সোনালি সময়ের সুন্দর ব্যবহার -সালাহউদ্দিন আইউবী

আমরা তরুণ-যুবকরা পার করছি জীবনের সোনালি সময়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। লকডাউনের পর নতুন করে শাটডাউন শুরু হওয়ায় সকলেই অনেকটা ঘরবন্দি। মহামারী করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আক্রমণে বাইরে বের হওয়ার সম্ভাবনাও কমছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন খুব শিগগিরই কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী বারবার আশ্বস্ত করলেও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহসাই খোলার ইচ্ছে সরকারের নেই। খোলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কোনো আয়োজন তো বাদই দিলাম।

নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ, ক্লাস পরীক্ষা আর আড্ডা দেওয়ার ব্যস্ততা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় অংশগ্রহণ করা যাচ্ছে না বিয়ে-শাদিসহ কোনো উৎসবে। তাহলে কিভাবে পার করছি আমরা এই সময়? কোথায় ব্যয় হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তারুণ্যের এই উচ্ছ্বসিত দিনগুলো। দিনগুলোর সুন্দর ব্যবহার করছিতো?
সময় অমূল্য রতন, বিশেষত তারুণ্য ও যৌবনের এই উত্তম সময় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। সকালের সূর্য উদিত হলে তার উত্তাপ যেমন কম থাকে আবার অস্ত যাওয়ার সময়ও উত্তাপ যথেষ্ট কম থাকে। কিন্তু ঠিক ভরদুপুরে সূর্যের উত্তাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। আমরা জীবনের সেই ভরদুপুরে অবস্থান করছি। ইসলাম যৌবনের এই উত্তম সময়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছে। আল্লাহর রাসূল সা. এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে পাঁচটি বিষয়ের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম তিনি উল্লেখ করেছেন যৌবনের কথা-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – لِرَجُلٍ وَهُوَ يَعِظُهُ اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ : شَبَابَكَ قَبْلَ هِرَمِكَ وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ وَغِنَاءَكَ قَبْلَ فَقْرِكَ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেন, “পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটির পূর্বে গনিমত জেনে মূল্যায়ন করো; বার্ধক্যের পূর্বে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার পূর্বে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের পূর্বে তোমার ধনবত্তাকে, ব্যস্ততার পূর্বে তোমার অবসরকে এবং মরণের পূর্বে তোমার জীবনকে।” (হাকেম ৭৮৪৬, বায়হাকি; শুআবুল ঈমান-১০২৪৮)

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের প্রান্তরে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই যৌবনের সর্বোত্তম সময়ে উপনীত হযরত আলী রা.-এর মাধ্যমে।
কঠিন বিপদের দিনে যেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো আশ্রয় থাকবে না সেদিন আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে আরশের ছায়ায় আশ্রয়দান করবেন। তাদের মধ্যে যুবকরা অন্যতম।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ الإِمَامُ الْعَادِلُ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ‏.‏ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ‏”‏.
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সা. বলেন, যেদিন আল্লাহ্র (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে, ৩. সে ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, ৪. সে দু’ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর ওয়াস্তে, একত্র হয় আল্লাহ্র জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহ্র জন্য, ৫. সে ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহবান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’, ৬. সে ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানে না, ৭. সে ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে, ফলে তার দু’ চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। (বুখারী-৬৬০)

সুতরাং আমাদেরকে মূল্যবান এই সময়কে আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতে হবে। মানবজীবন আল্লাহর নিয়ামতে পরিপূর্ণ। সময় ও জীবন আল্লাহর দান। সময়ের ইতিবাচক ব্যবহারই জীবনের সফলতা। সময়ের অপচয় ও অপব্যবহার জীবনের ব্যর্থতা। সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করা বা অপব্যবহার করার জন্য জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহর দরবারে। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সময়ের মূল্যায়ন করে সময় এর ব্যাপারে কসম খেয়েছেন। মহাগ্রন্থ কুরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ الْعَصْرِۙ٠ اِنَّ الْاِنْسَانَ لَفِیْ خُسْرٍۙ ٠ اِلَّا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ تَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَ تَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ۠
“সময়ের কসম। নিশ্চয়ই মানুষ আসলে বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং একজন অন্যজনকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে।” (সূরা আসর)

আমরা প্রায় সময় নানান ব্যস্ততায় ব্যতিব্যস্ত থাকি। যেকোনো উপলক্ষে অবসর যখন আসে, তা আমাদের জন্য মহামূল্যবান নিয়ামত। সময় আমাদের জীবনের এমন একটি মূলধন বা পুঁজি, যা বিনিয়োগ করলে আমরা ইহকাল ও পরকালে লাভবান ও উপকৃত হবো; আর এটি হেলায় নষ্ট করলে উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। সময় চলে গেলে তা আর কখনো ফিরে আসে না।
আমরা সাধারণত চার ধরনের কাজ করে আমাদের সময় ব্যয় করে থাকি।
এক. দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের লাভজনক কাজ।
দুই. আখিরাতের জন্য লাভজনক কিন্তু দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর। যেমন সাময়িকভাবে নানা ব্যস্ততা বাদ দিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে ইসলাম উদ্বুদ্ধ করেছে।
তিন. তৃতীয় প্রকার হচ্ছে বৈষয়িক জীবনের জন্য লাভজনক কিন্তু পারলৌকিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর। যেমন কোন নাজায়েজ কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে অর্থ উপার্জন করা।
চার. চতুর্থ প্রকার হচ্ছে জাগতিক ও আখেরাত কোনো জগতের জন্যই লাভজনক নয় বরং ক্ষতিকর।
মানব মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিবেচনায় খুব সহজেই অনুমেয় যে দুনিয়া ও আখেরাতের অলাভজনক এবং ক্ষতিকর কাজে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা মোটেই উচিত নয়। আমরা কি এই অনুচিত কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারছি। করোনাভাইরাসের কারণে ব্যস্ততামুক্ত এই সময়ে আমরা কী করতে পারি তাহলে? অবসর সময়ে করণীয় সম্পর্কে ইসলাম কী বলেছে? আমাদের বিবেচনাবোধ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা কী করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে? আজকের এই সময়কে কিভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমার অনাগত দুঃসময়ে আমার জন্য উপকারে আসবে?
সবকিছু ভেবেই একজন ঈমানদার হিসেবে, সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে, পিতা-মাতার সুযোগ্য সন্তান হিসেবে, লাখো তরুণের প্রত্যাশা পূরণের উপযোগী হওয়ার জন্য করণীয় চিন্তা করে সর্বোৎকৃষ্ট কাজগুলোই আমাদেরকে করতে হবে সোনালি সময়টিতে। আমরা কী কী করতে পারি সে সংক্রান্ত একটি

তালিকা নিন্মোক্ত দেওয়া হলো-

১. আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকা
অবসর সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত বর্ষিত হয় তাদের প্রতি যারা এই সময়কে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْۙ٠ وَ اِلٰى رَبِّكَ فَارْغَبْ۠
“কাজেই যখনই অবসর পাও ইবাদতের কঠোর শ্রমে লেগে যাও এবং নিজের রবেরই প্রতি মনোযোগ দাও।” (সূরা আলাম নাশরাহ : ৭-৮)
এখানে দুটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে-
এক. অবসর সময়ে ইবাদতের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
দুই. মহান প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর হিদায়েত বই অধ্যয়ন করা যেতে পারে।
আল্লাহর রাসূল সা. হাদীসে একইভাবে উল্লেখ করেছেন,
حَدَّثَنَا هَنَّادٌ، حَدَّثَنَا يُونُسُ بْنُ بُكَيْرٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، حَدَّثَنِي يَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ كَعْبٍ الْقُرَظِيِّ، حَدَّثَنِي مَنْ، سَمِعَ عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ، يَقُولُ إِنَّا لَجُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْمَسْجِدِ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ مَا عَلَيْهِ إِلاَّ بُرْدَةٌ لَهُ مَرْقُوعَةٌ بِفَرْوٍ فَلَمَّا رَآهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَكَى لِلَّذِي كَانَ فِيهِ مِنَ النِّعْمَةِ وَالَّذِي هُوَ الْيَوْمَ فِيهِ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ كَيْفَ بِكُمْ إِذَا غَدَا أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَرَاحَ فِي حُلَّةٍ وَوُضِعَتْ بَيْنَ يَدَيْهِ صَحْفَةٌ وَرُفِعَتْ أُخْرَى وَسَتَرْتُمْ بُيُوتَكُمْ كَمَا تُسْتَرُ الْكَعْبَةُ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ خَيْرٌ مِنَّا الْيَوْمَ نَتَفَرَّغُ لِلْعِبَادَةِ وَنُكْفَى الْمُؤْنَةَ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لأَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِنْكُمْ يَوْمَئِذٍ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ ‏.‏ وَيَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ هُوَ ابْنُ مَيْسَرَةَ وَهُوَ مَدَنِيٌّ وَقَدْ رَوَى عَنْهُ مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ وَغَيْرُ وَاحِدٍ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَيَزِيدُ بْنُ زِيَادٍ الدِّمَشْقِيُّ الَّذِي رَوَى عَنِ الزُّهْرِيِّ رَوَى عَنْهُ وَكِيعٌ وَمَرْوَانُ بْنُ مُعَاوِيَةَ وَيَزِيدُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ كُوفِيٌّ رَوَى عَنْهُ سُفْيَانُ وَشُعْبَةُ وَابْنُ عُيَيْنَةَ وَغَيْرُ وَاحِدٍ مِنَ الأَئِمَّةِ ‏.‏
আলী ইবনু আবু তালিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা সা.-এর সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এমন সময় চামড়ার তালিযুক্ত একটি ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে মুসআব ইবনু উমাইর রা. এসে আমাদের সামনে হাজির হন। রাসূলুল্লাহ সা. তার বর্তমান করুণ অবস্থা দেখে এবং তার পূর্বের সচ্ছল অবস্থার কথা মনে করে কেঁদে ফেললেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, সে সময় তোমাদের কী অবস্থা হবে, যখন তোমাদের কেউ সকালে এক জোড়া পোশাক পরবে আর বিকেলে পরবে অন্য জোড়া। আর তার সামনে খাদ্যভর্তি একটি পেয়ালা রাখা হবে আর অন্যটি উঠিয়ে নেয়া হবে। তোমরা তোমাদের ঘরগুলো এমনভাবে পর্দায় ঢেকে রাখবে, যেভাবে কাবাঘরকে গেলাফে ঢেকে রাখা হয়। সাহাবীগণ আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো তখন বর্তমানের চাইতে অনেক সচ্ছল থাকব। বিপদাপদ ও অভাব-অনটন হতে নিরাপদ থাকব। ফলে ইবাদত-বন্দেগির জন্য যথেষ্ট অবসর পাব। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: বরং বর্তমানটাই তোমাদের জন্য তখনকার তুলনায় অনেক ভালো।
(মিশকাত, তাহকিক ছানী-৫৩৬৬, তিরমিজি-২৪৭৬)

হাদীসে উল্লিখিত সম্ভাব্য যেই সময়ের কথা বলা হয়েছিল আমরা সেই সময় উপনীত। মানুষ আজ অবসর। হাতেগোনা কিছু পরিবার ব্যতীত অন্যরা অভাব-অনটন মুক্ত। কিন্তু এই সুসময়ে আমরা কিভাবে আমাদের অবসর সময় পার করছি সেটাই বিবেচনার বিষয়।
এজন্য আমাদের উচিত হবে অবসর সময়ে উদ্যমী মনে আল্লাহর ইবাদত করা; যে সময়ে ইবাদত করে তৃপ্তি পাওয়া যায় এবং তা মনে ভারী বা বিরক্তিকর না হয়। আর তাহলেই অভীষ্ট লাভ করতে পারবো।

২. অতীতের কৃত গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা
অবসর সময়ে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে নিজেকে মহান রবের নিকট পেশ করা যায়। মনের মাধুরী মিশিয়ে দুঃখ কষ্টের কথা বলা যায়। কৃত অপরাধের বিবরণ তুলে ধরে ক্ষমাশীল আল্লাহর কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা যায়। রাসূল সা. হাদীসে উল্লেখ করেছেন-
وَعَنْ عُقبَةَ بنِ عَامرٍ رضي الله عنه قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَا النَّجَاةُ ؟ قَالَ: ্রأَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَগ্ধ . رواه الترمذي، وقال: حديث حسن
উকবাহ ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নিবেদন করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! কিসে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব?’ তিনি বললেন, “তুমি নিজ রসনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। তোমার ঘর তোমার জন্য প্রশস্ত হোক। (অর্থাৎ, অবসর সময়ে নিজ গৃহে অবস্থান কর।) আর নিজ পাপের জন্য ক্রন্দন কর।” (তিরমিজি-২৪০৬)

৩. শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা
এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা। আমরা যখনই একাকী সময় পার করি, কর্মহীন অবসর সময় অতিবাহিত করি। ঠিক তখনই শয়তান আমাদের মস্তিষ্কে তার সর্বোচ্চ তৎপরতা প্রদর্শন করে। আখেরাতকে ভুলিয়ে দিয়ে দুনিয়ার চাকচিক্য আর আল্লাহবিমুখ কর্ম আমাদের সামনে অনিন্দ্যসুন্দর হিসেবে তুলে ধরে। আমরাও ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যাই দুনিয়ার এই মায়াজালে। শয়তান তার তৎপরতা বাড়িয়ে দেয় যতক্ষণ না আমরা অনুতপ্ত হই। মানুষকে এই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. দুটি বিষয়কে বিশেষভাবে উল্লেখ করে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ قَالَ عَبَّاسٌ الْعَنْبَرِيُّ حَدَّثَنَا صَفْوَانُ بْنُ عِيسَى عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَعِيدِ بْنِ أَبِي هِنْدٍ عَنْ أَبِيهِ سَمِعْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مِثْلَهُ.
ইব্নু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: এমন দু’টি নিয়ামত আছে, যে দুটোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে, সুস্থতা আর অবসর।
(বুখারী-৬৪১২, আধুনিক প্রকাশনী-৫৯৬৪)

৪. বইয়ের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা
অবসরের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী হওয়া উচিত বই। আলোকিত মানুষগুলোর আলো জমা আছে তাদের মূল্যবান লেখনীতে। আমাদের সুযোগ হয়নি সে সকল মানুষকে দেখার, সরাসরি তাদের কথা শোনার কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে সরাসরি তাদের হৃদয়ের গভীরে থাকা আকুতি ও অনুভূতিগুলো। সেই অনুভূতির সাথে আপনার আমার অনুভূতির মেলবন্ধন করতে হলে তাদের বইগুলো বেশি বেশি পড়তে হবে। অবসরে আমার আপনার হৃদয়ের গভীরে কালো কালির লেখনীগুলোকে ঠাঁই দিতে হবে। তাহলে আমাদের মন আর মস্তিষ্ক হয়ে উঠবে সেই সকল উজ্জ্বল তারকাদের ন্যায় যারা এই পৃথিবীকে করেছিল আলোকিত, দুনিয়া নামক বাগানকে করেছিল সুশোভিত। আলোকিত মানুষগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন বইকে। বইয়ের সাথে সময় কাটাতে তারা খুব বেশি পছন্দ করতেন। আমরা ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানি। একদা ইবনে তাইমিয়্যাহর পিতা সকল বাচ্চাকে নিয়ে একটি বাগানে বেড়াতে গেলেন কিন্তু ইবনে তাইমিয়্যাহ তাদের সাথে গেলেন না। যখন তাঁর বাবা ফিরে এলেন তখন ইবনে তাইমিয়্যাহ তাঁর বাবাকে বললেন যে, সে সময়ের মধ্যে তিনি একটি পুরো বই মুখস্থ (আয়ত্ত) করে ফেলেছেন। তিনি তাঁর কারাগারে বন্দিত্বের অবসর সময়ে পূর্ণ কুরআন মাজিদ ৮০ বারের মতো অধ্যয়ন করেন।

৫. তথ্যপ্রযুক্তির ভয়াল আক্রমণ থেকে নিজে বেঁচে থাকা এবং নতুন প্রজন্মকে বাঁচানোর চেষ্টা করা
দিনের বেশির ভাগ সময় আমাদের কেটে যায় ডায়েরি আর কলমের পরিবর্তে হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে। বই আর খাতার পরিবর্তে ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটার দিয়ে। এই চিত্রটি শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের নয় বরং আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের চিত্র আরো ভয়াবহ। তারা রীতিমতো আসক্ত। এইতো সেদিনও খাবার টেবিলে বসে জানতে পারলাম আমাদের একজন সহকারীর ছোট ভাই যার বয়স ১০ বছরের কাছাকাছি। সে তার পরিবারের কাছে বায়না ধরেছে, মোবাইল কিনে না দিলে সে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে। বাধ্য হয়ে তাকে মোবাইল কিনে দেওয়া হয়েছে। হয়তোবা সে আত্মহত্যা করবে না, তার দেহটি জীবিত থাকলেও আদতে তার কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। এরকম হাজারও শিশু, তরুণ অকালেই ঝরে যাচ্ছে জীবন থেকে শুধুমাত্র এই ডিভাইস আসক্তির কারণে।

সামান্য একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি : দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭টি। প্রাথমিকের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৩৮ জন।
মাধ্যমিক স্কুলসংখ্যা ৫৩ হাজার ৫৮৯টি। মাধ্যমিকে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এক কোটির উপরে। কলেজ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ত্রিশ লাখ। বাংলাদেশ আলিয়া মাদরাসা রয়েছে ৯ হাজার ৩১৯টি। কওমি মাদরাসা প্রায় ১৪ হাজার। উভয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫৩ লাখ (বণিক বার্তা ২৫ মার্চ, ২০২১)।
প্রফেশনাল শিক্ষায় বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থী প্রায় এক লাখ। টিচার এডুকেশনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের উপরে। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংখ্যা তিন লাখ ৬৮ হাজার সাতশত ৯২ জন। (বাংলা ট্রিবিউন ২৫ মার্চ, ২০২১) দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা প্রায় ৬০০টি। এখানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সারাদেশে ইবতেদায়ি মাদরাসা প্রায় নয় হাজার যেখানে ছাত্রসংখ্যা এক লাখ। সারাদেশে রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অর্থাৎ দেশের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটির উপরে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছাত্র। যার মূল অংশ শিশু-কিশোর, তরুণ অথবা যুবক।
পাঁচ কোটির এই বিশাল জনগোষ্ঠী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে সম্পূর্ণ অবসর সময় পার করছে। কোনো ধরনের দিকনির্দেশনা না থাকায় তাদের অনেকেই সারাদিন সময় ব্যয় করছে শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অথবা কোনো ধরনের ডিভাইস আসক্তিতে।
প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন নতুন শিশু ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হচ্ছে। আর দিনে যুক্ত হচ্ছে এক লাখ ৭৫ হাজার শিশু। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের শতকরা ২৫ শতাংশ শিশু। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান করোনায় ৬৫ শতাংশ শিশুর মোবাইল অথবা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রতি আসক্তি বেড়েছে। গার্ডিয়ান কমনসেন্সের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমেরিকার ৬৯ শতাংশ ১২ বছর বয়সী শিশু স্মার্টফোনে অভ্যস্ত।

আমেরিকার কমিউনিটি সার্ভে অনুযায়ী ৩-১৮ বছর বয়সী ৯৪ শতাংশ শিশুর জন্য বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। বর্তমানে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষার সুবাদে বাচ্চারা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে যাদের অনেকেই ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এনবিসি নিউজের তথ্যানুযায়ী ৮-১২ বছরের একটি শিশু দিনে মোট ৬ ঘণ্টা মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করছে। কোথাও কোথাও এই ব্যবহারের হার আরো বেশি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকার স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ শিশুই মোবাইল ব্যবহার করে। এই সব শিশু মোবাইল আসক্ত। ফ্রি ফায়ার, পাবজি, মাইনক্র্যাফট, টাউনশিপ, লুডু কিং, টেম্পল রান, জিটিএভি, ক্ল্যাশ রয়েল, ক্ল্যাশ অফ ক্লানস ইত্যাদি অগণিত গেমরূপী ব্যাধিতে মারাত্মক আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশুরা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ানক। এই আসক্তির কারণে অনেকে অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। আত্মহত্যার মতো প্রাণঘাতী কাজ করতেও দ্বিধা করছে না। এই তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে আমাদের অবসর সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের জন্য নিয়মিত অনলাইনে এবং অফলাইনে নানা ধরনের ইভেন্ট আয়োজন করতে হবে। তাদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্য সঙ্গ দিতে হবে। সম্মানিত ভাইয়েরা, আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণরা সুস্থ থাকলেই সুস্থ থাকবে আগামীর বাংলাদেশ, তারা ভালো থাকলেই ভালো থাকবে আগামীর সোনার বাংলাদেশ।

৬. অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উদ্যোগী ভূমিকা রাখার সুবর্ণ সুযোগ এই অবসর সময়ে
সমাজের বেশির ভাগ মানুষ হয়তোবা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। তবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী যারা কাউকে তাদের কষ্টের কথা বলতে পারবে না। চলমান পরিস্থিতির কারণে কারো কাছে পৌঁছতে পারবে না। আমাদেরকে পৌঁছে যেতে হবে তাদের কাছে। আমাদের সম্পদে তাদের হক রয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ فِیْۤ اَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّآئِلِ وَ الْمَحْرُوْمِ
“তাদের সম্পদে অধিকার ছিল প্রার্থী ও বঞ্চিতদের।”
(সূরা যারিয়াত : ১৯)
আসুন আমরা সবাই মিলে তাদের এই হক আদায় করি। তাদের অধিকারগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেই।
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ ابْغُونِي ضُعَفَاءَكُمْ فَإِنَّمَا تُرْزَقُونَ وَتُنْصَرُونَ بِضُعَفَائِكُمْ ‏”‏ ‏.‏
আবুদ দারদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি: আমাকে খোঁজ কর তোমাদের মধ্যে যারা নিঃস্ব-দুর্বল তাদের মাঝে। কেননা তোমরা রিজিক এবং সাহায্য-সহযোগিতাপ্রাপ্ত হয়ে থাক অসহায়-দুর্বল লোকদের উসিলায়। (আবু দাউদ-২৫৯৪)
সুতরাং কষ্টে থাকা মানুষগুলোর কষ্টের ভাগীদার হওয়া দরকার আমাদের সকলকে। হাসিমুখে একমুঠো ভাত প্রতিবেলা তাদের যেন জুটে সে জন্য আমরা আমাদের সাধ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply