সৈয়দ আমীর আলী উপমহাদেশের আলোকিত মানুষ -আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ

সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) একটি নাম, একটি ইতিহাস এবং একজন উজ্জ্বল মানুষের নাম। ১৭৫৭-এর ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়েন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সর্বশেষ নবাব, নবাব সিরাজউদ্দৌলা। অবিমৃষ্যকারী উচ্চাভিলাষী সেনাপতি আপন খালু মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম শিকার হন নবাব ও তাঁর সঙ্গী সাথীগণ। এবং এর মধ্য দিয়ে শুরু হলো বেনিয়ার বেশে আসা ধূর্ত ইংরেজ শাসকদের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন। ইংরেজদের উপনিবেশ শাসন আমলে উপমহাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী ব্যাপক নির্যাতন, নিপীড়ন ও দুঃশাসনের শিকার হন। ভারতীয় জনগোষ্ঠী মোগল শাসন আমলে যে সৌহার্দ্য, সুবিচার ও সমানাধিকার ভোগ করতেন, যে অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সুযোগ সুবিধা পেতেন হঠাৎ করেই ইংরেজদের “ভাগ করো, শাসন করো” নীতির কবলে পড়ে তা হারিয়ে গেল। হিন্দু জনগোষ্ঠী ইংরেজদের দোসর সেজে সমস্ত সুবিধা ভোগ করতে লাগল আর মুসলিম জনগোষ্ঠী সমস্ত অধিকার বঞ্চিত নিগৃহীত মানুষের সারিতে পড়ে গেল। ১৭৫৭-র পরাজয়ের পর উপমহাদেশে বেশ কিছু পরিবর্তন সূচিত হয়-

এক. ইংরেজগণ পর্যায়ক্রমে মুসলিম জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমাজমি কেড়ে নিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে নব্য হিন্দু জমিদার গোষ্ঠীর গোড়াপত্তন করে যারা পরবর্তীতে ধন-সম্পদ, শিক্ষা-দীক্ষা ও সামাজিক প্রতিপত্তি সৃষ্টি করে এবং একসময়কার বিত্তবান মুসলিম জনগোষ্ঠী দরিদ্র জনপদে পরিগণিত হয়।

দুই. প্রাক-ব্রিটিশ আমলে সমগ্র ভারতব্যাপী যে সমস্ত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা ছিল সেগুলো চলতো মানুষের ওয়াকফ করা লাখেরাজ সম্পত্তি দ্বারা। ইংরেজরা সে সমস্ত লাখেরাজ সম্পত্তি দখল করে তা জমিদারদের হাতে তুলে দেয়, ফলে এ সমস্ত মাদ্রাসা-মক্তব অর্থকষ্টে নিপতিত হয়ে কালক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে মুসলিমদের ভেতর শিক্ষার হার কমতে থাকে।

অপরদিকে, মুসলিম আলেম-ওলামাগণ কিছুটা অতিমাত্রায় ‘জযবা’র ফলে নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় (ইংরেজি) নিজেদের সন্তানদের পড়ালেখা করাতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে তাদের সন্তানগণ ব্রিটিশ সরকারের চাকরি ইত্যাদিতে অযোগ্য থেকে গেলেন।

তিন. ইংরেজ-হিন্দু যৌথ পরিকল্পনার ফলে মুসলিম শিক্ষা, সংস্কৃতি পশ্চাৎপদতার শিকার হলো, সর্বক্ষেত্রে হিন্দুগণ এগিয়ে এলো, মুসলিম জনগণ ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পেছনে পড়ে গেল।

চার. ইতোমধ্যে এই ১৯০ বছরে এ উপমহাদেশে উপনিবেশবিরোধী বেশ কিছু লড়াই হলো। ইতিহাস সাক্ষী এই সবগুলো লড়াই অনুষ্ঠিত হলো মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে যদিও সে সব লড়াই বেশ কিছু দেশপ্রেমিক, হিন্দু নেতাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ১৮৩২ সালের ‘বালাকোটের যুদ্ধ’, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ,পরবর্তীকালে তিতুমীরের লড়াই এবং সর্বশেষ ‘ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন।’

এই সব কটি আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিলেন মুসলিম নেতৃবৃন্দ কংগ্রেস যদিও ’৪৭ পূর্ব ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কৃতিত্বের বড় দাবিদার তবে সকলেই জানেন কংগ্রেস ব্রিটিশদের সাথে হাত মিলিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষকে ‘সেক্যুলার ভারতের প্রচ্ছদে’ মোড়া একটি বৃহৎ হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে কায়েম করতেই যারপরনাই চেষ্টা করেছিল।

১৯৪০ সালে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে মুসলিম লীগের প্রস্তাবের মুখে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাসমূহ নিয়ে এক বা একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি না উঠলে ভারতীয় উপমহাদেশের চিত্র অন্যরকম হতে বাধ্য ছিলো। সৈয়দ আমীর আলীর জীবন ও কর্ম নিয়ে আজকের এই নাতিদীর্ঘ লেখার এই উপক্রমণিকা নিয়ে অনেকে নতুন করে ভাবনায় পড়তে পারেন তবে এটি একটি অপরিহার্য বিষয়।

সৈয়দ আমীর আলীর
সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য : (১৮৪৯-১৯২৮)

সৈয়দ আমীর আলীর বাবা ছিলেন সৈয়দ সাদাত আলী যিনি মূলত উড়িষ্যার কটাকের বাসিন্দা ছিলেন। তার পাঁচ সন্তানের চতুর্থ সৈয়দ আমীর আলী ১৯৪৯ সালের ৬ এপ্রিল জন্ম লাভ করেন। বাবা সাদাত আলী পরবর্তীতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীন কলকাতায় স্থানান্তরিত হন এবং স্থায়ীভাবে হুগলি জেলার চুচুড়ায় বসবাস শুরু করেন।
সৈয়দ আমীর আলীর পরিবার ব্রিটিশ সরকারের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন এবং কতিপয় ইংরেজ শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগীর সহযোগিতায় শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে আসেন। তিনি শৈশবে শিক্ষা বিভাগের বৃত্তি প্রাপ্ত একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন।
১৮৬৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৬৮ সালে তিনি সম্মানসহ এমএ ডিগ্রি লাভ করেন যা ছিল তৎকালীন ভারতে এক দুরূহ অর্জন। ১৮৬৯ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কলকাতায় আইন ব্যবসা শুরু করেন। ইতোমধ্যে তিনি স্বল্পসংখ্যক মুসলিম পণ্ডিত ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে গণ্য হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রজন্মের তিনি একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ।

সৈয়দ আমীর আলী কালক্রমে একজন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা, সংস্কারক ও সর্বোপরি কতিপয় অসাধারণ প্রভাব বিস্তারকারী গ্রন্থপ্রণেতা হিসেবে পরিচিত হন। এ সমস্ত বই মূলত মুসলিম ইতিহাস, ইসলামের আধুনিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন, ভারতীয় আইন প্রণয়ন বিশেষ করে মুসলিম পারিবারিক আইন, মুসলিম রাজনৈতিক দর্শন যা কিনা ব্রিটিশ শাসনামলে প্রযোজ্য হতে পারে এসব বিষয়কে কেন্দ্র্র করে লেখা।
সৈয়দ আমীর আলী ১৮৬৯ সাল থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ইনার টেম্পল (ব্যারিস্টার ও বিচারকদের পেশাভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন) এ যোগদান করেন এবং সে সময়ে তিনি বহুসংখ্যক স্থানীয় (লন্ডন) কীর্তিমান ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ হন। ভারত শাসনের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় সকল প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ ও নেতৃস্থানীয় লিবারেল ব্রিটিশ নেতৃবৃন্দের সাথে যুক্ত হন জন ব্রাইট ফস্টে হেনরি  এবং তার স্ত্রী মিলিসেন্ট ফস্টে -এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

সৈয়দ আমীর আলী ১৮৭৩ সালে বিলাত থেকে ভারত ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর আইন পেশায় পুনরায় যোগদান করেন। পরের বছর তিনি সরকার কর্তৃক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হিসেবে নিযুক্ত হন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে ইসলামী আইনের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৮৭৮ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। সে সময়ে ১৮৮০ সালে তিনি এক বছরের জন্য পুনরায় বিলাত গমন করেন।
১৮৮১ সালে সৈয়দ আমীর আলী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৮৮৩ সালে তিনি গভর্নর কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করেন। ১৮৯০ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।

তারও আগে সৈয়দ আমীর আলী কেন্দ্র্রীয় জাতীয় মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশনের নামে মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন (Central national muhammadan association) এটি ১৮৭৭ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হলেন যিনি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বৈধ সম্পৃক্তির পথ রচনা করলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি পরবর্তীকালে মাদ্রাজ থেকে করাচি পর্যন্ত সর্বত্র বিস্তৃতি লাভ করে।
এর মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হলো যে, ব্যক্তিগত উদ্যোগ যতই হোক না কেন সাংগঠনিক উদ্যোগের মতো তা ততটা কার্যকর ও স্থায়ী হতে পারে না। এ সংস্থাটি উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা ও কার্যক্রমকে আধুনিক গতিশীল ও কার্যকর করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এ সংগঠনটির তিনি দীর্ঘ সিকি শতাব্দী নেতৃত্ব¡ দেন এবং মুসলমানদের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
সত্যেন্দ্র পি সিনহার পর সৈয়দ আমীর আলী দ্বিতীয় ভারতীয় ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশ ভারত সরকারের আইন সদস্য (Law member) ছিলেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড

১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লাহ কর্তৃক নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সৈয়দ আমীর আলী ১৯০৮ সালে “লন্ডন মুসলিম লীগ” প্রতিষ্ঠা করেন যা একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এর শাখা হিসেবে নয়।
১৯০৯ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে প্রিভি কাউন্সিল (Privy council) এর সদস্য নির্বাচিত হবার সম্মান লাভ করেন ১৯২৮ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। প্রিভি কাউন্সিল সদস্য হওয়ার সুবাদেই তিনি সম্মানজনক “The right honorable বা TRHon” উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯০৮ সালে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল গ্যালারিতে “Mohammedan art and life in Turkey Persia Egypt Morocco and India exhibition অনুষ্ঠিত হয়। সৈয়দ আমীর আলীকে এ প্রদর্শনীর উপদেষ্টা করা হয়। এ প্রদর্শনী ২৩ অক্টোবর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এর উদ্বোধনী ছিল মহিমান্বিত ২৭ রমজান।

১৯১০ সালে কতিপয় ব্রিটিশ মুসলমানদের সাথে থেকে সৈয়দ আমীর আলী লন্ডনের প্রথম ও সর্ববৃহৎ মসজিদ ইস্ট লন্ডন মসজিদের সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা (Co-founder) হিসেবে ভূমিকা রাখেন। এটি ইউরোপের সর্ববৃহৎ মসজিদ। এভাবে তাঁর ইসলামিক কার্যক্রমের ক্ষেত্র প্রসারিত হয় এবং তিনি সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ^ময় অধিকতর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জন্য তিনি আলাদা সাংবিধানিক ও সংসদীয় অধিকার আদায় করেন এবং “খেলাফত আন্দোলনের” পক্ষে ভূমিকা রাখেন।
১৯০৪ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্ট থেকে অবসরে যান এবং জীবনের বাকি অংশ তাঁর ব্রিটিশ স্ত্রী ইসাবেলা ইডা কনস্টার (Isabele Ida Konstar)-এর সাথে লন্ডনে কাটাতে মনস্থির করেন। বলা যায় সেক্ষেত্রে তিনি মূলধারা ইসলামী রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত থাকলেন।
জীবনভর তিনি একজন ইসলামী আইন ও বিচার বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে মূলত মানুষ একজন উদার ইসলামী পণ্ডিত হিসেবে জানেন।
১৯২৮ সালের ৪ আগস্ট তিনি তার লন্ডনের সাসেক্সের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে ব্রুকউড (Brookwood cemetry)-এ সমাহিত করা হয়।

সৈয়দ আমীর আলীর চিন্তাধারা ও
তাঁর গ্রন্থাবলী

অনেকেই সৈয়দ আমীর আলীর পিতামহ ইরানের মাশহাদ শহর থেকে ভারতে নাদির শাহের সঙ্গী হিসেবে আসার কারণে তাঁকে একজন শিয়া হিসেবে গণ্য করে থাকেন। কিন্তু তার বাবা সাদাত আলী বিহার থেকে কলকাতা এবং কলকাতা থেকে চূড়ান্তভাবে হুগলিতে বসতি গড়লে তার অপর চার ভাইয়ের মতো তিনিও হাই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন। পাশাপাশি বাবার মৃত্যুর পর যখন তার বয়স মাত্র ৭ বছর তখন মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি আরো বেশি জ্ঞান চর্চায় ব্রতী হন। ১৭ বছর বয়সে তিনি মাওলানা কেরামত আলী রহমাতুল্লাহ জৌনপুরীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং ইসলামের মৌলিক বিষয় বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠেন।
ইতঃপূর্বে যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে তাতে সংক্ষেপে আলোচিত হয়েছে যে সৈয়দ আমীর আলী একজন ইসলামী পণ্ডিত হিসেবে শিক্ষিত সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাবে ইসলামী দর্শন, নবী চরিত, ইসলাম আইন ও বিচারপদ্ধতি, ইসলামে নারীর অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি করেন।

এবারে আমরা আমীর আলীর অবদান বিষয়ে সীমিত পরিসরে মূল বক্তব্য তুলে ধরব:
হুগলি হাই মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালীন সময়ে আমীর আলী অল্প বয়সেই স্থানীয় ইমামবাড়ার মোতাওয়াল্লির সাথে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন। ১৭ বছর বয়সেই তিনি শিক্ষকদের বিশেষ সহযোগিতায় কোরআন, হাদিস, আরবি, ফারসিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি সাপ্তাহিক সভাসমূহে অংশগ্রহণের সুযোগ পান যা অন্যদের জন্য ছিল বিরল। আমীর আলী সাপ্তাহিক সভায় অনুবাদকর্মে সহযোগিতা করতেন। কেরামত আলী জৌনপুরীর আলোচনাসমূহ তিনি ইংরেজি ও গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করতেন।

আধুনিক শিক্ষিত তরুণদের ইসলামচর্চায় সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
সৈয়দ আমীর আলী প্রথম দফা ব্রিটেনের আইন অধ্যয়ন করার সময় তার লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি ভারতীয় নাগরিকদের দুর্ভোগ, বঞ্চনা, নারীসমাজের পশ্চাৎপদতা নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট এর সাথে সরাসরি দেখা করে তার কাছে এসব সমস্যা নিয়ে আলাপ করেন। তিনি এসব নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা প্রদান করেন, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন। তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই “A critical examination of the life and teachings of Mohammad.” ১৮৭৩ সালে এটি প্রকাশিত হয়। তাঁর বয়স যখন ২৪ বছর বইটি এতই আলোচিত হয় যে ইংরেজ প্রাচ্যবিদ R.D. Osborn (১৮৩৫-১৮৮৯) প্রশংসা করে লিখেছেন- “Regarded simply as a literary achievement, we have never read anything issuing from the educated classes in the country which could be completed with it; and the Muslims of India are to be congratulated on the possession of so able a man in there it is impossible if his afterlife accords this early promise that he should not leave his influence for good stamped that upon the country independent during characters.

সৈয়দ আমীর আলী একজন আইনজ্ঞ, বিচারপতি, আইন পরিষদ সদস্য সিটি কাউন্সিল সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল লেখক হিসেবে তার অবদান। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ছিল-
ক. The personal law of Mohammadans (1880)
এ বইটিতে মুসলিমদের চার মাযহাবের মতামতসহ মুসলিম ব্যক্তিগত ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনসমূহ সংকলিত হয়েছে।
খ. The spirit of Islam; or the life and teaching of Muhammad (১৮৯০ সালে প্রথম প্রকাশ, ১৯৫৩ সর্বশেষ মুদ্রণ বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত)
এ বইটি মূলত নবী করিম সা.-এর জীবনের বিভিন্ন দিক এবং ইসলামের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও সামাজিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বইটির ব্যাপারে সেকালের ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকায় ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। তার মধ্য থেকে দুইটি তুলে ধরা হলো-
“A most valuable and important work which in our opinion will remain a standard book of references sympathetic in Spirit, rich in details Pleasing in style, profuse in references to oriented works, useful alike to the scholar and general reader. national observer.”
ÒThe volumes one which can be heartily commended to all who are all who are interested in oriental religious. -Review of the churches.
গ. Ethics of Islam (১৮৯৩) এ বইটি ইসলামী নৈতিকতা মূল্যবোধ ও আচরণবিধির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অনুসরণযোগ্য বই।
ঘ. A short history of saracens (১৮৯৯) মধ্যযুগে যখন খ্রিষ্টসমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল সে সময়ে আরব, তুর্কি, পার্শিয়ান এলাকাসমূহ থেকে মুসলিম শাসকগণ পৃথিবীতে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি শৌর্যবীর্য নিয়ে সারা পৃথিবীকে আলোকিত করে সেসব মুসলিম শাসকদের গৌরবময় ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত অথচ প্রভাব বিস্তারকারী বই এটি।
ঙ. Islam (১৯০৬)
চ. The legal position of women in Islam (১৯১২)
সৈয়দ আমীর আলীর লিখিত বইয়ের সংখ্যা সাতটি। এই সাতটি বইই তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকার, জনগণ ও শিক্ষিত সমাজ যাতে এসব বই অধ্যয়ন করে ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়।
একজন মুসলিম শিক্ষিত তরুণ হিসেবে তার কাছে মনে হয়েছে যে ১৮৫৭ সালে মোগলরাজত্বের অবসানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের কবলে নিপতিত মুসলিম সমাজ, তাদের ধর্ম ইসলাম এবং ইসলামের বিধি-বিধানের ব্যাপারে শাসক ও সাধারণ জনগণের যে নেতিবাচক ধারণা তা যেন দূরীভূত হয়। এজন্যই তিনি কলম হাতে তুলে নেন।

উপমহাদেশের আলেমসমাজ যখন ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম ঘোষণা করে সন্তানদেরকে মাদ্রাসা শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখছিলেন সৈয়দ আমীর আলী তখন নিজে সুশিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠেন এবং তার অনুসারীদেরকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ খানের মতো তাকেও লোকেরা আলীগড় আন্দোলনের পথিকৃৎ মনে করেন।
ইরান থেকে কলকাতার পার্শ্ববর্তী হুগলিতে এসে বসতি স্থাপনকারী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জায়গিরদার ফয়জুল্লাহর সন্তান দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিন (১৭৩৩-১৮১২) জীবনের সমস্ত অর্থ অবহেলিত মুসলিমদের শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য দান করে যান তাঁর অর্থে গড়ে ওঠে হাজী মহসিন ফান্ড। ভারত-বাংলাদেশে তার টাকায় পরিচালিত হয় অসংখ্য স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। সৈয়দ আমীর আলী নিজেও হুগলি হাই মাদ্রাসা থেকে স্কুলে পড়ালেখা শেষ করে থেকে উপকৃত হন।
সেই ইরান থেকে আসা একটি ঐতিহাসিক পরিবারের কৃতী সন্তান সৈয়দ আমীর আলী। মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য ও অনন্য। তরুণ সম্প্রদায় তাঁর জীবন ও কর্ম অধ্যয়ন করে তার ক্ষুরধার সাবলীল লেখা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে যাবে এটাই একমাত্র প্রত্যাশা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আবাসিক হল ‘সৈয়দ আমীর আলী হল’ এই মহান মনীষীর নামে রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র
১. KK Aziz Ameer Ali; His life and work 1968 Lahore
২. SK wasti, memoirs and other writings of Syed Ameer Ali, Syed Ameer Ali on Islamic history and culture 1968 Lahore
৩. Abdullah Hasan A late 19th century Muslim response to The Western civilization of Islam and analysis of Ameer Ali life and works, AJ/SS 112, 1985 179-206
৪. Martin forward the failure of Islamic modernism, Syed Ameer Alis interruption Islam 1999

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply