সেই ভয়াল ২৮ অক্টোবর রক্তের তৃষ্ণা প্রবলতর হয়েছে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

Chhatrasangbadআটটি বছর পেরিয়ে গেছে। মানুষের স্মৃতি থেকে এখনও ২৮ অক্টোবরের নরহত্যার সেই উল্লাস মুছে যায়নি। রক্তপাত বাংলাদেশে আগেও ঘটেছে। আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী মতিউর রহমান রেন্টু তার ‘আমার ফাঁসি চাই’ গ্রন্থে দলের শীর্ষস্থানের লাশের তৃষ্ণার কথা লিখে বড় বিরাগভাজন হয়েছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে তার সেই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে অতিরিক্ত আবেগে কাদের সিদ্দিকী যখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তখন এই মতিউর রহমান রেন্টু তার সঙ্গে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে দু’জনই ছিলেন অত্যন্ত মরিয়া। সেই সুবাদেই সম্ভবত কাদের সিদ্দিকী ‘আমার ফাঁসি চাই’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন বা প্রকাশনা উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। রেন্টু লিখেছেন, সত্য-মিথ্যা বলতে পারি না, একটি লাশের জন্য অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন তার নেত্রী এবং রেন্টু তার জন্য লাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভয়ঙ্কর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী। রেন্টু তার বইয়ে অনেক ছবিও প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, রেন্টু জনসভামঞ্চে কারো জন্য কাপে ফেনসিডিল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রেন্টুর সে বই ক’ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল, জানা নেই। কিন্তু ঐ বই লক্ষ লক্ষ বিক্রি হয়েছিল। এর হাজার হাজার ফটোকপিও বিক্রি হয়েছে।
রক্তের তৃষ্ণা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরানোই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী নির্বিচারে, কী বীভৎসতায় মানুষ খুন করা হচ্ছে! প্রতিদিন রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে বাংলাদেশের সবুজ প্রান্তর। পুলিশের গুলিতে খুন। র‌্যাবের ক্রসফায়ারে খুন। ছাত্রলীগের অস্ত্রে খুন। আওয়ামী লীগের হাতে আওয়ামী লীগ খুন। আর বিরোধী দলকে খুন তো ওপেন জেনারেল লাইসেন্স। বিরোধী দলের কাউকে খুন করা যেন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অধিকারে পরিণত হয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমা ও পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছে। আদালতের রায়ে এসব খুনির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের কারাগার থেকে বের করে এনে সার্কিট হাউজে মন্ত্রীদের দ্বারা সংবর্ধনা দিয়েছে আর নির্লজ্জভাবে খুনিদের গুণকীর্তন করেছে। শেখ হাসিনা নিজে এসব খুনির পক্ষে যৌক্তিকতা প্রকাশ করেছেন। এটা মানুষের সমাজ?
যে যত বড় সন্ত্রাসী, সরকারের কাছে সে তত বেশি প্রিয়ভাজন। স্বার্থের কামড়াকামড়িতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ যখন পরস্পরকে খুন করে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে সরকার খুনির পক্ষ অবলম্বন করে। সরকারের ঘাতক-খুনি দরকার। খুনিদের যে মরে গেছে, সে তো মরেছেই। যে বেঁচে আছে, আরও খুনের জন্য সামনে তাকে প্রয়োজন হবে। কিন্তু এর সবকিছুই কি এভাবেই চলতে পারে? গুলশানে যুবলীগ নেতা মিল্কীর হত্যার পেছনে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ জড়িত। কিন্তু ‘সরকারি সহযোগিতায় গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তরা জামিন নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। এ অভিযোগ, আমাদের মতো অর্বাচীনদের নয়। মিল্কীর পরিবার রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন করে এই অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। একইভাবে নিহত হয়েছিলেন যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম। তিনি ভোলার এমপি, শাওনের সহযোগী ছিলেন। শাওনের গাড়িতে, শাওনের রিভলবারের গুলিতে ইব্রাহীম খুন হন। তারপর অনেকদিন ধরে নানান বাগি¦তণ্ডা চলেছে। শাওন আছেন বহাল তবিয়তে। ইব্রাহীম পরপারে চলে গেছেন। শাওনের কিছুই হয়নি। শাওনকে যে ভারি দরকার!
এরকম আরও শত শত উদাহরণ আছে। উভয় গ্রুপই শেখ হাসিনার সমর্থক। আওয়ামী লীগ সমর্থক। এক গ্রুপ আর এক গ্রুপকে খুন করেছে। যে খুন হলো, সে আওয়ামী স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। যে বেঁচে আছে, আওয়ামী নীতি হলো এই যে, সে চিরজীবী হোক। এরকম ঘটনাই লক্ষ্য করলাম, ফেনীর ফুলগাজীতে উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম হত্যাকাণ্ডের সময়। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট থেকে যা দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায়, সরকারের জেল-জালিয়াতির এমপি নিজাম হাজারী আছে এর পেছনে। কিন্তু তিনি নেই আসামির তালিকায়। আসামির তালিকায় অকারণে যুক্ত হয়েছেন তাঁতীদলের নেতা মিনার চৌধুরী। নারায়ণগঞ্জে একযোগে ৭ খুন হয়েছে। যারা খুন হয়েছে এবং যারা খুন করেছে তারা সবাই আওয়ামী লীগার। খুনি হিসেবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের সংশ্লিষ্টতা উদঘ্াটিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলেছেন, তিনি তাদের যে কোনো বিপদে আপদে পাশে থাকবেন। পুলিশের কী ক্ষমতা আছে? অভিশংসন আইনের পর আদালতেরই বা কী ক্ষমতা থাকবে আমরা সাধারণ মানুষেরা তার কিছুই বুঝতে পারি না। শাক দিয়ে বহুকাল কি মাছ ঢাকা যাবে?
২৮ অক্টোবর নিয়ে আগে কখনও এসব কথা লিখিনি। কেবলই বেদনাহত হৃদয়ে সেদিনের শহীদদের স্মরণ করার চেষ্টা করেছি। আজ মনে হলো, ২৮ অক্টোবরের মতো হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হয়তো এখনও ঘটেনি। একেবারে ঘটেনি, তাও বোধ হয় বলা যাবে না। ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সমাবেশ ছিল গুলিস্তানে তাদের পার্টি অফিসের সামনে। জামায়াতের সমাবেশ ছিল বায়তুল মোকাররমের সামনে। অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা থেকে পুরানা পল্টন মোড় পর্যন্ত। বিএনপির সমাবেশ ছিল নয়াপল্টনের অফিসের সামনে। তার আগেই শেখ হাসিনা তার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকায় এসে হাজির হয় যাতে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনার নির্দেশ মতো কাজ করে। আওয়ামী লীগের ঘাতক বাহিনী সেভাবেই ঢাকা এসে হাজির হয়েছিল। কাঁচা বাঁশের লগি, কাঁচা কাঠের বৈঠা ছিল তাদের সকলের হাতে হাতে।
শুরুর দিকে তেমন কোনো গোলোযোগের চিহ্নই ছিল না। যে যার পূর্ব ঘোষিত স্থানে সমাবেশ করছিলেন। বক্তৃতা, বিবৃতি, বক্তব্য দিচ্ছিলেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার করছিল। সেখানে আমি যাইনি। ঘরে বসে সমস্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছিলাম। কোন টিভি কী লাইভ দেখাচ্ছে, চ্যানেল পরিবর্তন করে করে বার বার সেগুলোই দেখছিলাম। হঠাৎ থমকে গেলাম। কোনো একটি টিভি চ্যানেলের লাইভ ভিডিওতে দেখলাম, আওয়ামী লীগের লগি- বৈঠাধারী কিছু কর্মী সীমানা লংঘন করে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে থেকে হঠাৎ করে হাজির হলো পুরানা পল্টন মোড়ে। সেখানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ছিলেন। হুট করেই কী যে হলো! বাগি¦তণ্ডা নেই। ঝগড়া-বিবাদ নেই। কলহ নেই। আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারী ঘাতক বাহিনী পুরানা পল্টন মোড়ে এসে হঠাৎ করেই পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক তরুণকে পেটাতে শুরু করলো। সে স্তম্ভিত। কিছু বলার চেষ্টা করছিল। বলতে পারলো না। লগি-বৈঠার আঘাতে আঘাতে সে মাটিতে পড়ে গেল। লগি- বৈঠাধারীরা সেখানেই তাকে নির্মমভাবে পেটাতে থাকলো। আহ্! স্বচক্ষে দেখা টেলিভিশনের ক্যামেরা ‘অনই’ ছিল। লাইভ। চার পাশে শত শত লোক ছিল। ক্যামেরাম্যান কী করছিলেন জানি না। রিপোর্টার ভয়ে আতঙ্কে হু হু করে কেঁদে ফেলেছিলেন। মানুষ মানুষকে এভাবে খুন করতে পারে, এ অকল্পনীয়। তার চোখের আর্দ্র ক্রন্দন সম্ভবত সারাবিশ্বকে স্তম্ভিত করে ফেলেছিল। সহকর্মী রিপোর্টার কথা বলতে পারছিলেন না। শঙ্কায়, বেদনায় ভয়াবহতায়। তিনি কেবলই চিৎকার করে বলার চেষ্টা করছিলেন , না না না এ কী হচ্ছে। এ হতে পারে না। আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারীরা যাকে পেটাচ্ছিল, সে তখন ধরাশায়ী। তাকে মৃত ভেবে তার শরীরের ওপর লাফিয়ে আওয়ামী নরপিশাচেরা উল্লাস প্রকাশ করেছে। তারপরও হঠাৎ শেষ মুহূর্তে এই তরুণ আর একবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিল। এবং দাঁড়িয়েছিলও। তখন লগি- বৈঠাধারীরা, ওহ্, পুনরায় একজন মানুষকে আবার পেটাতে শুরু করে। এবং ঐ কর্মীর মৃত্যু নিশ্চিত করে।
এরকম ভয়াবহ ঘটনার পর মহামানবী শেখ হাসিনা এই বলে আক্রমণকারীদের পক্ষ অবলম্বন করলেন যে, শিবির কর্মীরাই আগে ঐ সমাবেশে গুলি করেছিল, ফলে আত্মরক্ষার্থে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাওয়ালারা ওরকম আক্রমণ চালিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ এভাবে মানুষকে হত্যা করতে পারে, এ ছিল কল্পনারও অতীত। সেই দৃশ্য তো স্মৃতি থেকে মুছে যায় না। ইতিহাস থেকে  অস্বীকার করা যায় না।
এরপর আরও সহ¯্র ঘটনা ঘটেছে। শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক নির্যাতন আরও তীব্রতর হয়েছে। নিজেরা নিজেদের রক্ত পান করছে। ড্রাকুলাদের রক্তের নেশা এমনই। কিন্তু ২৮ অক্টোবর ২০০৬- এ আওয়ামী লীগের যে পৈশাচিক নরহত্যাযজ্ঞ হলো এবং আওয়ামী লীগ নেত্রীর দ্বারা সমর্থিত হলো। পৃথিবীর ইতিহাসে ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকাণ্ডের পর এটি তা উদাহরণ হিসেবে বলবৎ থাকবে।
লেখক : কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply