সাহস আছে যার সাফল্যের বিজয়মুকুট তার -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

পৃথিবীটা সত্যিই সাহসী মানুষের জন্য। ভিতু কাপুরুষের জন্য পৃথিবীটা আজাবের কারাগার। সাহস নিয়ে হিম্মতের সাথে পথ চলতে পারলে সফলতা সুনিশ্চিত। আর ভয়ে ভিতু হয়ে চলার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। যারা সাহস নিয়ে পথ চলেছে তারাই পৃথিবীকে জয় করতে পেরেছে। যুদ্ধজয় থেকে শুরু করে সমুদ্রজয়, পর্বতারোহণ কিংবা বিশ্বজয়- সকল ক্ষেত্রেই সাহসী মানুষ সুখের হাসি হেসেছে। আর ভিতুরা পলায়নপর হয়ে নিজেদের মধ্যেই নিজেরা হারিয়ে গেছে। সাহস যে শুধু যুদ্ধ কিংবা বিশ্বজয়ের জন্য প্রয়োজন তেমনটিই শুধু নির্ধারিত নয় বরং ছোট হোক কিংবা বড় প্রতিটি  কাজেই সাহসের প্রয়োজন আছে। নিজের মতপ্রকাশেও সাহসিকতার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সাহস না থাকলে সত্য আড়ালে থেকে যায়, ধামাচাপা পড়ে যায়। সাহস করে সত্য কথা বলতে পারা আর চুপ থাকা দুটোর মধ্যেই রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বরং চুপ থেকে শুধু মনে মনে ঘৃণা করাকে দুর্বল ঈমানের পরিচয় বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, তোমরা কেউ যখন কোনো খারাপ কাজ হতে দেখবে তখন হাত দ্বারা বাধা দেবে, যদি সেই সামর্থ্য না রাখ, তাহলে মুখ দিয়ে নিষেধ করবে, যদি এ সামর্থ্যও না রাখ, তাহলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে। আর এটা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম স্তর। (মুসলিম)
শুধুমাত্র চুপ থেকে মনে মনে ঘৃণা করে যেমন খারাপ কাজকে বন্ধ করা যায় না, তেমনি সাহস না থাকলে মিথ্যার ওপর সত্যকে বিজয়ীও করা যায় না। পৃথিবীতে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। মিথ্যাবাদীরা নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে সত্যবাদীদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে রাখতে চায়। কিন্তু তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য যদি সত্যবাদীরা সাহসী হয়। জুলুম-নির্যাতন আর নিপীড়নকে উপেক্ষা করে সত্যের পথে অবিচল টিকে থাকতে পারে সে, যে সাহসের সাথে হিম্মতের দ্বারা পথ চলতে পারে। তাইতো রাসূল সা: সাহস করে সত্য বলতে পারাকে উত্তম জিহাদ বলেছেন। হযরত আলী রা: থেকে বর্ণিত,  রাসূল সা: বলেছেন- অত্যাচারী শাসকের সামনে সাহস করে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (তিরমিজি)
ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ ছিলেন, দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক রা:। তার নির্ভীক সাহসিকতাই তাকে অর্ধ পৃথিবীর শাসক বানিয়েছিল। অর্ধ পৃথিবীর নেতৃত্ব ও রাজত্ব করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন সাহসের সাথে পথ চলতে পারার কারণেই। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি যেমন সাহসী ছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর তার সাহস একটুও কমেনি বরং তা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। কাফিরদের জুলুম-নির্যাতনের কারণে প্রকাশ্যে যেখানে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, সেখানে ইসলাম গ্রহণের পর হযরত ওমর রা:-ই প্রথম কাবার চত্বরে উচ্চস্বরে প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন তার ইসলাম গ্রহণের কথা। যেটা আর অন্য কারো পক্ষে সম্ভব ছিলো না। শুধু কি তাই? তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মক্কার কোরাইশদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পবিত্র কা’বা ঘরে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করেন। ওমর রা: এর এমন সাহসিকতায় মক্কায় ইসলাম প্রচারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হযরত ওমরের ভয়ে পাপিষ্ঠ আর মোনাফিকরা থরথর করে কাঁপত। তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস কেউ রাখত না। ওমর রা: মানেই একজন দুঃসাহসী মানুষের নাম। ওমর মানেই নির্ভীকচেতা এক আদর্শ মানব। একমাত্র আল্লাহ এবং তার রাসূল সা:-কে ছাড়া তিনি আর কাউকেই পরোয়া করতেন না। ভয় নামক শব্দটিকে যিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে জানেন তিনিই হযরত ওমর রা:। ভয়ে ভীত না হয়ে ওমর রা: সাহসিকতার যে পরিচয় দিয়েছিলেন তার প্রতিফলন ঘটেছিল ইসলাম প্রচারে।
‘সাহস আছে যার সাফল্যের বিজয়মুকুট তার’- এ কথাটি বাস্তবিক অর্থেই সত্য। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে এক সাহসী যুবকের বিজয় অভিযান সে কথারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করেছিল।  সাহসের সাথে লড়াই করে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই সিন্ধু বিজয় করে সেই অবিস্মরণীয় বিজয় উপাখ্যান যে যুবক রচনা করেছিলেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন তরুণ উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মতো এক তরুণ যুবকের সাহসী বিজয় উপাখ্যান শুধুমাত্র সিন্ধুকেই পদানত করেনি বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিজয়কেতন উড়ানোর শুভ সূচনা করেছিল। অথচ তার আগে কোনো মুসলিম বীর ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সিন্ধু অভিযানে সাফল্য অর্জনে সামর্থ্য হয়নি। এক মুহাম্মদ বিন কাসিমের উদ্দীপ্ত সাহসী চেতনা পাল্টে দিয়েছিল বিশাল ভূখন্ডের অগণিত মানুষের জীবনচরিত্রকে। কিশোর কাসিম তাই অকুতোভয় সাহসের জন্য উপাধি পেয়েছিলেন মহাবীরের।
শুধুমাত্র মুহাম্মদ বিন কাসিম কেন? পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে যারাই সাহসের সাথে পথ চলেছেন সাফল্যের বিজয়মুকুট তারাই পরেছেন। কত বেশি নির্ভীক এবং অসীম সাহস থাকলে তারিক বিন জিয়াদের মত একজন সেনাপতি মাত্র গুটিকয়েক নিরস্ত্র সৈন্য নিয়ে রাজা রডরিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সশস্ত্র সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্পেনের মত রাজ্য বিজয় করতে পারে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জুলাই মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে যে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন তা সাফল্যের স্বর্ণশিখরে লিখিত থাকবে কাল থেকে কালান্তর। প্রতিটি বিজয়ই রোমাঞ্চকর। কিন্তু সব বিজয়েই উপাখ্যান রচিত হয় না। স্পেন বিজয় করতে গিয়ে তারিক বিন জিয়াদ যে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা শুধুমাত্র ইতিহাসে নয়া উপাখ্যানই রচনা করেনি বরং বিস্মিত করেছে গোটা বিশ্বকে। অত্যাচারী রাজা রডরিকের সৈন্য সংখ্যা তাকে মোটেও বিচলিত করেনি। বরং তিনি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সাগর উপকূলে স্পেনের মাটিতে পা রেখেই সব সৈন্যকে নামিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন তাদের বয়ে আনা জাহাজগুলো! তারপর সৈন্যদের লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, প্রিয় বন্ধুগণ, আমাদের পিছু হটবার বা পলায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সম্মুখে দুশমন আর পশ্চাতে সমুদ্র। আমাদের সামনে এখন স্পেন, আর অত্যাচারী রডরিকের বিশাল বাহিনী আর পেছনে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশি। আমাদের সামনে দু’টি পথ খোলা। হয় লড়তে লড়তে জয়ী হওয়া, শাহাদতের মর্যাদায় সিক্ত হওয়া কিংবা সাগরের উত্তাল তরঙ্গমালায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাপুরুষের মতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। সেদিন সাহসী দীপ্ত ভাষণে অনুপ্রাণিত তার সাথীরা কাপুরুষোচিত মৃত্যুকে পায়ে ঠেলে শাহাদতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে বীরবিক্রমে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। তারিক বিন জিয়াদের সেই সাহসী সিদ্ধান্ত গোটা স্পেনে ইসলামের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
সাহস থাকলে ছোট্ট কিশোররাও বিজয়মুকুট ছিনিয়ে আনতে পারেন। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছোট্ট দুই কিশোর সাহাবী হযরত মুয়াজ বিন আমর রা: এবং মায়াজ বিন আফরা রা:। যারা বুকে দুর্দান্ত সাহস নিয়ে বদরের যুদ্ধে ইসলামের চিরশত্রু দুর্ধর্ষ কোরাইশ যোদ্ধা এবং কাফিরদের প্রধান সেনাপতি আবু জাহেলকে খতম করেছিলেন। ছোট্ট দু’জন কিশোর মিলে অসীম সাহসিকতার যে পরিচয় বদরের প্রান্তরে সেদিন দিয়েছিলেন তা সত্যিই এক বিস্ময়কর ঘটনা। বুকে সাহস সঞ্চারিত না হলে দুই কিশোর সাহাবীর পক্ষে সেদিন আবু জাহেলের মত দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকে খতম করা সম্ভব হতো না।
দুঃসাহসী আরেক সাহাবীর নাম হযরত আলী রা:। দুর্দান্ত সাহসিকতার জন্য এই বীরকেশরীকে ‘শেরে খোদা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিলো। হযরত আলী রা: যেমন ছিলেন একজন বীরযোদ্ধা তেমনি ছিলেন জ্ঞানী ও বিদ্বান। শৌর্য-বীর্যের জন্য তিনি ‘আসাদুল্লাহ’ বা আল্লাহর সিংহ উপাধিতে ভূষিত হন। এই বীর সাহসী যোদ্ধা ৩০টি সশস্ত্র জিহাদে বিজয় লাভ করেন। একইভাবে বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতার জন্য হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দেওয়া হয়েছিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা: ছিলেন মুসলিম ইতিহাসে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক মহান সেনাপতি। যিনি রণক্ষেত্রে নিজের সাহস ও শক্তি দ্বারা বাতিলের মূলোৎপাটন করে তাওহিদের ঝান্ডাকে বুলন্দ করেছিলেন। মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতিকে হারিয়ে মুসলিম বাহিনী যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখন খালিদ ইবন ওয়ালিদ রা:-কে সিপাহসালার নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়ে খালিদ রা: অসীম সাহস ও অপূর্ব দক্ষতা প্রদর্শন করে কালিমার বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। এ যুদ্ধে খালিদ রা:-এর ৯টি তরবারি ভেঙে গিয়েছিল। রাসূল সা: তাঁর এই তেজস্বিতা ও সাহসের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন। হযরত খালিদ রা: এমন এক সাহসী যোদ্ধা ছিলেন যে, কোনো যুদ্ধেই তিনি পরাজিত হননি।
সাফল্যের বিজয়মুকুট ছিনিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সাহসিকতা। যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ওমর, আলী, খালিদ, মুহাম্মদ বিন কাসিম আর তারিক বিন জিয়াদের মতো দুঃসাহসী মানুষেরা। প্রতিটি সাফল্যেই সাহস ও হিম্মত তাদের পথচলায় গতি সঞ্চার করেছিল। তাই কৃতিত্ব কিংবা সাফল্য অর্জনে সাহসের সাথে পথ চলার বিকল্প নেই। তবে খালি মাঠে গোল দেওয়া যেমন কৃতিত্বের নয় তেমনি নিরস্ত্র নিরীহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে পরাভূত করে বিজয় ছিনিয়ে আনাকে সাফল্যের বিজয়মুকুট অর্জন বলা যায় না। উত্তাল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দেয়া ছাড়া যেমন একজন নাবিককে দক্ষ ও সাহসী নাবিক বলা যায় না, তেমনি কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া, বাধা অতিক্রম করা ছাড়া বিজয়ী হওয়াকে সাহসিকতার পরিচয় বলে নির্ণয় করা যায় না। ভয়কে জয় করে অসাধ্যকে সাধন করে বিজয়ী হওয়াই হলো সাহসিকতার মূল পরিচয়।
লেখক : কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply