সে যে কেবলই প্রতারণাময় -ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান বেঁধেছিলেন, ‘(সখী) তোমরা যে বলো, দিবস-রজনী ভালোবাসা ভালোবাসা। সখী ভালোবাসা কারে কয়। সে কি কেবলই যাতনাময়? সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুঃখের শ্বাস? লোকে তবে করে কি সুখেরই তরে এমন দুঃখের আশা?’
না, আমার লেখার আজকের বিষয় এমন প্রেম-ভালোবাসা ও তাতে মন খারাপ করার জন্য নয়। আমার বিষয় একেবারে অন্য রকম। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ভালোবাসা বিষয়টার মধ্যে দুঃখ যাতনাই বেশি। তবু লোকে কেবলই ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ করে। আমিও যে কখনো কখনো এমন বেদনার গান, সাধ করে দুঃখের গান পছন্দ করি না, তাও নয়। তবে আজকের প্রসঙ্গ ভিন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্ম জানলই না, নির্বাচন কাকে বলে। এখন বাংলাদেশে ৩০-৩৫ বছরের যে টগবগে তরুণ সে জানে না, নির্বাচন কারে কয়। ১২-১৩ বছর আগে যে তরুণ প্রথম অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভোটার হয়েছিল, যে ভেবেছিল ভোট দিয়ে সে পছন্দের লোকদের ক্ষমতায় আনবে, তার আশার গুড়ে বালি পড়েছে প্রথম থেকেই। এ পর্যন্ত কোনো পর্যায়ের নির্বাচনেই তারা তাদের নিজেদের ভোট তো দিতেই পারেনি, এমনকি এমন কাউকে হয়তো চেনেও না, যিনি তার নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছেন। বরং ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সে রকম অভিজ্ঞতা না হওয়াই ভালো ছিল।

তবে কি বাংলাদেশে নির্বাচন হয়নি। আলবত হয়েছে। প্রতিনিয়তই হচ্ছে। সে নির্বাচনে কী দেখছে তরুণ প্রজন্ম। দেখেছে, লাঠালাঠি, দলবাজি, মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে একদল লোক আওয়ামী লীগের টিকিট জোগাড় করছে। আর আওয়ামী লীগের টিকিট বা নৌকা মার্কা যার, নির্বাচন কমিশন নামক মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিত্বহীনদের এক ক্লাব বুঁদ হয়ে নৌকার সে প্রার্থীদেরই জয়ী ঘোষণা করছে। কে কার ভোট দিলো, ধুলায় অন্ধকার। তারা জানছে, আমরা তথা তাদের পূর্বপুরুষরা সব প্রতারক, সব ভণ্ড জালিয়াত, বাটপার।
তারা তো আমাদের দিকে আঙুল তুলে বারবার এ কথাগুলো বলবে। দোষারোপ করবে, কেন আমরা তাদের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে গেলাম না? কেন আমরা সমাজ থেকে সব মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিলাম, কেন বিনষ্ট করলাম, কেন বিনষ্ট করলাম সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান? তারা যখন কিশোর ছিল, আমরা তখন প্রবীণ। দায়িত্ব কি আমাদেরও ছিল না?

আসলে ছিলই তো। কিন্তু আমরা তাদের পথের দিশা দিতে পারিনি। বলতে পারিনি, এই যে আমি পথরেখা টেনে দিলাম, এ পথ ধরে এগিয়ে এসো। সামনে সুন্দর সময়। এইটুকু পথ পেরোলেই সামনে সবুজ শস্যের মাঠ, ফুলের বাগান। বরং আমরা স্বৈ^রাচার আর দুর্বৃত্তের তাড়া খেয়ে ইটাক্ষেতের মাঝখান দিয়ে লক্ষ্যহীন দৌড়েছি। তরুণ সমাজ কোথায় পাবে পথের দিশা?
এখন ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করার দিন। দেশজুড়ে কবরের শাস্তি, প্রাণ নেই। প্রাণের স্পন্দন নেই। তরুণদের সামনে কোনো পথনির্দেশ নেই। কিন্তু দেশের স্বৈ^রশাসকরা, কিছু লোককে সুবিধা দিয়ে এমনভাবে কব্জা করেছে যে, তারা সরকারের একদলীয়তার পক্ষে অবিরাম মিডিয়ায় গীত গেয়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে যারা প্রবীণ ছিলেন, যাদের কথার মূল্য হতে পারত, তারাও কত যে সামান্য সুবিধার জন্য সরকারের যূপকাষ্ঠে নিজেদের বিবেককে বলিদান করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না।

তা হলে উত্তরণের পথ বের হবে কিভাবে? সাধারণত তারুণ্যই সে পথ বের করে নেয়। এরকম দুঃসহ স্বৈ^রশাসনের মধ্যেও আমরা তারুণ্যকে জ্বলে উঠতে দেখেছি। ওরে তারুণ্য, ওরে সবুজ, ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। এই যে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে ইলেকশনের বদলে সিলেকশন হচ্ছে, মানুষের ভোটাধিকারের কবর রচনা করা হচ্ছে, আমার অধিকার প্রয়োগ করতে পারছি না, আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ নয় বলে শত যোগ্যতা সত্ত্বেও চাকরি পাচ্ছি না, দলীয়করণের ফলে অ-আওয়ামী লীগাররা দেশের দুই নম্বর সিটিজেনে পরিণত হচ্ছে, কে করবে তার প্রতিকার? হ্যাঁ, তারুণ্যই করবে। করবে যে, তা তারা দু-একবার ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে। একবার উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনে।

আর একবার সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের আন্দোলনে। তারুণ্য যখন প্রতিবাদ করেছে, তখনই তারা সফল হয়েছে। এ দু’টি আন্দোলনও সফল। এভাবে ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে তারুণ্যের সাফল্য অনিবার্য। এই আন্দোলন দমাতে সরকারকে হেন কোনো হীন পথ নেই, যা আমরা নিতে দেখিনি। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি দেখেছি। ‘হেলমেট বাহিনী’ দেখেছি। নানা ধরনের মামলা দেখেছি। কিছু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতর প্রধানদের দেখেছি। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। এই ইতরেরা শিক্ষক নামে পরিচিত। এদের না আছে কোনো বিবেক, না আছে কোনো শিক্ষা। অথচ বেছে বেছে এদেরই বসানো হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে; কেবল নির্লজ্জ দলীয় আনুগত্যের কারণে।
যোগ্যতার প্রশ্ন দূর অতীত।

ফলে অথর্ব অসভ্য মেরুদণ্ডহীন বিবেকহীনরা এখন চালাচ্ছে রাষ্ট্র ও প্রশাসন। শিষ্টাচার চলে গেছে। এমপি ওসিকে বলেন, স্যার। আমলারা তথাকথিত জনপ্রতিনিধিদের কথা শোনেন না, বরং মন্ত্রীদের ডিকটেট করেন। কারণ তারা জানেন, দেশের শীর্ষ ব্যক্তির কাছে মন্ত্রীর কথার চেয়ে তার বক্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমলা কিংবা পুলিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকার যে কে চালাচ্ছে, সেটি এখন আর স্পষ্ট নয়। তবে রাজনীতিকরা যে চালাচ্ছেন না, সেটা স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোভিডের কারণে তিনি গণভবনে বন্দী।’ কেন, বের হলে কী হয়? আমরা তো ভেবেছিলাম, ইটনা-মিঠামইনের সড়ক উদ্বোধন করতে অন্তত তিনি যাবেন। এত সুন্দর একটা রাস্তা নির্মাণ করেছে তার সরকার। কিন্তু তার দেখা হলো না। আমারই আফসোস লাগে। তিনিও আফসোস করেছেন। কিন্তু আর কেন, স্কুল-কলেজ ছাড়া গোটা বাংলাদেশে সব কিছু তো খোলা। আমরাও মাস্ক পরে স্যানিটাইজারের ছোট শিশি পকেটে নিয়ে অফিসে যাই, বাজারে যাই। জনাব প্রধানমন্ত্রী, একদিন অন্তত ছদ্মবেশে মহানবী সা.-এর সাহাবীর মতো বেরিয়ে দেখুন, জনগণ, সাধারণ মানুষ কী বলছে। শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে। কিন্তু ভালোবাসা তো আর শুধু ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, ব্যক্তির চেয়ে দেশ-রাষ্ট্র-জনগণ নিয়ে যে ভালোবাসা- তা বহুগুণ প্রবল। তার জন্য জাতি নির্ভরশীল তারুণ্যের ওপর। কারণ তারুণ্যই সব সময় জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেছে।

জরাজীর্র্ণতায় আক্রান্ত যে বৃদ্ধ, তাকে যদি ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয় ক্ষমতাসীনদের গুণ্ডা-মাস্তÍান বা পুলিশ-র‌্যাব, তা হলে তিনি ফিরে আসবেন চরম অপমানে। বারবার তারা ফিরে আসছেন। কিন্তু তাদের জন্যই বা পথ করবে কারা? সে-ও ওই তারুণ্য। কারণ ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ ৫০ বছর আগে আমরা আজকের বৃদ্ধরা যখন তরুণ ছিলাম, তখন কারো পরোয়া করিনি- যুদ্ধে গেছি, অস্ত্র¿ ধরেছি। মাতৃভূমি স্ব^াধীন করেছি। এখন তাঁবেদাররা সে স্ব^াধীনতা ভূলুণ্ঠিত করছে। কে তাদের রুখে দেবে? তারুণ্য। সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের পথে তাদেরই অগ্রসর হতে হবে অকুতোভয়ে।

এ রাষ্ট্র জনগণের। সংবিধানে লেখা আছে। সংবিধান কি সব সময় মানে ক্ষমতাসীনরা? না, মানে না। তারা তাদের মতো করে সংবিধানের ব্যাখ্যা করে। যেমন নির্বাচন কমিশনের ইতরজনেরা করে। গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থ’া এখন প্রতারণামূলক হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কবর রচিত হয়েছে। সর্বত্র প্রতারণা। নির্বাচন নিয়েও প্রতারণা। কোথায়ও নির্বাচন হচ্ছে না। যিনি আওয়ামী লীগের, তিনিই জয়ী। এর অবসান জরুরি। জনগণ যাকে চায়, তিনিই জয়ী হবেন, এই ব্যবস্থ’া ফিরিয়ে আনতে হবে তরুণদেরই। ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছেন। তারুণ্যের জয় অনিবার্য।

পুনশ্চঃ বহুদিন নির্বাচন দেখি না। ‘ভোটডাকাতি’ দেখি। আগের রাতে ভোট দেয়া হয়ে যায়। গোটা নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ। বাংলাদেশে জোর করে ভোটের রাজনীতির অবসান ঘটানো হয়েছে। আর সে কারণে গত ৪-৭ নভেম্বর দিন-রাত সিএনএন-বিবিসি-আলজাজিরার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন কোটি কোটি মার্কিন নাগরিক। তাকিয়ে ছিলেন বিশ্ববাসী। ওই ক’টা দিন ভোটের আনন্দ উপভোগ করেছি। মনে হয়নি ভোট। সে তো কেবলই প্রতারণাময়।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply