সাহিত্য-সংস্কৃতিতে মহানবী সা.-এর অবদান আব্দুল আলীম

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মাদ সা. মানুষের জীবন পরিচালনার সকল দিক নিয়ে কাজ করেছেন। সকল বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত সকল পন্থায় তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। সভ্যতা ও সংস্কৃতি ছাড়া মানুষ, সমাজ এমনকি কোনো রাষ্ট্র চলতে পারে না। অন্যভাবে বলা যায় জীবন পরিচালনার সকল কিছু সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের প্রিয় নবী সা. সংস্কৃতি সম্পর্কিত সকল বিষয়ে কথা বলে গেছেন, প্র্যাকটিস করিয়ে গেছেন।
রাসূল সা.-এর জীবনাচরণ সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা.কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন ‘খুলুকুহুল কুরআন’ তাঁর জীবনই কুরআন। অর্থাৎ কুরআনে যা আছে সেগুলোর সকল কিছুর চিত্র রাসূল সা.-এর চরিত্রে ফুটে উঠেছে। জীবন সম্পর্কিত সকল দিক তাঁর কথা, কাজ এবং মৌন সম্মতিতে প্রকাশ পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অধিকাংশ মানুষ গান, অভিনয়, আবৃত্তিকে সংস্কৃতি মনে করে থাকে। কিন্তু এ ধারণাটা একান্তই ভুল। জীবনে চলার পথে কথা-বার্তা, ওঠা-বসা, লেনদেন, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সকল কিছু সংস্কৃতির আওতাধীন। এর সাথে সাথে সুস্থ সংস্কৃতির বিনোদন অন্যতম। রাসূল সা. তাঁর জীবনে সংস্কৃতিকে লালন করেছেন, অনেক কাজ বাস্তবায়ন করেছেন এমনকি অন্যকে উৎসাহ জুগিয়েছেন।
আজকের অপসংস্কৃতির সয়লাবের মুখে ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির অবস্থান শক্তিশালী ও মজবুত করণে রাসূল সা.-এর রেখে যাওয়া বিশাল হাদীসশাস্ত্র সাহিত্যের রূপ রস এবং উপাদানের ক্ষেত্রে কার্যকর ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ইসলামী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রাসূল সা.-এর সময় এবং বর্তমান অবস্থান আলোকপাতের পূর্বে এর সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনা প্রয়োজন। ১. ইসলামী সাহিত্য তাকেই বলা হবে, যার মধ্যে জীবনের এমন সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে। যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য কল্যাণপ্রদ গণ্য করেছে যার, মধ্যে এমন সব মতবাদের বিরোধিতা করা হবে যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছে। ২. ইসলামী সাহিত্যের পথিকৃৎ মিসরের নবীজ কিলানী ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘মাদখাল ইলাল আদব আল-ইসলামী’ বইতে লিখেছেন; ইসলামী সাহিত্য হচ্ছে- মুমিনের অন্তর থেকে উৎসারিত প্রভাবশালী সুন্দর শিল্পীর বর্ণনাভঙ্গি যাতে জীবন-জগৎ এবং মানুষ সম্পর্কে একজন মুসলমানের ঈমান আকিদায় প্রতিবিম্ব ঘটবে। যা হবে বিনোদন ও কল্যাণমুখী এবং আবেগ ও কল্পনা সঞ্চারকারী। আর যা কোন ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা গ্রহণের দাবি রাখে। ৩. লক্ষে¥ৗভিত্তিক বিশ্ব ইসলামী সাহিত্যলিগ ইসলামী সাহিত্যের নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছে; ইসলামী চিন্তা-চেতনার পরিধির ভেতর জীবন, জগৎ ও মানুষ সম্পর্কে শিল্পীর বর্ণনাকে ইসলামী সাহিত্য বলা হয়।
ইসলামী সংস্কৃতি : ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য হলো মানবতার কল্যাণ। তাই ইসলাম হলো মানবতার ধর্ম। ইসলামই একমাত্র জীবনবিধান যেখানে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত অর্থাৎ পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ সকল দিকের সুষ্ঠু সমাধান। ১. ইসলাম যেহেতু মানুষের সামষ্টিক জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করে তাই মানবজীবনের চিন্তার বিশ্বাস, প্রত্যয়, আবেগ, অনুভূতি, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, সামাজিকতা, আচরণ ও ক্রিয়াকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিমার্জন, পরিশোধন ও অনুশীলনের নামই ইসলামী সংস্কৃতি। ২. মিশরের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক হাসান আইয়ুব তাঁর রচিত ‘আল আকায়েদ আল ইসলামী’ গ্রন্থে ইসলামী সংস্কৃতির সংজ্ঞা প্রদান করে বলেছেন- ইসলামী সংস্কৃতি বলতে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক মানুষেরই সামষ্টিক জীবনের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, অনুরাগ, মূল্যবোধ ক্রিয়াকাণ্ড সৌজন্যমূলক আচরণ; পরিমার্জিত ও পরিশোধিত সৎকর্মশীলতা, উন্নত নৈতিকতা তথা জীবনের সকল কর্মকাণ্ডকে বুঝায়, মানুষের পরিপূর্ণ জীবন ধারাই ইসলামী সংস্কৃতির আওতাধীন। ৩. মাওলানা মওদূদী (রহ.) রচিত ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা বইতে তিনি বলেছেন : ইসলামী সংস্কৃতির লক্ষ্য হলো, মানুষকে সাফল্যের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে প্রস্তুত করা। এ সংস্কৃতি একটি ব্যাপক জীবন ব্যবস্থা, যা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব চরিত্র, আচার ব্যবহার, পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্ম, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত।
রাসূল সা.-এর সাংস্কৃতিক প্র্যাকটিসের মধ্যে অন্যতম হলো সামাজিকতা। উন্নত সামাজিক সভ্যতা ছাড়া মৌলিকভাবে কোন রাষ্ট্র বা দেশ গড়ে ওঠে না। সমাজে সবাই মিলে একসাথে বসবাস করতে হলে সামাজিকতা একটা অন্যতম মাধ্যম। এর সাথে লুকিয়ে আছে লোকাচার, সভ্যতা, একে অপরের মতামত, ভাব বিনিময়, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা। এটা ছাড়া কোনো সভ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না। রাসূল সা. ছোটকাল থেকেই এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। সমাজের কল্যাণে ছুটে বেড়িয়েছেন অনেকের কাছে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৈরি করেছেন “হিলফুল ফুজুল।” সকল যুবক-তরুণকে একসাথে নিয়ে সমাজ সংস্কারমূলক কাজে ব্রতী হয়েছেন।
মহানবী সা.-এর ধর্মীয় কাজ ছিল সংস্কৃতির একটি অন্যতম প্রকার। আবার সংস্কৃত হলো ধর্মীয় কাজের মাধ্যম। কারণ ধর্ম মানুষকে সত্যিকারার্থে সংস্কৃতিবান হতে শেখায়। ধর্ম ছাড়া কোন সংস্কৃতি চলতে পারে না। সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলী তৈরি করে। আর ধর্ম মনুষ্যত্ববোধের বীজ বপন করে। যে সংস্কৃতি ধর্মহীন সেই সংস্কৃতি এই পৃথিবীতে মানব কল্যাণে কোন কাজ করতে পারে না। তাই আমাদের রহমতের নবী সা. ধর্ম দিয়ে মানুষকে আসল সংস্কৃতি শিখিয়েছেন। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি লালন করে। এই সংস্কৃতি নির্ভর করে সেই ধর্মের ওপর। প্রত্যেক সংস্কৃতির সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, অনুভূতি জড়িয়ে আছে। বিশ্বাস তৈরি হয় ধর্মের ওপর ভিত্তি করে। ধর্মীয় জ্ঞান ছাড়া কোনো বিশ্বাস, অনুভূতি বা সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে না।
সংস্কৃতির একটি অন্যতম মাধ্যম হল ভ্রাতৃত্ববোধ। এর প্রভাবে মানুষ সংস্কৃতিবান হয়। এই বোধের কল্যাণে মানুষ একে অপরের সাথে পরিচিত হয়। সবার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, নতুন এক ভাবগাম্ভীর্য জাগ্রত হয়। পরস্পরবিরোধী কোনো সংস্কৃতি লালন করে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা মুশকিল হয়ে ওঠে। অন্যান্য সকল সাধারণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে কিন্তু মজ্জাগত ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে না। তাইতো মহানবী সা. মক্কা ও মদিনা উভয় জায়গাতেই এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। মহানবী সা. মদিনায় গিয়ে প্রথম যে কয়েকটি কাজ করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলো আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। কেননা এই দুইটি গোত্রের মাঝে প্রায় শতবর্ষ যুদ্ধ চলছিল। হীনস্বার্থে তারা একে অপরকে হত্যা করতো। সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকতো এই দুই গোত্রের মধ্যে।
রাসূল সা. যে জাহেলিয়াতের যুগে এই দুনিয়াতে এসেছিলেন যেখানে অসংখ্য সামাজিক কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল। মনুষ্যত্বের পর্যায়ে পড়ে না এমন অনেক কাজ ছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল জীবন্ত কন্যাকে হত্যা করা। চলমান ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকে আরবীয়রা এটা করত। রাসূল সা. এসে এ ধরনের অসামাজিক এবং অমানবিক কার্যক্রম বন্ধ করলেন। ধনী পরিবারের কাউকে হত্যা করলে গরিব পরিবারের আরেক জনকে হত্যা করা হতো। কিন্তু কোনো গরিব পরিবারের কেউ নিহত হলে তার কোন বিচার হতো না। দাস-দাসীদের হত্যা করা হতো নির্বিচারে, তাদের কোন অধিকার ছিল না।
বর্তমান পৃথিবীতে নারীকে সংস্কৃতির পণ্য বানানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক বিনোদনের নামে নারীকে মাঠে নামানো হয়েছে এবং পুরুষের ভোগ-বিলাসের পাত্র বানানো হয়েছে। নারীদের সামাজিক যে অধিকার থাকার কথা ছিল তা সেই যুগেও ছিল না এখনও নেই। মুহাম্মাদ সা. এসে নারীদের সঠিক ও যথাযোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি ইসলামের আলোকে নারী অধিকারের যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন তা আজও বিদ্যমান। তিনি হাদিসে সম্মানের ক্ষেত্রে আব্বার চেয়ে আম্মাকে তিনবার বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। রাসূল সা. এই সংস্কৃতি চালু না করে গেলে সমাজে আজ নারীরা অবহেলিত থাকতো।
সমাজে প্রচলিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম যত ধরনের আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বিয়ে। এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মানুষের ভিতরে অনেক কৌতূহল। জাহেলি যুগে বিয়ের কোনো নীতি নির্ধারণ করা ছিল না। যে কেউ চাইলে যাকে তাকে বিয়ে করতে পারতো। কেউ ইচ্ছা করলে একাধিক বিয়ে করতে পারতো। দেখা যেত রক্তের সম্পর্কেরও কাউকে বিয়ে করতে পারতো। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মোতাবেক রাসূল সা. বিয়ের প্রয়োজনীয় সকল নিয়ম-নীতি বেঁধে দেন। একাধিক বিয়ে করার ক্ষেত্রে চারটি, ১৪ প্রকার ব্যক্তিকে বিয়ে না করাসহ অনেক নিয়ম-নীতি ঠিক করেন। যাতে করে একটা সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। এ জন্য বলা যায় যে, বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে রাসূল সা. যে সংস্কৃতি দিয়ে গেছেন বা বলে গেছেন তা মেনে চললে সুন্দর সাংস্কৃতিক একটা সমাজ গড়ে উঠবে।
রাসূল সা.-এর যুগেও বিনোদন ব্যবস্থা ছিল, তিনি সেই ব্যবস্থাকে উজ্জ্বল করেছেন। তবে সেটা ছিল সুস্থ বিনোদন এবং শিক্ষণীয়। বর্তমানে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি যা লালন করে এবং আমরা যা গ্রহণ করি তার অনেক কিছুই রাসূল সা. করে যাননি বা বলে যাননি। রাসূল সা.-এর আমলে কবিতা আবৃত্তি করানো হতো অসংখ্য জায়গায়। অপসংস্কৃতির মোকাবেলায় গড়ে তুলেছিলেন সুস্থ একটি বিনোদন ধারা। যেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই, নেই কোনো বেহায়াপনা। কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে না। কেউ কারো ওপর বল প্রয়োগ করবে না।
কবিতা চর্চার বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সা. সবসময় উৎসাহিত করতেন। রাসূলের সা. কয়েকজন প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন যারা যুদ্ধের ময়দানসহ বিভিন্ন জায়গায় কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন হাসান বিন সাবিত রা.। তাঁকে ‘শায়িরুর রাসূল’ বা রাসূলের কবি বলা হতো। অন্যরা হলেন কাব বিন মালেক, কাব বিন যুহাইর রা., আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা.। যুদ্ধের ময়দানে গেলে রাসূল সা. কাফেরদের বিরুদ্ধে কবিতা বানানোর জন্য নির্দেশ দিতেন। বনি কুরাইযার সাথে যুদ্ধের দিন হাসান বিন সাবিতকে রা. রাসূল সা. এ কথা বলেন……
তৎকালীন আরবি সাহিত্য ছিল লোকজসাহিত্য। আর সেই লোকজ সাহিত্যকথা এতই উন্নত ছিল যে, আরবি কাসিদাগুলো হোমারের ‘ইলিয়ড’ ‘সফোক্লিসের’ ওডেসিকে হার মানায়। ওকায মেলায় এই কাসিদার যুদ্ধ বা কবিতার লড়াই এতই উন্নতমানের ছিল তা ভাবতেই অবাক লাগে। কবিতার সাহিত্যমান, বাগ্মী-গুণ, স্মৃতিশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব কবিকে সমাজে উচ্চ মর্যাদা পেতে সাহায্য করতো। কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল প্রেমলীলা, মদ খাওয়া অথবা জুয়া খেলার মত। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়ার মতো। ইমরাউল কায়েসের মত কবিদের কবিতার বিষয়বস্তু ছিল- নারী ও ঘোড়া। কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানের রণগীতি, প্রেমগীতি, রঙ্গব্যঙ্গ কবিতা বহু কুখ্যাত ও বিখ্যাত কবিগণ যশ কামাত যা তৎকালীন সকল কাব্যকলাকে ছেড়ে গিয়েছিল। যদিও তা বল্গাহীন জৈবানুভূতির যৌনরসে উৎসারিত আদিম ও পাশবিক উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করেছিল। আরব সমাজের সাহিত্য সাংস্কৃতিক বল্গাহীন অবস্থার উত্তরণে এবং মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগের অন্যতম একমাত্র প্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. তাঁর আদর্শই একমাত্র উত্তম আদর্শ। যার মূল ভিত্তি হল মহাগ্রন্থ আল কুরআন। জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মত সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তিনি যে আদর্শে উদ্ভাসিত হয়েছেন, আমাদের জন্য সেটিই আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য। রাসূল সা. কবি ছিলেন না, কিন্তু কবিতার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অসাধারণ। পবিত্র আল কুরআনেও কবিতা বা সাহিত্য শিল্পকলার অসাধারণ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- ‘‘বিভ্রান্ত তারা, যারা কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখনা তাঁরা (কবিরা) উ™£ান্ত হয়ে ঘুরে ফেরে এবং যা করে না তা বলে। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, বারবার স্মরণ করে আল্লাহকে এবং অত্যাচরিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। (সূরা শুয়ারা : ২২৪-২২৭)
উপরের চারটি আয়াতের প্রথম তিনটি আয়াতে তৎকালীন (আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ) আরবি কবিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। যারা অসত্য, অশ্লীল, বিভ্রান্তিকর, অমানবিক মুশরিকি চিন্তা চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের কবিতা অশ্লীলতা ও বিভ্রান্তিতে ভরা। মানবিক মহত্তম কোন প্রবণতা এতে নেই। সুতরাং এরা যেমন নিজেরা বিভ্রান্ত তেমনি তাদের যারা অনুসরণ করে তারও বিভ্রান্ত। শেষোক্ত আয়াতে সত্য সুন্দর কল্যাণের প্রতীক কবিদের প্রসঙ্গে তাদের চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এ চারটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য হলো : ১. তারা ঈমানদার ২. সৎকর্মশীল ৩. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী অর্থাৎ তাদের চিন্তা চেতনা, কর্ম ও আচরণে আল্লাহর বিধানের অনুবর্তী। ৪. সব রকম জুলুম নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, অবিচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চকণ্ঠ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রদর্শিত এই নীতিমালা অনুযায়ী মহানবী সা. কবিতা রচনায় যথোপযুক্ত উৎসাহ প্রদান করতেন। কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন, মাঝে মাঝে স্বয়ং কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং অন্যদের আবৃত্তি গভীর আগ্রহের সাথে শ্রবণ করতেন। বিভিন্ন কবি ও কবিতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য অত্যন্ত প্রাজ্ঞচিত। তিনি বলেন : ‘‘মুমিন ব্যক্তি তার তরবারি দিয়ে এবং তার মুখের ভাষা দিয়ে জিহাদ করে। যাঁর হাতে আমার প্রাণ সে মহান সত্তার কসম, তোমরা যে কাব্যাস্ত্র দিয়ে ওদের আঘাত হানছো তা তীরের আঘাতের মতই প্রচণ্ড।’’ (মিশকাত শরীফ) উল্লেখ্য যে- রাসূল সা.-এর সাহাবাত্রয় হাসসান বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা এবং কাব বিন মালিকের উদ্দেশে তাঁদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেছিলেন।
মুসলিম শরীফের একটি হাদীস ‘‘যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে ভাষার মাধ্যমে জিহাদ করলো সেই তো মুমিন।’’ এ সকল হাদীসসমূহে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. সত্যপন্থী বিশ্বাসী কবিদেরকে মুজাহিদরূপে এবং তাদের কবিতা ও মুখনিঃসৃত কাব্যভাষাকেও জিহাদের সমতুল্য বলে উল্লেখ করেছেন। আরবের বিভিন্ন গোত্রের নামকরা কবিরা এসেছেন রাসূলের সা.-এর দরবারে কবিতা ও বাগ্মিতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য। মহানবী সা. তাদের সামনে তাঁর কবি যোদ্ধাদের এগিয়ে দিয়েছেন। আরবের খ্যাতনামা যেসব কবি মহানবীর কবি যোদ্ধাদের সাথে কবিতা ও বাকযুদ্ধে ধরাশায়ী হয়েছেন তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে পরবর্তীকালে ইসলামের কলম সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। যেমন কাব বিন যুহাইর, কবি কুররা বিন হাবিবা রা. প্রমুখ ছিলেন এমনি ধরনের কবি। রাসূল সা.-এর হাদীসে এক্ষেত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন- তোমরা কাফির মুশরিকদের নিন্দা চর্চার জবাবে কাব্যযুদ্ধে অবতীর্ণ হও। তীরের ফলার চেয়ে তা আরও বেশি আহত করবে তাদের। ইবনে রাওয়াহাকে পাঠানো হলো। রাসূল সা. সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না। কাব ইবনে মালিকও এলেন। অবশেষে যখন হাসসান এলেন, তখন রাসূল সা. বললেন, সব শেষে ওকে পাঠালে তোমরা? ওতো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোময় সিংহশাবক। এ কথা শুনে জিভ নাড়াতে লাগলেন হাসসান বললেন, যিনি আপনাকে সত্য বাণীসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ। এ জিভ দিয়ে ওদের চামড়া ছুলে ফেলার মতো গাত্রদাহ সৃষ্টি করেই ছাড়বো। (আশুন আল বারী, ৪/২২)
উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়শা রা. বলেন, রাসূল সা. বিশিষ্ট কবি হাসসান বিন সাবিতের রা. জন্য মসজিদে নববীতে একটি মিম্বর স্থাপন করেন। এ মিম্বরে দাঁড়িয়ে কবি হাসসান রাসূলুল্লাহ সা.-এর শানে প্রশংসা ও গৌরবগাথাপূর্ণ কবিতা আবৃত্তি করতেন অথবা (কখনো কাফিরদের বিদ্রƒপাত্মক কবিতার মুকাবিলায়) জাওয়াবি কবিতা আবৃত্তি করতেন। রাসূল সা. তখন বলতেন, আল্লাহ তায়ালা রুহুল কুদ্দুস জিবরাইল (আ) দ্বারা কবি হাসসানকে সাহায্য করছেন যতক্ষণ হাসসান রাসূলুল্লাহর সা.-এর শানে কবিতা আবৃত্তি করছেন। (বুখারী) একবার মহানবী সা. দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন। মরুভূমির রাস্তায় সাধারণত রাত্রিতেই চলতে হয়। একে রাত্রি, উপরন্তু পথচলার ক্লান্তি মোচনের জন্য মহানবী সা. কবি হাসসানকে ডেকে বললেন, আমাদের কিছু হাদু (উটের গতি সঞ্চারক এক ধরনের ছন্দময় গীতি) শুনাওতো। কবি শুরু করলেন, মহানবীও গভীর মনোযোগ সহকারে তা শুনছেন। গানের তালে তালে উটের চলার গতি ও ক্ষিপ্রতম হয়ে উঠছে। উটের হাওদা পেছন দিকে ঢলে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মহানবী সা. গান থামাতে বললেন, তারপর বললেন, কবিতাকে এজন্য বলা হয় বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং সব আঘাত শেলের আঘাতের চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক। ইস্পাহানী : আল আগানী ৪/১৪৩]
নবী করীম সা. মহিলা কবিদেরকেও কবিতা রচনায় বিশেষ উৎসাহ প্রদান করতেন। প্রখ্যাত মহিলা কবি খানসা রা. এর কবিতা তিনি খুব পছন্দ করতেন। মাঝে মধ্যে যখনই তিনি তার কবিতা শুনতে চাইতেন, হাত ইশারা দিয়ে বলতেন, খুনাশ শুনাও তো? (থাযানাহ আল আদাব ১/৪৩৪) কবিতা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, শিল্পকলা সম্পর্কিত মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর হাদীসসমূহে একদিকে যেমন মহানবীর সা. কাব্যানুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি তৎকালীন সময় ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ অঙ্গনের অবস্থান ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কত দৃঢ় ছিল তারও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামী সাহিত্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মহানবী সা. কবিদের বিশেষ মর্যাদা ও এনাম পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাদের কাব্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতেন। এরূপ দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। নিম্নে দুটো উদাহরণ পেশ করা হলো: কবি হাসসান বিন সাবিতকে মহানবী সা. ‘‘শায়িরুর রাসূল’’ অর্থাৎ রাসূলের কবি খেতাবে ভূষিত করে তাকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেন। তার জন্য মসজিদে নববীতে একটি উঁচু মিম্বর তৈরি করে তাকে বিরল মর্যাদা দান করেন। তিনি সেই মিম্বরে বসে রাসূলের শানে কবিতা আবৃত্তি করতেন। মিসরের শাসনকর্তা মুকুকিকস অন্যান্য উপঢৌকনাদির সাথে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া দুই সুন্দরী মেয়েকে রাসূল সা.-এর খেদমতে পেশ করলে তার একজনকে (মারিয়া কিবতিয়াকে) নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অন্যজনকে (শিরিন) তিনি কবি হাসসানের স্ত্রী হিসেবে পেশ করেন। কবি কুবরা বিন হাবিরা ইসলাম গ্রহণ করলে মহানবী সা. তাকে দুটো চাদর দেন। উপরন্তু তাকে স্বীয় ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করান এবং তাকে নিজ সম্প্রদায়ের নেতা মনোনীত করেন। রাসূল সা. এভাবে কবি সাহিত্যিকদের মর্যাদা প্রদান করে তাদের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করেন। শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি একটি সমাজের দর্পণ ও ব্যারোমিটার। সমাজকে সঠিক পথ নির্দেশনা দানের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সমাজে রাসূল সা.-এর দেখানো পদ্ধতিতে যদি আমরা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করি তাহলে অবশ্যই আমাদের এ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিণত হবে একটি সুখ-শান্তির সমৃদ্ধ সূতিকাগার হিসাবে। যেখানে সবাই নিশ্চিন্তে নির্বিঘেœ জীবন যাপন করবে। প্রত্যেকে সফলতা খুঁজে পাবে তার নিজ নিজ জায়গায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply