সিরাতে রাসূল (সা) চাই পূর্ণাঙ্গ চর্চা

মুহিউদ্দীন খান

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত পয়গাম নিয়ে এ দুনিয়াতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আর ২৩ বছরের নবুওয়তি জিন্দেগির মধ্যেই তিনি মানবজাতি, মানবসভ্যতা এবং মানুষের অগ্রগতির কাফেলা যাতে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে চলতে পারে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে গিয়ে সাফল্যের সঙ্গে তাঁর রেজামন্দি ও মাগফেরাত পাওয়ার অধিকারী হয়, তারই একটা পরপূর্ণ রূপরেখা রেখে গেছেন।
হুজুর আকরামের (সা) অনুপম সে সিরাতে পাকের বিভিন্ন দিক নিয়ে যদি আলোচনার সূত্রপাত করতে হয়, তবে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে হুজুর (সা) কোন সময়, ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপটে এবং মানবসভ্যতার কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর দ্বারা মানুষের এ সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে কতটুক কাজ হয়েছিল এবং মানুষ কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছিল। অন্য দিকে সর্বপ্রথম তাঁকে যারা গ্রহণ করেছিলেন, যারা তাঁর শিক্ষা ও আদর্শকে নিজেদের জীবন বাস্তবায়িত করে পরবর্তী মানবসমাজের জন্য একটা উজ্জ্বল উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তাদের সে কার্যকলাপ এবং সেই সাহাবায়ে কেরামের আদর্শ চরিত্র কী রকম ছিল। কী রকম ছিল যারা সাহাবায়ে কেরামকে সঠিকভাবে অনুসরণ করেছেন এবং সে অনুসরণের রাজপথ ধরে আজ পর্যন্ত আল্লাহর দীন, আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের (সা) আদর্শকে মানুষের সামনে জীবন্ত নমুনা হিসেবে অম্লান করে রেখেছেন। আমরা যদি সিরাতে পাককে (সা) যথাযথ মূল্যায়ন করতে চাই, তবে যেমন আমাদের দেখতে হবে যে, মাত্র দশ বছর সময়কালের মধ্যে, দশ বছর কেন? মাত্র সাড়ে সাত থেকে আট বছর সময়কালের মধ্যে হুজুর আকরাম (সা) এমন একটি বিশাল রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, যার আয়তন ছিল আমাদের বাংলাদেশের মতো অন্তত ১৬টি দেশের সমান। তাঁর ইন্তেকালের সময় মুসলমানদের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া রাষ্ট্রটির আয়তন ছিল পৌনে আট লাখ বর্গমাইল। অথচ বাংলাদেশের আয়তন মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল। প্রায় ১৬টির সমান একটি বিশাল রাষ্ট্র হুজুর আকরাম (সা) সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে রেখে গিয়েছিলেন। মাত্র ২০ বছর সময়ের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম (রা) এই রাষ্ট্রের আয়তন ২৬ লাখ বর্গমাইলে সম্প্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হজরত ওসমানের (রা) খেলাফতকালে দাঁড়িয়েছিল ইসলামী খেলাফতের আয়তন ২৬ লাখ বর্গমাইলে। এটা কোনো কল্পকাহিনী নয়। ইতিহাস আছে, ভূগোল আছে এবং এ প্রমাণ মানচিত্র রয়েছে। প্রতিটি মানচিত্রে এই রেকর্ড লিপিবদ্ধ রয়েছে। গবেষণা করলে দেখা যাবে, যেসব এলাকা হজরত ওসমান (রা) শাসন করতেন, সেসব এলাকার আয়তন কত ছিল, কী রকম ছিল তার শাসনব্যবস্থা। এটাকে আমি সিরাতে পাকের (সা) অংশ হিসেবেই আখ্যায়িত করতে চাই।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) একদা মক্কা মোয়াজ্জমায় ঘোষণা করেছিলেন, দেখ আজকের যুগে তোমরা এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছ যে, একজন মানুষ তার বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যথেষ্টসংখ্যক লোকলস্কর সঙ্গে নিয়েও এক শহর থেকে অন্য শহরে নিরাপদে পৌঁছতে পার না, পথে ওঁৎ পেতে বসে রয়েছে লুটরো এবং তস্করের দল। অথচ শুধু কালেমা ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ প্রতিষ্ঠা করলে দেখবে, এমন এক সময় আসবে সুদূর ইয়েমেন থেকে কোনো যুবতী নিঃসঙ্গ অবস্থায় মাথার ওপর সোনা-চাঁদির বোঝা নিয়ে মক্কা মোয়াজ্জমা পর্যন্ত সফর করবে, তার দিকে চোখ তুলে দেখার মতো কোনো দুষ্কৃতকারীর অস্তিত্ব আর থাকবে না। সাহাবায়ে কেরামের সময়কার শাসনব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাই, হজরত ওমর (রা) তার খেলাফতকালে তৃতীয় বর্ষে মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামী খেলাফতের বিভিন্ন এলাকার প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের এক মহাসম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। সে মহাসম্মেলনে তিনি ভাষণ দিতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মনে রেখ, এখান থেকে সাড়ে সাতাশ মাইল দূরের ফোরাত নদীর তীরেও যদি একটি কুকুর না খেয়ে মারা যায়, তার জন্য কিয়ামতের ময়দানে ওমরকেই জবাবদিহি করতে হবে।
এটা বর্তমান যুগের কথা নয়, আজ থেকে চৌদ্দ শ’ বছর আগের একটি ঘোষণা। এরকম একটি ঘোষণার কথা যদি আজকের যুগের কোনো বিরাট রাষ্ট্রশক্তি প্রধানের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়, তবে সব মানুষই হাসবে। আজকের আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান, ব্রিটেনের সরকারপ্রধান কিংবা দুনিয়াতে এমন কোনো রাষ্ট্র আছে কি, যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এ কথা ঘোষণা করতে পারেন যে, আমার দেশে আমার শাসিত এলাকার মধ্যে কোনো মানুষ যদি না খেয়ে মরে, কোনো মানুষ যদি কষ্ট পায় আখেরাতে বিশ্বাসী না হলেও অন্তত দুনিয়ার বুকে আমি তার জন্য দায়ী এবং তার সব দায়দায়িত্ব বহন করবো। আছে কি এরকম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যার মুখ দিয়ে এরকম দুঃসাহসী ঘোষণা উচ্চারিত হতে পারে? নেই, সেটা সম্ভবও নয় তাদের পক্ষে। আমাদের অনেকে জিজ্ঞাসা করে থাকেন সেই ইসলাম, খোলাফায়ে রাশেদিন, সেই সোনালি যুগের দিনগুলো মাত্র ত্রিশ বছর পরে কেন ভেঙে গেল? এর পরে কেন ইসলাম টিকে থাকল না? আমি বলতে চাই, এর চেয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন আর কিছু হতে পারে না। কারণ খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ থেকে শুরু করে আপনারা লক্ষ্য করবেন, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) ছিলেন হুজুর আকরামের (সা) প্রথম খলিফা। তিনি খেলাফত আলা মিনহাজিন্নবুওয়াত অর্থাৎ নবুওয়তের আদলে খেলাফত কিভাবে পরিচালনা করতে হয় তার সূচনা করেছিলেন। তার সূচিত এই খেলাফতের ধারাবাহিকতা বর্তমান শতাব্দীর বিগত ১৯২৪ সালে তুরস্কের সর্বশেষ খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত চলে এসেছে। বস্তুত হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) থেকে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ছিল একশ ছয়জন। আমি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এই একশ ছয়জন খলিফার মধ্যে মাত্র বিশ-বাইশজন শাসক একটু সংযমী ছিলেন। মানে হুজুর আকরাম (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের পুরোপুরি অনুসরণ ও অনুকরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। কিন্তু তাদের মধ্যে অন্তত এমনও শাসকের সন্ধান পাওয়া যায় যাদের শাসনব্যবস্থা হজরত ওমর (রা) কিংবা হজরত ওমর বিন আবদুল আজীজের (রা) শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তারা অন্তত আল্লাহকে মানা, রাসূলের (সা) দেয়া বিধানকে দুনিয়ার বুকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে যে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন, তাদের চরিত্র যে রকম নির্মল ছিল, তাদের শাসন যে রকম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যেসব বিষয় যদি আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্তসহ উপস্থাপন করতে পারি, তবে একে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস কারও হবে বলে মনে করি না। স্যার অ্যাডমন্ড বার্ক নামক জনৈক বিখ্যাত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ান তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছিলেন, মুহাম্মদের (সা) অনুসারীরা যে শাসনব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, অন্তত পূর্ববর্তী এক হাজার বছরের মধ্যে এমন কোনো দুঃসংবাদ আমরা পাই না যে, তাদের দ্বারা শাসিত এলাকার মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে, মানুষ না খেয়ে মরেছে।
অনেকে বলে থাকেন, ইসলামের জন্ম হয়েছে মক্কায়, ইসলাম লালিত পালিত হয়েছে মদিনায়, ধ্বংস হয়েছে বাগদাদে এবং ইসলামের কবর রচিত হয়েছে ইস্তাম্বুলে। এটা খ্রিষ্টানদের বানানো কল্পকথা।
আমরা যদি এ কথা বিশ্বাস করি, তবে আম্বিয়ায়ে মোজতাহেদিন, প্রখ্যাত মোফাচ্ছেরিন এবং মোহাদ্দেসিনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের দ্বারা আমাদের যেভাবে সমৃদ্ধশালী করেছেন, ইসলামী ইতিহাস এবং ইসলামী তাহজিব তমদ্দুনকে যেভাবে সংরক্ষণ করেছেন, সেসবের নিরিখে এসব কল্পকথাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়। সুতরাং সিরাতকে খণ্ডিতভাবে চর্চা করা এবং পাঠ করার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের গোটা উম্মাতে মুহাম্মদীকে একটি মাত্র ইউনিট হিসেবে কল্পনা করে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের ওপর দিয়ে যতগুলো যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে তার প্রত্যেকটি যুগে এই উম্মত বিশ্বের মানুষের জন্য কতটুকু করেছেন, মুসলমানদের কতটুকু অবদান ছিল এবং মুসলমানরা তাদের ঈমান আকিদার ওপর ভিত্তি করে কত দূর অগ্রসর হয়েছে, যদি এর ওপর একটা সার্বিক পর্যালোচনা না হয়, তবে সিরাতে পাকের আলোচনাই হলো না। সিরাতে পাকের (সা) আলোচনা যদি করতে হয়, তবে হুজুর আকরামের (সা) আদর্শকে, তাঁর সুন্নাহকে এবং তাঁর জীবনকে এ যুগ পর্যন্ত নিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক মদীনা

SHARE

Leave a Reply