সোশ্যাল মিডিয়া নিরাপত্তাহীনতার নতুন ডাইমেনশন -খালেদ এইচ আরমান

আমরা পৃথিবীতে এসেছিলাম আল্লাহর দাস হিসেবে। কথা ছিল, আমরা তার গোলামি করব। তার হক আদায়, সেই সাথে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হক আদায়ে সংগ্রাম করব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখন মুসলিম উম্মাহর একটা শ্রেণী প্রতিনিয়ত শয়তানের দাসে পরিণত হচ্ছে। শয়তানের গোলামি করাকে নিজেদের জীবনোদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে। তারা যেভাবে চাইবে আমরা (মুসলিম উম্মাহর একটা শ্রেণী) সেভাবেই নিজেদের নিয়ে ভাববো। এই পৃথিবীর বুকে এর চেয়ে বড় দাসত্ব আর কী হতে পারে?
কয়েকটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি-
১. নতুন বাসাটা যখন রেডি হচ্ছিল, তখন বাসায় ইন্টেরিয়র ডিজাইন করানোর কথা ভাবছিলাম। ভাবা শেষ হলে বিষয়টি বাসার সবার সাথে শেয়ার করলাম। বললাম, ‘বাসার ভেতর একটু ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ করালে কেমন হয়?’ সবাই সাথে সাথে সায় দিল, বেশ আগ্রহের সাথেই সায় দিল। ঠিক দুদিনের মাথায় আমার ফেসবুক টাইমলাইনে কম করে হলেও চার-পাঁচটা ইন্টেরিয়র ডিজাইনার কোম্পানির প্রোফাইল বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছিল। অথচ আমি গত প্রায় ১০ বছর ধরে ফেসবুক ব্যবহার করছি। একটা বারের জন্যও কোনদিন কোন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার কোম্পানির নাম-ধামও শো করেনি।
২. ইদানীং লেখালিখির বেশ ইচ্ছা হচ্ছিল। লেখার জন্য অনেকগুলো টপিকও ঠিক করে ফেলেছিলাম। কিন্তু কিভাবে লেখাগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপন করব? কিভাবে মানুষকে আমার লেখা ব্লগগুলো পড়াতে পারব? এসব ভাবতে ভাবতে ওয়ার্ডপ্রেস থেকে নিজস্ব একটা সাইট বানানোর চিন্তা মাথায় এলো। সাইট কিনার কথা পাশের বাসার খালাতো ভাইয়ের সাথে একটুখানি শেয়ার করলাম। সে আবার দক্ষ প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সার। সে জবাব দিল, “টাকা-পয়সা থাকলে সাইট একটা কিনতে পারো।” আমাকে অবাক করে দিয়ে ঠিক এরপরের দিন-ই দুই-তিনটা ডোমেইন বিক্রেতা কোম্পানির আমার টাইমলাইনে আসতে লাগল। অথচ এতদিন যাবৎ এসব ওয়েবসাইট বিক্রির বিজ্ঞাপন আমার টাইমলাইনের চতুর্পাশেও আসেনি।
৩. তৃতীয় ঘটনাটি স্বয়ং আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে ঘটেছিল। পোর্ট সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ নিয়ে পড়ছে সে। তো, একদিনের একটা প্রেজেন্টেশনে তার ইংলিশ কনভার্সেশন ক্লাস টিচারের খুব ভালো লাগে। যেহেতু সে প্রফেশনাল ফ্রিল্যান্সার, ইংলিশে তার মোটামুটি দখল আছে। তো, স্যার তার ইংলিশের প্রতি ইম্প্রেসড হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, IELTS করেছ নাকি TOEFL? সে একটা জবাব দিল। ব্যাস অতটুকুন-ই। ভার্সিটি থেকে বাসায় এসে দেখে তার ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকে দেখে IELTS, TOEFL, GRE , এজঊ সহ আরো ইংরেজি শিক্ষার কত কোর্সের বিজ্ঞাপনে তার টাইমলাইন ছেয়ে গিয়েছে!
৪. ডেরেক ডু প্রিজ নামক এক ব্যক্তি টুইট করেন যে, গত রাতে তিনি তার সঙ্গীর সাথে হস্তরেখা পাঠ করানোর ব্যাপারে পরামর্শ করেন। পরের দিন সকালেই তার ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হস্তরেখা পাঠ করার অ্যাপ্সে ভেসে যায়। তিনি নিশ্চিত হন যে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আমাদের সকল কথাবার্তা নির্বিঘ্নে শুনতে পায়।
আপনাদের মাথায় এখন যে মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, আমার মনেও সেই একই প্রশ্নের উদয় হয়েছিল। কিভাবে ফেসবুক আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করতে পারে? আমরা যে বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা বলি, কিভাবে ফেসবুক সেই বিষয়টি নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে? তাহলে কি ফেসবুক আমাদের কথাবার্তা শুনতে পায়? একটা মুহূর্তের জন্য আপনারাও হয়ত আমার মত এটাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু একটু পরেই নিজ দায়িত্বে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, ফেসবুক প্রতিনিয়ত আমাদের মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
আমাদের যাদের ফোনে Internet Speed Meter Lite নামক এপটি ইন্সটল করা আছে, তারা একটি জিনিস খেয়াল করে থাকবেন। সেটা হলো, আমরা যখন আমাদের অ্যান্ড্রয়েডে মোবাইল ডাটা চালু করি, Down (Download) ও Up (Upload) স্পিড প্রদর্শিত হচ্ছে। মোবাইলে ডাটা না থাকলে যদিও কোন ডাউনলোড হয় না,Down ও Up স্পিড সবসময় শো হয়। এখন প্রশ্ন হল, Down (Download) স্পিড দেখিয়ে যে সংখ্যাটা দেখানো হয়, সেটা হল আমরা অনলাইন থেকে যা কিছু ডাউনলোড করি বা ইন্টারনেট ব্রাউজ সেটার গতি। কিন্তু Up (Upload) স্পিড দেখিয়ে যে সংখ্যাটা দেখানো হয়, সেটা আসলে কিUpload হওয়ার গতি?
আমরা সবসময় আমাদের পকেটে মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়েই ঘুরি। তখন আমরা হরেক রকমের কথাবার্তা বলে থাকি। আর আমাদের কথাবার্তার একটা বিরাট অংশজুড়ে থাকে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ ও কাক্সিক্ষত ধরনের জীবনযাত্রা। দুর্ভাগ্যজনক ও অতি অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য যে, আমাদের সকল কনভার্সেশন আমাদের ফোনের মাইক্রোফোনের মাধ্যমে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে আর যে মুহূর্তেই মোবাইল ডাটা অন করি, ঠিক তখন-ই তা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের হাতে ঠিক সেই গতিতেই Upload হয়ে যায়, যেই গতি আমাদের দেখানো হয়। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে এই প্রক্রিয়ায় তথ্য চুরির অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের কথোপকথন ও তথ্যাদি চুরি করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ফেসবুকের এক মুখপাত্র বলেন “We only access to your microphone if you have given our app permission and if you are actively using a specific feature that requires audio.- যার সারমর্ম দাঁড়ায়, আমরা শুধুমাত্র কোন অ্যাপকে মাইক্রোফোনে অনুমতি দিলেই এবং অডিও প্রয়োজন এমন কোন বিশেষায়িত ফিচার সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করলেই তারা আমাদের মাইক্রোফোনে প্রবেশ করে।’
এখন কথা হলো, ফেসবুকের সব অ্যাপ্স ব্যবহার করতে তাদেরকে মাইক্রোফোনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া লাগে। কারণটা হল, ফেসবুক অ্যাপ্সগুলোর অনন্য ফিচারসমূহ। শুধুমাত্র ফেসবুকের এই একটি ফিচার-ই আমাদেরকে তাদের দাসে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। ভাবছেন কিভাবে আর কাদের? অবশ্যই মার্ক জাকারবার্গের নয়। পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করা হবে।
পৃথিবীতে এই মুহূর্তে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। তার মধ্যে ১.৫৬ বিলিয়ন মানুষ অলমোস্ট প্রতিদিন ফেসবুকে লগ-ইন করে থাকে। এদের মধ্যে সকল পেশার মানুষ আছে যারা নিজেদের ধ্যানধারণা মানুষের কাছে ব্যক্ত করে আর ফেসবুক সেগুলো লুফে নেয়। হয়ত এ জন্যই এখন ইহুদি-খ্রিষ্টানরা ছাড়া অন্য কেউ কোন কিছু আবিষ্কার করতে পারে না। আপনি একটা বিষয় ভেবে দেখতে পারেন। গত কয়েক বছরে ফেসবুক এমন সব ফিচার তাদের অ্যাপে এড করেছে যেগুলো আমরা অনেক পছন্দ করি। আমাদের অপছন্দনীয় ফিচার খুব একটা নেই কিন্তু। এখন নিশ্চয় ভাবছেন এটা কি করে সম্ভব? ঐ যে আমরা যখন বলাবলি করি, “এটা এমন হলে ভাল হতো, ওটা ওমন হলে ভাল হত!”
ফেসবুকের তথ্য চুরির কথা এখানেই শেষ নয়। তারা এখন আমাদের ব্রেইনেও প্রবেশাধিকার চাইছে। গত তিন বছর ধরে ফেসবুক মানুষকে কনভিন্স করানোর চেষ্টা করছে যে, মানুষ ফেসবুককে তাদের তথ্যাদির ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হয় Federal Trade Commission এর কাছে। আনুমানিক বছর তিনেক আগে ফেসবুক একটা হেডসেট বানানোর ঘোষণা দিয়েছিল। এই প্রজেক্টটা Facebook Reality Labs কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। তারা এমন একটা হেডসেট বানানোর পরিকল্পনা করছে যেটা আমাদের ব্রেইনওয়েভকে মনিটর করতে পারবে এবং সেই সাথে পড়তে ও ভাষায় রূপান্তর করতে পারবে। অতঃপর ফেসবুক ব্যবহারকারীরা শুধুমাত্র চিন্তা করার মাধ্যমে টাইপ করতে পারবে, হাতের আঙুল দিয়ে নয়, শুধুমাত্র চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে।
প্রজেক্টটাতে কাজ করছে সানফ্রান্সিসকোর University of California–এর একদল কম্পিউটার বিজ্ঞানী। তারা এপিলেপ্সি রোগীর ব্রেইনে স্থাপন করা ইলেক্ট্রোড থেকে সিগন্যাল ব্যবহার করে একটা এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছে। এক সিরিজ MCQ থেকে উৎপন্ন সিগন্যালগুলো মনিটর ও রেকর্ড করে এই সিস্টেমটা ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত সঠিক উত্তর দিতে অনুমান করতে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতে এই সিস্টেমটা ব্যবহার করে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ Oculus এর মত শক্তিশালী Virtual Reality হেডসেট তৈরি করবে যা কিনা শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমেই Select/Delete এর মত অপশন বাছাই করতে সাহায্য করবে।
আমরা ও ফেসবুক কর্তৃপক্ষ, দুই পক্ষ-ই এই সিস্টেম দ্বারা উপকৃত হবে। তবে সবচেয়ে উপকৃত হবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষে আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হব আমরা। এই সিস্টেমের নেতিবাচক দিকের কথা ভাবুন। এখন তো ফেসবুক আমাদের কথোপকথন থেকে আমাদের পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে জানছে। এমন একটা সময় আসবে হয়ত, যখন এই প্রজেক্টটা সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে যাবে এবং ফেসবুক আমাদের চিন্তাশক্তি থেকেও আমাদের ধ্যানধারণার ব্যাপারে জেনে যাবে। এটার তীব্রতা অত্যন্ত মারাত্মক হবে নিঃসন্দেহে।
এখন ফেসবুকের মালিকানা ও স্বত্বাধিকারী নিয়েও প্রশ্ন ও সন্দেহ আছে। যদিও মেইনস্ট্রিম খবরগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, ফেসবুকের স্বত্বাধিকারী মার্ক জাকারবার্গসহ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন বন্ধু, এটা নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ আছে। গুজব আছে যে, মার্ক জাকারবার্গ আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA (Central Investigation Agency) এর একজন এজেন্ট। গুরুতর অবিশ্বাস্য হলেও এই গুজবকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেশ কয়েক বছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে মার্ক জাকারবার্গ প্রোগ্রাম সঞ্চালকের তাড়নায় তার পরনের হুডিটি উন্মুক্ত করেন। হুডিটি উন্মুক্ত করার সময় জাকারবার্গকে যথেষ্ট বিব্রত হতে দেখা যায়। হুডিটির ভিতরে নিচের ডিজাইনটা দেখা যায় যেটাকে জাকারবার্গ তাদের কোম্পানির মিশন বলে আখ্যায়িত করেন। ডিজাইনটির মধ্যকার প্যাটার্ন দেখে উপস্থাপিকা বলেন, “Oh my God! This is a secret cult and probably for the illuminati.। উপরন্তু, ডিজাইনটির মধ্যে আমরা জায়োনিস্টদের তারকাখচিত চিহ্নটিও দেখতে পাচ্ছি। এছাড়া, ফেসবুকের CIA প্রজেক্ট হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট কনভিন্সিং তথ্য আছে। CIA সংক্রান্ত Factzone এর একটি রিপোর্টে সংবাদ পাঠিকা Brooke Alvarey বলেন- “According to the Department of Homeland Security reports, Facebook has replaced almost every other CIA information gathering programme since it was launched in 2004. Much of the credit belongs to the CIA agent Mark Zuckerberg who runs the day to day Facebook operation for the agency. The decorated agent, codenamed the Overlord was recently awarded the prestigious medal of intelligence commendation for his works with Facebook programme, which he called the single most powerful tool population control ever created.”
CIA এর ডেপুটি ডিরেক্টর Christopher Sartinsky এক অধিবেশনে বলেন, “After years of secretly monitoring the public, we were astounded so many people would willingly publicize where they live, their religious and political views, an alphabetized list of all their friends, personal email address, phone numbers, hundreds of photos of themselves and even status updates about what they were doing from moment to moment. It is truly a dream come true for the CIA and it’s the reason we invented the Internet.”
আশা করি, এসব নিউজ থেকে ফেসবুক কাদের ও কী উদ্দেশ্যে সৃষ্ট প্রজেক্ট সেটা বুঝতে কারো বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। CIA নাকি Illuminati?? নাকি উভয়-ই?
এতো গেল ফেইসবুকের কথা। ইন্সটাগ্রামও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই কারণ ইন্সটাগ্রাম ফেইসবুকের মালিকানাধীন একটা সোশ্যাল মিডিয়া। এসবের সাথে আরো আছে গুগল। গুগল; গুগল আর্থের মাধ্যমে আমাদের শারীরিক অবস্থানের উপর কঠোর নজরদারি রাখতে পারে। আমেরিকান সিনেটরদের একটা অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল গুগল সিএও সুন্দর পিচাইকে। সেখানে তাকে শারীরিক অবস্থান জানার ক্ষেত্রে গুগলের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। সে অকপটে স্বীকার না করলেও তার ভাষ্য ছিল ঠিক ফেসবুকের সেই মুখপাত্রের মত যিনি বলেছিলেন, কেবল অনুমতি দিলেই ফেসবুক আমাদের কথোপকথন শুনে। এছাড়া গুগলের সাথে CIA এর ভাল সম্পর্ক আছে। যাই হোক, এখনো একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়নি। তারা আমাদের পছন্দের ব্যাপারে এত কেয়ার করে কেন?
আমরা এখন এমন একটা অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে তারা আমাদের ব্যাপারে আমাদের চেয়েও বেশি কিছু জানে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, আমরা কোনটা পছন্দ করি আর কোনটা অপছন্দ করি; এসব সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা। আরো কয়েকটা উদ্দেশ্যের মধ্যে একটা উদ্দেশ্য হলো, আমাদেরকে অনলাইনে আটকে রাখা। ইউটিউবে আমরা যখন কোন ভিডিও দেখি, তখন সেই ভিডিওর পরে যেসব ভিডিও প্লে হওয়ার জন্য ভিড় করে কিংবা সেই পেজের আশপাশে এসে উপস্থিত হয়, সবগুলোই কিন্তু আমাদের কাক্সিক্ষত মানের ভিডিও। অর্থাৎ, আমরা সবসময় ঠিক এই ধরনের ভিডিও-ই খুঁজে বেড়াই। আমাদের ফোনের ব্রাউজিং হিস্ট্রি একদম তাদের হাতের নাগালে। হাতের মুঠোয় বলায় শ্রেয় এখানে। সেই ব্রাউজিং হিস্ট্রি দেখে দেখে তারা আমাদের ব্রাউজিং পেইজে সেইসব ভিডিও-ই পাঠায় যা আমরা খুঁজে বেড়াই। ফেসবুকেও ভিডিও দেখার সময় আল্টিমেটলি একটার পরে একটা সেই ভিডিওগুলোই আসে যেগুলো আমাদের রুচি ও পছন্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এভাবেই আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ইউটিউব কিংবা ফেসবুক বা অন্য কোন সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকি।
এসব কিছুর কারণে পৃথিবীজুড়ে এমন একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে যেখানে মনে হয় সব কিছু ম্যাট্রিক্স, Everything isn’t how we experience it. অর্থাৎ সব কিছু আমরা যেরকম দেখি আসলে সেরকম নয়। যদিও সেসব কিছুর ব্যাপারে কিছুটা সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে, অন্তত এতটুকু বিশ্বাস করা যায় যে, ফেসবুক, গুগল থেকে শুরু করে পৃথিবীখ্যাত সব ইন্টারনেট ও অনলাইন জায়ান্ট ইলুমিনাতি ও জায়োনিস্টদের প্রজেক্ট। তারাই আসলে আমাদের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে এত কেয়ার করে। কিন্তু কেন?
ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে তারা আমাদের কথোপকথনের উপর চরম নজরদারিতা রাখছে এবং পছন্দের সব জিনিসগুলো জেনে নিচ্ছে। এভাবে আমাদের পছন্দসই একটা দুনিয়া তৈরি করা তাদের জন্য সহজ হবে। অতঃপর দুনিয়ায় আমাদের পছন্দের জিনিসগুলো সহজলভ্য ও সেগুলোর প্রচলন অবাধ ও অবিরত করে দিয়ে তারা এমন একটা দুনিয়া তৈরির চেষ্টা করছে যেখানে আমরা প্রচণ্ডভাবে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে যাব। নিজেদের দ্বীনের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলব। পরকালের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের পরিবর্তে হাসি-ঠাট্টা জন্মাবে। New World Order বলতে মূলত এই ধরনের দুনিয়াটাকেই বোঝানো হয়ে থাকে।
আগেকার জামানায় মানুষ যুদ্ধ করে কোন একটা ভূখণ্ড দখল করত। অতঃপর সেই ভূখণ্ডের অধিবাসীদেরকে নিজেদের দাসে পরিণত করত। কিন্তু এখন যুগ পাল্টিয়েছে। এখন মানুষের সমস্ত শরীরকে দখল করা লাগে না। মানুষের মন-মস্তিষ্ক দখল করার মাধ্যমেই এখন তাকে দাসে পরিণত করা যায়। তারা যেভাবে চাইবে আমরা সেভাবে চিন্তা করব। তারা যে সিস্টেম বাছাই করবে, সেই সিস্টেম অনুযায়ী আমরা আমাদের জীবনে সাজাবো। অতঃপর তারা যে পন্থা ঠিক করবে, সেই পন্থা অনুযায়ী আমরা আমাদের জীবনকে পরিচালনা করব। মানুষের মন ও মস্তিষ্ক অন্য কারো ধ্যান-ধারণা দিয়ে পরিপূর্ণ করার চেয়ে পৃথিবীর বুকে বড় দাসত্ব আর কী হতে পারে?
আমরা পৃথিবীতে এসেছিলাম আল্লাহর দাস হিসেবে। কথা ছিল, আমরা তার গোলামি করব। তার হক আদায়, সেই সাথে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হক আদায়ে সংগ্রাম করব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখন মুসলিম উম্মাহর একটা শ্রেণী প্রতিনিয়ত শয়তানের দাসে পরিণত হচ্ছে। শয়তানের গোলামি করাকে নিজেদের জীবনোদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে। পুরো দুনিয়ায় এখন মুসলমানদেরকে শয়তানের দাস বানানোর প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের দিয়ে শয়তানের গোলামি করানোর জন্য শত শত প্রজেক্ট হাতে নেয়া হচ্ছে।
এখনো প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। আমাদের জন্য পছন্দসই দুনিয়া বানিয়ে তারা কিভাবে উপকৃত হবে? এটা সবার জানা আছে যে, দাজ্জালের অনুসারীদের একটা বিরাট অংশ হবে ইহুদিরা। এই ইহুদিরাই সর্বপ্রথম দাজ্জালকে সমর্থন করবে। কারণ আমাদের কাছে সর্বশেষ নবী হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা.)। অন্যদিকে খ্রিষ্টানদের কাছে ঈসা (আ) হচ্ছেন মাসিহ অর্থাৎ সর্বশেষ নবী। আর ইহুদিদের কাছে মাসিহ হচ্ছে সেই দাজ্জাল যে নিজেকে প্রথমে নবী ও পরবর্তীতে আল্লাহ দাবি করবে। জায়োনিস্টদের এতসব অপতৎপরতার একদম গোড়ার উদ্দেশ্যটা হলো তাদের মাসিহর আগমনকে ত্বরান্বিত করা। তারা দাজ্জালের আগমনের অপেক্ষায় মুখিয়ে আছে। আর দুনিয়ার মানুষ দাজ্জালের কথা বেমালুম ভুলে না যাওয়ার আগ পর্যন্ত দাজ্জালের আবির্ভাব হবে না। আর বিভিন্ন রকমের ঈমানবিধ্বংসী ও দুনিয়ামুখী প্রজেক্ট সৃষ্টির মাধ্যমে তারা আমাদেরকে দ্বীন, সেই সাথে দাজ্জালের কথা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, যাতে দাজ্জালের আগমন ঘটে এবং তারা পৃথিবীতে তাদের পরিপূর্ণ ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারে।
আল্লাহ আমাদের এই ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। সমগ্র উম্মাহকে জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার তৌফিক দিন। আমিন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply