সেই ছেলেটি: শহীদ আবদুর রহীম -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

পাক হানাদার বাহিনীর ভয়ে গোটা দেশ প্রকম্পিত। শহর, নগর, বন্দর, গঞ্জে মৃত্যুর বিভীষিকা। চারদিকে হত্যা, গুম, জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসলীলা। শহর-বন্দরের মানুষ পালিয়েছে নিজের জীবন নিয়ে গ্রামে; নিভৃত পল্লীতে। হাজার মাইল দূর থেকে এসেছে ওরা আমাদের স্বাধীনতা লুটে নিতে, আমাদের কণ্ঠ রোধ করতে। মার্চ-এপ্রিল হানাদার বাহিনীর একচেটিয়া মার খেতে খেতে গোটা জাতির পিঠ ঠেকেছে দেয়ালে। এ পর্যায়ে মৃত্যু অথবা পুনর্জীবন। শুরু হলো প্রতিরোধের পালা। জীবন-মৃত্যুর হোলি খেলায় স্বাধীনতাযুদ্ধের সংগ্রামমুখর দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিন ১লা মে, ১৯৭১ শনিবার বেলা দেড়টায় চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়ার বড় হাতিয়া মিয়াজি পাড়ায় জন্মগ্রহণ করে এক শিশু।
জন্মের প্রথমলগ্ন কেটেছে আতঙ্কগ্রস্ততায়। কখনো কখনো ঘুমঘোর থেকে আঁতকে উঠেছে বোমার বিকট শব্দে। বেশি দিন কাটেনি সে ভয়ভীতি। ক’মাস পরই প্রথম হামাগুড়িতে পরশ পেয়েছে স্বাধীন দেশের সোনালি মাটির। হাঁটিহাঁটি পা-পা করে পিতা-মাতার একান্ত আদর-¯েœহে বেড়ে ওঠে শিশু। পাঁচ বছর বয়সে পা রাখতেই আব্বা-আম্মা প্রথম হরফ আলিফ, বা, তা, ছা শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠালেন নিজ বাড়ি থেকে অনতিদূরে কুমিরাঘোনা আখতরাবাদ মাদ্রাসায়। মাত্র দু’বছরেই ওস্তাদের পবিত্র সান্নিধ্যে সূরা, কিরাত, কায়দা, সিপারা এবং আলিফ-লাম-মিমের সবক নিয়ে ফেললো ছেলেটি।
আব্বা-আম্মার বড় সাধ ছেলেকে পবিত্র কুরআনে হাফিজ বানাবেন। তাই দক্ষিণ চট্টগ্রামের সেরা দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় হিফজুল কুরআন বিভাগে ভর্তি করালেন তাকে। বাড়ি থেকে একটু দূরে চুনতি। মাকে ছাড়া একাকী থাকতে একটুও মন টেকে না তার। বয়সও বা কত হয়েছে? মাত্র সাত বছর। সুযোগ পেলেই মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে যেতো মায়ের কাছে।
মা বিদুষী মহিলা। ছেলের উন্নতি চান। ছেলেকে বড় হতে হবে। হতে হবে মানুষের মতো মানুষ। দুনিয়াজোড়া ছড়িয়ে পড়–ক ছেলের কীর্তিগাথা। তাই ছেলের প্রতি ¯েœহবাৎসল্য লুকিয়ে রেখে বারবার পাঠাতেন মাদ্রাসায়। আল্লাহ্র মেহেরবানিতে ১৯৭৭-৭৮ দু’বছরেই ছেলেটি আল্লাহ্র কুরআনকে হৃদয়ে ধারণ করে ফেললো।
আব্বা ভাবলেনÑ শুধু হাফেজ হলে চলবে না। কুরআন শুধু মুখস্থের জন্য নয়। একে বুঝতে হবে। প্রতিটি শব্দ, বাক্যের মানি-মতলব বুঝে নিয়ে বাস্তবে আমল করতে হবে। দ্বীন প্রচারের জন্য যোগ্য আলেম হতে হবে। দিতে হবে সমাজের নেতৃত্ব। ছেলেকে আবার ভর্তি করালেন আখতরাবাদ (কুমিরাঘোনা) আখতারুল উলুম মাদ্রাসায়। ১৯৭৯-৮১ মাত্র তিন বছরেই ৪টি শ্রেণির পড়া শেষ করলো সে।
দুই.
ছেলেটির আব্বা হলেন এদেশের একজন বিখ্যাত আলেম ও পীর-এ-কামেল। একজন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক। অনাথ-এতিমের দরদিবন্ধু, সমাজসংস্কারক। স্বধর্ম, দেশ ও জাতির চিন্তায় তিনি নিমগ্ন। তিনি দেখলেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বেজায় ফাঁক। এক দেশে দুই শিক্ষানীতি। কেউ মিস্টার আবার কেউ মোল্লা। একে অপরের প্রতি চরম ঘৃণা প্রদর্শন করে তারা। যারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তারা দ্বীন-ধর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ; অথচ দুনিয়াবি সকল সুযোগ-সুবিধা তাদের করায়ত্ত। পক্ষান্তরে যারা মাদ্রাসা শিক্ষিত তারা সমাজে চরমভাবে অবহেলিত। এ দু’মুখো নীতির অবসানে ধর্ম ও কর্মের সমন্বয়ে সুযোগ্য নাগরিক সৃষ্টির জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন অত্যাধুনিক বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসা। বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশদ্বার বার আউলিয়ার পবিত্র পদধূলিধন্য বন্দরনগরী চট্টলার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার প্রথম লগ্নে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে ছেলেটি পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কৃতিত্বের সাথে একটির পর একটি শ্রেণি পেরিয়ে এলো ছেলেটি। তার সামনে একটি একটি করে উন্মোচিত হতে থাকে পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার। লেখাপড়া, বক্তৃতা-বিবৃতি, গদ্যে-পদ্যে, নৈতিক-আধ্যাত্মিক জ্ঞানে নিজেকে সে গড়তে থাকে নীরবে-নিভৃতে। ১৯৮৬ অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় ছেলেটি বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের হিফজুল কুরআন বিভাগে ৭ম স্থান অধিকার করে সবাইকে চমৎকৃত করে। দুর্লভ এ প্রাপ্তি তার একান্তই কঠোর অধ্যবসায়ের ফল। প্রাপ্তির এ আনন্দ ছেলেটিকে আরো বিনয়ী করে তোলে। গর্বের লেশমাত্র তার চাহনিতে প্রকাশিত হয়নি। সে ভর্তি হলো আলিম প্রথম বর্ষ বা একাদশ শ্রেণিতে। ’৮৬ সালের জুনে ছেলেটির পিতা নিজেই আলিম ১ম বর্ষের উদ্বোধনী ক্লাসে সমবেত ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে তাকে মিশকাত শরিফ হতে বুখারি শরিফের প্রথম হাদিস পাঠ দিলেন, “ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়্যাত।”

তিন
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে যে ছেলের জন্ম, বেড়ে ওঠার সাথে সাথে দাদীর কাছে, মায়ের কাছে, ভাইয়ের কাছে সে শুনেছে অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা। রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া যুদ্ধের কাহিনী। যুদ্ধ-পরবর্তী ’৭৪ এর মন্বন্তর। ’৭৫ এর রক্তাত অভ্যুত্থান। ’৮১ এর ক্ষমতার পালাবদল। এক এক করে খুলে গেছে ইতিহাসের সকল পৃষ্ঠা। ’৮২ সালে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পড়তে আসার মাত্র ৩ মাস যেতে না যেতেই গোটা জাতির ঘাড়ে চেপে বসে সামরিক জান্তা। ৫ম শ্রেণির সে ছেলেটি দেখেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে কিভাবে দুর্নীতি চলে, গরিব-দুঃখীর অধিকার নিয়ে কিভাবে চলে ছিনিমিনি খেলা, রক্ষক হয়ে কিভাবে ভক্ষকের ভূমিকা পালিত হয়। গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে জনসাধারণকে ভোটদানের আহ্বান জানানো হয়; অথচ জনতা ভোটকেন্দ্রে না গেলেও জনপ্রতিনিধি বীরদর্পে নির্বাচিত হয়ে যায়। একদিকে ধর্মের বাণী আওড়ানো হয়, অন্যদিকে বিধর্মী রাম-কৃষ্ণের গীত গাওয়া হয়।
তারুণ্যের উচ্ছল ছেলেটি উৎসুক দৃষ্টিতে দেখলো আকাশচুম্বী প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছে। বিলাস-ব্যসন আর সুখ সামগ্রীর সয়লাব বয়ে যাচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণির অট্টালিকায়। সুদ-ঘুষ, অপচয়-অহঙ্কারে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ। তার পাশাপাশি ফুটপাথে, বস্তিতে, পল্লীবাংলার কুঁড়েঘরে নিরন্ন মানুষের আহাজারি দিনদিন বেড়ে চলছে। সমাজের এ দ্বিমুখী নীতির তীব্র দাহনে তার অন্তর জ্বলে-পুড়ে একাকার হয়ে যায়। সে খুঁজতে থাকে মুক্তির উপায়। রাতের আঁধারে, স্বপ্নের ছাউনিতে হাফেজ ছেলেটির মুখ দিয়ে বিড়বিড় করে উচ্চারিত হয় কুরআনের বাণী : তোমরা কেন আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম করছো না? ঐ সব নির্যাতিত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য, যারা আল্লাহ্র নিকট ফরিয়াদ করে বলছে, হে প্রভু! এই জনপদ থেকে আমাদেও বের করে নিয়ে  যাও, যার অধিবাসীরা জালেম এবং তোমার  পক্ষ থেকে আমাদের জন্য  কোন  বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী  পাঠাও । ( সূরা নিসা:  ৭৫)
কোন্ পথ বেছে নেবে সে? কোন্ তন্ত্র-মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ বদলে দেয়ার আহ্বান জানাবে লোকদের? ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলায় ছেলেটি। জাহেলিয়াত নয়, পুঁজিবাদ বা সমাজবাদ নয়, নয় সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ অথবা তথাকথিত ‘লুটেরা’ গণতন্ত্র। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রতিষ্ঠিত ইসলামের সোনালি যুগে। ছেলেটি আবেগ আপ্লুত হয়ে অধ্যয়ন করে নবীজির সাথী আবু হযরত বকর (রা), মহান শাসক ওমর (রা) জিন্নুরাইন খলিফা উসমান (রা) এবং সিপাহশালার মহাবীর আলীর (রা) চরিত্র। একদিন সবার অলক্ষ্যেই খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠিত সেই পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ কায়েমের জন্য সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনে। আল্লাহ্র পথে জান-মাল কোরবানি দেয়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনে। আল্লাহর পথে জান-মাল কোরবানি দেয়ার দৃঢ় শপথে বলীয়ান হয়ে গড়তে থাকে নিজকে। দাওয়াত দিতে এগিয়ে যায় অপর ভাইকে।

চার
মাত্র কিছু দিনের মধ্যেই ছেলেটির অধ্যয়ন পরিধি ব্যাপকতর হলো। সমসাময়িক দেশীয় ও বিশ্বরাজনীতির পাশাপাশি সে আত্মস্থ করলো ফাঁকাবুলির মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও মাওবাদ। সে বিবেকের কষ্টিপাথরে যাচাই করলো ওসব মানবতাবিরোধী তন্ত্র-মন্ত্র। বন্ধুদের জন্য, মুসলিম উম্মাহ্র জন্য ক্ষুরধার লেখনীতে বললো : আল্লাহ্র বাণী, “তোমরা আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম কর নিজেদের মাল ও জান দ্বারা।” এই জান-মাল কোরবানি ছাড়া অতীতেও কোনদিন ইসলাম কায়েম হয়নি, এ যুগেও হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। সে জান-মাল রাস্তায় ছড়ালেই ইসলাম কায়েম হবে না; বরং তা আল্লাহ্র পথে দান করতে হবে সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক পন্থায়। সে পন্থা হলো- জামাতবদ্ধ অবস্থায় নিয়ম-তান্ত্রিকভাবে নবী করিম (সা)-এর ন্যায় ইসলামী আন্দোলন করে যাওয়া।
ছেলেটি বেছে নিয়েছিলো সেই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। তার অকৃত্রিম বিশ্বাস, মৃত্যু হচ্ছে জীবনের দু’টি পর্যায়ের মাঝখানে একটি দরজা মাত্র। এর এপাশটা কর্মের জীবন আর ওপাশটা ভোগের জীবন। জীবনের এ পার্শ্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই ওপার্শ্বে গিয়ে অনন্তকাল সুখ ভোগ করা যাবে। নবী করিম (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছিল বলেই অতি দ্রুত সারা পৃথিবীতে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী হুকুমত কায়েম করা সম্ভব হয়েছিল। এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে ছেলেটি বেরিয়ে যেতো মানুষের দুয়ারে, রাজপথে মিছিলে, সংগ্রামী কাফেলায়।
এগিয়ে চলার সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে হায়েনাদের রক্তচোষা হিং¯্রতায় নিপতিত হয় কাফেলার অনেক সাথী। (১২ ফেব্রুয়ারি ’৮৭) এমনি এক কমান্ডো হামলায় চট্টগ্রামের পটিয়ার রাহাত আলী হাইস্কুলে ২০ জন সহযাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়। ছেলেটির হৃদয় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তার ব্যথাগুলো সে শব্দের মালা গেঁথে বিবেকের দুয়ারে সমর্পণ করে :
জাগো মুসলিম হে মহাবীর
ছিঁড়ে তাগুতের শত জিঞ্জির
নতুন শপথে আগে চল আজ
দ্বীনি জিহাদের পরে নব সাজ।
বিশ্বে তোমার ছিল উঁচু শির
আল-কুরআনের হে রাহাগির,
তার বাণী ছেড়ে কোথা যাও চলে
সোনালি অতীত দু’পায়ে দলে?
অন্ধকারার প্রাচীর পেরিয়ে
কুয়াশার জাল ছিঁড়ে এসো বেরিয়ে।
শত্রুর সাথে মিশে শুধু কমজাত
ভাইয়ের রক্তে রাঙায় সে নিজ হাত
ওপথে যেয়ো না তুমি
ধ্বংসে প্রিয় জন্মভূমি,
সত্য সেনানী তুলে নাও হাতে ঈমানের শমশির
হতে মুজাহিদ বিশ্ব বিজয়ী মুসলিম মহাবীর॥

জীবন-মৃত্যুর দোলায় দুলতে থাকে দ্বীনি কাফেলা। একদিকে হায়েনার উদ্যত সঙ্গিন, অন্যদিকে শাহাদাতের স্বপ্ন রঙিন। সত্যপন্থী কাফেলার ক্রমবর্ধমান আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্যাপক ছাত্র-জনতা যখন দ্বীনি আন্দোলনে দলে দলে শরিক হচ্ছিল ঠিক সে মুহূর্তে স্বৈরাচারের পদলেহী খোদাদ্রোহী তাগুতি শক্তির মদদপুষ্টরা ময়দান ছেড়ে চোরাগলির সুড়ঙ্গে ওঁৎ পেতে থাকে।
১২ ফেব্রুয়ারি কাফেলার সাথীদের প্রতি আঘাত আর এক বছর পূর্বে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দু’জন সাথী জাফর জাহাঙ্গীর ও বাকিউল্লাহ্ নামক জিন্দাদিল মুজাহিদের শাহাদাতের শোক প্রকাশে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ১৪ ফেব্রুয়ারি ’৮৭ অচল হয়ে পড়ে। ছেলেটি ভাই হারানো ব্যথার আকুতি জানাতে, জালিমশাহির জুলুমের প্রতিবাদ জানাতে বেরিয়ে পড়ে রাজপথে। প্রতিবাদ জানানোর এ প্রথা নাগরিক অধিকার, স্বাধীন দেশের স্বাধিকার। আল্লাহ্র সৈনিকদের ইস্পাতদৃঢ় বিশাল মিছিল চাটগাঁর রাজপথ প্রকম্পিত করে এগিয়ে চলে সম্মুখে। কেঁপে ওঠে জালিমশাহির মসনদ। প্রতিটি হৃদয়ে ব্যথার তীব্র দাহন, মুখে প্রখর স্লোগান, আগুনের ফুলকি। ছেলেটি সবার আগে। মনজিলে পৌঁছার প্রবল বাসনায় সে দীপ্ত শপথে পায়ে পা রেখে অগ্রসর হতে থাকে। হাতে তার তৌহিদী পতাকা। তার কানে কানে কে যেন দরাজ গলায় আবৃত্তি করছিল :
জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি
শহীদী রক্তে হেসে উঠে যবে জিন্দেগানি।
আর একটু সামনে এগিয়ে যেতেই আন্দরকিল্লায় শত্রুর মৃত্যুঘাতী বোমা এসে পড়ে ছেলেটির বুকে। শাহাদাতের অমিয় সুধা লাভের আশায় ৩০ পারা কুরআন বক্ষে ধারণকারী হাফেজ বুক পেতে নেয় শত্রুর বোমা। শাহাদাতের স্বর্গীয় আহ্বানে ছেলেটি শামিল হয় হযরত হাসান, হোসাইন এবং হামজা (রা)-এর কাফেলায়।

পাঁচ
প্রচন্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা জাতি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি ঘরে ঘরে শুরু হয় শোকের মাতম। জাতীয় সংসদে চলে বিতর্ক। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি আশ্বাস দেন (!) বিচারের। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন লন্ডন, আমেরিকায় প্রদর্শন করে বিক্ষোভ। মুসলিম দেশসমূহের শহরে নগরে অনুষ্ঠিত হয় দোয়ার মাহফিল। জাতীয় সংবাদপত্র, দেশি-বিদেশি প্রচার মাধ্যম- বিবিসি, ভয়েস অব-আমেরিকা, রেডিও তেহরানসহ সারা বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান নর-নারীর কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে ছেলেটি। কবির কল্পনায়, শিল্পীর তুলিতে, রাজনীতির ভাষায়, জিহাদের ময়দানে, জিহাদীর প্রাণে প্রাণে ছেলেটি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে ওঠে শাহাদাতের স্বর্ণ ছোঁয়ায়। তাই তো তৌহিদবাদী কবি আল মাহমুদের কণ্ঠে বেরিয়ে আসে শব্দের সুষমা সম্ভার:
কে বলে নিহত এরা? পরাজিত মৃত্যুর পেছনে
আমি শুনি অবিশ্রাম ডানার আওয়াজ,
উড়ে যায় জোড়াবাঁধা গুঞ্জন মুখর হরিয়াল
উড়ে যায় বেহেস্তের সবুজ ছায়ায়।
আবদুর রহীম কারো নাম নয়
যেন কোন রঙধনু, রক্তের বৃষ্টির পর
আকাশ আকুল করে উঠে যায় সীমাহীন নীলের নকশায়।

সেই ছেলেটি সৌভাগ্যবান শহীদ হাফেজ আবদুর রহীম। আজ জীবিত আবদুর রহীমের চেয়ে শহীদ আবদুর রহীম অনেক শক্তিশালী। তার প্রিয় সংগঠন হয়েছে আরও জনপ্রিয়। তার প্রিয় আব্বা হাদিয়ে জামান মুজাহিদে মিল্লাত শাহ্সুফি হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার এবং স্নেহময়ী মা স্বর্ণগর্ভা মনছুরা বেগমের আশা ছিল ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। সে হবে জগদ্বিখ্যাত আলেম। তার সুনাম ছড়িয়ে পড়বে বাংলার ঘরে ঘরে। লোকেরা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইবে- এই সোনার ছেলের জন্মদাতা-গর্ভধারিণী কারা? পরিচয় দানে হবেন তাঁরা খুশিতে আত্মহারা। আল্লাহ তাঁদের আশা পূর্ণ করেছেন অন্যভাবে।
আল্লাহ্ তো মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্মান দানকারী। তিনি কাউকে রাজ্য দান করেন আবার কেড়ে নেন। কাউকে সম্পদশালী বানান, কখনো আবার একমুঠো অন্নের কাঙালি করে তাকে পথে প্রান্তরে জিল্লতি প্রদান করেন। আবদুর রহীমের আব্বা-আম্মা বড়ই সৌভাগ্যবান যে, পুত্র হারানোর অথই শোকসাগর তাঁদের সম্মানকে পর্বতপ্রমাণ উচ্চতা দান করেছেন মহান রাব্বুল আলামিন। আপন সন্তানকে দ্বীনের পথে কোরবানি করে খরিদ করে নিয়েছেন বেহেস্ত। আর তাইতো হযরত ইয়াকুব (আ)-এর মত ‘সবরে জামিলের অনন্য পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে শহীদের পিতা মাওলানা আবদুল জব্বার বলতে পারেন, ‘আল্লাহ্র পথে আমার পুত্রকে কোরবানি করে আমি সৌভাগ্যবান। আল্লাহ তার শাহাদাতের বদৌলতে এদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করে দিন।”
কিয়ামত পর্যন্ত এ বাংলার প্রতিটি দ্বীনি মুজাহিদের অন্তরে, জিহাদের প্রান্তরে, মজলুম মানুষের ঘরে ঘরে উচ্চারিত হবে একটি চেতনাদ্বীপ্ত অমর নাম, শহীদ হাফেজ আবদুর রহীম। আল্লাহ তার শাহাদাতকে কবুল করুন, আমিন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া ও শিশু-কিশোর দ্বীন দুনিয়া, চট্টগ্রাম

SHARE