সিরিয়া সঙ্কটের গন্তব্য কোথায়? – মো: আলমগীর হোসেন আকাশ

প্রায় ৫০ বছর পূর্ব থেকে সিরিয়া শাসন করছে বাথ পার্টি। ঠিক তখন থেকে বিরোধী দল নিষিদ্ধ করা হয় এবং জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। অনেক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। ২০১১ সালে আরব বিপ্লবের ঢেউ আসতে না আসতেই সিরিয়া বহিষ্কৃত হয় আরব লিগ থেকে।
আজ সিরিয়া সঙ্কটের পেছনে অনেক কারণ দৃষ্টিগোচর হয়। প্রথমে যে বিষয়টা লক্ষ্য করা যায় তা হলো ৬০ এর দশকে ¯œায়ুযুদ্ধের অবসানের পরপরই অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। উত্থান হয় সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর। একের পর এক প্রতিশোধ নিতে শুরু করে মুসলিম দেশগুলোর ওপর। যে মুসলিম দেশ একটু আধুনিক বা সমৃদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে তাকে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখিয়ে বা মৌলবাদী উসকে দেয়। এই ধারাবাহিকতা শুরু হয় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
তার পরবর্তীতে যে বিষয়টা লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো বিশ্বের আরো দুই পরাশক্তি হলো চীন ও রাশিয়া। তারাও সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়েছিল সিরিয়ার ওপর। রাশিয়া চেয়েছে অস্ত্র ব্যবসা করে সিরিয়ার মাঝে তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য এবং অন্য দিকে চীন চাচ্ছে সামরিক যুদ্ধ না করে বাজার যুদ্ধ করার মাধ্যমে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে। সিরিয়া হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ও তেলসমৃদ্ধশালী দেশ। চীন এটা কৌশল হিসেবে নিয়েছে।
অন্য দিকে আরো একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হচ্ছে পশ্চিমাবিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদীরা সিরিয়ার বিরুদ্ধে শুরু করল গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অপ্রপ্রচার। তারা ধারণা করছে এই বিপুল অস্ত্র বাশার আল আসাদ সঙ্কক্ষণ করতে পারবে না। তা পরবর্তীতে মৌলবাদী গোষ্ঠীদের হাতে চলে যাবে এবং পশ্চিমাবিশ্বের জন্য এটা হুমকিস্বরূপ।
গত দুই তিন বছরে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে ১ লাখেরও বেশি লোক মারা যায়। ১০-২০ লাখ লোক নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমায়। দীর্ঘ দিনের গৃহযুদ্ধ একটা সঙ্কট অবস্থা সৃষ্টি করছে। একদিকে বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা, অন্য দিকে বিদ্রোহীদের সরকার উৎখাতের চেষ্টা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত তিন বছরে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো পরোক্ষভাবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিভিন্নভাবে জড়িত ছিল। এই সঙ্কটের মাঝে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন করছে পরাশক্তি রাশিয়া এবং সাথে আছে চীন। এ ছাড়া ইরান পুরোপুরিভাবে সিরিয়া সরকারের পক্ষে রয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং হামাস সংগঠনও বাশার আল আসাদের সাথে রয়েছে।
অপর দিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল বাশার আল আসাদ বিরোধী। তারা বিদ্রোহীদের সমর্থন করে। সিরিয়ার সরকার বিরোধী প্রধান জোট হলো ন্যাশনাল কোয়ালিশন। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সরকার ও বিদ্রোহী ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও বিজয় অর্জন করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। গত বছর আগস্টের শেষ দিকে সিরিয়ায় নিরীহ জনগণের ওপর রাসায়নিক হামলা চালানো হয়। এতে সরকার ও বিদ্রোহীরা একে অপরকে দোষী করার চেষ্টা করে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই রাসায়নিক হামলাকে কেন্দ্র করে সিরিয়াতে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে।
সম্প্রতি সিরিয়া সঙ্কটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া আর পরোক্ষ অবস্থানে নেই। এখন তারা মুখোমুখি অবস্থানে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুরোধে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে রাশিয়া উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-এর বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে। ইতোমধ্যে আইএস-এর সদর দফতর গুঁড়িয়ে দিয়েছে রুশ যুদ্ধবিমান। ৫০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার অংশ নিয়েছে এই যুদ্ধাভিযানে। ৬০ বারের বেশি হামলায় আইএস সন্ত্রাসী এখন দিশেহারা হয়ে পালাতে শুরু করেছে। মজার দিক হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশের আন্তর্জাতিক জোট যেখানে গত এক বছর ধরে বিমান হামলা করে আইএস-এর পতন ঘটাতে পারেনি। সেখানে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাশিয়ার হামলায় তাদের অবস্থান একেবারে দুর্বল করে দিয়েছে।
রাশিয়ার বিমান হামলায় মার্কিন ও ফ্রান্স তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এখনো তারা বলছে যে, বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় থেকে সরে যেতে হবে। একই সাথে তারা সিরিয়ার রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছেন। এতে রাশিয়ার ভøাদিমির পুতিন বলেন : সিরিয়ার জনগণই দেশটির ভবিষ্যৎ ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণের কেউ নন।
অন্য দিকে সিরিয়ায় বিমান হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তুরস্ক ও সৌদি আরব। তাদের চিন্তা যে পশ্চিমা আদলে সেটা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ অনেকবার বলেছেন, সিরিয়া সঙ্কটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হলো তুরস্ক। সিরিয়া সঙ্কটের শুরু থেকে তুরস্ক সবসময় উসকানি দিয়ে আসছে। তুরস্ক সিরিয়ার সকল সন্ত্রাসীকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলও অসন্তোষ প্রকাশ করে।
সিরিয়ার সন্ত্রাসীদের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা হচ্ছে, সিরিয়াতে নাকি দু’টি সন্ত্রাসী দল আছে। একটা হলো ভালো সন্ত্রাসী দল অন্যটি হলো খারাপ সন্ত্রাসী দল। তারা একদিকে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে, অন্য দিকে বিমান হামলার নামে প্রহসন চালিয়ে আইএসকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
মূল বিষয় হলো, আমেরিকা চাচ্ছে সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে উৎখাত করে সেখানে তাদের ইচ্ছেমতো সরকার গঠন করে নতুন একটি মধ্যপ্রাচ্য তৈরি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। তারপর ধীরে ধীরে মুসলিমদের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে তাদেরকে পঙ্গু করে দেয়া। এই পথে একমাত্র বাধা হচ্ছে বর্তমান সিরিয়ার সরকার বাশার আল আসাদ ও ইরান। অপর দিকে ইসরাইলের চিন্তা হচ্ছে, হামাস ও হিজবুল্লাকে দুর্বল করে ইসরাইলে তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা। আর এই পথে তারা বাশার আল আসাদের শক্ত অবস্থান ও ইরানকে একমাত্র বাধা মনে করছে।
আজ বিশ্বমানবতা জানতে চায়, আইএস সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কারা! তাদের উত্থান কিভাবে! কেনইবা তাদের তৈরি করা হয়েছে। যে কোন দেশে যখন কোন সন্ত্রাসী হামলা হয় অথবা কোন অপরাধ সংঘটিত হয় তা অল্প সময়ের ব্যবধানে নিরসন করা যায়। কিন্তু আইএস হঠাৎ করে কোথা থেকে এলো এবং তাদের হুঙ্কারে বিশ্ব আজ স্তব্ধ। তাদের আক্রমণে শত শত নিরীহ মানুষ হত্যাসহ মুসলিমদের পবিত্র আবাস মসজিদ পর্যন্ত রেহাই পায়নি। এভাবে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা ইসলামের ইতিহাসে কোন নজির আমার জানা নেই।
এই নিয়ে রাশিয়ার ভøাদিমির পুতিন বলেন, আইএস কারা ! এটা আমেরিকা ও তার অন্যান্য জোট রাষ্ট্রগুলো খুব ভালো করেই জানে। তারা নাকি আইএস উৎখাতে বিমান হামলা করছে, গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত পারেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, আইএস উৎখাতের নাম দিয়ে তার বাসার আল আসাদকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে। আসলে তারা যুদ্ধের নামে করছে প্রহসন। এর কারণ হচ্ছে যে, আইএস হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তৈরি।
এতে করে মার্কিনিদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। কারা আইএস-এর পক্ষে আর কারা আইএস-এর বিপক্ষে তা এখন স্পষ্টভাবে বলা যায়। ইরানও বলার চেষ্টা করেছে যে, সিরিয়ার সঙ্কট তৈরির পেছনে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের চিন্তা হলো মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা এবং নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা।
আজ মার্কিন ও রাশিয়ার মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সিরিয়া কোন পথে এগিয়ে যাবে সেটা সময় বলে দেবে। বিশ্ব আজ মনে করছে যে, রাশিয়ার এই বিমান হামলা হয়তোবা সিরিয়ার সঙ্কট কেটে যাবে না হয় পৃথিবী আরো এক নতুন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে এবং ৬০ দশকের পর বিশ্বে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের অবসান ঘটবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

SHARE

Leave a Reply