সফল তত্ত্ব। তবে এর মধ্যে কিছু প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আছে তা হলো কিছু কণার ভর থাকলেও অন্যগুলোর কেন নেই?
পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্ব মূলত ১২টি মৌলিক কণা দিয়ে গঠিত এবং চারটি মৌলিক শক্তি এই কণাগুলোর আবরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এগারটি মৌলিক কণার খোঁজ আগেই পাওয়া গেছে। বাকি ছিল কেবল এই হিগস বোসন। কাজেই হিগস বোসন কণার আবিষ্কার তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার জন্য এক বিরল যুগান্তকারী ঘটনা। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের কোনো সন্দেহ নেই। সে জন্য এ আবিষ্কারে অভিভূত হিগস নিজেও। সত্যেন বসু বেঁচে থাকলেও তিনিও অভিভূত হতেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিগস বোসন আবিষ্কার সম্পর্কে আমরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও এ আবিষ্কার যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। বলা যায় এ আবিষ্কার ৯৯.৯৯৯৯… শতাংশ সঠিক। তবে বিজ্ঞানীরা এও বলছেন এ আবিষ্কারের পরও আমাদের আরো অনেক কিছুই জানতে শিখতে হবে। ব্রিটেনের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সের পদার্থবিদ পিটার নাইট বলেন, এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমরা একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলাম, সেই সাথে সূচনা করলাম নতুন আরেক অধ্যায়ের। সার্নের বিজ্ঞানী বুচমুয়েলার বলেন, ‘আমাকে যদি বাজি ধরতে হয়, তবে আমি বাজি ধরে বলতাম, আসল বাজিটা ধরেছিলেন পিটার হিগস।
কিন্তু এ সম্পর্কে সুনিশ্চিত করে বলতে পারিনি। এ যেনো এক ধোঁয়াশের পাতিহাঁস, যা হিগসের মতো প্যাক প্যাক ডাক ছেড়ে চলছে। তাই এখন এ বিষয়ে আমাদেরকে আরো উদঘাটন করতে হবে। এর ভেতরের সব রহস্য জানতে হবে, যাতে আমরা বলতে পারি হ্যাঁ হিগসের ধারণাই সঠিক।
লন্ডন ইম্পারিয়্যাল কলেজের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার প্রধান জোরোমি গাউন্টলেট বলেন, সার্ন আরো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ‘ডার্ক মেটার’ সম্পর্কে আমাদের জানাতে পারে। তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের অভিমত, মহাবিশ্বের অকেনটাজুড়ে রয়েছে ডার্কমেটারের অস্তিত্ব। তাদের পরীক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব চার মাত্রিকতা সম্পর্কে, দূর করা সম্ভব আইনস্টাইন বর্ণিত বৃহত্তর মহাবিশ্ব ও কণার অতি পারমাণবিক জগৎ সম্পর্কিত বৈপরীত্য।
ব্রিটেনের সায়েন্স অ্যাকাডেমি রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট পল নার্স বলেছেন, ‘এ আবিষ্কারের দিনটি বিজ্ঞান ও মানবজাতির অর্জনের একটি বড় দিন। … আজ মহাবিশ্ব গঠনকারী উপাদানকে জানার, বোঝার একদম কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি।’
সুইজারল্যান্ডের সার্নে ৪ জুলাই, ২০১২ আয়োজিত এক সেমিনারে হিগস বোসন আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। এ সেমিনারে সার্নের ডিরেক্টর জেনারেল রলফ ডিটার হিউয়ার বলেন, ‘একজন অপেশাদার সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার মনে হয় আমরা তা পেয়ে গেছি। কিন্তু যখন সাংবাদিকেরা এরপর তার কাছে জানতে চাপাচাপি করেন, এটি আসলে কী, তখন বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তখন তিনি বলেন, ‘আমরা বোসনের সন্ধান পেয়েছি, এখন খুঁজে দেখব বোসন জিনিসটা কী।’ প্রশ্ন আসে, এটি যদি হিগস বোসন নাই হয়, তবে এটা কী হতে পারে? এ সম্পর্কে জানার অনেক বাকি থাকলেও সার্ন বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে এ সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাদের জানিয়েছেন।
সিএমএস-এর বিবেক শর্মা বলেছেন, আমরা জানি এটি এক ধরনের বোসন। কণা পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে দুই ধরনের মৌল কণা রয়েছে। একটি ফারমিয়নস, যার মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রন, কোয়ার্ক ও নিউট্রিনস। অপরটি বোসন, যার মধ্যে রয়েছে ফোটন এবং ড আর ু বোসন। হিগস একটি বোসন। এবং আমরা জানি নতুন কণাটিও একটি বোসন। কারণ, এটি যেসব বস্তু ক্ষয় করে, তার মধ্যে আছে এক জোড়া হাই-এনার্জি বা প্রবল শক্তিধর ফোটন, অথবা গামা রশ্মি। গাণিতিক প্রতিসাম্য (ম্যাথামেটিক্যাল সিমেট্রি) অনুযায়ী, একটি মাত্র বোসন মিলিয়ে যেতে পারে ঠিক অন্য দুটি ফোটনে।
নতুন সন্ধান পাওয়া এই কণা সম্পর্কে আর কী বলতে পারি? এর সম্পর্কে আমরা বলতে পারি, এটি এখনো কোনো কিছুই নির্দেশ করে না যে, এটি হিগস নয়। আমাদের জানা কণাগুলোও এগুলোর ওপর কার্যকর বল সম্পর্কে স্ট্যান্ডার্ড মডেল পূর্বাভাস দেয়, কী হারে, একটি সুনির্দিষ্ট ভরের বস্তুর হিগস বিভিন্ন কণায় ক্ষয় হবে। ৪ জুলাই সন্ধান পাওয়া নতুন কণা ক্ষয় হওয়ার যে হার দেখতে পাওয়া গেছে, তা ঠিক পূর্বঘোষিত ১২৫ গিগাইলেকট্রোভোল্টস নয়। ফলে সন্দেহ থেকে যায়, এতে বহিরাগত উপাদানও রয়েছে। এখানে যদি ১২৫ গিগাইলেকট্রোভোল্ট হিগসের মতো কোনো উপাদান থাকে, তখন এর ক্ষয়ের হার কতটুক হওয়া উচিত এ প্রশ্ন বিবেক শর্মারত্ত। কিন্তু ডিকে রেট বা ক্ষয়হারের মধ্যে পার্থক্য এতটাই কম যে আরো কয়েকটি উপাত্ত নিলে অমিলটা কেটেও যেতে পারে। এখানে মারাত্মক কোনো অসামঞ্জস্য নেইÑ বললেন ইনকালড্রেলা, যিনি সিএস-এর প্রধান। হিগস বোসনের সন্ধান পাওয়ার সাম্প্রতিক ঘোষণা তিনিই দেন।
নতুন পাওয়া এ কণাকে হিগস বোসন বলতে গেলে পর্যাপ্ত কী প্রমাণ দরকার? যেহেতু আমাদের রয়েছে নানা ধরনের হিগস তবে এ প্রশ্নের সহজতর একটি উত্তর হচ্ছে : কী করলে এই কণা স্ট্যান্ডার্ড মডেলে হিগস বোসনের ভূমিকা পালন করতে পারে? প্রথমটি হলোÑ হিগস ফিল্ডের মাধ্যমে অন্য ভরকণা দেয়া হিগস ফিল্ডে একটি পার্টিকলের চেয়ে অন্য পার্টিকলকে ধার করে দেয়। যে পার্টিকলের মাধ্যমে এই ফিল্ড তৈরি হয়, তা অবশ্যই স্ক্যালার হতে হবে। হবে ভেক্টর ফিল্ডের বিপরীত। এর অর্থ এই ফিল্ড চুম্বকক্ষেত্র ও অভিকর্ষক্ষেত্র থেকে আলাদা। এর কোনো দিক মাত্রা নেই। শুধুমাত্র একটি স্ক্যালার বোসন এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে। কখন আমরা জানব, এটি একটি স্ক্যালার বোসন? সার্নের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বছরের শেষের দিকে কমপক্ষে এর একটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম সম্পর্কে আমরা জানতে পারব। নতুন পাওয়া এ কণার এই ধর্ম হচ্ছে এর ংঢ়রহ, যা এ বছরই নির্ণয় করা সম্ভব হবে। স্ক্যালারগুলোর দিক বা ডিরেকশনালিটি নেই। এর অর্থ হচ্ছে এগুলোর এর স্পিন ০। যেহেতু আমরা জেনেছি এটি একটি বোসন, অতএব এর স্পিন হবে একটি পূর্ণসংখ্যা এবং এটি মিলিয়ে যায় দুটি ফোটনে। গাণিতিক প্রতিসাম্য আবার জানিয়ে দেয়, এর স্পিন ১ হতে পারবে না। লার্জ হ্যাড্রল কলাইডারের বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করতে সক্ষম হবেন এর স্পিন ঙ না ২ । বেশির ভাগ মানুষই মনে করে এটি স্ক্যালার, তবে এটি এখনো প্রমাণের অপেক্ষায়। বিবেক শর্মা প্রবল বিশ্বাসী, এটি একটি স্ক্যালার বোসন। কারণ, ২ স্পিনওয়ালা বোসন গঠন খুবই কঠিন কাজ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

 

SHARE

1 COMMENT

Leave a Reply