সাহিত্যের সীমানা -হেলাল আনওয়ার

‘সাহিত্য’ গণ্ডিহীন এক বিশাল-বিপুল বিষয়। এর সীমানা বা অবয়ব নির্ধারণ করা শুধু দুঃসাধ্যই নয় অসাধ্যও বটে। দেশ, কাল, জাতি সময় ভেদে সাহিত্য নির্মাণ হলেও সব সাহিত্যই সার্থক হয় না। মানোত্তীর্ণ সাহিত্যের হায়াত যে কেবল দীর্ঘায়িত হয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যদি সে সাহিত্য বিকৃত ইতিহাসের রসদনির্ভর হয় তাহলে তা ভালো সাহিত্য হলেও কোন এক সময় ভাগাড়ের জঞ্জাল হয়ে পড়ে থাকে।
সাহিত্যিক যে ধর্মের তার সাহিত্যদর্শনও সেই আঙ্গিকে হয়ে থাকে। কেননা সে জাতির অগ্রগতি উন্নতি ঐ সাহিত্যিকের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। কারণ, স্বগোত্রীয় কোনো সাহিত্যিক যদি তার নিজ ধর্ম এবং বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে তাহলে অবশ্যই সেই জাতি অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে। এই বিবেচনাকে মাথায় রেখে সাহিত্যের সীমানা নির্ধারণ করা অতীব জরুরি বলে বোধ করি।
মানুষ তার নিগূঢ় সত্তাকে কখনো উপেক্ষা করতে পারে না। নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, বোধ আর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে। আর জাগ্রত চেতনা কেবল ধর্মীয় মূল্যবোধের পায়রবি করে থাকে। আর যিনি ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা বা অবহেলা করেন তার জাগ্রত দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসে এবং তার সৃষ্টিসম্ভারও তখন উত্তাল সাগরের ফেনিল জলের মতো শূন্য বালুচরে আছড়ে পড়ে।
সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, প্রত্যেক সময়ে প্রত্যেক যুগে সাহিত্যের সীমানা অনুল্লেখভাবে বলবৎ ছিল এবং এখনো আছে। আর সেই সীমানা হলো ধর্মবোধ ও জাতিসত্তার ক্রমবিকাশের মাধ্যমে।
তাই সাহিত্যের সীমানা নির্ধারিত হবে অবশ্যই জাতিসত্তার ক্রমবর্ধমান বিকাশ সাধনের মাধ্যমে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ইজম বা মতাদর্শের ভিত্তিতে।
আমরা জানি, সাহিত্যের মৌলিক আবেদন হবে সার্বজনীন। বঙ্কিমী সাহিত্য তার হিন্দুত্ব সীমানাকে অতিক্রম করতে পারেনি। তেমনি বিদ্যাসাগরীয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মধুসূদন দত্তের কেউ তার সাহিত্যে ধর্মবোধকে উপেক্ষা করেননি। এমনকি ব্রাহ্মণ্য চিন্তা-চেতনার প্রাবল্যতায় লেখকগণ আপুøত হয়ে সেই আঙ্গিকে নিজ সাহিত্য রচনায় আদ্যপান্ত মনোনিবেশ করেন। চাই তা গল্প বা কবিতা কিংবা প্রবন্ধ-নিবন্ধ যাই হোক না কেন। তাদের চিন্তা চেতনায় হিন্দুত্ব কৃষ্টি-কালচারের সরব উপস্থিতি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে আমরা পরিলক্ষণ করি। আর এটা তাদের নিগূঢ় চিন্তার অনিবার্য সারৎসার। এটা তাদের বিশ্বাস ও বোধের বিষয়।
শুধু মানবসমাজ কেন সবারই (চাই তা জীব হোক কিংবা জড়) নিজস্ব সীমানা থাকে। কেউ তার সীমানাকে অস্বীকার করতে পারে না। এমনকি তুলসী গাছ যদি বলে, আমি বড় বৃক্ষ হবো আবার বটবৃক্ষ যদি বলে আমি গোলাপ ফোটাব, সুবাস দেবো তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বরং তা হবে হাস্যকর।
সবারই জন্য একটি নিজস্ব সীমানা থকে। কেউ সেই সীমানাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। তাই সাহিত্যের জন্যও নির্দিষ্ট সীমা থাকা বাঞ্ছনীয়। এই Enter cultural protection অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে আমাদের সাহিত্যে নানা রকম Virus-এর অনুপ্রবেশে আমাদের সাহিত্যের সীমানা Folder-কে damage করে দেবে।
আমাদের বুঝতে হবে ব্রাহ্মণ সাহিত্যিকগণ তারা কখনো তাদের জাতীয় সীমানাকে অতিক্রম করে সাহিত্য রচনা করেননি। এক সময় সকল মঙ্গল কাব্যসমূহ সৃষ্টি হয়েছিল তাদের ধর্মবোধকে সারথি করে। কিন্তু তা কখনো শ্রীহীন বলে কারোর কাছে বিবেচিত হয়নি। বরং তা সেই সমাজ বা জাতির কাছে ভীষণভাবে আলোড়িত হয়েছিল। মূলত সাহিত্যিকেরা নগদ কোনো যশ বা খ্যাতির আশায় সাহিত্য রচনা না করলেও কেউ তার সীমানাকে ভুলতে পারেননি। এজন্য তাদের সকলকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কেননা, ব্রাহ্মণ্যবাদীর সীমানাকে তারা অতীব শ্রদ্ধার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাতে তাদের সমাজ যেমন উপকৃত হয়েছে, তেমনি নিজ ধর্মের Commitment ও রক্ষা করতে পেরেছেন।
আবার সুমেরীয়রা তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে সাহিত্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় চার হাজার সাতশত বছর আগে রাজা গিলগামেশের বীরত্ব নিয়ে মহাকাব্য রচিত হয়। আর এ সাহিত্যের মাধ্যমে তারা তাদের সীমানাকে আরো সমুন্নত করেছেন। কিন্তু জাতি বা ধর্মের সীমানাকে তারা লংঘন করেননি।
এভাবে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সাহিত্যের দিকে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো তারা তাদের লেখনীতে পৌরাণিক কাহিনীগুলো অপূর্ব সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। তবু তারা ধর্ম বা জাতি কোনটার সীমানাকে অতিক্রম করেননি। ঠিক, এভাবে এশেরীয়দের কথাও আমরা উল্লেখ করতে পারি, যারা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সাহিত্যকর্ম গিলগামেশ কাহিনী নিজেদের মতো করে রচনা করেছেন। সেখানে তারা নিজ ধর্মের সীমানাকে অতিক্রম করেননি। বরং তারা ধর্মবিশ্বাসকে আপন সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে আরো ত্বরান্বিত করেছেন।
সাহিত্যের সীমানা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় অনেকে মনে করতে পারেন ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ আসলে তা মোটেও না। কারণ, যে যে ধর্মের লোক সে কেবল সেই ধর্মের জয়গান গেয়ে যাবে এটা বাস্তবসম্মত। কেননা, তিনি কখনো ধর্মীয় গণ্ডিকে অস্বীকার করতে পারেন না। তৎকালীন চীনের রাজা কনফুসিয়ান তিনি তার দর্শন হিসেবে তিনটি বিষয় জনগণকে জানাতেন। তাহলো-শালীনতার শিক্ষা, সাহিত্য (কাব্য) এবং ইতিকথা। আবার গৌতম বুদ্ধের বাণী হলো:
আমি মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা গ্রহণ করছি
অপরের কোন দ্রব্য চুরি করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা গ্রহণ করছি।
প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা গ্রহণ করছি।
নৃত্য, গীত ইত্যাদিতে নগ্ন হয়ে অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও লম্ফঝম্ফ করা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করছি।
মূলত গৌতম বুদ্ধের বেঁধে দেয়া এই সীমানাকে তারা কোনোভাবেই অতিক্রম করেনি। কী সাহিত্যে, কী ধর্মে সর্বক্ষেত্রে বুদ্ধিস্টগণ তাদের ধর্মীয় সীমানাকে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে। এজন্য বুদ্ধের ভক্তগণ গেয়ে বেড়ান।
আমি কী কাজ করিতে কী কাজ করিনু
হেলায় ফেলায় মোর দিন চলে যায়
আমি পংকজে থাকিব পংক না মাখিব গায়
এটা দিব্য দেয়ার ন্যায় স্পষ্ট যে, প্রত্যেকের জন্য একটা গণ্ডি বা সীমানা থাকা আবশ্যক। তা না হলে বিক্ষিপ্ত বা উদ্ভ্রান্তের মতো সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। বিশেষ করে কবি বা সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরো বেশি। নইলে তাদের সাহিত্যগুলো স্রোতের শেওলার মতো কূলহীন দিশাহীন ভাবে ভেসে যাবে নিঃসন্দেহে।
ধর্মবিশ্বাসই একজন সাহিত্যিকের সীমানা নির্ধারণ করে দিতে পারে। এ জন্য যে সাহিত্যিক যে ধর্মের অনুসারী, তার সাহিত্য সেই ধর্মের আলো-ছায়ায় সম্প্রসারিত হবে। আর যদি কেউ বিশ্বাসের পরিপন্থী পথকে অনুসরণ করে তাহলে সে তার নিজস্ব সীমানাকে লংঘন করল। এটা নিজ ধর্মের সাথে যেমন সে প্রতারণা করল আবার নিজ জাতির সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করল। তাই কোন অবস্থাতেই সীমালঙ্ঘন না করে সীমানাকে সুসংহত করা উচিত।

দুই.
একজন লেখক এবং তার সাহিত্য সীমানা নিয়ে আলোচনা বর্তমান সময়ের দাবি। আমরা মুসলিম জাতি। ইসলাম আমাদের ধর্ম। নবী হজরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর বিদায় হজের ভাষণের শেষে স্পষ্ট করে বলেছেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। আমার নিয়ামতসমূহ সবটুকু দান করলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে ধর্ম হিসেবে আমি মনোনীত করে দিলাম।” ( সূরা মায়েদা, আয়াত-৩)
পবিত্র আল কুরআন ঐশী বাণী, যা মানুষের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত-৩)
আর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) হলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। মোটামুটি এই হলো মুসলিম জাতির সীমানা।
জাতি হিসেবে এই যদি আমাদের সীমানা হয় তাহলে, সাহিত্যের সীমানা অবশ্যই ভিন্ন হতে পারে না। এই বিশ্বাস এবং বোধ জাগ্রত না হলে মুসলিম সাহিত্যের সীমানা নির্ধারণ করাও সম্ভব হবে না। সেই সাথে এ বিশ্বাস বদ্ধমূলভাবে পোষণ করতে হবে যে, এক আল্লাহর কাছে আমাদের সকল কর্মের জবাবদিহিতা করতে হবে। কেননা, আল্লাহ বলেন-“ অবশ্যই তাদের প্রত্যাবর্তন হবে আমার দিকে। অতঃপর তাদের হিসাব নেয়া (দায়িত্ব সম্পূর্র্ণত) আমার ওপর।” (সূরা আল ফজর, আয়াত-২৫-২৬)
অবশ্যই ভালো এবং মন্দ বিচার বিশ্লেষণ করে তাকে তার পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়া হবে। এ জন্য মুসলিম সাহিত্যিকদের যেসব বিষয় স্মরণে রাখতে হবে তা হলো-
বিশ্বাস : এক আল্লাহর প্রতি সীসাঢালা প্রাচীরের মতো শক্ত বিশ্বাস রাখতে হবে। তিনি সবার স্রষ্টা, তিনি মালিক, তিনিই ইলাহ। আল্লাহ বলেন, (হে রাসূল) আপনি বলে দিন আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয়। তিনি পূত ও পবিত্র তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারোর থেকে জন্ম নেননি। তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। (সূরা এখলাস) নেই কোন ইলাহ আল্লাহ ছাড়া (কালেমায়ে তায়্যেবা)।
আকিদাগত বিশ্বাস : এটা এমন এক ধরনের বিশ্বাস যা তার কর্মের মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। বিশ্বাস কেবল অন্তরে লালন করলে চলবে না, কেবল ধারণ করলে হবে না। জীবনের বাস্তবতায় নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে, প্রতিটা বিভাগে মহান স্রষ্টার জয়গান উদারভাবে বর্ণনা করতে হবে। পৃথিবীর কোন লোভ-লালসা বা স্বার্থ যেন তাকে মহান রবের পথ থেকে ফিরিয়ে না রাখে।
এই কর্ম বা বাস্তব বিশ্বাস একজন সাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলবেন। সে যেন ইচ্ছে করেই তার সীমানাকে লংঘন না করে। নিজ তাহজিব, তমদ্দুন, নিজ ধর্মীয় দর্শন তার লেখনীর মাধ্যমে প্রচার করবে। আমাদের সাহিত্যিকদের মনে রাখতে হবে যে একক স্রষ্টা হিসেবে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বেঁধে দেয়া সীমানাকে অতিক্রম করা যাবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সীমানা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন, “কোন মুমিন কোনো মুমিনের পরিবর্তে কোন কাফিরকে বন্ধু বা অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে না।” ( সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং-২৮)
এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সীমানা কতটুকু। সকলেরই আল্লাহ ও তার রাসূলকে মেনে জীবন পরিচালনা করতে হবে। এই সীমানাকে যারা লংঘন করবে তাদের কঠিন পরিণতির ভয়ও দেখানো হয়েছে।
সুতরাং লেখক বা সাহিত্যিক যদি মুসলিম হয়, তাওহিদে বিশ্বাসী হয় তাহলে তাকে অনিবার্যভাবে খোদার বিধানকে সমুন্নত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। তা না হলে ধর্ম এবং সমাজ এর কুফল ভোগ করতে থাকবে। এ জন্য মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, “আর তোমাদের আল্লাহ এক। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি করুণাময় পরম দয়ালু।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৬৩) অনুরূপভাবে সুরা বাকারার : ২৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি ও অনন্ত। তাকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তিনি অবগত, যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তার জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তার আসন আসমান ও জমিনব্যাপী পরিব্যাপ্ত। আর ওদের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি দুর্বল হন না। তিনি অতি উচ্চ, মহামহিম।” আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, “তুমি একনিষ্ঠভাবে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত হও। এবং কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবে না। যা তোমার উপকারও করে না আবার অপকারও করে না। কারণ, এ করলে তুমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা ইউনুস, আয়াত : ১০৫-১০৬)
উপরোক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায়, একজন কবি বা সাহিত্যিককে সর্বপ্রথম তাওহিদ বা একত্ববাদে বিশ্বাসী হতে হবে। রাসূলকে মনেপ্রাণে নেতা হিসেবে মানতে হবে। এক্ষেত্রে কোন কাফির বা মুশরিকদের অন্ধ অনুকরণ করা যাবে না। এমনকি তাদেরকে বন্ধু হিসেবেও গ্রহণ করা যাবে না। তাহলে সে তার ঈমানকে ধ্বংস করে ফেলবে। মহান রব এই প্রক্রিয়াকে ব্যবসার সাথে তুলনা করেছেন। “আমি কি তোমাদের এমন একটি ব্যবসার কথা বলব না? যা তোমাদেরকে (মহান রবের) কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে? তাহলো- তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা (প্রাণান্তকর) করবে তোমাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে।” (সূরা আস সফ, আয়াত নং-১০-১১) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঐ সব ভ্রষ্ট সম্পর্কে বলেন, “ওরাই সেই সব লোক যারা সঠিক পথের বিনিময়ে গুমরাহ পথকে ক্রয় করে। ওদের এই কার্যাদি (ব্যবসা) ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত নয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৬)
বিশ্ব প্রতিপালকের এসব ঘোষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইলাহ হিসেবে আনুগত্য করা যাবে না। চাই সে জ্ঞানী, গুণী, পন্ডিত, সাহিত্যিক যাই হোন না কেন। সাহিত্যিক তার আপন ভাষার মোহনীয় জাদুতে আল্লাহর দেয়া দ্বীনকে সর্বাত্মকভাবে প্রচার করবে। যদি কেউ এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সে তার সীমানাকে অতিক্রম করল।
আমরা জানি, প্রতিটা জিনিসেরই ভালো ও মন্দ দিক থাকে। কেউ যদি ভালো করে, উত্তম কর্ম করে তাহলে সে অবশ্যই প্রশংসা পেয়ে থাকে। আবার যদি কেউ মন্দটা করে তাহলে সে তিরস্কৃত ও নিন্দিত হয়ে থাকে। এই ভালোর জন্য পুরস্কার আর মন্দের জন্য তিরস্কার এটা অনিবার্য অনুষজ্ঞ। আল্লাহ বলেন, “ভালো আর মন্দ এক জিনিস নয়। মন্দের জবাব ভালো দিয়েই দেয়া উচিত।” (সূরা হা-মীম সাজদা, আয়াত ৩৪)
এজন্য সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ঐ একই রকম। সীমানা লংঘনকারীদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণী যেমন বর্ণনা করেছেন তেমনি তা মান্যকারীদের পুরস্কারের নন্দিত বাণীও প্রকাশিত হয়েছে।
পবিত্র আল কুরআনের বহু আয়াত বিভিন্ন সূরাতে বর্ণিত হয়েছে যেখানে, মহান রাব্বুল আলামিন নেক আমলকারীদের জন্য সুসংবাদ দান করেছেন। সূরা বাকারার ১৪৩, ১৫১, ১৫৩ ও ২৫১ নম্বর আয়াতে, সূরা নিসার ১৪৭ ও ১৭৩ নম্বর আয়াতে, সূরা মারিয়ামের ১৬০ নম্বর আয়াতে, সূরা আম্মিয়ার ৯৫ নম্বর আয়াতে ঐ সব মানুষের সুসংবাদ বিধৃত হয়েছে। সূরা নূরের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক স্পষ্ট করে বলেন, “যাতে তারা সৎ কাজ করে, তার জন্য আল্লাহ তাদের উত্তম জাযা দান করেন এবং আপন অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের বেশি দেন। আল্লাহ যাকে খুশি তাকে বেশুমার রিজিক দান করেন।” আল্লাহ আরো বলেন, “এবং যারা বিশ্বাস করে ও সৎ কাজ করে আমি নিশ্চয় তাদের ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেবো এবং তাদের কর্মের উত্তম প্রতিদান দেব।” (সূরা আনকাবুত, আয়াত-৭) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে সৎ কাজ করে সে নিজের কল্যাণের জন্য তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিদান সেই ভোগ করবে। তোমার পালনকর্তা তার বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না।” (সূরা হা-মীম সাজদা : ৪৬) সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আল্লাহ আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। সুতরাং তোমরা তার ইবাদাত করবে। এটি সরল পথ।” (সূরা আলে ইমরান : ৫১) আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরো বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা রুকু কর, সেজদাহ কর এবং তোমাদের পালনকর্তার ইবাদাত কর যাতে তোমরা কৃতকার্য হতে পার।” (সূরা আল হাজ্জ, আয়াত নং ৭৭)
এভাবে পবিত্র আল কুরআনের বহু স্থানে মহান রবের আনুগত্যের বিষয়ে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। যাতে করে তার বান্দারা সীমালংঘন করে নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে তার খলিফা করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
(সূরা বাকারা, আয়াত-৩০)
সাথে সাথে বলে দিলেন, তাকে ছাড়া যেন মানুষেরা আর কাউকে দাসত্ব না করে। আল্লাহ বলেন, “আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য।” (সূরা আয যারিয়াত, আয়াত নং ৫৬ )
সুতরাং মহান রবের দেয়া সীমানা হলো- তাকে ভিন্ন আর কাউকে ইবাদাতের উপযোগী মনে না করা।

তিন.
তথাকথিত আধুনিক মনস্ক সাহিত্যিকগণ মনে করেন সাহিত্যের সীমানা মানেই অন্যকে অনুকরণ, অনুসরণ বা অনুগামী হয়ে সাহিত্য রচনা করা। মূলত জাতি, ধর্ম আর সমাজ সম্পর্কে এটা তাদের নোংরা অভিপ্রায় বৈ কিছুই না। ব্রাহ্মণ্য সমাজ যদি তাদের ধর্মকে শোধনালয় বলে মনে করতে পারেন সেখানে মুসলমানগণ তাদের ধর্মকে কেন খাটো করে দেখবে? ক্রিশ্চিয়ান সাহিত্যিকগণ যদি খ্রিষ্টধর্মকে অবলম্বন করে সাহিত্য রচনা করতে পারেন তাহলে মুসলিম ধর্মকে ধারণ করে মুসলিম সাহিত্য রচনা করতে অসুবিধা কোথায়? যেখানে বৌদ্ধরা তাদের ধর্মতত্ত্বকে সাহিত্যে রূপ দিয়ে তার প্রচার আর প্রসারের কাজে লাগাতে পারেন সেখানে মুসলিম সাহিত্যিকগণ তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে সাহিত্যে রূপায়ণ করতে দ্বিধান্বিত হবে কেন?
মূলত এটা হলো- নিজ ধর্মের সাথে, নিজ জাতির সাথে এক ধরনের তামাশা করা। হীন মানসিকতার সাহিত্যিকগণই এরূপ হীন ও উদাসীনতায় ভুগতে পারে। যারা এই সীমানাকে লংঘন করে তারা যশ বা খ্যাতি থেকে অনেক দূরে চলে যায়। খ্রিষ্টান বা হিন্দুগণ তারা যদি তাদের ধর্মের আওতায় থেকে এবং তাদের আদর্শকে ধারণ করে বিশ্বমানের সাহিত্য রচনা করতে পারেন তাহলে মুসলিম সাহিত্যিকগণ তাদের ধর্মের আওতায় থেকে অবশ্যই বিশ্বমানের সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারবেন।
আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো আরবি, ফারর্সি, উর্দু, বাংলা- এসকল সাহিত্যে মুসলিমগণ ধর্মীয় সীমানাকে অতিক্রম না করেও বিশ্বমানের সাহিত্য রচনা করে যশস্বী হয়েছেন। রাসূল (সা:)-এর সাহাবা থেকে শুরু করে বহু সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। হযরত আবু বকর, হযরত উমর, মা খাদিজা, হযরত আলী, হাসসান বিন সাবিত, হযরত খাব্বাব (রা) এভাবে অসংখ্য সাহাবী কবি কবিতা রচনা করেছেন ধর্মীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে, যা আজো অমর হয়ে আছে। অথচ তারা তাদের সাহিত্যের সীমানাকে কোনোভাবেই অতিক্রম করেননি।
কবি মুতানাব্বি, হারিরি, আবু আলা আল মায়ারি, ইবনে খালদুন, আবুল ফারেজ, আল ইদ্রিসি, আবু রুশদ, ইমাম গাজ্জালি, আল বিরুনি, ফেরদৌসি, রুমি, জামি, শেখ সাদি প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যারা একদিকে বিশ্বমানের সাহিত্য উপহার দিয়েছেন, অপর দিকে ধর্মীয় আদর্শকে দার্শনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য করতে সহযোগিতা করেছেন।
এভাবে আল্লামা ইকবাল, কবি হাফিজ তারাও ধর্মীয় সীমানাকে অতিক্রম করেননি। ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মীর মোশাররফ হোসেন, শাহ সগীর, কবি মুজাম্মেল হক, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ, ইয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, এস ওয়াজেদ আলী, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদ, কবি ফররুখ আহমদসহ অসংখ্য সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যারা তাদের ধর্মীয় দর্শনকে সাহিত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। অথচ তাদের যশ বা খ্যাতি কোন অংশে ক্ষুণ্ণ হয়নি। বরং তারা মর্যাদার দিক দিয়ে গগন স্পর্শ করেছেন।
কোনো সাহিত্যিক যদি মনে করেন, আমি অন্য ধর্মকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে বড় হবো তাহলে অবশ্যই তার ধারণা একদিন মিথ্যে ফানুস হিসেবে পরিগণিত হবে। এ প্রসঙ্গে আবুল ফজলের উক্তি হলো- সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ পূর্ণ মানুষই হতে পারে না। আশরাফুল মাখলুকাত হবে কী করে?
তাই ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা, বিশ্বাস, আচরণ, অনুষ্ঠান সবই মনুষ্যত্ব ও সামাজিক জীবনের ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত। বাস্তব আচরণ অর্থাৎ আমল ছাড়া শুধু ফাঁকা বিশ্বাস ইসলাম নয়, কাজেই ধর্মও নয়। (ধর্ম ও সাহিত্য : আবুল ফজল)
পরিশেষে বলতে চাই, যারা নিজ ধর্মকে সাহিত্যে বর্ম হিসেবে ব্যবহার না করে অন্য ধর্মের অন্ধ অনুকরণ করে নিজ সীমানাকে উপেক্ষা করবে তারা মূলত নিজ ধর্ম বা জাতির সাথে প্রতারণা করবে। আর এটাই হলো- সাহিত্যের সীমানা। ধর্মীয় সীমানার বাইরে থাকলে যেমন অধর্ম হয় তেমনি নিজ ধর্মের সীমানাকে উপেক্ষা করে সাহিত্য রচনা করলে তাও সীমালংঘনের পর্যায়ে পড়বে।
সুতরাং সজাগ থাকতে হবে, যেন আল্লাহর দেয়া এ সাহিত্যপ্রতিভা কোনভাবেই মুসলিম হিসেবে ইসলাম ধর্মের সীমানাকে অতিক্রম না করে। তাওহিদ, রেসালাত, আখিরাতমুখী সাহিত্যই হোক মুসলিম সাহিত্যিকদের একমাত্র সাহিত্য উপজীব্য। যার দ্বারা স্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী জীবনের মহা কল্যাণ তারা লাভ করতে পারেন।
সুতরাং সমস্ত স্তবস্তুতি, সমস্ত ইবাদাত-বন্দেগি, সকল আনুগত্য-উপাসনাই যেন হয় একমাত্র মহান রবের সন্তষ্টির জন্য।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply