সেনা-অভ্যুত্থানে আবারও রক্তাক্ত মিয়ানমার -হারুন ইবনে শাহাদাত

প্রতিদিন মিয়ানমারে রক্ত ঝরছে। গৌতম বুদ্ধের অহিংসার বাণী ভুলে এবার শুধু রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়, গণতন্ত্রকামী প্রতিবাদী মানুষের বুকেও গুলি চালাচ্ছে দেশটির স্বৈরাচারী শাসকের পদলেহী সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তাদের বুলেটের আঘাতে নিরীহ মানুষের রক্তে সিক্ত হচ্ছে মিয়ানমারের মাটি। জাতিসংঘের হিসাবে সেনাবাহিনীর গুলি ও নির্যাতনে কমপক্ষে দেড় শ’ জন নিহত হয়েছে। কারাবন্দী বিরোধী দলের একাধিক নেতা-কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং ক্ষমতা দখল করেছেন। রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা গণহত্যার দায় থেকে মুক্তি পেতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে তিনি মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেছেন। ক্ষমতা দখলের পর থেকে শুরু হয়েছে নতুন মাত্রার নির্যাতন নিপীড়ন।

মিয়ানমারে সেনা শাসনের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ৫০ বছরের বেশি সময় দেশটি সেনাবাহিনী শাসন করেছে। সামরিক জান্তার কবলে পড়ে দেশটির নামও বদলে গেছে। মিয়ানমারের আদি নাম বার্মা। কিন্তু পৃথিবীর মানচিত্রে বার্মা বলে আর কোনো দেশ নেই। সামরিক শাসকরা নতুন নাম দিয়েছে মিয়ানমার। সামরিক স্বৈরশাসকরা দেশটির পতাকা এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর, প্রদেশ ও সংখ্যালঘু মুসলিম অধিবাসীদের নাম পরিচয় পর্যন্ত বদলে ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমার। তবে সুপ্রতিবেশী নয়। একদলীয় শক্তিশালী কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীন এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারত বন্ধুত্বের উষ্ণ সম্পর্ক নিয়ে সব সময় মিয়ানমারের সেনাশাসকদের পাশে থেকেছে এবং এখনো আছে। আর এ কারণেই মিয়ানমারের বেপরোয়া আচরণ দিন দিন সীমা ছাড়িয়েছে। অব্যাহতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণতন্ত্র হত্যার পরও বিশ্ব সম্প্রদায় সেই অর্থে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। চীন, রাশিয়া, ভারতসহ বিশ্বের সকল স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শক্তি মিয়ানমারকে সমর্থন করে যাচ্ছে। তাদের এই সমর্থনের কারণে এককালের স্বাধীন আরাকান এখন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। আরাকানের ভূমিপুত্র (আদি ও আসল বাসিন্দা) রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাঙালি আখ্যা দিয়ে তাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে বাস্তুচ্যুত করেছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এখানে উল্লেখ্য ভারতে আশ্রয় নেয়াদের অধিকাংশই হিন্দু রোহিঙ্গা। মুসলিম যারা আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের অনেককেই পুশব্যাক করেছে ভারত।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী আচরণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস এখন আর শুধু আরাকান বা রাখাইনে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী নেইপিডো ছাড়িয়ে গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। তারপরও ভারত কেন সুসম্পর্ক রেখেছে? চীনের স্বার্থ স্পষ্ট। চীন একনায়ক শাসিত। তাদের একদলীয় কমিউনিস্ট সরকার সামরিক সরকারের চেয়েও এক কাঠি বেশি। রাখাইন ঘিরে চীনের বড় প্রকল্প আছে, কিন্তু ভারতের স্বার্থ কী?

ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশকে চাপে রাখতে এটা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। ইকোনমিক টাইমসে গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব করতে মিয়ানমারকে কাছে টানছে ভারত। দেশটিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করবে নরেন্দ্র মোদি প্রশাসন। রাখাইনে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর করছে বেইজিং। যাকে টেক্কা দিতে, আগামী বছরই ভারতীয় অর্থায়নে শুরু হচ্ছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাখাইনের সিত্তি বন্দর প্রকল্পের কাজ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন-ভারত দ্বন্দ্বে মাঝখান থেকে মিয়ানমার তার অবস্থান আরও পোক্ত করে নিচ্ছে। ভারত রাখাইন স্টেটের সিটওয়েতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ভারতের এখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার। এ প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ের (এক সময়ের আকিয়াব) সংযুক্ত হবে। ভারত অনেক আগেই এ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল।

বঙ্গোপসাগার ঘেঁষে এ সমুদ্রবন্দর (সিটওয়ে) ভারতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে পণ্য পরিবহনে (সাত বোন রাজ্যে) এ রুটটি ব্যবহৃত হবে। কালাদান নদীর মোহনায় এটি অবস্থিত বিধায় এটা ‘কালাদান প্রজেক্ট’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এটা সম্পন্ন হলে নদীপথে সিটওয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের চীন স্টেটের পালেটওয়া (চধষবঃধি) বন্দরকে সংযুক্ত করবে। এরপর সড়কপথে পালেটওয়া সংযুক্ত হবে মিজোরামের জরিনপুই (তড়ৎরহঢ়ঁর)-এর সঙ্গে। এ প্রজেক্টটি সম্পূর্ণ হলে একদিকে মিয়ানমার-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে সাত বোন রাজ্যগুলোয় পণ্য পরিবহন সহজ হবে। সুতরাং ভারতের বড় স্বার্থ রয়েছে মিয়ানমারে।
ভারতের ‘অপঃ ঊধংঃ চড়ষরপু’এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মিয়ানমার। ভারত বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। চলতি বছরই ভারতের অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে ও ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। বাণিজ্য বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। মিয়ানমারে ভারতের বিনিয়োগ দেশটিকে ১১তম বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে পরিণত করেছে। ভারতের ৩০টি কোম্পানির সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৬৩ মিলিয়ন ডলার (চীনের বিনিয়োগ ২০ বিলিয়ন ডলার)। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভ দেশটিকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একটি আকর্ষণীয় দেশে পরিণত করেছে। ভারতও এ প্রতিযোগিতায় আছে।

এদের এই স্বার্থের দ্বন্দ্বের খেসারত দিচ্ছে মিয়ানমারের সাধারণ জনগণ। স্বার্থান্বেষী আগ্রাসী গোষ্ঠী সামরিক সরকারের কাছ থেকে যত সহজে অবৈধ সুবিধা হাসিল করতে পারে, গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে তত সহজে পারবে না। এই কথা বুঝতে পেরেই তারা বারবার সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গা হত্যাসহ সেনাবাহিনীর নানাবিধ মানবতাবিরোধী অপরাধকে নগ্নভাবে সমর্থন করেও গণতন্ত্রপন্থী হিসেবে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সু চি টিকতে পারলেন না।

ফিরে দেখা
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ৫০ বছরের বেশি সময় থেকেছে সেনা শাসনের অধীনে। গত ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর দেশটিতে পার্লামেন্টারি নির্বাচনে অং সান সু চির ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ৪১২ আসনের মধ্যে ৩৪৬টিতে জয় পায়। অথচ নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত ইউএসডিপি জিতেছিল ৩৩টি আসনে। নির্বাচনে ভরাডুবির পর দেশটির সামরিক বাহিনী ‘কারচুপি’র অভিযোগ তোলে। সেসময় থেকে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। তখন থেকে সেনা অভ্যুত্থানের গুঞ্জন ওঠে। অবশেষে সেই গুঞ্জন বাস্তবে পরিণত হলো।’

রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগ থেকে বাঁচার শেষ চেষ্টা
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কেন নির্বাচিত সরকারকে হটালো। কেন এই অভ্যুত্থান? সেনাবাহিনীর প্রতি নমনীয় আচরণের পরও কেন নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করা হলো? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে অনেক বিশ্লেষক নানান অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাদের অধিকাংশ অভিমত হলো, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াংয়ের অবসরের সময় হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে। অবসরে গেলে সু চির সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে তার পক্ষে অবস্থান নাও নিতে পারে। এমন আশঙ্কা আর ভয় থেকেই তিনি নিজের হাতে ক্ষমতা নিয়েছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তুলে ধরতে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন সূত্রে প্রকাশ, ইসরাইলি-কানাডিয়ান এই লবিস্টের নাম আরি বেন-মানাশে যিনি ইসরাইলি সামরিক ইন্টেলিজেন্সে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। বেন-মানাশে আরও জানান, মিয়ানমারের বর্তমান সেনা কর্মকর্তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশে ফিরিয়ে নিতে চান। তিনি জানান, রোহিঙ্গা মুসলিমদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বেন-মানাশে আরো জানান, তিনি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কথা বলছেন এবং এর আগে মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডো সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জান্তা সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল মিয়া তুন উ’র সঙ্গে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। সামরিক সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে তাকে সম্মানী দেয়া হবে। তবে সম্মানীর অর্থের পরিমাণ জানাননি বেন-মানাশে।

জান্তাকে বিশ্বাস করা কঠিন
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত পঞ্চাশ বছর তারা রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের যে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে তার বিচার না হলে তা হবে খুবই দুর্ভাগ্যনজক। তাছাড়া বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ চীন, শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক রাজনীতির গতি প্রকৃতিও মুসলিম বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে। মিয়ানমারের মিত্র চীন উইঘুর মুসলমানদের সাথে যে নিষ্ঠুর আচরণ করছে তা জাতিগত নিধনের পর্যায়েই পড়ে। শ্রীলঙ্কা সে দেশে ইসলামী বই আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে। মিয়ানমারের আরেক ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতও উল্লিখিত ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তাই তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সংখ্যালঘু জাতি গোষ্ঠীর মানুষ জাতিগত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply