সিন্ডিকেট হলুদ সাংবাদিকতা ও কয়েকটি ঘটনার পোস্টমর্টেম

Yealoo jurnalistআবু সালেহ মো. ইয়াহইয়া

(পর্ব ২)

ঢাকাস্থ মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকি
ঘটনা : ঢাকার মিসর দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর অভিযোগে শওকত আফসার নামে এক তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২২ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রাজধানীর ফার্মগেট থেকে তাকে গ্রেফতার করে। মিসরে ‘গণহত্যা’ বন্ধ না করলে ঢাকায় মিসর দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ২১ আগস্ট দূতাবাসের কনস্যুলার শাখায় একটি চিঠি পাঠানো হয়। হাতে লেখা ওই চিঠির প্রেরক হিসেবে মোহাম্মদ শওকত ওসমানের নাম উল্লেখ ছিল। সেখানে তার মোবাইল ফোন নম্বরও দেয়া ছিল। এ ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে দূতাবাসের কনস্যুলার শাখা ২১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা আসে।
মিডিয়া কী বলে
শওকত আফসারকে গ্রেফতারের পর ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে এক প্রেস কনফারেন্সে তাকে শিবিরকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। কোন রকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই শুধু পুলিশের বক্তব্যকে পুঁজি করে অধিকাংশ গণমাধ্যমে শিবিরকে জড়িয়ে সানন্দে প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশ করতে থাকে। ‘মিসর দূতাবাসে হুমকি : শিবিরকর্মী আটক’ শিরোনামে ২২ আগস্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকার মিসরীয় দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকিদাতা শিবিরকর্মী শওকত আফসার হিরনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজধানীর ফার্মগেটের ফোকাস কোচিং সেন্টার থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর হিরনকে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে হাজির করা হয়। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় যেভাবে মিসরীয় দূতাবাস উড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের দূতাবাস উড়িয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয় এ শিবির নেতা। তিনি বলেন, ফেসবুকে একটি গ্রæপের মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে এ অপরাধ করার চিন্তা করে হিরন। ইংরেজিতে লেখা হিরনের হুমকিপত্রে মোবাইল নম্বর উল্লেখ ছিল। পরে তাকে মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে গ্রেফতার করা হয়।’
২২ আগস্ট ’১৩ দৈনিক সমকাল ‘মিসর দূতাবাসে হুমকির দায়ে শিবিরকর্মী গ্রেফতার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেটের শিবির পরিচালিত ফোকাস কোচিং সেন্টার থেকে শওকতকে গ্রেফতার করা হয়। তার মূল নাম শওকত আফসার হলেও হুমকির চিঠিতে তিনি শওকত ওসমান উল্লেখ করেন। চিঠিটি তারই লেখা বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তিনিও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তা স্বীকার করেছেন। শওকত নিজে গিয়ে দূতাবাসের চিঠির বাক্সে হুমকি সংবলিত চিঠিটি ফেলে আসেন। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে মুরসি সমর্থকদের একটি গ্রæপ আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।’
২২ আগস্ট ’১৩ দৈনিক জনকণ্ঠ ‘মিসর দূতাবাসে হুমকি দেয়ার অভিযোগে শিবিরকর্মী গ্রেফতার’ শিরোনামে প্রতিবেদন করে। প্রতিবেদনে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘মিসরে মুসলমানদের ওপর হমলা নির্যাতন নিপীড়নে তিনি ব্যথিত হয়েছেন। এ জন্য মিসরে জুলুম নির্যাতন বন্ধ না হলে ঢাকার দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন। গ্রেফতারের পর আফসার নিজেকে শিবিরকর্মী এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ফেসবুক পেজের ফলোয়ার হিসেবে দাবি করে।
২২ আগস্ট ’১৩ দৈনিক সংবাদ এ ‘মিসরীয় দূতাবাসে হামলার হুমকিদাতা শিবির ক্যাডার গ্রেফতার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই দিনে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকিদাতা শিবির ক্যাডার গ্রেফতার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘মিসর দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকি : শিবিরকর্মী আফসার গ্রেফতার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও দৈনিক কালেরকণ্ঠ পত্রিকা।
এভাবে প্রায় কাছাকাছি শিরোনাম দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যায়যায়দিন, আমাদের সময়, মানবকণ্ঠ, সকালের খবর, বাংলানিউজ, নতুনবার্তা, বিডিনিউজ, শীর্ষনিউজসহ বেশির ভাগ গণমাধ্যম। একইভাবে চ্যানেল আই, দেশ টিভি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এনটিভি, সময় টেলিভিশন, একাত্তর টিভিতেও শওকত আফসারক শিবিরকর্মী হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ প্রচার করা হয়।

ঘটনার ব্যাপারে ছাত্রশিবিরের বক্তব্য
এ দিকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ২১ আগস্ট গণমাধ্যমে এক প্রতিবাদবার্তা পাঠানো হয়। প্রতিবাদবার্তায় ছাত্রশিবির সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল জব্বার বলেন, ‘মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকিদাতা হিসেবে পুলিশ কর্তৃক শওকত আলী হিরন নামে একজনকে গ্রেফতার করে তাকে শিবিরকর্মী হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা দেখে আমরা বিস্মিত। ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সরকারের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যে কোন কিছুর সাথে ছাত্রশিবিরকে জড়ানোর যে সরকারি অপপ্রয়াস, তারই প্রতিফলন এই ঘটনায় দেশবাসী পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকি দেয়া বা এ ধরনের কোন অপচেষ্টার সাথে ছাত্রশিবিরের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আর শওকত আলী হিরন নামে ছাত্রশিবিরের কোন কর্মীও নেই। তাকে গ্রেফতার করে ছাত্রশিবিরের ‘কর্মী’ হিসেবে চালিয়ে দেয়া চরম মিথ্যাচার ও সত্যের অপলাপ বৈ কিছু নয়।’
উক্ত প্রতিবাদ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক গণমাধ্যমে ছাপা হলেও শওকত আফসারকে শিবিরকর্মী সাজানোর অপচেষ্টা থেমে থাকেনি। পরদিন কতিপয় গণমাধ্যমে এ বিষয়ে শিবিরকে জড়িয়ে আবারো সংবাদ প্রচার করলে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আরেকটি প্রতিবাদলিপি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। ঐ প্রতিবাদবার্তায় বলা হয়, ‘গতকাল কতিপয় টিভি চ্যানেল ও অনলাইন মিডিয়ায় ঢাকাস্থ মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকিদাতার সাথে ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করা হলে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ‘হুমকিদাতা ছাত্রশিবিরের কেউ নয়’ দাবি করে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানানো হয়। দেশের জনপ্রিয় অনেক মিডিয়াতেই প্রতিবাদটি স্থান পায়। তারপরও কতিপয় দৈনিক পত্রিকা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে হুমকিদাতাকে ‘শিবিরকর্মী’ উল্লেখ করে ডিবির বক্তব্য হুবহু প্রকাশ করেছে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিবাদটি প্রতিবেদনে যোগ করা হয়নি। এমনকি বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের স্বার্থে ছাত্রশিবিরের কারো বক্তব্য নেয়ার প্রয়োজন বোধও করেননি। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে গ্রেফতারকৃত হিরনের মামা ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলম এবং তার মেজো ভাই নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান ‘হিরন কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এবং সে ঢাকা এসেছিল মেডিক্যাল কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। তাকে রাস্তা থেকে আচমকা গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তারা এটাকে আরেক জজ মিয়া নাটক বলেও উল্লেখ করেছেন। অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ‘দৈনিক প্রথম আলো’র সহযোগী সম্পাদক ও বামধারার লেখক হিসেবে পরিচিত জনাব আনিসুল হকের সাথে প্রোগ্রাম চলাকালীন হিরনের একটি ছবি ব্যাপক প্রচার হচ্ছে। এ থেকে তার রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার পরিচয় কিছুটা হলেও আঁচ করা যাচ্ছে।
পুরো ঘটনা যেভাবে ঘটেছে এবং যেভাবে প্রচার করা হয়েছে তা থেকে বিষয়টিকে অনেকটা সাজানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিশেষ কোনো স্বার্থ হাসিলের হীন চেষ্টা বলে দেশবাসীর কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের মনে কতিপয় প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে-
১. হুমকিদাতা কর্তৃক তথাকথিত চিঠিতে নিজের নাম, মোবাইল নাম্বার এবং ইমেইল আইডি উল্লেখ করার কারণ কী?
২. তাকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হলেও সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে দেয়া হয়নি কেন?
৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত ‘দৈনিক প্রথম আলো’র সহযোগী সম্পাদক ও বামধারার লেখক হিসেবে পরিচিত জনাব আনিসুল হকের সাথে প্রোগ্রাম চলাকালীন হিরনের ছবি থেকে কিছু আঁচ করা যায় কি?
৪. ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পর্ক না থাকার পরও তাকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে ফলাও করে প্রচার করার উদ্দেশ্য কী?
৫. ‘ফোকাস’-এর পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপিতে (আজকের দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে) জানানো হয়েছে সে ফোকাসের ছাত্র নয় এবং ঘটনার দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য সেখানে যাননি। তাহলে তাকে ফোকাস থেকে আটক করা হয়েছে বলে কেন প্রচার করা হচ্ছে?
৬. মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছু একজন ছাত্র ঘটনার দিন ফোকাসে তথা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে যাওয়ার কারণ কী? (যদি পুলিশের বক্তব্য সত্য বলে ধরে নেয়া হয়)

শিবির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে আটককৃত হিরনকে ‘ছাত্রশিবিরকর্মী’ বলে চালিয়ে দেয়ার গণমাধ্যমের এ অপপ্রয়াস দেখে দেশবাসী বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। এটা স্পষ্ট যে, ছাত্রশিবিরের সুনাম ক্ষুণœ করতে এবং আন্তর্জাতিকভাবে শিবিরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতেই এমন ন্যক্কারজনক বিষয়ের সাথে ছাত্রশিবিরকে জড়ানো হয়েছে। আর সরকারের সাজানো নাটককে পুঁজি করে গণমাধ্যমগুলো যেভাবে ‘সিন্ডিকেট নিউজ’ করেছে তা স্পষ্টত তথ্যসন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রকৃত ঘটনা কী
২১ আগস্ট ’১৩ দৈনিক প্রথম আলো ‘মিসরীয় দূতাবাসে হুমকি দেয়ায় এক ‘মুরসি সমর্থক আটক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকায় মিসরীয় দূতাবাস উড়িয়ে দেয়ার হুমকির অভিযোগে শওকত আফসার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক এক ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আজ সকালে ফার্মগেটের ফোকাস কোচিং সেন্টারে ঢোকার সময় তাকে আটক করা হয়।
২৬ আগস্ট ’১৩ দৈনিক আমার দেশ (অনলাইন) ‘মিসর দূতাবাসে হামলার হুমকি : হিরনের কাহিনী বানোয়াট, আরেক জজমিয়া নাটক’ শিরোনামে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকায় মিসর দূতাবাস বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার হুমকির অভিযোগে গ্রেফতার কক্সবাজারের ছাত্র শওকত আফসার হিরনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। র‌্যাবের দাবি, সে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর হিরনের পরিবারের দাবি, সে কোনো রাজনীতির সঙ্গেই জড়িত নয়; সে ষড়যন্ত্রের শিকার। তাকে নিয়ে আরেক ‘জজমিয়া’ কাহিনী সাজানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ তার পরিবারের। হিরনের পরিবার জানিয়েছে, সে রাজনৈতিকভাবে তেমন সক্রিয় ছিল না। তবে কক্সবাজারে তার ওঠাবসা ছিল বামপন্থী ও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে। তার আপন মামা কক্সবাজার আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এলাকাবাসী জানান, হিরন সম্পর্কে গণমাধ্যমে যেসব খবর বেরিয়েছে তা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। হিরনের ভাই নাসির মিয়া জানান, হিরন ১৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করার জন্য কক্সবাজার থেকে ঢাকা গিয়েছিল। সে ঢাকা শহর চেনে না এমনকি ঢাকার কোনো অলিগলি চেনার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ ঢাকা যাওয়ার এক দিনের মধ্যে কিভাবে তার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব? তিনি বলেন, ঘটনাটি পুরো বানোয়াট। তিনি আরও জানান, আমাদের পরিবার কখনও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু নিজেরা কোনো রাজনীতি না করলেও আত্মীয়স্বজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলমের আপন ভাগিনা হিরন। হিরনের ভাই মোক্তার আহমদ ঈদগাহ পালাকাটা ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তার ফুফা আমান উল্লাহ সাধারণ সম্পাদক। হিরন কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, কক্সবাজার সিটি কলেজে পড়ার সময় সে চলাফেরা করত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে। বামঘেঁষা কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি সে ছিল অনুরক্ত। ২০১০ সালে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত কবিতা মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবিরা কক্সবাজার এলে শওকত আফসার হিরন তাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। কক্সবাজার শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে ওই সব কবির সঙ্গে ফটোসেশন করে। কক্সবাজার শহীদ মিনারে একটি ছবিতে তার সঙ্গে অধ্যাপক মুনতাসির মামুন ও কবি মুহম্মদ নুরুল হুদাকেও দেখা যায়। অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও বামধারার লেখক আনিসুল হকের সঙ্গে প্রোগ্রাম চলাকালীন হিরনের একটি ছবি পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারের দাবি, হিরন চিন্তা-চেতনায় কোনো রাজনৈতিক দলে বিশ্বাসী হলেও নাশকতামূলক কাজ করবে এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। র‌্যাব তাকে দিয়ে আরও একটি ‘জজমিয়া নাটক’ সাজাতে চায়।

শওকতের খবরে নানা অসঙ্গতি Yealoo jurnalist-01
হুমকিদাতা কর্তৃক তথাকথিত চিঠিতে নিজের নাম, মোবাইল নম্বর এবং ইমেইল আইডি উল্লেখ করার বিষয়টি অনেকের কাছেই রহস্যজনক মনে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সুদূর মিসরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন একজন মেধাবী ছাত্র কি এতটাই কাণ্ডজ্ঞানহীন হতে পারে! তাকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হলেও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি। তাকে ফার্মগেটের ফোকাস থেকে গ্রেফতার করার কথা বলা হলেও ফোকাসের পক্ষ থেকে এক প্রতিবাদলিপিতে জানানো হয়েছে সে (হিরন) ফোকাসের ছাত্র নয় এবং ঘটনার দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যও সেখানে যাননি। তা ছাড়া মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছু একজন ছাত্র ঘটনার দিন ফোকাসে তথা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে যাওয়ার কারণ কী? ফোকাস তো মেডিক্যাল কোচিং নয়! (সূত্র : ২৬ আগস্ট ’১৩ দৈনিক আমার দেশ)
এ দিকে ২৫ আগস্ট দৈনিক নয়া দিগন্ত ‘গ্রেফতারকৃত শওকত কোন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত?’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকাস্থ মিসর দূতাবাস বোমায় উড়িয়ে দেয়ার হুমকির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া কক্সবাজারের ছাত্র শওকতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। র‌্যাবের দাবি সে শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। শওকতের পরিবারের দাবি, শওকত কোনো রাজনীতির সাথেই জড়িত নয়, সে ষড়যন্ত্রের শিকার। সে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সাথে ছিল না। তবে কক্সবাজারে তার ওঠাবসা ও চিন্তা চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। এলাকার অনেক মানুষ জানান, আমাদের চোখের সামনে বেড়ে ওঠা শওকত ঢাকায় যাওয়ার সাথে সাথে কিভাবে চরম সন্ত্রাসী বনে গেলো এটাই তাদের জিজ্ঞাসা।’

ঘটনার পরিণতি
এই ঘটনার জের ধরে নিরাপত্তার অজুহাতে মিসর দূতাবাসের কনস্যুলার শাখা ২১ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১০ দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গুলশান ২ নম্বর-এ ৯০ নম্বর সড়কে অবস্থিত মিসর দূতাবাস ও আশপাশ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ আগস্ট ’১৩)
গ্রেফতারকৃত আফসারকে আদালত থেকে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। (সূত্র : ২২ আগস্ট ’১৩ দৈনিক সমকাল)। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে কী কথ্য পাওয়া গেল বা আদৌ শওকতকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে কি না এ ব্যাপারে দেশবাসী আজও কিছুই জানেন না। ডিবি পুলিশ ও যে সকল গণমাধ্যম ব্যাপক উৎসাহের সাথে শওকতকে ‘শিবিরকর্মী’ বলে প্রচার করেছিল রহস্যজনকভাবে তারাও এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করছেন। যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি দেশের দূতাবাস ১০ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো এবং ছাত্রশিবিরের সাথে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রচারণাও পেয়েছিল, তা নিয়ে আর কোনো গণমাধ্যমে তার ফলো আপ সংবাদ প্রচারিত হয়নি। শওকতের রাজনৈতিক পরিচয় অন্য মিডিয়াগুলোর কল্যাণে জনসমক্ষে চলে আসার ফলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোর অপপ্রচারের বিষয়টি দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। (চলবে)
লেখক : প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply