সোশ্যাল মিডিয়া সত্যই আসল যুক্তি # আবদুল জব্বার

একজন সভ্য মানুষ কখনো গালি দেন না, তিনি কখনো অশ্লীল কথা বলেন না, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন না। একজন ভদ্র-সভ্য মানুষ এসব করতেই পারেন না। কথায় আছে ব্যবহারে বংশের পরিচয়। সভ্য মানুষের মতো আচরণ তার ভালো বংশপরিচয় এবং উন্নত আচরণ প্রকাশ করে। ভদ্র-সভ্য ভালো মানুষ কারো প্রতি রাগান্বিত হলেও খারাপ ভাষা ব্যবহার করেন না। তাদের রাগ প্রকাশের ভঙ্গিটাও হয় সভ্য, সুন্দর ও সংযত। অপর দিকে একজন মন্দ মানুষ যখন রেগে যায় তখন সে ভুলে যায় ভদ্রতা-সভ্যতা এবং তার পাশবিক রূপ বেরিয়ে আসে। সে তখন গালি দেয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ করে, যুক্তিহীন পাশবিক আচরণ করে। সে এগুলো ব্যবহার করে জিততে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেই হেরে যায়।
একজন মন্দ মানুষ যখন যুক্তিতে হেরে যায় তখন সে সাহায্য নেয় গালির। কারণ গালির ভূমিকা হচ্ছে আলোচনার পথরোধ করা। আপনি কাউকে একটা যুক্তি দিলে তার একটা সম্ভাবনা থাকে সেই যুক্তিটা খন্ডানোর। কিন্তু যেই আপনি তাকে গালি দিলেন তখন তার খন্ডানোর আর কিছু থাকে না।
গালি দেয়া, অশ্লীল কথা বলা, অশ্লীলতা ছড়ানো আমাদের সমাজের এক মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি একটি মানসিক ব্যাধিও বটে। বর্তমানে সোশ্যাল নেটওয়ার্কও এর বাইরে নয়। বরং অনেক সময় দেখা যাচ্ছে অফলাইনের সভ্য মানুষটিই অনলাইনে এসে অভদ্র আচরণ করছে।
অনলাইন ও সোশ্যাল সাইটগুলোতে যেসব অশোভনীয় আচরণগুলো সাধারণত দেখা যায়-
১.    যে কোন পোস্ট নিজের মতের অমিল হলেই গালাগাল করা
২.    যুক্তির পরিবর্তে পাল্টা অযৌক্তিক ও অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করা
৩.    পোস্টে বা কমেন্টে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও বা এসবের লিঙ্ক পোস্ট করা
৪.    অপরের অমতে ট্যাগ করা
৫.    মিথ্যা/অসত্য তথ্য/ছবি ছড়িয়ে দেয়া
৬.    কারো ছবিকে এডিট করে হেয় করার কাজে ব্যবহার করা
৭.    অন্যের লেখা বা পোস্ট নিজের বলে চালিয়ে দেয়া
৮.    সত্য-অসত্য যাচাই না করে লাইক/শেয়ার করা
৯.    প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র না দেয়া
১০.    অপ্রাসঙ্গিক অ্যাড দেয়া
১১.    অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট করা
১২.    অধিক প্রশ্ন ও বেশি কথা বলা
১৩.    নিজের আমিত্ব জাহিরে বাকপটুত্ব করা
১৪.    কারো কথার মাঝখানে টক্কর দেয়া
১৫.    না বুঝে হইচই করা
১৬.    অন্যায়ের পক্ষে তর্ক করা
১৭.    বিচার মানি তবে তালগাছ আমার এরূপ প্রবণতা
১৮.    নোংরা গান শোনা, দেখা ও চর্চা করা
১৯.    অল্প জেনেই সিদ্ধান্ত নেয়া
২০.    যাচাই না করে বিশ্বাস করা।

গালিগালাজ করা কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়। মুদ্রাদোষ বা অভ্যাসবশত অনেকেই কথায় কথায় গালি দেন, অনেকেই হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলেও অন্যকে গালি দিয়ে বসেন।
শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামে গালি দেয়া, অশ্লীল কথা বলা, অশ্লীলতা ছড়ানো নিষিদ্ধ এবং পাপের কাজ। যেমন-
আল্লাহ তায়ালা বলেন :
“যেসব লোক ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের বিনা কারণে কষ্ট দেয় তারা একটা অতি বড় মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা নিজেদের মাথায় উঠিয়ে নেয়।” (সূরা আহজাব : ৫৮)
কুরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের ভদ্রতা শিক্ষা দিয়ে বলেছেন-
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কোনো দল যেন অপর কোনো দলকে উপহাস না করে। কেননা, যাদের উপহাস করা হলো তারা উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অপর নারীদের উপহাস না করে। কেননা, যাদের উপহাস করা হলো তারা উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর ফুসুক অতি মন্দ। যারা তওবা করে না তারাই জালেম।” (সূরা হুজুরাত : ১১)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মুসলমানদেরকে গালমন্দ করা ফাসেকি আর তাদের বিপক্ষে যুদ্ধ করা কুফরি।” (বুখারি ও মুসলিম)
সাদ ইবনে মালিক রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মুসলমানদের গালি দেয়া জঘন্য পাপ (ফাসেকি)। (নাসাঈ, ইবনে মাজা)
হযরত আবু যর রা: থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সা: কে বলতে শুনেছেন, কোন ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে যেন ফাসেক অথবা কাফের এর অপবাদ না দেয়। কেননা সে যদি প্রকৃতই তা না হয়ে থাকে তবে এই অপবাদ তার নিজের ঘাড়ে চেপে আসবে। (বুখারি)
হযরত আবু হোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, পরস্পরকে গালিদানকারীর মধ্যে যে আগে গালি দিয়েছে সে দোষী, যদি নির্যাতিত (প্রথম যাকে গালি দেয়া হয়েছে) ব্যক্তি পরিসীমা অতিক্রম না করে থাকে। (মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিজি)
নবী সা: আরো বলেন, চারটি স্বভাব থাকলে সে মুনাফিক। তাহলো : আমানত খেয়ানত করা, মিথ্যে বলা, ওয়াদা খেলাপ করা, ঝগড়া ও গালমন্দ করা। (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, স্বীয় পিতা-মাতাকে গালি দেয়া কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি কি তার পিতা-মাতাকে গালি দিতে পারে? রাসূল সা: বললেন, হ্যাঁ, এভাবে দিতে পারে- যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির পিতাকে গালি দেবে, আর উক্ত ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির পিতাকে গালি দিলো। যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির মাকে গালি দিলো, তখন উক্ত ব্যক্তি প্রথম ব্যক্তির মাকে গালি দিল। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১৪৬, শরহু মাশকিলুল আসার, হাদিস নম্বর-৮৯৯)
ইসলাম যেসব আচরণগত উপদেশ দিয়েছে তা হলো-
নবী সা: বলেন, মুমিন কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীল ও গালিগালাজকারী হয় না। (তিরমিজি ২০৪৩)
ইসলামে সুন্দর ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম। নবী সা: বলেন, “ইসলাম হচ্ছে সুন্দর ভাষায় কথা বলা ও ক্ষুধার্তকে আহার দেয়া।”
রাসূল সা: বলেছেন, “তোমরা ভাষায় মিষ্টভাষী হও, আচরণে সংযমী হও।”
আলী ইবনে আবু তালিব রা: বলেন, যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা বলে এবং তা প্রচার করে তাদের উভয়ে সমান পাপী। (আদাবুল মুফরাদ)
ইসলাম কঠোর ও নরম ভাষা ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছে, কিন্তু তা ক্ষেত্রবিশেষে। তবে সেই ভাষা অবশ্যই অশ্লীল নয়।
নবী সা: বলেন, “তুমি হক কথা বলো যদিও তা তিক্ত হয়।” তিনি আরো বলেন, ‘‘সুন্দর ভাষা জান্নাতে পৌঁছায় আর দুর্ব্যবহার দোজখে পতিত করে।” (বুখারি)
এসব আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায় ইসলাম এসেছে মানুষকে সভ্য-ভদ্র-ভালো বানানোর জন্য। তাই যারা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে তারা হয় ভদ্র ও শালীন।
কখনো কোন শিক্ষিত মানুষকেও দেখা যায় প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করছেন এবং বিভিন্ন মন্দ উপাধি বা গালি ব্যবহার করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছেন যা খুবই দুঃখজনক।
নবী করিম সা: একদা বসেছিলেন, তার উপস্থিতিতে এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর রা:কে গালি দিলো। তিনি (ঐ ব্যক্তির বারবার গালি দেওয়া এবং হযরত আবু বকর রা:-এর সবর ও খামুশ থাকার ওপর) খুশি হতে থাকেন এবং মুচকি হাসতে থাকেন। অতঃপর যখন সেই ব্যক্তি অনেক বেশি গালিগালাজ করল তখন হযরত আবু বকর রা: তার কিছু কথার জবাব দিলেন। তার ওপর রাসূল সা: অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। হযরত আবু বকর রা:ও তার পেছনে পেছনে তার নিকট পৌঁছলেন এবং আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সা:! (যতক্ষণ) ঐ ব্যক্তি আমাকে গালি দিচ্ছিল আপনি সেখানে অবস্থান করছিলেন, তারপর যখন আমি তার কিছু কথার জবাব দিলাম তখন আপনি নারাজ হয়ে উঠে গেলেন। রাসূল সা: এরশাদ করলেন, যতক্ষণ তুমি চুপ ছিলে এবং সবর করছিলে তোমার সাথে একজন ফেরেশতা ছিল, যে তোমার পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছিল। তারপর যখন তুমি তার কিছু কথার জবাব দিলে (তখন সেই ফেরেশতা চলে গেল আর) শয়তান মাঝখানে এসে গেল। আর আমি শয়তানের সাথে বসি না। (এই জন্য আমি উঠে রওয়ানা হয়ে গিয়েছি) এর পর তিনি এরশাদ করলেন, হে আবু বকর! তিনটি বিষয় আছে যা সম্পূর্ণ হক ও সত্য যে বান্দার ওপর কোন জুলুম অথবা সীমালঙ্ঘন করা হয় আর সে শুধু আল্লাহ তায়ালার জন্য তা মাফ করে দেয় (ও প্রতিশোধ না নেয়) তখন তার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করে শক্তিশালী করে দেন। যে ব্যক্তি আত্মীয়তা বজায় রাখার জন্য দানের রাস্তা খোলে, আল্লাহ তায়ালা তার বিনিময়ে অনেক বেশি দান করেন। আর যে ব্যক্তি সম্পদ বৃদ্ধি করার জন্য সওয়ালের দরজা খোলে আল্লাহ তায়ালা তার সম্পদ আরও কমিয়ে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ)
সর্বোপরি ধর্মীয় ছোট কোন বিষয়ে বিতর্ক ও গালিবাজদের সবসময় এড়িয়ে চলাই ভালো।
আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে তাদের কণ্ঠ নিচু রাখে তারাই সেসব লোক আল্লাহ যাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।” (সূরা হুজুরাত : ৩)
এখন সোশ্যাল মিডিয়া সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করায় এই মাধ্যমকে একটি চক্র অপব্যবহার করে, নানা অপরাধ সংঘটিত করছে। তাই এ মাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার করা আজ সময়ের দাবি। এই মাধ্যমকে ভালো কাজে ব্যবহার করে সত্য ও সুন্দরের পক্ষে জনমত গঠন করার লক্ষ্যে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন মিডিয়াকর্মীর ভূমিকা পালন করে সমাজের সকল অবিচার অনাচারকে রুখে দিতে পারি। আসুন সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই- “সত্যই আমাদের পুঁজি, সত্যই আমাদের যুক্তি।”
লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply