সুশাসনের মৌল উপাদান

এমাজউদ্দীন আহমদ

21অতীতের ছোট্ট একটা ঘটনা। ছোট্ট বলছি এ জন্য যে খলিফা উমরের (রা.) সময় আরব সা¤্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল ভয়ঙ্করভাবে এবং সেই বৃহৎ সাম্রাজ্যের একজন নারীর অভিযোগ সম্পর্কেই এই লেখাটি। আরবের উত্তরাঞ্চলে তখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। খালিফা অন্য কেউ নন, হযরত উমর (রা.) স্বয়ং বিনিদ্র রজনী এবং সমগ্র দিন কাজ করেও তিনি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। এমনিতে তিনি ছিলেন স্বল্পাহারী। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তাও কমিয়ে দিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করছেন কিভাবে দু’মুঠো খাবার সবার মুখে তুলে দেয়া যায়। তিনি ঠিক করেছিলেন, সবার জন্য খাবারে ব্যবস্থা না করে তিনি এক ফোঁটা দুধও মুখে নেবেন না। দুর্ভিক্ষ তো ছিল তার পরও দেখা দিয়েছিল মহামারী। তিনি অস্থির হয়ে সাধারণ মানুষকে কেমন আছেন নিজের চোখে দেখা জন্য ছোটাছুটি করছিলেন। সিরিয়ার লোকজনের অবস্থা নিজের চোখে দেখার জন্য এক সময় রওনা দিলেন উটের পিঠে চড়ে : লোকজনের সাথে কথা বললেন। জানালেন এবং সমগ্র বিয়ষটি প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে বলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেই উটের পিঠে চড়েই ফিরছেন মদিনায়। পথে ছোট্ট একটা তাঁবু তার দৃষ্টিগোচর হলে সেখানে তিনি যান এবং এক মহিলার দেখা পান। তিনি মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন খলিফা উমর (রা.) সম্পর্কে তিনি কী জানেন? মহিলা উত্তরে বলেন, হ্যাঁ জানি। তিনি আজ সিরিয়া থেকে মদিনা ফিরছেন। সেই মন্দ লোকটা সম্পর্কে আর কিছু বলতে চান? মহিলা হকচকিত হয়ে প্রশ্ন করে। এর বেশি আর কী বলবো? সে জাহান্নামে যাক।
খলিফা উমর (রা.) জানতে চান, কেন মা. উত্তরে মহিলা বলেন : এখন পর্যন্ত সে আমাকে কিছুই দেয়নি। খলিফা জানতে চান, এতদূরের সবার খবর কিভাবে তিনি নেবেন মা। মহিলার উত্তর ছিল : রাষ্ট্রের সবার খবর যদি তিনি রাখতেই না পারেন তবে খেলাফত চালাবেন কিভাবে। খলিফা উমর (রা.) তাকে সালাম জানিয়ে বললেন, মাগো আপনি আমাকে আজ মস্তবড়ো এক শিক্ষা দিলেন। সত্যিই তো সবার খবর যদি তিনি জানতে না পারেন তা হলে কিসের খলিফা তিনি! সুশাসনের এই প্রাথমিক তত্ত্বটি কোথা থেকে, কিভাবে তিনি শিখেছেলেন তা একাধিকার উচ্চারণ করেছেন তাঁর সঙ্গী সাথীদের সাথে।
আমাদের বলার তেমন কিছু নেই। সাংবাদিক দম্পতি সাগর -রুনি হত্যা মামলা সম্পর্কে প্রথমে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ বাহিনী সঠিক তথ্য বের করে আনবেন। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে ভোরে রাজধানীর রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়াকৃত বাসায় তারা খুন হন। এরপর কত ৪৮ ঘণ্টা পার হলো কিন্তু এ সম্পর্কে কোন তথ্য জাতি জানতে পারেনি। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি নিজেই মনিটর করছেন। দেশের পুলিশ প্রধান বলেছিলেন, প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে তদন্তের খাতিরে সবকিছু এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সাগর-রুনির খুুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ একটি রিট আবদেন করলে হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। এই রুলে এই হত্যাকান্ডের কারণ উদঘাটন এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার খুনিদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যে। স্বরাষ্ট্রসচিব, তথ্যসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যারেব মহাপরিচালক, ডিবির উপকমিশনার দক্ষিণ এবং শের এ বাংলা নগর থানার ওসিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলাা হলেও এখনো কোন তথ্য জাতি জানতে পারেনি। বরং জানা গেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক বাণী- প্রত্যেকের ঘর পাহারা দেয়া কি পুলিশের পক্ষে সম্ভব? হযরত উমর (রা.)-এর সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তুলনা করা ঔদ্ধত্য আমার নেই। শুধু এটুকু বলবো সুশাসনের মৌল সূত্রটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিখে নিতে পারেন সিরিয়ার তাঁবুতে বসবাসকারী বঞ্চিত এ মহিলার নিকট থেকে।
লেখক : সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply