সাহাবী-কবি হাস্সান বিন সাবিত

মোশাররফ হোসেন খান

Mansurসাহাবী-কবি হাস্সান বিন সাবিত (রা)। রাসূলের (সা) যুগের এক শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কবি-খ্যাতি ছিল গোটা আরব জুড়ে। সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হতো তাঁর কবিতার পংক্তি। তিনি রাসূলকে  (সা) পেয়েছিলেন অনেক কাছে। রাসূলের (সা) ভালোবাসাও পেয়েছিলেন অনেক বেশি। রাসূলের (সা) প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত ছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে এক সৌভাগ্যবান কবি ছিলেন হাস্সান বিন সাবিত।
রাসূলকে (সা) তিনি ভালোবাসতেন প্রাণ দিয়ে। তাঁর সেই ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না।
‘তোমার তারিফ’ কবিতায় রাসূলের (সা) প্রতি তাঁর সেই ভালোবাসার দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। যেমন-
‘তোমার চোখের মত ভালো চোখ পৃথিবীতে নেই,
এবং কোনোও মাতা এমন সুন্দর পুত্র আর
প্রসব করেনি জানি বিশ্বে কোথাও।

তোমার সৃজন সে তো একেবারে দোষমুক্ত করে
এবং তুমিও তাই চেয়েছিলে আপন ইচ্ছায়;
তোমার তারিফ এই পৃথিবীতে বেড়েই চলেছে
যেমন কস্তুরী ঘ্রাণ বাতাসে কেবলি ছুটে চলে।

তোমার সৌভাগ্য, যার নেই কোনো সীমা-পরিসীমা
সমুদ্র পানির মতো তোমার হাতের দয়ারাশি
এবং তোমার দান নদীর মতোন বেগে চলে।
আল্লাহ সহায় হোন হে রাসূল তোমার উপরে
কেননা শত্র“রা জ্বলে সর্বক্ষণ তোমার ঈর্ষায়।

তোমার প্রশংসা করি আমার তেমন ভাষা নেই
আমিতো নগণ্য কবি অন্তত : ভাষার দিকে থেকে
প্রশংসা পায় না নবী নিছক আমার এ ভাষায়
নবীর ছোঁয়াচ পেয়ে এ কবিতা অমরতœ পাবে।’
কবি হাস্সান বিন সাবিত হিজরতের প্রায় ঘাট বছর পূর্বে ৫৬৩ খ্রীস্টাব্দে ইয়াছরিবে (মদীনা) জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে নির্মিত মসজিদে নববীর পশ্চিম প্রান্তে বাবে রহমতের বিপরীত দিকে অবস্থিত ফারে কিল্লাটি ছিল তাঁদের পৈত্রিক আবাসস্থল। কবি হাস্সানের কবিতায় এর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি শৈশব থেকে কবি হিসাবে বেড়ে ওঠেন এবং কবিতাকে জীবিকার উৎস হিসাবে গ্রহণ করেন। এটা একটি দৃষ্টান্তমূলক বিসয়ও বটে। প্রাচীন আরবের জিল্লাক ও হীরার রাজপ্রাসাদে কবির যাতায়াত ছিল। তবে গাস্সানীয় সম্রাটদের প্রতি একটু বেশী দুর্বল ছিলেন তিনি। কবি হাস্সানের সাথে তাঁদের একটা গভীর হৃদ্যতার সম্পর্কও গড়ে ওঠে। তিনি তাঁদের প্রশংসায় বহু সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করেছেন। তার কিছু অংশ সাহিত্য সমালোচকগণ হাস্সানের শ্রেষ্ঠ কবিতার মধ্যে গণ্য করেছেন। সম্রাটগণও সেইসব কবিতার প্রতিদানে তাঁর প্রতি যথেষ্ট বদান্যতাও তাঁরা প্রদর্শন করেন। তাঁদের এ সম্পর্ক ইসলামের পরেও বিদ্যমান ছিল। কবি হাস্সান বিন সাবিত যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর জীবনে বার্দ্ধক্য এসে গিয়েছিল। মদীনায় ইসলাম প্রচারের সূচনা পর্বে তিনি মুসলমান হন। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরতের সময় হাস্সানের বয়স ছিল ষাট বছর।
রাসূলুল্লাহর (সা) আর্বিভাব বিষয়ে কবি হাস্সান বলেন : আমি তখন সাত/আট বছরের এক চালাক-চতুর বালক মাত্র। যা কিছু শুনতাম তাই বুঝতাম। একদিন এক ইহুদীকে ইয়াছরিবের একটি কিল্লার ওপর উঠে চিৎকার করে মানুষকে ডাকতে শুনলাম। মানুষ জড় হলে সে বলতে লাগলো : ‘আজ রাতে আহমাদের নক্ষত্র উদিত হয়েছে। আহমাদকে আজ নবী করে দুনিয়ায় পাঠানো হবে।’
কবি হাস্সান বিন সাবিত ছিলেন একজন বাগ্মী ও বীর যোদ্ধা। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। একবার ইবন আব্বাসকে বলা হলো হাস্সান আল লাঈন (অভিশপ্ত হাস্সান) এসেছে। কবি হাস্সান বিন সাবিত বললেন : ‘হাস্সান অভিশপ্ত নন। তিনি জীবন ও জিহ্বা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জিহাদ করেছেন।’
খন্দক মতান্তরে উহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল (সা) মুসলিম মহিলাদেরকে কবি হাস্সানের ফারে দূর্গে নিরাপত্তার জন্য রেখে যান। তাদের সাথে কবি হাস্সানও ছিলেন। এই মহিলাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু সাফিয়্যা বিনত আবদুল মুত্তালিবও ছিলেন। একদিন এক ইহুদীকে তিনি কিল্লার চতুর্দিকে ঘুর ঘুর করতে দেখলেন। তিনি চিহ্নিন্তত হলেন, যদি মহিলাদের অবস্থান জেনে যায় তাহলে ভীষণ বিপদ আসতে পারে। কারণ রাসূল (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তখন প্রত্যক্ষ জিহাদে লিপ্ত। তিনি হাস্সানকে বললেন, এই ইহুদীদেরকে জানিয়ে দেবে। হাস্সান বললেন, আপনার জানা আছে আমার নিকট এর কোন প্রতিকার নেই। আমার মধ্যে যদি সেই সাহসই থাকতো তাহলে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথেই থাকতাম। সাফিয়্যা তখন নিজেই তাঁবুর একটি খুঁটি হাতে নিয়ে ইহুদীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন। সাফিয়্যা লোকটিকে হত্যার পর মাথাটি কেটে এনে হাস্সানকে বলেন, ধর এটা দূর্গের নিচে ইহুদীদের মধ্যে ফেলে এসো। তিনি বললেন : এ আমার কাজ নয়। অত:পর সাফিয়্যা নিজেই মাথাটি ইহুদীদের মধ্যে ছুড়ে মারেন। ভয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
হাস্সান (রা) জিহ্বা দিয়েও রাসূলে কারীমের সাথে জিহাদ করেছেন। বানূ নাদীরের যুদ্ধে রাসূল (সা) যখন তাদেরকে অবরুদ্ধ করেন তখন তাদের গাছপালা জ্বালিয়ে দেন তার সমর্থনে হাস্সান কবিতা রচনা করেন। বানূ নাদীর ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সাহায্য ও সহযোগিতা চুক্তি ছিল। তাই তিনি কবিতায় কুরাইশদের নিন্দা করে বলেন, মুসলমানরা বানূ নাদীরের বাগ-বাগিচা জ্বালিয়ে দিল, তোমরা তো তাদের কোন উপকারে আসোনি। তাঁর সেই কবিতার কিছু অংশ এরকম : ‘যারা কুরাইশদের সাহায্য করেছিল তারা পরস্পর পরস্পরকে হারালো। তাদের নিজের শহরেই তাদের কোন সাহায্যকারী ছিলনা। তারা সেই সব লোক যাদেরকে কিতাব (গ্রন্থ) দান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা তা বিনষ্ট করে ফেলেছে। তারা এখন তাওরাত থেকে অন্ধ হয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে।’
‘তোমরা আল-কুরআন অস্বীকার করেছো। অথচ সতর্ককারী যা বলেছিলেন তার প্রতি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছিলে।
অতএব, বানূ লুআয়-এর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্যে (ইয়াছরীবের) আল-বুওয়ায়রা’ স্থানটি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া সহজ হয়েছে।’
এ কবিতা মক্কায় পৌঁছালে কুরাইশ কবি আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিছ বলেন : আল্লাহ সর্বদা তোমাদের এমন কর্মশক্তি দান করুন, যাতে আশে-পাশের আগুনে খোদ মদীনা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর আমরা দূরে বসে তামাশা দেখবো। আবু সুফিয়ানের সেই কবিতাটির তিনটি শ্লোক এখানে উদ্ধৃত হলো :‘আল্লাহ এমন কাজ চিরস্থায়ী করুন এবং প্রজ্জলিত আগুনে তার চারিপাশকে জ্বালিয়ে দিন। আমাদের মধ্য থেকে কে সেখান থেকে দূরে থাকবে, তুমি খুব শিগগির তা জানতে পারবে। তুমি আরো জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কাদের ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই খেজুর বাগানে যদি যাত্রীদল বা কাফিলা অবস্থান করতো তাহলে তারা বলতো, এখানে তোমাদেরকে অবস্থান করতে দেয়া হবে না। তোমরা চলে যাও।’
পৌত্তলিক কবিদের নিন্দা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অপপ্রচারের জবাব দানের জন্য তৎকালীন আরবের তিনজন শ্রেষ্ঠ কবি মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁরা হলেন হাস্সান ইবন ছাবিত, কাব ইবন মালিক ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। হাস্সান ও কাব প্রতিপক্ষ কবিদের জবাব দিতেন তাদেরই মত বিভিন্ন ঘটনা, যুদ্ধ-বিগ্রহের জয়-পরাজয়, কীর্তি ও গৌরব তুলে ধরে, আর আবদুল্লাহ তাদের কুফরী ও দেব-দেবীর পূজার কথা উল্লেখ করে ধিক্কার দিতেন। হাস্সান (রা) আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি কুরাইশদের অবাধ্যতা ও তাদের মূর্তিপূজার উল্লেখ করে নিন্দা করতেন না। কারণ তাতে তেমন ফল না হওয়ারই কথা। তারা তো রাসূলকে (সা) বিশ্বাসই করেনি। আর মূর্তি পূজাকেই তারা সত্য বলে বিশ্বাস করতো। তাই তিনি তাদের বংশগত দোষ-ত্র“টি, নৈতিকতার স্খলন, যুদ্ধে পরাজয় ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরে তাদেরকে চরমভাবে আহত করতেন। আর একাজে আবূ বকর (রা) তাঁকে জ্ঞান ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন।
প্রাচীন আরবী কবিতার যতগুলি বিষয় বৈচিত্র্য আছে তার সবগুলিতে কবি হাস্সানের (রা) পদচারণা পাওয়া যায়। এখানে সংক্ষেপে তাঁর কবিতার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো :
একথা সত্য যে প্রাচীন আরবী কবিতা কোন উন্নত সভ্যতার মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। তবে একথাও অস্বীকার করা যাবে না, বড় সভ্যতা দ্বারা তা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছে। আরব সভ্যতার সত্যিকার সূচনা হয়েছে পবিত্র কুরআনের অবতরণ ও রাসূলুল্লাহর (সা) আবির্ভাবের সময় থেকে। কুরআন আরবী বাচনভঙ্গি ও বাক্যালঙ্কারের সবচেয়ে বড় বাস্তব মুজিযা। এই কুরআন অনেক বড় বড় বাগ্মীকে হতবাক করে দিয়েছে। একারণে সে সময়ের যে কবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁর মধ্যে বাকপটুতা ও বাক্যালঙ্কারের এক নতুন শক্তির সৃষ্টি হয়। এ শ্রেণীর কবিদের মধ্যে হাস্সান ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। এ শক্তি তাঁর মধ্যে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশী দেখা যায়।
পবিত্র কুরআনে সাহাবায়ে কিরামের গুণ-বৈশিষ্ট্যের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছেÑসিজদার চিহ্নহ্ন তাদের মুখমণ্ডলে স্পষ্ট বিদ্যমান। হাস্সান উক্ত আয়াতকে উছমানের (রা) প্রশংসায় রূপক হিসাবে ব্যবহার করে হত্যাকারীদের ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :
‘তারা এই কাঁচা-পাকা কেশধারী, ললাটে সিজদার চিহ্নহ্ন বিশিষ্ট লোকটিকে জবাই করে দিল, যিনি তাসবীহ পাঠ ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করতেন।’
এই শ্লোকে কবি উছমানের চেহারাকে সিজদার চিহ্নহ্নধারী বলেছেন। তৎকালীন আরবী কবিতায় এ জাতীয় রূপকের প্রয়োগ সম্পূর্ণ নতুন।
আরবী অলঙ্কার শাস্ত্রে তাতবী বা তাজাওয়ায নামে একপ্রকার প্রতীকের নাম দেখা যায়। তার অর্থ হলো কবি কোন বিষয়ের আলোচনা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু অকস্মাৎ অতি সচেতনভাবে তা ছেড়ে দিয়ে এমন এক বিষয়ের বর্ণনা করেন যাতে তাঁর পূর্বের বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। কবি হাস্সানের কবিতায় এ জাতীয় প্রতীক বা ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
আরবে অসংখ্য গোত্র দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে বসবাস করতো। তারা ছিল যাযাবর। যেখানে পানি ও পশুর খাদ্য শেষ হলে নতুন কোন স্থানের দিকে যাত্রা করতো। এভাবে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতো। আরব কবিরা তাদের কাব্যে এ জীবনকে নানাভাবে ধরে রেখেছেন। তবে কবি হাস্সান বিষয়টি যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে বেশ অভিনবত্ব আছে। তিনি বলেছেন :
‘জাফনার সন্তানরা তাদের পিতা ইবন মারিয়্যার কবরের পাশেই থাকে,
যিনি খুবই উদার ও দানশীল।’ প্রশংসিত ব্যক্তি যেহেতু আরব বংশোদ্ভূত। এ কারণে তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করে বলে দিলেন, এরা আরব হলেও যাযাবর নন, বরং রাজন্যবর্গ। কোন রকম ভীতি ও শঙ্কা ছাড়াই তাঁরা তাঁদের পিতার কবরের আশে-পাশেই বসবাস করেন। তাঁদের বাসস্থান সবুজ-শ্যামল। একারণে তাঁদের স্থান থেকে স্থানান্তরে ছুটে বেড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
আরব কবিরা কিছু কথা রূপক অর্থে এবং পরোক্ষভাবে বর্ণনা করতেন। যেমন : যদি উদ্দেশ্য হয় একথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি অতি মর্যাদাবান ও দানশীল, তাহলে তাঁরা বলতেন, এই গুণগুলি তার পরিচ্ছেদের মধ্যেই আছে। কবি হাস্সানের (রা) কবিতায় রূপকের অভিনবত্ব দেখা যায়। যেমন একটি শ্লোকে তিনি বলতে চানÑ ‘আমরা খুবই কুলিন ও সম্ভ্রান্ত।’ কিন্তু কথাটি তিনি বলেছেন এভাবে:
‘সম্মান ও মর্যাদা আমাদের আঙ্গিনায় ঘর বেঁধেছে এবং তার খুঁটি এত মজবুত করে গেঁড়েছে যে, মানুষ তা নাড়াতে চাইলেও নাড়াতে পারে না।’ এই শ্লোকে সম্মান ও মর্যাদার ঘর বাঁধা, সুদৃঢ় পিলার স্থাপন করা এবং তা টলাতে মানুষের অক্ষম হওয়া এ সবই আরবী কাব্যে নতুন বর্ণনারীতি। ছন্দ, অন্ত্যমিল ও স্বর সাদৃশ্যের আশ্চর্য রকমের এক সৌন্দর্য তাঁর কবিতায় দেখা যায়। শব্দের গাঁথুনি ও বাক্যের গঠন খুবই শক্ত, গতিশীল ও সাবলীল। প্রথম শ্লোকের প্রথম অংশের শেষ পদের শেষ বর্ণটি তাঁর বহু কাসীদার প্রতিটি শ্লোকের শেষ পদের শেষ বর্ণ দেখা যায়। আরবী ছন্দ শাস্ত্রে যাকে কাফিয়া বলা হয়। আরবী বাক্যের এ ধরনের শিল্পকারিতা এর আগে কেবল ইমরুল কায়সের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তবে তাঁর পরে বহু আরব কবি নানা রকম শিল্পকারিতার সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। আব্বাসী আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি আবুল আলা মা আরবীর একটি বিখ্যাত কাব্যের নাম ‘লুযূমু মালা ইয়ালযাম’। কবিতা রচনায় এমন কিছু বিষয় তিনি অপরিহার্যরূপে অনুসরণ করেন, যা আদৌ কবিতার জন্য প্রয়োজন নয়। তার এ কাব্যগ্রন্থটি এ ধরনের কবিতার সমষ্টি। এটা তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। কবি হাস্সানের কবিতার আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রায়ই এমন সব শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা ব্যাপক অর্থবোধক। তিনি হয়তো একটি ভাব স্পষ্ট করতে চেয়েছেন এবং সেজন্য এমন একটি শব্দ প্রয়োগ করেছেন যাতে উদ্দিষ্ট্য বিষয়সহ আরো অনেক বিষয় সুন্দরভাবে এসে গেছে। কবি হাস্সানের ইসলামী কবিতা যাবতীয় অতিরঞ্জন ও অতিকথন থেকে মুক্ত বলা চলে। একথা সত্য যে কল্পনা ও অতিরঞ্জন ছাড়া কবিতা হয় না। তিনি নিজেই বলতেন, মিথ্যা বলতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এ কারণে অতিরঞ্জন ও অতিকথন, যা মূলত: মিথ্যারই নামান্তরÑআমি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।
শুধু তাই নয়, তাঁর জাহিলী আমলে লেখা কবিতায়ও এ উপাদান খুব কম ছিল। আর এ কারণে তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি আন-নাবিগা কবি হাস্সানের একটি শ্লোকের অবমূল্যায়ন করলে দুই জনের মধ্যে ঝগড়া হয়।
কবি হাস্সানের এই বিদ্রƒপাত্মক কবিতা শুনে আল-হারেছের দুই চোখে অশ্র“র প্লাবন নেমে আসে। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে ছুটে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং হাস্সানকে বিরত রাখার আবেদন জানান।
কবি হাস্সান (রা) চমৎকার মাদাহ বা প্রশংসা গীতি রচনা করেছেন। আলে ইনানের প্রশংসায় তিনি যে সকল কবিতা রচনা করেছেন তার দুইটি শ্লোক এ রকম :
‘যারা তাদের নিকট যায় তাদেরকে
তারা বারীস নদীর পানি স্বচ্ছ শরাবের সাথে
মিশিয়ে পান করায়।’
এই শ্লোকটিরই কাছাকাছি একটি শ্লোক রচনা করেছেন কবি ইবন কায়স, মুসআব ইবন যুবায়রের প্রশংসায়। কিন্তু যে বিষয়টি হাস্সানের শ্লোকে ব্যক্ত হয়েছে তা ইবন কায়সের শ্লোকে অনুপস্থিত।
অন্য একটি শ্লোকে তিনি গাসসানীয় রাজন্যবর্গের দানশীলতা ও অতিথি পরায়ণতার একটি সুন্দর চিত্র এঁকেছেন চমৎকার ভঙ্গিতে। যেমন :
‘তাঁদের গৃহে সব সময় অতিথিদের এত ভিড় থাকে যে
তাঁদের কুকুরগুলিও তা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
এখন আর তারা অন্ধকার রাতে
নতুন আগন্তুককে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না।’
একবার কবি কাব ইবন যুহায়র একটি শ্লোকে গর্ব করে বলেন : কাবের মৃত্যুর পর কবিতার ছন্দ ও অন্ত্যমিলের কি দশা হবে?
শ্লোকটি শোনার সাথে সাথে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কবি সাম্মাখের ভাই তোমরূয বলে উঠলেন : আপনি অবশ্যই ছাবিতের ছেলে তীক্ষ্মধী হাস্সানের মত কবি নন।
কবি হাস্সানের (রা) সকল কবিতা বহুদিন যাবত মানুষের মুখে মুখে ও অন্তরে সংরক্ষিত ছিল। পরে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়। তাঁর কবিতার একটি দিওয়ান আছে যা ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। তবে এতে সংকলিত বহু কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ইমাম আল-আসমাঈ একবার বললেন : হাস্সান একজন খুব বড় কবি। একথা শুনে আবু হাতেম বললেন : কিন্তু তাঁর অনেক কবিতা খুব দুর্বল। আল-আসমাঈ বললেন : তাঁর প্রতি আরোপিত অনেক কবিতাই তাঁর নয়। ইবন সাল্লাম আল জুমাহী বলেন : হাস্সানের মানসম্পন্ন কবিতা অনেক। যেহেতু তিনি কুরাইশদের বিরুদ্ধে প্রচুর কবিতা লিখেছেন, এ কারণে পরবর্তীকালে বহু নিম্নমানের কবিতা তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়েছে। মূলত: তিনি সেসব কবিতার রচয়িতা নন।
কবি হাস্সান রাসূলকে (সা) অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রাসূলের (সা) প্রতিটি বিষয়ে তিনি খেয়াল রাখতেন এবং রাসূলকে (সা) অনুসরণ করতেন। রাসূলের (সা) কাছ থেকেই তিনি কবিতার প্রেরণা ও প্রণোদনা পেতেন। তাঁর ‘রাহবার’ কবিতাটি সামনে রাখলে আমরা এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট ধারণা করতে পারবো। যেমন :
‘নবীজী আমার
দয়াময়ের দেখান পথ।
যারা করে তাঁর অনুসরণ
জাহান্নামের ভয়াবহতা থেকে তাদের দেন মুক্তি,
দেখান তাদের সঠিক পথ।

সবারই ইমাম তিনি,
সত্যের পথে হিদায়াত করেন কঠোর শ্রমে।
সত্যের শিক্ষক তিনি।

হে আমার কওম, শোন-
তাঁর অনুসরণেই খোলে সৌভাগ্যের দরোজা :
তাঁর আদর্শের উপস্থিতিতেই
পৃথিবী অভিষিক্ত হয় আল্লাহর নিয়ামতে।
সুষমাময় পথের তিনিই রাহবার।

এমন বিপদ আসে যদি
তাদের পক্ষে বহন করা যা দু:সাধ্য
তখন তাঁর কাছেই থাকে সকল কঠিনের সহজ সমাধান।

হিদায়াত থেকে বিচ্যুত হওয়া উম্মতের জন্য
তিনি বড় কষ্ট পান।
তিনিতো কেবলই কামনা করেন
তাঁর উম্মতেরা থাকবে সতত সরল পথে;
থাকবে তারা হিদায়াতের প্রশস্ত রাজপথে অটল, অনড়।’
মূলত কবি হাস্সান ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ সাহাবী-কবি। যার কবিতা আজও গোটা মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে। তাঁর কবিতা আমাদের প্রেরণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাঁর কবিতা আমাদেরকে উজ্জিবীত করে চলেছে। বোধ করি এই ধারা অব্যাহত থাকবে কাল থেকে কালান্তরে।

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

SHARE

Leave a Reply