সিরাতুন্নবী সা.-এর আয়নায় প্রিয় ছাত্রসংগঠন -অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ, অসসালাতু অসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ, অ-আলা আলিহি ওয়া আস্হাবিহি আজমায়িন।
মানুষ সাধারণত পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা বলে থাকে। বর্তমানে নতুন হিজরি বছরের রবিউল আউয়াল মাসকে কেন্দ্র করে কথাবার্তা চলছে। আজ থেকে ১৪৪২ বছর আগে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে সেখানে দ্বীনের দাওয়াত দেন ও সেখানে ইসলামী সমাজ কায়েম করেন। অনেকে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবন ও তার কর্মকে সামনে রেখে লেখালেখি, বক্তৃতা কথাবার্তা বলছেন- এটা ভালো কথা, তবে এটা শুধু সাময়িক হলে চলবে না। যেটা সারা বছর দরকার সেটা দু’ এক মাস করে ছেড়ে দিলে চলবে না। একবার কিছু লোক হযরত আয়েশা রা.-এর খেদমতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলার জন্য আরজ করলেন। জওয়াবে হযরত আয়েশা রা. তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি কুরআন পড় নাই? মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর চরিত্র ছিল জীবন্ত কুরআন।” (আবু দাউদ)
প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি ও কল্যাণ পেতে হলে আল্লাহ প্রদত্ত আল-কুরআন এবং মুহাম্মাদ সা.-এর জীবন-কর্মপদ্ধতি সব সময় জানতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে। এটার মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ। একজন ইংরেজ মুসলিম অনেকদিন আগে একটি কথা বলেছিলেন- We can never reach our goal until and unless we follow the footprints of Prophet Muhammad Sallallahu Alaihi Wasallam- আমরা কখনোই আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না যতক্ষণ এবং যে পর্যন্ত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ না করব।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের পথে ছাত্রসমাজকে এগিয়ে নিতে চায়, সত্যিকার মুসলিম বানাতে চায়। তাই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন হাদিস যাতে চর্চা করা সম্ভব হয় সে ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়ে থাকে। যার ফলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরেও তারা কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন-যাপন করার চেষ্টা করে। আলহামদুলিল্লাহ বাংলাদেশে অগণিত ছাত্র এই সংগঠনের সাথে জড়িত হয়ে এদেশে আল্লাহর কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর রহমতে সেই মিছিলে শরিক থাকার তৌফিক আল্লাহ তায়ালা আমাকে দিয়েছেন এবং সেখান থেকে ছাত্রজীবন শেষ করে বৃহত্তর কর্মজীবন এসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ বছর এর কাছাকাছি কুরআন-হাদীস ভিত্তিক জীবন কাটাতে পেরে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি আলহামদুলিল্লাহ। ভুলত্রুটি যা কিছু হয়েছে আল্লাহ তায়ালা যেন তা ক্ষমা করে দেন এবং তার কাছে সংরক্ষিত ৯৯ ভাগ রহমত দ্বারা আমাকে মাফ করে দিয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসে যাওয়ার তৌফিক দিন-আমিন। আমি বিগত জীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে যেমন দেখে আসছি তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখান থেকে কুরআন হাদিসের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জন করা যায়। বিশেষ করে ছাত্রদের জীবনে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করার একটি উত্তম স্থান। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে একটি দল থাকার জন্য ঘোষণা দিয়েছেন-
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকতে হবে যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, ন্যায়ের আদেশ দিবে এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তারাই সফলকাম হবে।” (সূরা আলে-ইমরান : ১০৪)
তোমাদের মধ্যে এমন এক দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা নেকি ও সৎকর্মশীলতার দিকে মানুষকে আহবান জানাবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। আল্লাহর কুরআনে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ঈমানদারদের সম্পর্ক জুড়ে দেয় এবং অন্যদিকে সমস্ত ঈমানদারদেরকে পরস্পরের সাথে মিলে সীসাঢালা এক মজবুত জামায়াত তৈরি করে। দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মাল ও জান দিয়ে প্রচেষ্টা চালাবে এবং একে অপরের সাথে সহযোগিতা করবে। সূরা যারিয়াতের ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্যে সুস্পষ্ট সতর্ককারী Then hasten ze to Allah, I am from Him a Warner to zou, clear and open!
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরববাসীরা ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতার কারণে সমগ্র আরব জাতিই ধ্বংসের কবলে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এই আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হওয়া থেকে ইসলামই তাদেরকে রক্ষা করেছিল। রাসূল সা. এর জীবন্ত অবদান তারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল। তারা দেখছিল : আওস ও খাযরাজ দু’টি গোত্রে বছরের পর বছর থেকে শত্রুতা চলে আসছিল। রাসূল সা.-এর ও ইসলামের বদৌলতে তারা মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের সাথে এমন নজিরবিহীন ত্যাগ ও প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার করেছিল, যা সাধারণত একই পরিবারের লোকদের নিজেদের মধ্যে করতে দেখা যায় না।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়ার কোন উপায় নেই। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ক্যান্সারের মত শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে চলছে। ইংরেজদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আলাদা করে সমাজে দুটো শ্রেণীর সৃষ্টি করা হয়েছে। মাদ্রাসা পাস করা একজন ছাত্র এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা একজন ছাত্র মন মেজাজ ও চিন্তার দিক থেকে একমুখী হয় না। বরং একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারে না। সাধারণত এমন অবস্থায় দেখা যায়। এমনকি চেহরা সুরাত ও পোশাক আশাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের দুজন নাগরিক তৈরি হয়। চিন্তা ও কাজের ঐক্য না থাকার কারণে দেশ গড়ার কোন পরিকল্পনা তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্র যে ধরনের নাগরিক দেখতে চায় এ শিক্ষা ব্যবস্থায় তা উপহার দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর মেহেরবানিতে ইসলামী শিক্ষা অর্জনের জন্য খুব আকর্ষণ অনুভব করতাম। এটা পারিবারিক পরিবেশের কারণে হতে পারে। ছোটবেলা আমার শ্রদ্ধেয় মা এর কাছ থেকে কুরআন মাজিদ ও বাংলা প্রথম পাঠ শেষ করি। খুব সম্ভব সাত বছর বয়স থেকেই নামাজ পড়া শুরু করি। আর এলাকায় ইসলামী জলসা কোথাও হলে সেখানে উপস্থিত হয়ে ইসলামী ওয়াজ শুনতে থাকি। এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হব এ রকম একটা চিন্তা করতে থাকি। ফলাফল দেখা গেল মানবিক শাখায় রাজশাহী বোর্ডে ৩য় স্থান অধিকার করেছি। জানতে পারলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হলে এস.এস.সিতে প্রাপ্ত মেধাবৃত্তি পাওয়া যাবে না। ফলে রাজশাহীতে সরকারি কলেজেই ভর্তি হলাম। এদিকে জানতে পারলাম ইসলামী ছাত্রসংগঠন করলে মাদ্রাসার মতই ইসলাম শিখা যাবে। ফলে কলেজ লাইফে ভর্তি হবার সাথে সাথে ইসলামী ছাত্রসংগঠনে ভর্তি হয়ে যাই। এদিকে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি কুরআন হাদীস শিক্ষার কাজ শুরু করি। কলেজে ভর্তি হবার পরেই সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করি।
নামাজ রোজার হাকিকত বই থেকে সামষ্টিক পাঠ শুরু করি। বইটি খুবই আকর্ষণ সৃষ্টি করল। নতুন বই পেলে সেটা শেষ না করে ছাড়তাম না। কিন্তু ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের শিক্ষা নিয়ে বসে থাকতে পারিনি। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আনজুমান-ই-ইসলাম নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। এলাকায় ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন করার দায়িত্ব পালন করতে থাকি। রাজশাহী শহরের মরহুম আব্দুল মান্নান ভাই (আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন) তখন ইউনিট সভাপতি ছিলেন। শহরে কোলাহলমুক্ত পরিবেশ হিসেবে মৎস্য বিভাগের বড় বড় পুকুরগুলোর পাড়কে বেছে নিতেন এবং সেখানে বাদাম কিনে নিয়ে একদিকে বাদামচক্র হয়ে যেত অন্যদিকে দরসে কুরআন ও সামষ্টিক পাঠ এর প্রশিক্ষণ হয়ে যেত। কুরআন হাদীসের সিলেবাস শেষ করে পর্যায়ক্রমে কর্মী, সাথী ও সদস্য জীবন শেষ করলাম ১৯৭৮ সালের শেষে। ১৯৭৯ সালে শেষদিকে বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে যোগদান করি।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আমাকে যা শিখিয়েছে এবং আমি যা অর্জন করতে পেরেছি তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো-
(এক) দুনিয়ার জীবনই শেষ নয়, এরপর আর একটা জীবন আছে যেখানে এখানকার কাজ কর্মের হিসাব হবে- ভালো কাজ করে যেতে পারলে জান্নাত আর খারাপ কাজ করলে জাহান্নামে যেতে হবে।
(দুই) আখেরাতের সেই জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে দুনিয়ার জীবনেই তা করে যেতে হবে। এখানে যেমন ফসল হবে আখেরাতে তেমন ফলাফল পাওয়া যাবে।
(তিন) ইংরেজি পড়ে দুনিয়া বুঝা যেতে পারে আখেরাতের কিছুই বুঝা যাবে না। তা বুঝতে হলে কুরআন ও হাদীস বুঝে বুঝে পড়তে হবে। ইসলামী জীবন বিধানের ওপর লিখা ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করতে হবে।
(চার) কুরআন হাদীসের আলোকে দুনিয়ার সকল আইন-কানুন গ্রহণ ও বর্জন করতে হবে এবং সকল আইনের উপরে কুরআন হাদীসের আইনের মর্যাদা দিতে হবে। কুরআন এসেছে মানুষকে উভয় জগতে মুক্তি দিতে।
(পাঁচ) যে কোন কাজ করতে হলে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অনুমোদিত পন্থায় করতে হবে। বিদায় হজের এ হাদীসটি সকলকে মনে রাখতে হবে। “আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি দুটি কিতাব। যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে ধরে থাকবে ততদিন তোমরা পথ ভ্রষ্ট হবে না, তা হচ্ছে একটি আল্লাহর কিতাব আর একটি আমার সুন্নাহ।”
(ছয়) নিজের ব্যক্তিগত মত কুরআন হাদীসের মতের কাছে কুরবানি করতে হবে- এবং নিঃশর্তভাবে আল্লাহর ও তার রাসূলের আনুগত্য করতে হবে।
(সাত) পিতা-মাতার নির্দেশ মেনে চলতে হবে। কিন্তু ইসলামী ফরজ কাজে বাধা দিলে তা শোনা ও মানা যাবে না। কিন্তু দুনিয়ায় তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করতে হবে ও তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে।
(আট) মাল ও জান আল্লাহর। তাই এগুলো তারই পথে খরচ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথে খরচ করার কাজটি খরচ নয়, এগুলো আল্লাহর কাছে আখেরাতে জমা হয় ও বহু গুণে বৃদ্ধি পায়।
(নয়) স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে শহীদী মৃত্যু অনেক ভাল- বিনা হিসেবে জান্নাতে যাওয়া যাবে। জীবন যিনি দিলেন তার পথেই জীবন বিলীন হবে এটাই তো স্বাভাবিক।
(দশ) রাতের বেলায় ঘুম ত্যাগ করে (শেষ রাতে) আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে জীবনের একমাত্র কামনা। জায়নামাজে বসে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা ও রহমাত চাইতে হবে। মনে রাখতে হবে গাভীর ওলান থেকে দুধ বের করে সেই দুধ যেমন পুনরায় ওলানে প্রবেশ করানো অসম্ভব তেমনি অশ্রু ঝরানো ব্যক্তির পক্ষে জাহান্নামে প্রবেশ অসম্ভব হবে। আল্লাহর রহমাত যুক্ত হয়ে সকলের মুক্তি হবে।
(এগারো) দুনিয়াই আমলনামা তৈরি করতে হবে ভালো আমল দিয়ে। আদালতে আখেরাতে ডান হাতে আমল পেতে হবে।
ইসলামী সংগঠনের সকল জনশক্তিকে শক্তভাবে নিচের সাবধানবাণীগুলো মনে রাখতে হবে-
(এক) আল্লাহ তায়ালা কথা ও কাজকে এক করতে বলেছেন। কথা এক রকম, কাজ আর এক রকম যাতে না হয়। সূরা বাকারায় ৪৪ আয়াতে বলা হয়েছে-
“তোমরা মানুষকে নেকির আদেশ কর আর তোমরা নিজেদেরকে ভুলে যাও অথচ তোমরা কিতাব (কুরআন মাজিদ) তেলাওয়াত করে থাক এরপরও কি তোমাদের বুদ্ধি হবে না?। সূরা সফে বলা হয়েছে-
“হে ঈমানদার লোকেরা তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা করো না? আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত ক্রোধ উদ্রেককারী বিষয় যে তোমরা যা বল তা করো না।” (সূরা সফ : ২,৩)
(দুই) অত্যন্ত মজবুত সুসংগঠিত এক বাহিনী হিসেবে তৈরি হতে হবে যাদের আনুগত্য ও ত্যাগ সংগঠনকে সীসাঢালা প্রাচীর হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। সূরা সফে ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা আল্লাহর পথে লড়াই করে দলবদ্ধভাবে যেন সীসাঢালা প্রাচীরের মতো। কাজটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। এ রকম কঠিন কাজ করার জন্য অত্যন্ত নিখুঁত ও মজবুত বাহিনীর দরকার। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে এটা মনে রেখেই অগ্রসর হতে হবে।
(তিন) ইসলামী আন্দোলন এটা কোন সাময়িক আন্দোলন নয়। একাজ জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে চালিয়ে যেতে হবে। তবেই আসবে সফলতা। ছাত্রজীবনে খুব সক্রিয় থাকল কিন্তু ছাত্রজীবন শেষে কর্মজীবনে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল। এতে বুঝা যায় সে ব্যক্তি ইসলামী আন্দোলন সঠিকভাবে বুঝে নাই। আমরণ আন্দোলন চালাতে পারলে বুঝতে হবে এটা সঠিক ইসলামী আন্দোলন। মানুষ প্রশিক্ষণ নেয় কাজ করার জন্য। প্রশিক্ষণ শেষে ময়দানে গিয়ে কাজ করে প্রশিক্ষণের প্রমাণ দেয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী ছাত্রশিবির মানুষের প্রাথমিক জীবনে ইসলামী আন্দোলনের প্রশিক্ষণ মাত্র। কর্মজীবনে ছাত্রজীবনের প্রশিক্ষণগুলো কাজে লাগাতে হবে। এটাই হচ্ছে জীবনের প্রকৃত ক্ষেত্র।
বিয়ে করে ঈমান পূর্ণ করা হয় এবং বড় পরীক্ষার ক্ষেত্রে অবতরণ করতে হয়। পরীক্ষার সময়ই যদি ইসলামী আন্দোলন কাজে না লাগল তাহলে ছাত্রজীবনের এতদিনের টিএসটিসি, শববেদারি, সামষ্টিক পাঠ, স্টাডি সার্কেল ইত্যাদি কোন কাজে লাগল?
এই প্রশ্নই আজকের সকলের সামনে জোরদার হয়ে উঠছে। আশা করি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য, সাথী, কর্মী সমর্থকসহ সকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আগামীতে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে বিপ্লবী ভূমিকা রাখবেন। সেই সাথে কাঁটা বিছানো পথ হলেও তা মাড়িয়ে শিরকমুক্ত, বিদআতমুক্ত, অহংকারমুক্ত হয়ে জান্নাতের পথে অগ্রসর হতে হবে। আল্লাহ সেই তৌফিক দিন- আমিন। আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জাহান্নামকে মনোলোভা জিনিসসমূহ দ্বারা ঘিরে দেওয়া হয়েছে এবং জান্নাতকে ঘিরে দেওয়া হয়েছে কষ্টসাধ্য কর্মসমূহ দ্বারা। (সহীহুল বুখারী-৬৪৮৭)
রাসূল সা. ৬৩ বছর বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। আল্লাহর রহমতে সে পরিমাণ বছর পার হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষায় আছি যে কোন সময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাবার জন্য। শেষ মুহূর্তে বিদায়ী কথা বলে যাওয়ার সুযোগ পাব কিনা জানি না। আজকে শেষ কথা মনে করে কয়েকটি কথা আমার একান্ত প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিকসহ দ্বীনী ভাইবোনদেরকে বলে যেতে চাই-
এক নম্বর- দেখতে দেখতে জীবন কখন যে শেষ হয়ে গেল টের পাওয়া গেল না। পড়ন্ত বেলায় আফসোস করতে হবে কেন আরো ভালো কাজ করিনি, কেন আরো বেশি কুরআন হাদিস পড়িনি কেন আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে জীবনের গোনাহ খাতার জন্য আরো বেশি মাফ চাইনি। যদি যৌবন অবস্থা থেকেই রাতের আঁধারে আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে ক্ষমা চাইতাম এবং সকলের জন্য দোয়া করতাম তাহলে কতই না ভালো হতো। যে সমস্ত ভালো কাজ করা উচিত ছিল করতে পারিনি দয়া করে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিও আর যে কয়দিন হায়াত রেখেছ এই সময়টুকুকে ঠিকমতো কাজে লাগার তৌফিক দিও।
দুই নম্বর- নতুন প্রজন্ম যারা ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছে ভবিষ্যতে যোগ দিবে তাদের সবাইকে কুরআন হাদিস পড়ার জন্য অনেক বেশি সময় খরচ করার আকুল আবেদন করছি। শিরক, বিদআত, রিয়া, অহংকার ও কারো হক নষ্ট কোন অবস্থায়ই কোন খাতেই যাতে না হয়।
তিন নম্বর- কবরের প্রথম হিসাব নামাজ, জামায়াতে সালাত এবং সময়মত সালাত ঠিক রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে- ‘আগে সালাত পরে কাজ’। কবরের ঘাট পার হতে পারলে বাকি ঘাটগুলো পার হওয়া সহজ হবে।
চার নম্বর- মাতা-পিতার সাথে তাদের হক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি তাদের সন্তুষ্টির ওপরেই নির্ভর করছ্ এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি তাদের অসন্তুষ্টির উপরেই নির্ভর করছ্। যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি মাতা পিতার সন্তুষ্টির উপরেই নির্ভর করছে, অতএব যেকোনো মূল্যে মাতা-পিতাকে খুশি রাখতে হবে। তাদের সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে।
পাঁচ নম্বর- কারো কাছে কোন দেনা-পাওনা রাখা যাবে না এবং কারো হক নষ্ট হয়ে থাকলে এখানেই হক পরিশোধ করে যেতে হবে। কারণ কাল কিয়ামতে কারো হক পরিশোধ করার কোনো সুযোগ থাকবে না বরং নিজের নেকি তাদেরকে দিয়ে দিতে হবে এবং তাদের গুনাহ বহন করে জাহান্নামে যেতে বাধ্য হতে হবে। এ রকম অবস্থা যেন না হয়।
ছয় নম্বর- এমনভাবে জীবন যাপন করতের হবে যাতে আমি চলে গেলেও আমার তিরোধানের পর তারা আমার জন্য অন্তর থেকে প্রাণভরে দোয়া করতে পারে। কুরআন মাজিদের সূরা শুয়ারার ৮৩ নম্বর আয়াত থেকে ৮৫ নম্বর আয়াত একটি অনুকরণীয় ও অবিস্মরণীয় দোয়া হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম করেছিলেন যা আল্লাহ তায়ালা আমাদের সামনে কেয়ামত পর্যন্ত তার কিতাব আল-কুরআনে সুন্দর ভাবে রেখে দিয়েছেন।
“হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে শামিল করে দিন’ ‘এবং পরবর্তীদের মধ্যে আমার সুনাম-সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন’, ‘আর আপনি আমাকে সুখময় জান্নাতের ওয়ারিশদের অন্তর্ভুক্ত করুন’।” আর যিনি আশা করি, বিচার দিবসে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবেন’।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে এ দোয়া করার তৌফিক দান করুন। আমিন। ওমা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।
ওয়া আখিরি দাওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন- সুবহানাকা আল্লাহুম্মা অবিহামদিকা আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা অআতুবু ইলাইকা।
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক; সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply