সুন্নাতে রাসূল (সা) ও স্বাস্থ্য

ডা: মো: শহীদুল্লাহ

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবন আমাদের উত্তম আদর্শ। পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ’। অর্থাৎ তোমাদের জন্য রাসূলুল্লøাহ (সা)-এর জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সূরা আহজাব, আয়াত ২১) আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহা¤মদ (সা)-এর ¯¦াস্থ্যকর জীবনাদর্শ অনুসরণ করেই ¯¦াস্থ্যকর জীবন সম্ভব; একটি সুন্দর স্বাস্থ্যকর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আধুনিক সব ওষুধ সব ধরনের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক রোগ ভালো করতে পারে না। নবী করিম (সা) তার বাস্তব জীবনে চর্চা করে দেখিয়ে দিয়েছেন, বিভিন্ন হাদিসে বলে গেছেন কিভাবে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করা যায়। কিভাবে রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, তা তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর আগে, যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান ততটা উন্নত ছিল না। উদাহরণ¯¦রূপ উল্লেখ করা যায়, হাই তোলার সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে বলেছেন (সহীহ বুখারি)। হাই তোলা মানুষের একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার। হাই তোলার সময় আমরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানি। আর এই দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে বাতাস থেকে হাজারো জীবাণু মুখে প্রবেশ করতে পারে। জীবাণু যাতে মুখে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য নবী করিম (সা) হাই তোলার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে বলেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) ডান কাত হয়ে শুতেন। তাঁর ডান হাত রাখতেন ডান গালের নিচে। সাহাবীদেরকেও এভাবেই শুতে বলতেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডান কাতে শোয়াই অধিক ¯¦াস্থ্যসম্মত। এতে হƒৎপি-ের ওপর চাপ পড়ে কম। পেটের ভেতর ভারী যকৃৎ ঝুলে থাকে না। ফলে পাকস্থলীর ওপর চাপ পড়ে না। পাকস্থলীর স্বাভাবিক নড়াচড়া ঠিক থাকে এবং পাকস্থলীর ভেতরের খাদ্যদ্রব্য হজমের উপযোগী হয়ে সহজেই খাদ্যনালীর পরবর্তী অংশে চলে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন ততটা উন্নত ছিল না, সেই সময়ে আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর আগে নবী করীম (সা) এসব স্বাস্থ্যকর বিষয় চর্চা করে আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে অজু করতে হয়। অজু কিভাবে করতে হবে, শরীরের কোন্ কোন্ অঙ্গ ধুতে হবে, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সেই নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা যখন নামাজের জন্য দ-ায়মান হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখম-ল ও দু’হাত কনুইসহ ধৌত করবে। তারপর মাথা মাসেহ করবে, আর দু’পা গিরা পর্যন্ত ধুবে।” (সূরা মায়েদা, আয়াত ৬) অজুর ফরজ এগুলো। অজু করার সময় শরীরের এসব অঙ্গ ধৌত করা ছাড়াও তিনবার করে হাত ধুতে হয়, কুলি করে মুখ ধুতে হয়, নাক পরিষ্কার করতে হয়। এগুলো অজুর সুন্নাত। নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা যায় বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। অজুর মাধ্যমে হাত ধোয়ার পর খুব কম জীবাণুই হাতে লেগে থাকতে পারে। তাই নিজের ও অন্যের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়। মুখ ও দাঁতের যতেœও হজরত মুহা¤মদ (সা) ছিলেন যথেষ্ট যতœবান। সাহাবীদেরকেও তিনি মুখ ও দাঁতের যতেœর কথা বলেছেন। দিনে পাঁচবার অজু করার সময় কুলি করে মুখ ধোয়ার মাধ্যমে মুখের জীবাণুর সংখ্যা অনেক কমে যায়। দাঁত মাজা বা ব্রাশ করার ফলে দাঁত ও মাড়ির ফাঁকে ফাঁকে লেগে থাকা ময়লা ও জীবাণু পরিষ্কার হয়। দাঁতের মাড়ি শক্ত হয়। দাঁতের ক্যারিস বা ক্ষয়রোগ হওয়ার আশঙ্কা কমে। প্রতিবার অজুর আগে মিসওয়াক করা সুন্নাত। আমাদের জন্য বোঝা হয়ে যাওয়ার ভয় না থাকলে হযরত মুহাম্মদ (সা) সবাইকে প্রত্যেক ইবাদতের আগে দাঁত মাজার নির্দেশ দিতেন। (সহীহ বুখারি) মুখ ধোয়ার পরই নাক ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। এর মাধ্যমে নাকের ভেতর লেগে থাকা ধুলোবালি আর রোগজীবাণু পরিষ্কার হয়। সাধারণভাবে বেশির ভাগ রোগজীবাণুই মুখ ও নাকের মধ্য দিয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। অজু করার সময় দিনে পাঁচবার মুখ ও নাক ধুয়ে ফেলার ফলে রোগব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। অজুর এসব সুন্নাত কাজ আমাদের শরীরকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যবান রাখতে এবং রোগব্যাধিমুক্ত রাখতে সহায়তা করে।
খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত অত্যন্ত স্বাস্থ্যস¤মত। অতিভোজন তিনি পছন্দ করতেন না। অতিভোজন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিভোজনের ফলে ডায়াবেটিস, হƒদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ইত্যাদি হতে পারে। নবী করীম (সা) পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে এবং এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করতে বলেছেন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতে বলেছেন। (ইবনে মাজাহ)
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) নিয়মিত মধু খেতেন। প্রতিদিন সকালে অন্য কিছু খাওয়ার আগে এক কাপ পানিতে এক চামচ মধু মিশিয়ে পান করতেন। এরূপে মধু পান করলে খাদ্যনালীর কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন রোগে উপকার হয়। রোগজীবাণুও ধ্বংস করতে পারে।
খোলা পানীয় ও খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রাসূলুল্লাহ (সা) খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় ঢেকে রাখতে বলেছেন। (সহীহ বুখারি) খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার কথাও বলেছেন তিনি। (সহীহ বুখারি)
সুস্থ থাকার জন্য নবী করীম (সা)-এর আদর্শকে আমাদের অবশ্যই মেনে চলতে হবে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১)।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ

SHARE

Leave a Reply