সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও সময় ব্যবস্থাপনা পৌঁছে দিবে সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে -মোবারক হোসাইন

পরিকল্পনা হচ্ছে ভবিষ্যৎ পালনীয় কর্মপন্থার মানসিক প্রতিচ্ছবি। পরিকল্পনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সময়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে। If we fail with right scheme, we will take the wrong succeed (যদি আমরা পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনাই গ্রহণ করলাম) “If you do not know where you are, it is impossible to determine how you can get to where you want to be.”” পরিকল্পনাবিহীন কাজ মানেই উদ্দেশ্যবিহীন কাজ। সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন সময়ের যথার্থ ব্যবহার ও সুন্দর পরিকল্পনা।
পরিকল্পনা হলো যেকোনো কাজের দরজা। To plan master is to plan the gateway to learning. পরিকল্পনা যেকোনো কাজের অর্ধেক। Well plan is half done. A plan is a blueprint for action. লক্ষ্য বা টার্গেট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সময় ব্যবস্থাপনার সুন্দর পরিকল্পনা, যা আপনাকে পৌঁছে দিবে সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে। আবরাহাম লিঙ্কন বলেন, “If we could first know where we are, and whether we are tending, we could better judge what to do, and how to do it.”

পরিকল্পনার সংজ্ঞা
সাংগঠনিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিভিন্ন কার্যাবলি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করার পদ্ধতিকে পরিকল্পনা বলা হয়।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতাকে সামনে রেখে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অগ্রিম কাজের তালিকা প্রণয়নকে পরিকল্পনা বলে।
পরিকল্পনা মানেই ধাপে ধাপে কোনো লক্ষ্যে পৌঁছার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।
Planning is deciding in advance what to do, how to do it, when to do it and who is to do it. Planning is a trap to capture the future.
ড্যান স্টেইনহফ(Dan Steinhoff) এর মতে, পরিকল্পনা হলো লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা এবং তা অর্জনের জন্য পদ্ধতি নির্ধারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া।
মোট কথা পরিকল্পনা মানে- Six Ws এবংhow এর উত্তর খুঁজে বের করা। যেমন-

Why must it be done?
What action is necessary?
Where will it take place?
When will it take place?
Who will do it?
How it will be done?

মনে রাখতে হবে। পরিকল্পনা হলো-
Planning is an intellectually demanding process.

উন্নতমানের বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়া
বিবেচনাপ্রসূত কর্মপন্থা নির্ধারণ
উদ্দেশ্য, ঘটনা ও হিসেবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

পরিকল্পনার গুরুত্ব : সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজেই সফলতা আসে না।
কি ব্যক্তিজীবনে, কি সমাজে, কি ব্যবসায়ে, কি রাষ্ট্রীয় কাজে সর্বক্ষেত্রেই পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম।

পরিকল্পনা দিকনির্দেশনা দেয়
পরিকল্পনা মিতব্যয়িতা অর্জনে সহায়তা করে
পরিকল্পনা পরিবর্তিত অবস্থার মুকাবিলা করে
পরিকল্পনা মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
সংগঠনের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ
সমন্বয়ে সাহায্য করে
নানাবিধ সমস্যার সমাধান
দৃষ্টিভঙ্গি কেন্দ্রীভূতিকরণ
সীমিত জনশক্তির সঠিক ব্যবহার
গতিশীল নেতৃত্ব
দক্ষতা বৃদ্ধি

পরিকল্পনার বিভিন্ন স্তর : পরিকল্পনা প্রণয়নে অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমন-
ভিশন (Vision) : স্বপ্ন (ambition), কেন প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, কি করতে চায়।
মিশন (Mission) : প্রতিটি সংগঠিত দলভিত্তিক কাজের একটি মিশন থাকে। ভিশনে পৌঁছার জন্য বর্তমানে যা করণীয় তাই মিশন।
উদ্দেশ্য (objectives) : উদ্দেশ্য হলো কোন কাজের চূড়ান্তরূপ। একটি সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য থাকে এবং সে উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য প্রতিটি বিভাগেরই আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য থাকে।
কৌশল (Strategy) : কৌশল হলো, লক্ষ্য অর্জনের উপায়। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশেষ বিশেষ অবস্থা বিবেচনা করে কখন কোন কৌশল প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ধারণ করতে হয়। এটি হচ্ছে Sense of priorities- লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কী কী করতে হবে।
নীতি (Principle) বা পলিসি (Policy) : নীতি বা পলিসি হলো একটি সাধারণ বিবরণ যা কোনো কিছু করার বা না করার নির্দেশনা দেয়। পলিসি লিখিত অথবা অলিখিত উভয়ই হতে পারে।
বিধি (Rules) : বিধিও এক ধরনের পরিকল্পনা। এটা হচ্ছে কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন বিশেষ ও নির্দিষ্ট কার্যক্রম নেয়া হবে তা নির্ধারণ করা।
কার্যপ্রণালি (Work System) : কার্যপ্রণালিও পরিকল্পনা। কারণ এটি ভবিষ্যতে কাজ সম্পাদনের জন্য উত্তম প্রণালি ঠিক করে দেয়।
বাজেট (budget) : পরিকল্পনা যখন সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয় তখন তা হয়ে যায় বাজেট।
পৃথিবী সৃষ্টির পরিকল্পনা : আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। তিনি সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্ব চরাচর সৃষ্টি করেছেন এবং পরিকল্পনা মাফিক ধ্বংস করবেন। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, মানবজাতি পরিকল্পনা বিষয়ক ধারণা মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকেই পেয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আছে : সমগ্র আসমান ও জমিন আল্লাহ তাআলা ছয় দিনে ছয় পর্যায়ে সৃষ্টি করেছেন এবং আসমানসমূহকে স্তরে স্তরে সজ্জিত করেছেন। তিনি সৌরজগৎকে যথাস্থানে স্থাপন করেছেন, দুনিয়ার ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্থানে স্থানে নদী-নালা, সাগর, পাহাড়-পর্বত ও বনভূমি স্থাপন করেছেন। আল্লাহ তাআলাই রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদকে পয়দা করেছেন, (এদের) প্রত্যেকেই (মহাকালের) কক্ষপথে সাঁতার কেটে যাচ্ছে। এসব কিছুই সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল। পরিকল্পনা মাফিক আসমান ও জমিনের নীলনকশা তৈরি করে এগুলোকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, প্রতিটি বস্তুই পরিকল্পনা মোতাবেক তৈরি, যার ফলে প্রকৃতির কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবকাশ নেই।

Planning Process
Step 1 Situational Analysis
Step 2 Alternative Goals and Plans
Step 3 Goal and Plan Evaluation
Step 4 Goal and Plan Selection
Step 5 Implementation
Step 6 Monitor and Control

পরিকল্পনা গ্রহণে লক্ষণীয় দিক
SWOT-এর বাস্তবায়ন
S = Strength (শক্তি)
W = Weakness (দুর্বলতা)
O = Opportunity (সুযোগ)
T = Threat (হুমকি)

SMART – পরিকল্পনা গ্রহণে লক্ষণীয় দিক
S = Set the goal or Specific (লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা)
M = Measurable (অনুমান বা পরিমাপ করা)
A = Attainable or achievable (অর্জন যোগ্য)
R = Resourceable or Reliable (সম্পদ বা বিশ্বস্ততা)
T = Time bond or Time frame (সময় নির্দিষ্ট)

পরিকল্পনার গুণগত বৈশিষ্ট্য
সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য
সহজবোধ্য ও সহজসাধ্য
কার্যাবলি বিশ্লেষণ ও শ্রেণি বিভাগ
সমন্বয় ও যোগসূত্র
নিরবচ্ছিন্নতা
নমনীয়তা
ভুল-ত্রুটিশূন্যতা
সমতা
সম্পদসমূহের পূর্ণ সদ্ব্যবহার
মিতব্যয়িতা
ব্যাপকতা
যথার্থতা
বাস্তবতা
ভবিষ্যৎমুখিতা
সৃজনশীলতা
গ্রহণযোগ্যতা

পরিকল্পনার প্রকারভেদ/ ধরন
ক) প্রকৃতিগত শ্রেণী বিভাগ
লক্ষ্য (Goal)
২. স্থায়ী পরিকল্পনা(Standing plan)
৩. একার্থক প্ল্যান(Single use plan)

খ) সংগঠন কাঠামোগত শ্রেণী বিভাগ
কার্যভিত্তিক পরিকল্পনা
২. বিভাগীয় পরিকল্পনা
৩. আঞ্চলিক পরিকল্পনা
৪. সামগ্রিক পরিকল্পনা

গ) মেয়াদভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
দীর্ঘমেয়াদি
মধ্যমেয়াদি
স্বল্পমেয়াদি
তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা

পরিকল্পনা যেসব কারণে ব্যর্থ হয়
অবাস্তব ও অধিক সংখ্যক লক্ষ্য নির্ধারণ
সঠিক কর্মকৌশল ও কর্মপন্থা নির্ধারণ
দৈনন্দিন কার্যক্রমে পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করা
সৃজনশীলতা মুক্ত পরিকল্পনা
সকলের জন্য আদর্শ মানসম্পন্ন পরিকল্পনার অভাব
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাকে অধিক গুরুত্বারোপ।
পরিকল্পনা গ্রহণের সময় যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে
জনশক্তির অবস্থা
অর্থনৈতিক অবস্থা
বিরোধী শক্তির তৎপরতা
পরিবেশ বিচার
সময়সীমা নির্ধারণ

সাংগঠনিক দিক থেকে পরিকল্পনা দুই ধরনের
জনশক্তির পরিকল্পনা
কাজের পরিকল্পনা
জনশক্তির পরিকল্পনা দুই ধরনের
বায়োডাটা সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে-
ক. শিক্ষাগত যোগ্যতা
খ. মেধাভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস
গ. সামাজিক অবস্থা
ঘ. সাংগঠনিক যোগ্যতা
মান অনুযায়ী ভাগ করে দেয়া
ক. – Group
খ. B- Group
গ. C- Group
ঘ. D- Group
কাজের পরিকল্পনা –
আজ/এ সপ্তাহে/এ মাসে/এ বছরে কী কী কাজ করবো। অতঃপর গুরুত্বানুসারে শ্রেণীবদ্ধ করতে হবে। যেমন-
Grade – A : Most important work (আজই করা দরকার এবং আমাকেই করতে হবে)
Grade – B : Very important work (আজই করা দরকার তবে অন্যের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে)
Grade – C : Important work (আগামীকাল করলেও চলবে)
Grade – D : Less important work (কম গুরুত্বপূর্ণ, করলে কল্যাণ আছে না করলে ক্ষতি নেই)
উদাহরণ : Most important work Very important work
আপনি পরীক্ষার্থী, সকাল দশটায় পরীক্ষা, ওদিকে মা অসুস্থ, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে- এক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?
এম.বি.ও পদ্ধতিতে পরিকল্পনা
Management by objectives (MBO) বা উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা।
এম.বি.ও পরিকল্পনার ৪টি পর্যায়।
ক. প্রস্তুতি গ্রহণ
খ. সিদ্ধান্ত গ্রহণ
গ. যোগাযোগ স্থাপন বা জানানো
ঘ. নিয়ন্ত্রণ

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্যা
পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারা
অর্থনৈতিক সমস্যা
দায়িত্বশীলদের সীমাবদ্ধতা
গতানুগতিক পরিকল্পনা গ্রহণ
ত্বরিত ফল লাভের চিন্তা করা
সমস্যা সম্ভাবনার আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ না করা
প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব
দাওয়াতি কাজে জনশক্তির অংশগ্রহণ কম
যে যে বিষয়ে যোগ্য তাকে সে বিষয়ে কাজে না লাগানো

সমাধান
বছরের প্রথম থেকেই পরিকল্পনার আলোকে যথাযথ মোটিভেশন চালানো
দায়িত্বশীলদের মাঝে পরিকল্পনা বন্টন করে দেয়া
দায়িত্বশীলদের অধিকতর পরিশ্রমপ্রিয় হওয়া
জনশক্তিকে জ্ঞানের জগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে
ইনফরমেশন সেল গঠন
বেইজ এরিয়া মজবুত করা
পরিকল্পনা বারবার পর্যালোচনা করা
জনশক্তির সঠিক পরিসংখ্যান ও শ্রেণিবিন্যাস করা
পরিকল্পনা গ্রহণের সময় বাস্তব অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা
গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিদ্ধান্তের প্রতি অটল থাকা

সময় ব্যবস্থাপনা
বিখ্যাত দার্শনিক আশরাফ আলী থানবী (রহ) বলেছেন, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এ তিন কালের সমষ্টিই হলো কাল বা সময়। বিশ্বনবী (সা) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন- আদম সন্তানেরা সময়কে গালি দিয়ে আমাকে আঘাত করে; অথচ আমিই সময় আমার হাতেই আছে সবকিছু। (আল বুখারি- ৪৮২৬)। বর্তমান বিশে^র অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ কারযাবি সময়ের তিনটি বৈশিষ্ট্য বলেছেন- ১. সময় অস্থায়ী, ২. সময় কখনো ফিরে আসে না, ৩. সময় মহামূল্যবান বস্তু। তিনি আরও বলেন- Time is more expensive than money, gold, diamond or pearls. নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছেন, “আমি অস্ট্রিয়ানদের পরাজিত করতে পেরেছিলাম তার প্রধান কারণ, তারা পাঁচ মিনিট সময়ের মূল্য অনুধাবন করতে পারেনি বলে।” বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, “যা তুমি আজ করতে পারো তা কখনো কালকের জন্য ফেলে রাখবে না, কারণ বর্তমানের একটি দিন ভবিষ্যতের দু’টি দিনের সমান।”
আল্লামা সুয়ুতি (রহ) ‘জামউল জাওয়ামে’ নামক গ্রন্থে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, রাসূল (সা) এরশাদ করেন, “প্রতিনিয়ত সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘দিন’ এই বলে ঘোষণা করতে থাকে যে, যদি কেউ কোন ভালো কাজ করতে চায়, তাহলে যেন সে তা করে নেয়। কেননা আমি কিন্তু আর ফিরে আসবো না। আমি ধনী-দরিদ্র, ফকির-মিসকিন, রাজা-প্রজা সকলের জন্য সমান। আমি বড় নিষ্ঠুর। আমি কারো প্রতি সদয় ব্যবহার করতে শিখিনি। তবে আমার সঙ্গে যে সদ্ব্যবহার করবে সে কখনও বঞ্চিত হবে না।” তাই বলা যায় “DonÕt waste time, go ahead. You will become success.”
কর্মপরিকল্পনা এবং সাফল্যের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় ব্যবস্থাপনা। আপনাকে অবশ্যই সময় ব্যবস্থাপনা জানতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, যদি আপনি সঠিকভাবে তা প্রয়োগ করতে পারেন। এর জন্য যা করতে হবে :
ক. আপনার প্রতিদিনের কাজগুলো লিপিবদ্ধ করুন।
খ. প্রতিটি কাজে এখন আপনি গড়ে কত সময় ব্যয় করছেন তা নিরূপণঠিক করুন।
গ. প্রতিটি কাজে গড়ে কতটুকু সময় প্রয়োজন তা বের করুন।
ঘ. প্রতিটি কাজে গড়ে আপনি কতটুকু সময় অতিরিক্ত ব্যয় করেন তা বের করুন।
ঙ. এখন সিদ্ধান্ত নিন কিভাবে আপনি আপনার সময় ব্যয় করবেন?
কাজের চাপ ব্যবস্থাপনা : পরিকল্পনার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কাজের চাপ ব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশে এ বিষয়টিকে খুব কম গুরুত্ব দেয়া হয়। আপনি যদি চাপ কমাতে না পারেন, তবে তা আপনার সফলতার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। চাপ কমানো ও ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের যা করতে হবে :
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা
নেতিবাচক লোকদের এড়িয়ে চলা
সবকিছু সহজে গ্রহণ করা
মাথা ঠান্ডা রাখা
সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা
নেতিবাচক বিষয়কে ইতিবাচকভাবে দেখা
সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
প্রকৃত পক্ষে সময় আমাদের নয়। সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের দিয়েছেন আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। রাসূল (সা) আমাদের বলেছেন, “দু’জন ফেরেস্তার নি¤রূপ আহবান ব্যতীত একটি প্রভাতও আসে না। হে আদম সন্তান! আমি একটি নতুন দিন এবং আমি তোমার কাজের সাক্ষী! সুতরাং আমার সর্বোত্তম ব্যবহার করো। শেষ বিচার দিনের আগে আমি আর কখনও ফিরে আসব না। হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলো যার আজকের দিন গতকালের চেয়ে উত্তম হলো না।”
সময় ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র হচ্ছে সময়ের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুধাবন করা।
জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে হলে তাই সময়ের মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক। এক বছরে ১২ মাস, ৫২ সপ্তাহ, ৩৬৫ দিন। সে হিসাবে ৩৬৫ দিন সমান ৮৭৬০ ঘণ্টা, ৫২৫৬০০ মিনিট, ৩১৫৩৬০০০ সেকেন্ড। কে কিভাবে জীবনের সময়গুলো ব্যয় করেছে হাশরের মাঠে আল্লাহ কাঠগড়ায় তার হিসাব আদায় করে ছাড়বেন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছর ৬ মাস। যদি আমি বা আপনি এই বয়স পাই তাহলে হবে ৬২৬৭৩৬ ঘন্টা। আমাদের হিসাবটা এইভাবে ব্যয় করা যেতে পারে: আমাদের জীবন = ৬২৬৭৩৬ ঘন্টা।
শৈশবের অপরিপক্বতায় কেটে যায়- ৫ বছর
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে কেটে যায়- ২৫ বছর
চাকরি বা পেশাগত দায়িত্ব পালনে কেটে যায়- ৩০ বছর
বার্ধক্যের দুর্বলতায় চলে যায়- ১১ বছর।

অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫৫ বছর
শৈশবকালের অপরিপক্বতা ও বার্ধক্যের দুর্বলতার সময় বাদ দিলে আপনার আমার জীবনের পরিধি হলো পঞ্চান্ন বছর বা ৪,৮২,১৩০ ঘন্টা। প্রতিদিন আমাদের সময় কিভাবে ব্যয় হচ্ছে তার একটি গড় হিসাব নিচে উপস্থাপন করা হলো:

তাই অতীত ও ভবিষ্যতের কথা বেশি ভেবে সময় নষ্ট না করে বর্তমানকেই বেশি কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। দুনিয়াতে এমন কাজে সময় ব্যয় করা উচিত যে কাজের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়া যায়।

ইসলামে সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
ইসলাম সময় ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছে। প্রথমেই চলুন আমরা আল কুরআনের একটি ছোট্ট সূরা আল আসরের কাছে যাই, ‘সময়ের কসম। মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে, সৎ কাজ করতে থেকেছে, একে অন্যকে হক কাজ ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ আল্লাহ তায়ালা সময়ের কসম করে সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা) বলেছেন, “মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন দিবসে মানুষকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, কিভাবে তা ব্যয় হয়েছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে বলা হবে, কেমন করে সে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে? সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন হবে, এই সম্পদ সে অর্জন করল কোত্থেকে? আর কিভাবেই বা তা খরচ করেছে? তার যে জ্ঞান ছিল, তা দিয়ে সে কী করেছে?”
সময় ব্যবস্থাপনা হচ্ছে নিজেকে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে মানুষকে যে সময়ের গতিতে আবদ্ধ সেই সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। বিখ্যাত বই The Effective Executive-এর লেখক পিটার ড্রাকার সময় ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি ধাপ অনুসরণের সুপারিশ করেছেন। সেই অধ্যায়টি হলো ‘নিজের সময়কে জানুন’।
১. আপনার সময়ের বিশ্লেষণ করুন। ২. নিষ্ফল বা নিরর্থক চাহিদাগুলো ছাঁটাই করুন। ৩. হাতে সময় নিয়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য স্থির করুন।
ইসলাম প্রাত্যহিক জীবনে আমাদেরকে যে নির্দেশনা দিয়েছে:
১. আপনার সময়ের বিশ্লেষণ করুন: রাসূল (সা) পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের ওপর অগ্রাধিকার বা গুরুত্ব দেয়ার জন্য বলেছেন : ‘বৃদ্ধকাল আসার আগে যৌবনের, অসুস্থতার আগে সুস্থতার, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতার, ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে অবসরের ও মৃত্যু আসার আগে জীবনের।’ পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা, পারিপার্শ্বিকতা ও প্রতিটি কাজের জন্য বিশ্লেষণমূলক সঠিক সময় নির্ধারণ ও বিন্যস্তকরণ ইসলামের দাবি।
২. নিষ্ফল বা নিরর্থক চাহিদাগুলো ছাঁটাই করুন। লেখকের এ সুপারিশের অনেক আগে কুরআন বলছে, ‘সেই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা বাজে কাজ থেকে বিরত থেকেছে।’ (সূরা মুমিনুন : ১ ও ৩) এখানে ফালাহ মানে সাফল্য ও সমৃদ্ধি। এটি ক্ষতি, ঘাটতি, লোকসান ও ব্যর্থতার বিপরীত অর্থবোধক শব্দ। সূরা ফুরকানে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা এমন কোনো জায়গা দিয়ে পথ চলে যেখানে বাজে কথা ও কাজের মহড়া চলে, তখন তারা ভদ্রভাবে জায়গা অতিক্রম করে চলে যায়।’ সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মুমিন এমন ব্যক্তি যিনি সময় ব্যবস্থাপনায় বাজে কথা ও কাজকে প্রশ্রয় দেন না। অর্থাৎ অনর্থক বাজে কথা ও কাজে সময় ব্যয় মুমিনের কাজ নয়। ‘কাজেই যখনই অবসর পাও, ইবাদাতের কঠোর শ্রমে লেগে যাও এবং নিজের রবের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করো।’ (সূরা আলাম নাশরাহ : ৭-৮)
৩. হাতে সময় নিয়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য স্থির করুন: এ কথার অর্থ হলো, দুই বা ততোধিক কাজ একই সাথে না করে বরং একটি কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য যেই সময় প্রয়োজন, ততটুকু সময় শুধু সেই কাজের জন্যই নির্ধারণ করুন। তাহলে কাজটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে। এলোমেলো অগোছালো কাজ দশটা করার চেয়ে একটি কাজ সুচারুরূপে পালন ভালো। ইসলাম যেই কাজটিকে ইহসান এবং এর কর্মীকে মুহসিন নামে আখ্যায়িত করেছে।

সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল বা দিকনির্দেশনা
মানুষের হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত। সময় থেকে সময় নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ। নিয়মিত রুটিন করে সময় বরাদ্দ রাখুন এবং সে মোতাবেক চর্চা করুন কাজে কোনো অসুবিধা হবে না ইনশাআল্লাহ। সময় নির্ধারণ করে কাজ করলে কাজ সঠিক, সুন্দর হয়। সময় নির্ধারণ সম্পর্কেM. K Gandhi বলেন, “Time is life, life is time. Balance between life and time can help one to reach the highest apex of success.” তাইতো বলা হয়েছে, “Lost time can never be found again.” প্রবাদ আছে, A Stitch is time saves nine. সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল বা দিকনির্দেশনাগুলো মাথায় রেখে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি সঠিকভাবে করতে কোনো অসুবিধায় পড়তে হয় না এবং কাজটি করতে কোনো ঝুঁকিও পোহাতে হয় না। নি¤েœ সময় ব্যবস্থাপনার কতগুলো কৌশল বা দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোকপাত করা চেষ্টা করা হলো :
সময় নির্ধারণ করুন
কাজের সিরিয়াল তৈরি করা
সময় থেকে লেখালেখির সময় বের করুন
গুছিয়ে কাজ করুন
দৈনন্দিন পঞ্জিকা ব্যবহার করুন
অভিধানের ব্যবহার শুরু করুন
সব কিছু করার সময় বের করুন
কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা
গুরুত্ব অনুযায়ী কখন কোন কাজটি নেয়া
বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে কাজে স্থির থাকা।
কৌশল ঠিক করা
কাজের অগ্রগতি মিলিয়ে দেখা।

উপসংহার
পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার। পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা কখনই সম্ভব না। পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা অনন্য এক দুর্লভ ঐশ্বর্য। ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে এর মূল্য অপরিসীম। মানবজাতির প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে মহামূল্য সময়। সময়কে সবসময় মূল্যবান সম্পদে পরিণত করে সময়ের মূল্য দিতে হবে। সময় যে মূল্যবান সম্পদ এর উক্তি দিতে গিয়ে বরার্ট ব্রাউনিং বলেন, “একটা দিন চলে যাওয়া মানে জীবন থেকে একটা দিন ঝরে যাওয়া।” মানুষের জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো নিজ জীবন, আর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো সময়। ইমাম শাফেয়ি (রহ) যথার্থই বলেছেন, Time is like a sword: if you don’t cut it, it will cut you.অর্থাৎ, সময় হলো তলোয়ারের মত, যদি তুমি তা দিয়ে না কাটো তাহলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে।H. Stanely Juddবলে“A good plan is like a road map: it shows the final destination and usually the best way to get there.”
লেখক : সম্পাদক

SHARE

Leave a Reply