সুদৃঢ় ঐক্যই মুসলিম উম্মাহর মুক্তির উপায় -এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐক্য শব্দের অর্থ হলো একতা। ইসলামের মৌলিক আহ্বান হচ্ছে : আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। এই তাওহিদী আহ্বানের মধ্যেই ঐক্যের বীজ নিহিত। ইসলামে শিরকের সুযোগ নেই এবং অনৈক্য ও বিভেদের অবকাশ নেই। কুরআন মজিদে বার বার ঐক্যের প্রতি আহ্বান জানান হয়েছে, বিভেদের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাঁচার জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। বস্তুত ঐক্যের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্ট লাভ হয়। আর বিভেদে তার অভিশাপ আসে। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্নভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন ও বিভেদের পথ পরিহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
বিদায় হজের ভাষণে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হে ভ্রাতৃমন্ডলী, আমার বাণী মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করতে চেষ্টা কর। জেনে রেখো, সকল মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সবাই একই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। সমগ্র দুনিয়ার সকল মুসলমান একই অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ। স্মরণ রেখো, বাসভূমি ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মুসলমান সমান। আজ থেকে বংশগত কৌলিন্য প্রথা বিলুপ্ত হলো। পরস্পরের প্রাধান্যের একমাত্র মাপকাঠি হলো খোদাভীতি বা সৎকর্ম। সে ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে কুলীন, যে নিজ কার্য দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এক মুমিন অপর মু‘মিনের জন্য আয়নাস্বরূপ এবং এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই। তারা একে অপরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে রক্ষা করে।” (সুনান আবু দাউদ : ৪৯১৮)
কুরআনের বর্ণিত আয়াতসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেই ঐক্যের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যায়। ‘এবং তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুন্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা হিদায়েত লাভ করতে পার।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)
কোনো সম্প্রদায়, সংগঠন কিংবা জাতির পক্ষে বড় কিছু অর্জন করতে হলে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এ কারণেই বলা হয় ঐক্যই শক্তি, অনৈক্যই দুর্বলতা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এমন এক সময় আসবে, যখন তোমাদের নিধনের জন্য বিভিন্ন (কাফের) গোষ্ঠী একে অপরকে আহ্বান করবে। ঠিক যেমন অভুক্ত খাদকদের আহ্বান করা হয়, (মুখরোচক খাবারের) পাত্রের প্রতি। তখন একজন বলে উঠলেন, আমাদের সংখ্যাস্বল্পতার কারণে কি সেদিন এমন দুরবস্থা হবে? ইরশাদ হলো, বরং সেদিন সংখ্যায় তোমরা অনেক বেশি, অনেকটা প্রবহমান পানির ফেনার মতো (পরিমাণে অধিক অথচ অন্তঃসারশূন্য) থাকবে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের প্রতি ভয়-ভীতি তুলে দিবেন (তারা তোমাদের খুবই নগণ্য ভাববে)। আর তোমাদের অন্তরে ‘ওয়াহান-বা দুর্বলতা’ সৃষ্টি করে দিবেন। জনৈক প্রশ্নকর্তা জানতে চাইলেন, ‘ওয়াহান’ কি? ইরশাদ হলো দুনিয়ার মোহ এবং মৃত্যুভীতি। (আবু দাঊদ : ৪২৯৭)
ধর্মতত্ত্ব, ধর্মপালন পদ্ধতি, সমাজ ও রাজনীতির কিছু বিষয়সহ বিভিন্ন প্রশ্নে মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও আল্লাহর একত্ব, সর্বশেষ নবী হিসেবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব, কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পুনরুত্থান, পরকালীন শান্তি ও শাস্তি ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্নে বিশ্বমুসলিমের মধ্যে ব্যাপক মতৈক্য রয়েছে। কিন্তু গৌণ বিষয় নিয়ে কিছু মতপার্থক্য যুগে যুগে মুসলিম ঐক্যকে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মুসলমানরা নানা দল, উপদল, ফেরকায় বিভক্ত হয়েছে। মূলগত বিষয়ের ঐক্যের চেয়ে গৌণ বিষয়ের অনৈক্য মুসলিম জাহানকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত।
মুসলিম অনৈক্যের পেছনে অমুসলিমদের ষড়যন্ত্র একটি বড় কারণ বলে ধারণা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ইসলামের আবির্ভাব পরবর্তীকাল থেকে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বৈরিতা চলে আসছে। উপমহাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ইহুদি-খ্রিষ্টান ষড়যন্ত্রের বাইরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ষড়যন্ত্রও মুসলিম ঐক্যকে বিঘিœত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে চলেছে। মুসলমানদের বিভক্ত ও দাবিয়ে রাখার জন্য অমুসলিম বৃহৎ শক্তিসমূহ মুসলমানদের ক্ষেত্রে এক নীতি এবং অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করছে। কাশ্মির ও পূর্ব-তিমুরের ক্ষেত্রে গৃহীত দ্বৈতনীতি তার এক প্রকৃষ্ট উদারহণ। ফিলিস্তিন, ইরাক, কসোভো, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, সুদান, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের ঘটনাবলি উপর্যুক্ত সত্যকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে। মুসলমানদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণেই বর্তমান বিশ্বের উদ্বাস্তুদের ৯২ ভাগই মুসলমান।
ইসলামের মূলভিত্তি অর্থাৎ যে বিষয়গুলোতে বিশ্বাস এবং কর্মগুলো না করলে একজন ব্যক্তি মুসলমান থাকেন না সে বিষয়গুলো ব্যতীত অন্যান্য সকল বিষয়ের মতানৈক্য বজায় রেখেও মুসলমানদের পক্ষে ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে আরব, অনারব, মাজহাবপন্থী-মাজহাব বিরোধী, আহলে হাদিস, কেয়ামি, বেকেয়ামি, পীরবাদী-পীরবিরোধী, সুফিবাদী-সুফিবাদবিরোধী, তাবলিগি-তাবলিগ বিরোধী, কট্টর শরিয়তপন্থী, কট্টর মারেফতপন্থী, মৌলবাদীÑ মৌলবাদবিরোধী ইত্যাদি পরিচয়ের সঙ্গে যে অমৌলিক বিরোধের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে তা বজায় রেখেও মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। ব্যক্তি ও গৌষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ বিবেচনা করা হলেও উপর্যুক্ত প্রশ্নে মতপার্থক্য কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের সততাই একান্তভাবে প্রয়োজন। মুসলমানদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, চিন্তা ও কর্মক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ঐক্য অর্জন কখনো সম্ভব হবে না। এটি মানুষের সহজাত প্রবণতা বিরোধী এবং এ কারণে তা কাম্যও হতে পারে না। মুসলমানদের লক্ষ্য হবে একটি ড়িৎশরহম ঁহরঃু অর্জন যা দ্বারা তারা নিজেদের মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় মতভেদ দূর করতে সক্ষম হবেন।
মুসলমানদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, বাইরের ষড়যন্ত্র অতীতে চলেছে, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। এ বিপদ সামনে রেখেই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি ও কৌশল অর্জন করতে হবে। মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ষড়যন্ত্র দূরীভূত করা সম্ভব হলে বহিঃষড়যন্ত্র মুসলিম শক্তি ও ঐক্যকে শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে মুসলমানদের পরকালীন জীবনের পাশাপাশি ইহকালীন জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি ও গৌরব লাভের জন্যে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা অর্জন, পরমত সহিষ্ণুতা, ছোটখাটো বিষয়ে মতানৈক্য পরিহার, বিভিন্ন মতের সমন্বয়, জনসমর্থনের ওপর নির্ভরশীল, বৈধ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জাতিরাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply