সুন্দরবনে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প লাভ-ক্ষতি -কামরুজ্জামান নাবিল

সুন্দরবন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমাদের ১৬ কোটি নিঃশ্বাসের উৎস। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এই সুন্দরবনকেন্দ্রিক। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সুন্দরবন ও আশপাশ খাল, নালা ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
আমাদের বন্যপ্রাণীর অধিকাংশের আবাসস্থল এ সুন্দরবনে। জাতীয় প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসও এ সুন্দরবনে। চিত্রা হরিণ, পারা হরিণ, বানর, বনমোরগ, কাঠবিড়ালি, চিতা বাঘ, গন্ডার ও অসংখ্য প্রজাতির পাখির বসবাস এ নয়নাভিরাম বনেই। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ও জীববৈচিত্র্যের আধার ভালোবাসার এই সুন্দরবন। সেই বনের পরিবর্তেই আজ স্থাপন করা হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎকন্দ্র।

যেখান থেকে শুরু এ রামপাল প্রকল্প
২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা হয়। ২০১০ সালের ৩০ আগস্ট এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
এরপর রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
গত ১২ জুলাই, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল), ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের (বিএইচইএল) সঙ্গে বাগেরহাটের রামপালে মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি সই করে। ১.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের এ চুক্তির অর্থায়ন করবে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সুন্দরবন ও রামপাল প্রকল্প
আমাদের ক্ষতি
আর্থিকভাবে অলাভজনক : ইন্দো-বাংলা যৌথ কোম্পানির থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য বাগেরহাটের রামপালে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হবে, যার নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই নির্মাণব্যয়ের শতকরা ৭০ ভাগ বৈদেশিক ঋণ থেকে ধার করা হবে। বাকি শতকরা ৩০ ভাগ প্রকল্প ব্যয় বাংলাদেশ ও ভারত সমানভাবে অর্থাৎ শতকরা ১৫ ভাগ হারে বহন করবে।
একটি সূত্র বলছে, এনটিপিসি ও পিডিবির যৌথভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ অর্থাৎ তিন হাজার ৯৬০ কোটি টাকা ব্যয় করবে পিডিবি ও ভারতীয় কোম্পানি অর্থাৎ প্রত্যেকে ১৫% করে বিনিয়োগ করবে।
বাকি ৭০ শতাংশ বা ৯ হাজার ২৪০ কোটি টাকা অর্থায়ন হবে ঋণের মাধ্যমে যা এনটিপিসি (ভারতীয় কোম্পানি) বিভিন্ন ব্যাংক ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করবে।
কাজেই মাত্র ১৫% বিনিয়োগ করেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৮৫% মালিকানাই থাকবে এনটিপিসির (ভারতীয় কোম্পানি)।(২)
এই বিষয়ে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে ভারতের জন্য অনেক লাভজনক হবে। একই সাথে ভারতীয় কোম্পানিকে অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধাও দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। তাদের কর মওকুফ করা হচ্ছে। ভারতীয় কোম্পানি ‘এনটিপিসি’ শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ ইনভেস্ট করে শতকরা ৫০ ভাগের কর্তৃত্ব পাবে।
তা ছাড়া তাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হবে। শুধু তাই না যে বিদ্যুৎ তৈরি হবে তার দাম এখনও অনির্ধারিত। সবকিছু মিলিয়ে ভারতের লাভের অঙ্ক অনেক বেশি।
পরবর্তীতে এই প্রকল্প থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সেই বিদ্যুৎ কিনবে ভারতের কাছ থেকে। আর বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে।

ফর্মুলার বর্ণনা
যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা। আর যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১৪৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়লার দাম প্রতি টন ১৪৫ ডলার চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এই প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ যদি বিদু্যুৎ কিনতে চায় তবে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা।
অথচ এর আগে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, খুলনার লবণচরা এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় যে তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশের ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে পিডিবি চুক্তি করেছিল, সেখানে পিডিবি মাওয়া থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবে ৪ টাকায় এবং আনোয়ারা ও লবণচড়া থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবে ৩ টাকা ৮০ পয়সা হিসেবে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা।
সুন্দরবনের নিকটে
Environmental Impact Assessment (EIA)প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে এবং সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার ইনভায়রনমেন্টালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) থেকে ৪ কিমি বাইরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু জিআইএস সফটওয়্যার দিয়ে মেপে দেখা যায়, এই দূরত্ব সর্বনিম্ন ৯ কিলোমিটার হতে সর্বোচ্চ ১৩ কিলোমিটার।
অন্য দিকে যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে সেই ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না।
রামপাল প্রকল্পের ভারতীয়  কোম্পানি এনটিপিসির সম্পর্কে কিছু পুরনো তথ্য : ভারতের বিজ্ঞান ও পরিবেশ সেন্টারের ‘হিট অন পাওয়ার’ নামক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে,  বৈশ্বিক মানদন্ডে ভারতের কয়লা বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর পরিবেশ দূষণ রোধের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমানের।
তাদের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আবার নিম্নতর মানের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এনটিপিসি এবং ভারতেই সবচেয়ে পরিবেশদূষণকারী বদরপুর প্রকল্পটি ছিল এদেরই।
যে কেম্পানিকে নিয়ে ৮ অক্টোবর ২০১০ তারিখে ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত NTPCÕs coal-based project in MP turned down  বা ‘মধ্যপ্রদেশে এনটিপিসির কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বাতিল’ শীর্ষক খবরে বলা হয় : জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষিজমির ওপর তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ভারতের কেন্দ্রীয় গ্রিন প্যানেল মধ্যপ্রদেশে ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) এর ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি।
NTPC’র একই ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের প্রস্তাব গাজমারা উড়িষ্যা থেকে পরিবেশ বিভাগ থেকে ছাড়পত্র না দিয়ে ফেরত দেয়া হয়।
যে বিবেচনায়  NTPC নিজের দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারেনি সেই একই বিবেচনায় বাংলাদেশে কী করে তারা এই প্রকল্পের দায়িত্ব পেল?

বিদ্যুতের চাহিদা
বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বিভিন্ন হিসাব থাকলেও পিডিবির দেয়া তথ্য মতে,  দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, অন্য দিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে  প্রায় ৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
অন্য হিসাবে দেখা যায়, বিপণন সংস্থা ডিপিডিসি, ডেসকো, পিডিবি, ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মোট চাহিদা হচ্ছে ৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরোদমে উৎপাদন করলে ৭ হাজার ৮২৬ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারে, তবে রামপালের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? সুন্দরবনের হত্যাকান্ডের বিনিময় কি শুধুই ভারতের তথাকথিত ‘বন্ধুত্ব’?

আমরা বছরে কী হারাচ্ছি
রামপালে প্রতিষ্ঠিতব্য এই ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতে প্রতিষ্ঠার জন্য ৭৯২ একর একফসলি কিংবা অনুর্বর পতিত জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার (১৮৩৪ একর) ৯৫ শতাংশই কৃষিজমি ও চারপাশের ১০ কিমি ব্যাসার্ধের এলাকার (স্টাডি এলাকা) ৭৫ শতাংশ কৃষিজমি।

এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আমরা
কি হারাতে পারি:
ক.    বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ৬২,৩৫৩ টন এবং প্রকল্প এলাকায় ১২৮৫ টন ধান উৎপাদিত হয়।
খ.    ধান ছাড়াও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ১,৪০,৪৬১ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদিত হয়।
গ.    প্রতি বাড়িতে গড়ে ৩/৪টি গরু, ২/৩টি মহিষ, ৪টি ছাগল, ১টি ভেড়া, ৫টি হাঁস, ৬/৭টি করে মুরগি পালন করা হয়।
ঘ.    ম্যানগ্রোভ বনের সাথে এলাকার নদী ও খালের সংযোগ থাকায় এলাকাটি স্বাদু ও লোনা পানির মাছের সমৃদ্ধ ভান্ডার। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খাল ও নদীর নেটওয়ার্ক জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষা করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে বছরে ৫২১৮.৬৬ মেট্রিক টন এবং প্রকল্প এলাকায় (১৮৩৪ একর) ৫৬৯.৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। উপরের সব কিছুই আমাদের হারাতে হবে।

উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন
১৮৩৪ একর ধানী জমি অধিগ্রহণের ফলে ৮০০০ পরিবার উচ্ছেদ হয়ে যাবে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ চার-পাঁচশ জনের, ফলে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। শুধু তাই নয়, আমরা প্রতি বছর হারাবো কয়েক কোটি টাকার কৃষিজ উৎপাদন।

কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সকল প্রয়োজনীয় মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করা হবে। এভাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে-
ক.    কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লার গুঁড়া, ভাঙা টুকরো কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানিসহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটিসহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে।
খ.    সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্টে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা ওঠানো নামানোর সময় কয়লার গুঁড়া, ভাঙা কয়লা পানিতে/মাটিতে পড়ে- বাতাসে মিশে মাটিতে মিশে ব্যাপক পানি-বায়ু দূষণ ঘটাবে।
গ.    চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুই পাশের তীরের ভূমি ক্ষয় হবে।
ঘ.    কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দ দূষণ হবে।
ঙ.    রাতে জাহাজ চলের সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো জলজ নিশাচর প্রাণী এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশু-পাখির জীবনচক্রের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের প্রভাব : বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন অপারেশনে থাকবে তখন ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন অন্তত প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস সুন্দরবনের বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বর্তমান ঘনত্বের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গোটা সুন্দরবন ধ্বংস করতে পারে।
ফ্লাই অ্যাশ ও বটম অ্যাশের প্রভাব :  কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে অন্তত ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। যাতে বিভিন্ন ভারী ধাতু, যেমন- আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকবে। যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহাম্মদ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষতিকর বিষয়গুলো যেভাবে তুলে ধরেছেন, প্রথমত, বাংলাদেশের সরকার রামপালে কয়লা দিয়ে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের কোম্পানি ‘এনটিপিসি’র সঙ্গে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তি করেছে। এই চুক্তিটি পুরোপুরি  অসম এবং অস্বচ্ছ একটি চুক্তি। ভারতের সাথে ওই চুক্তির টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসগুলো পুরোপুরি বাংলাদেশে স্বার্থের বিরুদ্ধে।
দ্বিতীয়ত, আইনগত বা বিধিসম্মতভাবে এই চুক্তি করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন এবং দেশীয় আইন অনুযায়ী চুক্তি করলে প্রথমে এ ব্যাপারে এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে তারপর চুক্তির বিষয়। কিন্তু এটি না করেই চুক্তির দেড়/দু’বছর আগে থেকেই জমি অধিগ্রহণ শুরু করেছে সরকার। আর এই জমি অধিগ্রহণ নিয়েও চলেছে নানারকম অনিয়ম। জোরপূর্বক সেখান থেকে জমি অধিগ্রহণ করে মানুষদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এমন একটা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে যেটি সুন্দরবনের অতি নিকটবর্তী; বলা যায় সুন্দরবনের একটি অংশ।

আন্তর্জাতিক মহলের চোখে
রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প
পরিবেশ সমীক্ষা ও রামপাল প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও।
নরওয়ের একটি দাতা সংস্থা জিপিএফজির প্রতিবেদনে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশ সমীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া ও অস্পষ্ট ব্যাখ্যার অভিযোগ করা হয় এবং প্রকল্পটিতে কনটিনজেন্সি প্ল্যান ও পরিবেশদূষণ রোধ ব্যবস্থার অভাবের কথা বলা হয়।
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের ওপর ২০১৪ সালে পরিচালিত ইউনেস্কোর সমীক্ষায় সুন্দরবনের অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশদূষণের উচ্চ ঝুঁকির কথা বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রেরণে বাংলাদেশ সরকারের অনীহায় হতাশা প্রকাশ করা হয়।
আইইউসিএনের প্রতিবেদনে, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি আরও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানোর সুপারিশ করা হয়।

রামপাল প্রকল্প নিয়ে
বিশিষ্টজনদের মতামত:
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত সরকার মিলে সুন্দরবন পরিকল্পিতভাবে ধবংস করতে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের পাশে রামপাল ও ওরিয়ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে এ বন ধ্বংসে নেমেছে তারা।’
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘এ প্রকল্প ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে  বৈরিতা বাড়াবে। দেশের বাস্তবতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে, তবে তা অবশ্যই সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়।’
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি সই আসলে সুন্দরবন ধ্বংসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাইলফলক।’

SHARE