সেক্যুলারিজম ও ধর্মভিত্তিক বিপণন প্রেক্ষাপট আমেরিকা -দেলোয়ার হোসেন ফাহিম

আমেরিকা কি একটি সেক্যুলার দেশ। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পন্ডিত এডওয়ার্ড সাঈদ বলেন, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে আন্তরিক ধর্মীয় রাষ্ট্রের তালিকায় আমেরিকার অবস্থান অনেক উপরে। এই রাষ্ট্রের বিচারালয়ে গড, প্রশাসনে গড, সামরিক বাহিনীতে গড’। আমেরিকা সেক্যুলার রাষ্ট্র কিনা, প্রশ্নটা অনেকের কাছে অবান্তর মনে হলেও আমেরিকান রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে খ্রিস্টধর্মের সরব ও আন্তরিক উপস্থিতি প্রশ্নটার প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। পশ্চিমাবিশ্বে গির্জাকে চ্যালেঞ্জ করেই সেক্যুলার আন্দোলন তার যাত্রা শুরু করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল চার্চের কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করা। তবে উত্তর-আধুনিক পশ্চিমাবিশ্বে সেক্যুলারিজমের পক্ষে জয়গান ধ্বনিত হলেও নিজেরা খুব বেশি সেক্যুলার হওয়ার চেষ্টা করেনি। তারা সারা বিশ্বে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে শর্ত হচ্ছে সেটা হতে হবে তাদের মতো ভাবা ‘সেক্যুলার গণতন্ত্র’। আমেরিকান নেতৃত্ব অন্যান্য দেশসমূহে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যাপার থেকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিদায়ের পক্ষে। যদিও পশ্চিমের অধিকাংশ দেশই সেক্যুলারিজমের নামে মোটামুটি খ্রিস্টীয়-গণতন্ত্র বা খ্রিস্টান-প্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মকে সযতেœ লালন করছে। আমেরিকার সংবিধানের প্রথম দশটি সংশোধনী ‘বিল অব রাইটস’ নামে পরিচিত, যার প্রথমটিই হচ্ছে সেক্যুলারিজম সংক্রান্ত। যাতে বলা আছে, ‘ঈড়হমৎবংং ংযধষষ সধশব হড় ষধি ৎবংঢ়বপঃরহম ধহ বংঃধনষরংযসবহঃ ড়ভ ৎবষরমরড়হ ড়ৎ ঢ়ৎড়যরনরঃরহম ঃযব ভৎবব বীবৎপরংব ঃযবৎবড়ভ.’ তবে আমেরিকার জনগণ ও রাজনীতিবিদদের অধিকাংশই আমেরিকাকে একটি খ্রিস্টধর্মাবলম্বী দেশ মনে করে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার ঞযব অঁফধপরঃু ড়ভ ঐড়ঢ়ব বইয়ে লিখেছেন-“এটা সত্য যে, আমরা আমেরিকানরা ধার্মিক। তিনি লিখেছেন- একেবারে অতিসাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, ৯৫ শতাংশ আমেরিকান ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি গির্জায় যান, ৩৭ শতাংশ নিজেদের একনিষ্ঠ খ্রিস্টান মনে করেন এবং এর চেয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ডারউইনের বিবর্তনের পরিবর্তে ঈশ্বরদূতে বিশ্বাস করেন’। সেখানে খ্রিস্টধর্ম শুধু প্রার্থনাকেন্দ্রে সীমিত নয়। আমেরিকায় মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ওপর লেখা বইগুলো লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। খ্রিস্টান মিউজিক ফাইল, বিলবোর্ড চার্ট এবং ব্যাপক পরিসরে নতুন নতুন গির্জা প্রধান শহরগুলোতে দেখা যায়। ডে-কেয়ার থেকে শুরু করে অনেক কিছুতে যাজকদের উৎসবমুখর নিয়মিত উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। প্রেসিডেন্ট ওবামা তার বইয়ে আরও লিখেছেন- ‘আমাদের প্রেসিডেন্টরা নিয়মিত স্মৃতিচারণ করেন, যিশুখ্রিস্ট কিভাবে তাদের হৃদয়ে পরিবর্তন এনেছেন। ফুটবল খেলোয়াড়রা বল স্পর্শের আগে ঈশ্বরকে স্মরণ করেন যেন স্বর্গ থেকে তিনি তা দেখছেন।’ প্রখ্যাত মার্কিন সমাজতত্ত্ববিদ পিটার বার্গার একবার বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে এলিট সুইডিশদের দ্বারা শাসিত একটি ভারতীয় দেশ’। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষেরা ভারতীয়দের মতো ধর্মভীরু, তবে তাদের শাসনব্যবস্থা সুইডেনের মতো সেক্যুলার। একটি জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৫৫ ভাগ আমেরিকান মনে করেন সংবিধান খ্রিস্টান জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ বিষয়ে তৎকালীন সিনেটর জন ম্যাককেইনকে জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বললেন : আমি সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ই বলব যে সংবিধান আমেরিকাকে একটি ক্রিশ্চিয়ান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ বিষয়ে তৎকালীন সিনেটর হিলারি ক্লিনটন বলেন : আমাদের এই জাতি বিশ্বাসীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি জাতি। আমাদের ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্ববহ সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলন, যেমন দাসপ্রথার উচ্ছেদ, সমস্ত আমেরিকানদের জন্য নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা, এসব বিশ্বাসীদের সাহায্যে সংঘটিত হয়েছে। সাদা চোখে যদিও আমেরিকা একটা সেক্যুলার দেশ কিন্তু সেখানে ক্রিসমাসের লম্বা রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকলেও ঈদের বা পূজার ছুটি মেলে না। পশ্চিমা রাজনীতিতে, বিশেষ করে আমেরিকায় এখনো ভোট পাওয়ার জন্য প্রার্থীকে পোপের চেয়ে কত বড় খ্রিস্টান সেটা প্রমাণ করতে হয়! এমনকি প্রার্থীর পূর্বপুরুষদের মধ্যে যদি কেউ খ্রিস্টধর্মের বাইরের অনুসারী ছিলো বলে প্রমাণিত হয়, তখন বিরোধী প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় ইস্যুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। আমেরিকার ৩২তম নির্বাচনী প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন বারাক হোসেন ওবামা। তিনি ছিলেন মুসলমান পিতার ঔরসজাত সন্তান। পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম তথা তার মায়ের ধর্মে দীক্ষিত হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে-ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে নাকি তার গভীর সম্পর্ক। তার নাম থেকে নাকি ইসলামের গন্ধ আসে। একপর্যায়ে বিরোধীদের সমালোচনা ঠেকাতে বারাক হোসেন ওবামাকে তার নাম থেকে হোসেন শব্দটি বাদ দিতে হয়েছে। এটাই হচ্ছে আমেরিকায় ধর্মের মোকাবেলায় সেক্যুলারিজমের এক বিরাট অবদান! আমেরিকা যদি সত্যিকার অর্থে সেক্যুলার হয় অর্থাৎ সে দেশের রাজনীতিতে ধর্মের স্থান যদি না-ই বা থাকে তাহলে ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল ছুঁয়ে শপথ নেয়া রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ নয় কি? প্রেসিডেন্টের পদ তো রাষ্ট্রের পদ, শাসনতন্ত্রের পদ, কোন ধর্মীয় পদ নয়। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ প্রায় সবাই নির্বাচিত হওয়ার পর গির্জায় গিয়ে বাইবেল স্পর্শ করে শপথ করেন যে; তিনি ন্যায়নীতি ও শাসনতন্ত্র অনুসারে আগামী চার বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। অনেকে বলেন, এটা নাকি আমেরিকার ঐতিহ্য। তাই চাইলেই হুট করে তা বাদ দেয়া যায় না। তাহলে আমেরকিার নীতি অনুযায়ী মুসলিম রাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মসজিদে গিয়ে কুরআন হাতে শপথ পড়লে সেক্যুলারিজম কি রক্ষা পাবে? আমেরিকা যে কাজ করলে মিডিয়ার বাহবা পায়, একই কাজ করলে মুসলিমবিশ্বের জাত চলে যায়! আমেরিকায় সেক্যুলারিজম মূলত পুঁজিবাদের বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে চলছে। বর্তমান বিশ্বে বিপণনের কৌশল অনেকটাই পাল্টে গেছে। ক্যানভাসারের যুগ আর নেই। ‘পুশিং সেল’ জিনিসটাও নেই, যেখানে ক্রেতার কাছে গিয়ে বিক্রেতাকে কাকুতি-মিনতি করতে হতো পণ্য কেনার জন্য। এখন বরং বিপণনের মূলমন্ত্র হচ্ছে, মানুষের চাহিদা সর্বদাই সুপ্ত থাকে, সেটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তাতিয়ে দিতে হবে যেন ক্রেতা নিজেই পাগলের মত ছুটে আসে বিক্রেতার কাছে। এ ক্ষেত্রে ক্রেতার আবেগকে ব্যবহার করা যায়। জাতীয় আবেগকে ব্যবহার করে আমেরিকানরা যেমন সব পণ্যেই ‘আমেরিকানিজম’ নিয়ে আসার চেষ্টা করে, কোকাকোলার গায়েও দেখা যায় ‘মেড ইন গ্রেট ব্রিটেন’। বাংলাদেশেও ভিনদেশী এয়ারটেল, বাংলালিংক, রবি আর গ্রামীণফোন অনেক বেশি সফল হলো মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের গল্পবলা বোনের কান্নার বিপণন করে। দেশপ্রেম বুঝুক আর বা না বুঝুক, এসব বিদেশী কোম্পানিগুলোর পকেট ভারী করতে সমস্যা হয়নি, বিজ্ঞাপনের এমনই গুণ। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আবেগের চেয়েও প্রাচীন এবং অনেক বেশি স্পর্শকাতর আবেগের নাম হলো ধর্ম। কাজেই ‘লাক্স মেখে সুন্দরী’ হওয়ার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া পড়েছিল ‘হালাল সাবান’ অ্যারোমেটিক ব্যবহার করার আহ্বানে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলো না হয় তথাকথিত ‘পশ্চাৎপদ, ধর্মান্ধ, মূর্খ’ জাতি। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ার প্রগতিশীল ও আধুনিক আমেরিকার কি অবস্থা? আমেরিকাতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ বাস করলেও ধর্মগতভাবে সেখানে খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীরাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। স্বভাব এবং জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়ে প্রোটেস্টান্টরা অপেক্ষাকৃত উদার, দলবদ্ধতার চেয়েও ব্যক্তিগত আচারকেই গুরুত্ব দেয়। আমেরিকান অভিজাত, সরকার এবং সশস্ত্রবাহিনীর নানা পদে এদের সংখ্যা বেশি। প্রোটেস্টান্টদের শিক্ষার হার বেশি, রোজগারও বেশি, তার মানে দাঁড়াচ্ছে এদের ক্রয়ক্ষমতাও বেশি। ক্যাথলিকরা অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল, পোপের অনুসারী, বিধিনিষেধও বেশি। সাধারণভাবে এরা গর্ভপাত এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সমর্থন করে না। এদের পরিবার বড়। আর ইভান্ঞ্জেলিক্যালরা অনেকটাই বাইবেলের অনুসারী। কোন সিনেমা বা বিজ্ঞাপন বেশি খোলামেলা হলে এরা সেটাই পছন্দ করে না, গর্ভপাত তো দূরের কথা। একই সাথে এরা অনেকেই অ্যালকোহল বিরোধী। এই সম্মিলিত আমেরিকান খ্রিস্টান জনগণের বার্ষিক ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৫-৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এই কেনাকাটার একটা বড় অংশ আবার হয় ক্রিসমাস, থ্যাংকসগিভিং বা ইস্টারের মত ধর্মীয় উৎসবগুলোর সময়ে। যিশুর জীবনী নিয়ে তৈরি মেল গিবসনের ‘দ্য প্যাশন অব ক্রাইস্ট’ মুভিটার বিপুল জনপ্রিয়তার সাথে সাথে ‘জেসাস’ বা যিশুর জনপ্রিয়তাও বেড়েছিল সমান তালে। সেই সুযোগে যিশু সম্পর্কিত পণ্যের ব্যবসাও বেড়েছিল ব্যাপকভাবে। একটা উদাহরণ হলো ‘জেসাস ইজ মাই হোমবয়’ স্লোগান সংবলিত টি-শার্ট, মগ বা চাবির রিংয়ের রমরমা বিক্রি। গত নির্বাচনে রিপাবলিকান রমণীর ধর্মীয় ইমেজের সাথে পাল্লা দিতে ওবামা শিবির এই স্লোগানকে কাজে লাগিয়েছে। িি.িলবংঁংরংসুযড়সবনড়ু.পড়স সাইটে গেলেই দেখা যাবে ‘ওবামা ইজ মাই হোমবয়’ লিখে বারাক ওবামার জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। বিপণনকারীদের মূল টার্গেট থাকে তরুণ-তরুণী আর মহিলারা, কেননা খরচের দিক থেকে এরাই অগ্রণী। িি.িৎড়সধহঃরপপধঃযড়ষরপ.পড়স ওয়েবসাইটে আধুনিক ‘ক্যাথোলিক’ পণ্যের প্রচার চলে। ল্যাটিন ক্যালিগ্রাফিতে ‘গধৎরধ’ লেখা টাইটফিটিং টি-শার্টখানা আমেরিকান তরুণীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। মারিয়ার সব কয়টি অক্ষরই পণ্যের গায়ে স্পষ্ট বর্ণে লেখা থাকে। ক্যাথলিকদের পরিবার সাধারণত বড় হয়, কাজেই তাদেরকে লক্ষ্য করে বানানো বিজ্ঞাপনগুলোতে জোর দেয়া হয় ‘ফ্যামিলি ডিসকাউন্ট’, ‘বান্ডল অফার’ এই জাতীয় ব্যাপারগুলোর দিকে। যেমন ‘পুরো পরিবারের হলিডে প্যাকেজ’। ক্যাথলিকদের নিজস্ব ম্যাগাজিন, রেডিও, টিভি চ্যানেল সবই আছে, সেগুলোর ভোক্তা প্রচুর, বিজ্ঞাপনের জন্য এগুলোরও বেশ ভালো জায়গা। প্রোটেস্টান্টদেরকে লক্ষ্য করে বানানো দারুণ জনপ্রিয় একটা বিজ্ঞাপন ছিল জেরক্স-এর। ১৯৭৬ সালের এই বিজ্ঞাপনে একজন পাদরিকে দেখা যায় জেরক্সের ফটোকপিয়ারের সামনে হাসিমুখে দাঁড়ানো। স্লোগানটা ছিল-‘দ্য ডুপ্লিকেটরস ফর দোজ হু অ্যাপ্রেশিয়েটস দ্য ভারচু অব সিম্পিøসিটি’ অর্থাৎ ‘তাদের জন্য এই ডুপ্লিকেটর যারা সহজ-সরল কায়দায় বিশ্বাস করেন।’ জেরক্সের এই পাদরিকে এরপরও জেরক্সের নানা বিজ্ঞাপনে দেখা যায় এবং দারুণ সফল এক ক্যাম্পেইনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। মুভি বা থিয়েটারের প্রোটেস্ট্যান্টরাই মূল দর্শক, কাজেই সেখানকার বিজ্ঞাপন এবং পণ্য বাছাই করা হয় এই শ্রেণীকে সামনে রেখে। একই সাথে রোজগারের দিক দিয়ে উপরের দিকে বলে গলফ ক্লাব, অভিজাত রিসোর্টে বেশি দামি, কাস্টমাইজড বা স্পেশাল অফারগুলো এদের কথা মাথায় রেখে করা হয়। ইভান্ঞ্জেলিক্যালরা যেহেতু অত্যন্ত রক্ষণশীল, কাজেই অ্যালকোহল, ড্রাগস এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক একদমই নিষিদ্ধ এদের মাঝে। এদের জন্য তৈরিকৃত বিজ্ঞাপনগুলোতে পুরুষরা থাকে প্রধান চরিত্রে এবং পারিবারিক মূল্যবোধের গুরুত্ব থাকে অনেক বেশি। বিজ্ঞাপন দেয়াও হয় এমন সব অনুষ্ঠানের মাঝে যেগুলো রক্ষণশীল অর্থাৎ যৌনতামুক্ত এবং সুশীল। তবে ধর্মীয় ‘থিম’ বা চরিত্র নিয়ে বিজ্ঞাপন বানাবার সময় বিপণনকারীদের খুব-ই সতর্ক থাকতে হয় যেন কোনভাবে কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগে না যায়। যাদের ধারণা মুসলিমদের ঈমানেই কেবল আঘাত লাগে, তারা কয়েকটা ‘ব্যর্থ’ ধর্মভিত্তিক বিজ্ঞাপনের খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। আইনের মাঝে পড়ে না বলে এরা হয়তো রাস্তায় এসে প্রতিবাদ করতে পারে না, কিন্তু পুরো ক্যাম্পেইনটা বর্জন করতে কোন সমস্যা নেই, বিপণনকারীর বারোটা বাজাতে সেটাই যথেষ্ট। এরকমই একটা ক্যাম্পেইন ছিল ইএসপিএন-এর, যেখানে অ্যাথলেটদের তুলনা করা হয় যিশুর সাথে। স্বাভাবিকভাবেই তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় সেটা প্রত্যাহার করতে। কোমল পানীয় ডক্টর পিপার-এর আরেক বিজ্ঞাপনে আবার দেখানো হয় একটা বানর ডক্টর পিপার খেয়ে খেয়ে মানুষ হয়ে যাচ্ছে। এখন রক্ষণশীল খ্রিস্টানরা যেহেতু বিবর্তনবাদ জিনিসটাই মানে না, কাজেই এই বিজ্ঞাপনও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। খ্রিস্টান সভ্যতার সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ক্রিসমাসে। ক্রিসমাসভিত্তিক বিজ্ঞাপনে খ্রিস্টান দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হচ্ছে সান্টা ক্লজ। আর পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় কোকাকোলা। এই দু’টির সম্পর্কটাও অনেক রহস্যপূর্ণ। ১৯৩১ সালে কোকাকোলা প্রথমবারের মত তাদের থিম এবং পানীয়ের রঙের সাথে মিলিয়ে লাল পোশাকে সাদা বর্ডার দেয়া সান্টা ক্লজ উপস্থাপন করে এবং কোক আর সান্টার জনপ্রিয়তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে সেই সান্টা ক্লজ-ই আস্তে আস্তে সব জায়গায় চালু হয়ে যায়। পরবর্তীতে সান্টা ক্লজ দেখলেই কোক আর কোক দেখলেই সান্টা, একের সাথে অপরকে চমৎকার মানিয়ে যায়। ব্যাপারটাকে বলা হয় ‘কালার সাইকোলজি’, এর এত সার্থক প্রয়োগ আর কোথাও হয়েছে বলে মনে হয় না। স্রেফ উৎপাদনের এলাকার জন্য সবুজ রঙের ঔধসবংড়হ হুইস্কির পরিচয় হয়ে গেছে ক্যাথোলিক হুইস্কি, আর কমলা রঙের ইঁংযসরষষং কে বলে প্রোটেস্টান্ট হুইস্কি। একই ব্যাপার দেখা যায় ক্যাথোলিক আর প্রোটেস্টান্ট অধ্যুষিত এলাকার ফুটবল ক্লাবগুলোতেও। বাংলাদেশে রূহ আফজার বিজ্ঞাপন দেখে ধর্মানুভূতি শুধু মুসলিমদেরই আছে, এটা ভেবে সো-কল্ড সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীর মন খারাপ করার কারণ নেই। পশ্চিমাবিশ্ব থেকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সেক্যুলারিজম আমদানিকারক দেশ যেমন বাংলাদেশের মুদ্রায় যদি লেখা থাকে ‘আমরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী’, তাহলে এ দেশে কী অবস্থার সৃষ্টি হবে! অথচ খাঁটি সেক্যুলার আমেরিকার ‘ন্যাশনাল মটো’ হিসেবে ১৯৫৬ সালেই গৃহীত হয়েছে ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’। আমেরিকার ডলারে ওহ এড়ফ বি ঃৎঁংঃ লেখা কি তথাকথিত সেক্যুলারিজমের পরিপন্থী নয়? নিত্যপণ্যের গায়ে ‘যেশাস ইজ মাই সেইভিয়ার’ একটা কমন দৃশ্য সেখানে। ‘গড উইনস’ কিংবা ‘যেশাস লাভ মি’ লেখা টি-শার্ট কাটতি চোখে পড়ার মতো। জুতার হিলটাও সেখানে ক্রুশের প্রতীক দিয়ে তৈরি হয়! রিটেইল শপগুলোতে ‘ফেইথ পপস’ কিংবা ‘ফুড অব দ্য বাইবেলে’র চাহিদা অনেক বেশি। ফার্স্টফুড যেমন ফ্রেন্স ফ্রাইতে অবিকল যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য থাকে। তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ভারত সংবিধানে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত না করলেও, বাস্তবে ওরা ধর্মভীরু। এরপরও যারা পশ্চিমা বিশ্বকে সেক্যুলারিজমের মানদন্ড রূপে পেশ করে সেক্যুলারিজম বলতে রাষ্ট্র থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ কিংবা সকল ধর্মের সমানাধিকার বুঝায়, তাদের জন্য আমেরিকার মরহুম প্রেসিডেন্ট আবরাহাম লিঙ্কনের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘তুমি সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার এবং কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা তোমার পক্ষে সম্ভব; কিন্তু তুমি সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার না’।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply