স্বাধীনতার একক সুফলভোগীদের অপরাজনীতি -আশীষ মাহমুদ

৫৬ হাজার বর্গমাইলের সুজলা সুফলা অপরূপ প্রকৃতির পবিত্র ভূমি বাংলাদেশ। পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসন রুখে দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের স্বাধীনতা। মুক্তিকামী জনতা নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়দীপ্ত স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশকে বিশে^র দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ছিল বদ্ধপরিকর। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা, চিন্তার ঐক্য ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সে সময় খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু না! সেই রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে নেমে গেল আরো এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংস্কৃতি। ক্ষমতার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে তারা নেমে পড়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, অস্ত্রের লড়াই, গুম এবং হত্যার মত জঘন্য অপরাধে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই অপকর্মে হাতিয়ার হয়ে ওঠে বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া একদল মেধাবী ছাত্র। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এদেশের ছাত্রসংগঠনগুলোর আহবানে বিশ^বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। অসংখ্য মেধাবী ছাত্র দেশের জন্য জীবন দিয়েছে তবুও তারা দেশ স্বাধীনের সংগ্রাম থেকে পিছু হটে যায়নি। বরং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের মোকাবেলা করেছে সাধারণ অস্ত্র দিয়ে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেই অস্ত্র আর সাধারণ থাকেনি। বরং সেই অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে লেজুড়বৃত্তি ছাত্ররাজনীতি ও জাতির অকল্যাণে। রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে মেধাবী ছাত্ররা তাদের ছাত্রত্বসুলভ মনোভাব হারিয়ে ফেলে। ফলশ্রুতিতে জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক বাবা-মায়ের অতি আদরের সন্তান নিজেকে দেশের জন্য না বরং রাজনৈতিক নেতাদের মনোবাঞ্ছনা পূরণ করতে নিজেকে পরিণত করে ভয়ানক সন্ত্রাসীতে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া ছাত্রসংগঠন। স্বাধীনতাযুদ্ধে যাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশকে দেখিয়েছিল আশার আলো কিন্তু স্বাধীনতার পরে তারাই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। মূলত অসৎ রাজনীতিবিদের মনোবাসনা পূর্ণ এবং আদর্শহীনতা তাদের পদচ্যুতির মূল কারণ। ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলাদেশে এক দানব বাহিনীতে পরিণত হয়। নষ্ট রাজনীতির সুযোগে তারা জড়িয়ে পড়ে পরীক্ষায় নকল হতে শুরু করে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্ষণ, নিজ দলের কর্মীর পাশাপাশি অন্য মতাদর্শে বিশ^াসী রাজনৈতিক কর্মীদের গুম, খুনসহ নানা অপরাধে। সেই সময় এমন কোনো দিন ছিল না যেদিন পত্রিকার পাতায় ছাত্রলীগের অপকর্মের সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। সেই থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অপকর্মের শুরু। কালের পরিক্রমায় ছাত্রলীগের অপরাধের ডায়েরিতে যোগ হয়েছে ভর্তি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ, ক্যাম্পাসসহ দেশের সর্বত্র ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে একের পর এক ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের। বিশেষত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ হয়েছে লাগামবিহীন ঘোড়া। নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে মারামারি অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ক্যাম্পাসগুলো পরিণত হয়েছে মিনি ক্যান্টনমেন্টে। তাদের হাতে হয়েছে একের পর এক মেধাবী খুন হয়েছে। বন্ধ হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বারবার। এতে করে দেশের অগণিত ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাজীবন আজ প্রায় অনিশ্চিত। বিগত এক যুগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছাত্রলীগ এখন আর কোনো ছাত্রসংগঠনের নাম নয় বরং একটা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম। একটা আতঙ্কের নাম।

ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক নৃশংসতা ও অপকর্ম
একের পর এক ধর্ষণ : ছাত্রলীগের কাছে ধর্ষণ এখন মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ এ স্বামীর সাথে বেড়াতে যাওয়া এক গৃহবধূকে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের চত্বর হতে ধরে নিয়ে গণধর্ষণ করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। সারাদেশ যখন এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছে ঠিক সেই সময় আবারো পরপর দুটি ধর্ষণে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ। সেই সিলেটে আরেক ছাত্রলীগ নেতা গত ২৯ সেপ্টেম্বর এক কিশোরীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের একজন সহ-সভাপতি ধর্ষণ করেন এক তরুণীকে। এ ছাড়াও গত ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর ভোলা সদর মডেল থানায় ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন এক তরুণী। ৪ সেপ্টেম্বর ভোলার মনপুরা থানায় মনপুরা সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন এক স্কুলশিক্ষিকা। ১০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করেন এক নারী। গত ২০ আগস্ট স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘ চার বছর ধরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা কলারোয়া উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের নামে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ এ বরিশালের বিমানবন্দর থানায় জেলা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের বিরুদ্ধে নথুল্লাবাদ এলাকা থেকে এক কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে অন্তঃসত্ত্বা এক স্কুলছাত্রী। ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয় কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে। ৮ নভেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হয়। এমনকি নিজ দলের নেত্রীদের ছাড়েনি ছাত্রলীগ! গত ৮ অক্টোবর ২০১৯ এ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে স্থানীয় যুব মহিলা লীগের নেত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ঢাকার সরকারি বাঙলা কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেন কলেজ ছাত্রলীগের এক নেত্রী। পরবর্তীতে সভাপতি তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে বিচার দিয়ে কোন সুরাহা না হলে সেই ছাত্রলীগ নেত্রী আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে এই মামলায় ছাত্রলীগ সভাপতিকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর বেলকুচি থানায় জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির বিরুদ্ধে স্কুল শাখার নেত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তো ধর্ষণের মহোৎসবে মেতে ছিলেন। প্রতি রাতে বাসর সাজিয়ে একের পর এক নারীকে ধর্ষণ করে গেছেন। অবশেষে শততম ধর্ষণ উপলক্ষে ককটেল পার্টির আয়োজন করলে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা জন্ম নেয়। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে। ২০০০ সালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত হয় এক নারী। ছাত্রলীগের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অসংখ্য নারী ও শিশু যার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। এত এত ধর্ষণের মাঝে অল্পকিছু খবরের কাগজে প্রকাশিত কিংবা মামলা হয়েছে। আর অধিকাংশই গোপনে থেকে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই অল্পকিছু মামলাও শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখ দেখেনি।

ধারাবাহিকভাবে মেধাবীদের হত্যা : শিক্ষার পবিত্র ভূমি ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের হাতে সবচেয়ে বেশি মেধাবী তাজাপ্রাণ ঝরে পড়েছে। প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ ঘটনার প্রেক্ষিতে হত্যা তো নিয়মিত ঘটনা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর থেকে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিপক্ষের কর্মীদের হত্যার উৎসবে নামে ছাত্রলীগ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় এই এক যুগে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে প্রায় ৬০ জন এবং একই সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের অন্তত আরো ২৫ জন। ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রলীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আসাদ (রাজীব)কে হত্যা করে লাশ বহুতল ভবন থেকে ফেলে এই নারকীয় বাহিনীর হত্যাকাণ্ড শুরু। ওই বছরে ১৩ মার্চ ছাত্রলীগের হামলায় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী নিহত হন। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে সিট দখল কে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন মেধাবী ছাত্র আবু বকর। এই ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। একই বছরের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রলীগের হাতে নিহত হন শিবিরের শাহ আমানত হলের সাধারণ সম্পাদক মামুন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে পুনরায় ছাত্রলীগের হাতে নিহত হন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রশিবির কর্মী মহিউদ্দীন কায়সার। তাকে ষোল শহর রেলস্টেশনে ছাত্রলীগ কর্মীরা কুপিয়ে হত্যা করে। একই বছরের ২৮ মার্চ রাতে শাটল ট্রেনে চট্টগ্রাম শহর হতে বিশ^বিদ্যালয় ফেরার পথে বিশ^বিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র ও শিবিরকর্মী হারুন অর রশীদকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। একই বছরের ১৫ এপ্রিল নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান। একই বছরের ১৫ আগস্ট শোক দিবসের টোকেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে মারধর করে বহুতল ভবন থেকে ছুড়ে ফেলে হত্যা করে।

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির দিনে দিন দুপুরে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে শিবির সন্দেহে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে দর্জি দোকানি বিশ^জিৎ দাসকে কুপিয়ে হত্যা করেন জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যা বছরের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে একই বছরে ১৫ জুলাই রাতে পদ্মা সেতুর চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে দুই গ্রুপের মধ্যকার গোলাগুলির ঘটনায় বলি হতে হয় ছাত্রলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেলকে। একই বছরের ৮ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের এক গ্রুপের কর্মীরা কুপিয়ে হত্যা করে অপর গ্রুপের কর্মী ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়েরকে। ওই বছরের ৯ জুন এক গ্রুপের ছুরিকাঘাতে নিহত হন হাজী দানেশ বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফাহিম মাহফুজ বিপুল। ১২ মার্চ ২০১২ তে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী সজীব। ২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলির বলি হন ১০ বছরের শিশু রাব্বি। ক্যাম্পাসে দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আরেক বলি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী আকন্দ। তাকে নিজ কক্ষে গুলি করে হত্যা করে অপর গ্রুপের কর্মীরা। একই বছরের ৩১ মার্চ নিজ দলের নেতাকর্মীর হাতেই প্রাণ হারান বাকৃবির আশরাফুল হক হলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র সায়াদ ইবনে মায়াজ। একই বছরের ১৪ জুলাই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রকাশ্যে খুন হন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাইমুল ইসলাম রিয়াদ। ২০ নভেম্বর শাহাজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ কর্মী ও সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সুমন দাস। ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে নিহত হন সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্র তাপস সরকার।

২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল বিশ^বিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারান হাবিপ্রবির বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জাকারিয়া ও কৃষি বিভাগের ছাত্র মাহমুদুল হাসান মিল্টন। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর টেন্ডার বাণিজ্যের চেককে কেন্দ্র করে নিজ ভাড়া বাসায় খুন হন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ও চবির ছাত্র দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ছিলেন বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ও সহকারী প্রক্টরসহ ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মী। তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সংঘটিত করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের হায়েনারা। ভারতের সঙ্গে একতরফা চুক্তির প্রতিবাদে আবরার ফাহাদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এই সামান্য কারণে বাবা মায়ের আদরের সন্তানকে ছাত্রলীগের কর্মীরা নির্মম প্রহারের মাধ্যমে হত্যা করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় গত ১০ বছরে ছাত্রলীগের হাতে শুধুমাত্র বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২৪ জন মেধাবীকে জীবন দিতে হয়েছে। এই ২৪ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ৮ জন, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে ৫ জন, ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে ২ জন, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে ২ জন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ১ জন, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে ৩ জনসহ আরো বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে আরো ৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যকার ১৭টি হত্যাকাণ্ড নিজেদের সংগঠনের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে।

ইচ্ছে হলেই মারধর ও হামলা : সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কাজে ছাত্রলীগকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বারবার হামলা করে শিক্ষার্থীদের দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে গেছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনটি। বিশেষত কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করার অহরহ অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হেলমেট ও হাতুড়ি বাহিনীর হামলা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছিল। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরেও ভিপি পদে নির্বাচন করা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নুুরুল হককে তারা পরাজিত করতে পারেনি। মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে নুরু ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। যা তাকে দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট খ্যাত ডাকসুর ভিপি পদে অধিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে ভিপি নুরুর উত্থানকে রুখে দিতে তার ওপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত দশবার প্রাণঘাতী হামলা করে ছাত্রলীগ ও তার দোসররা। রাজধানী ঢাকার সরকারি ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এই সময় ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনাও সংঘটিত করে তারা। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে গেলে ছাত্রলীগের বিশ^বিদ্যালয়ের সভাপতি সঞ্জিত দাসের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা করা হয়। এই সঞ্জিত দাস ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহসভাপতি রহুল আমিনকে তুচ্ছ ঘটনার জন্য বেধড়ক মারপিট করেন। যার কোনো বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজ হতে বিএ পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর খাদিজা আক্তার নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। নার্গিসকে মৃত ভেবে পালিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীরা বদরুলকে আটক করে পুলিশে দেয়। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের এসএম হলে এহসান রফিক নামের এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এহসান নিজের ক্যালকুলেটর ফেরত চাইলে এই হামলা চালায় তারা। পরবর্তীতে এহসান নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছেড়ে চলে যান। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ওপর হামলাসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

সীমাহীন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তি জালিয়াতি ও বাণিজ্য : জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজ থেকে ৬% কমিশন দাবি করে ছাত্রলীগের শীর্ষপদ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক থেকে পদচ্যুত হতে হয় শোভন-রাব্বানীকে। তবে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভর্তি বাণিজ্য জাতির কাছে নতুন কিছু নয়। বরং ধারাবাহিকভাবে এটি হয়ে আসছে। বলা চলে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভর্তি বাণিজ্য ছাত্রলীগের এখন ঐতিহ্যের অংশ। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের এই ঘৃণ্য কাজে ছাত্রলীগ ব্যবহার করে আসছে। গত ২০১৯ সালের মে মাসের ২৮ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা টেন্ডার শিডিউল ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের অর্ধশত কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের কাজ ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতাকে পাইয়ে দিতে ইবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলিমুজ্জামানকে দফায় দফায় হুমকি দেয়া হয়েছে। নানামুখী চাপে ক্লান্ত ইবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছিনতাইয়ের মামলা হয়। ইতঃপূর্বে এই মাসুদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল।

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক গোলাম রাব্বী খানসহ তিন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেছেন বিশ^বিদ্যালয় সেকেন্ড গেটের এক দোকানি। রাজশাহীতে গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে রাজশাহী একটি কোচিং সেন্টার ভাঙচুরের মামলায় রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ। সিলেটে গত ২০ আগস্ট ২০২০-এ চাঁদাবাজির মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ইতঃপূর্বে আরেকবার সে একই অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগংগা কলেজের ছাত্রাবাসের নতুন ভবন নির্মাণে চাঁদা দাবির ঘটনায় কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি নিবির আহম্মেদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২০১৯ সালের ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মূল চত্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখের কনসার্ট। কিন্তু ১২ এপ্রিল রাতেই ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী কনসার্টের ইভেন্ট ম্যানেজারকে চাঁদা দেয়ার জন্য চাপ দেয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কনসার্টস্থলে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। হামলাকারীরা সবাই ছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। হাইকোর্ট মোড়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ভোরে বালুর ট্রাকে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতেনাতে গ্রেফতার হয় ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ শান্ত ও অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের আল আমিন। উভয়েই জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানী থানা পুলিশ চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করে বনানী থানা ছাত্রলীগ সভাপতি আনিসসহ ৩ জনকে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি করার জন্য গত ৪ জানুয়ারি ২০১৮ তে প্রথম দফায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় উপ-সম্পাদক মহিউদ্দীন রানা, একুশে হলের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জনকে বহিষ্কার করে বিশ^বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে বিশ^বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি দ্বিতীয় দফায় ৭৮ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে। যার অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মী এবং এদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বেলাল হোসেন, একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মশিউর রহমান, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক আবু জুনায়েদ সাকিব, পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক মাসুদ রানা, স্যার এ এফ রহমান হল শাখার কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক লাভলুর রহমান, বঙ্গবন্ধু হলের শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক এম ফাইজার নাঈম, ফজিলাতুন্নেসা হলের গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আফসানা নওরীন, রোকেয়া হলের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক ফাতেমা-তুজ-জোহরা, সূর্যসেন হলের উপপ্রচার সম্পাদক শাকিল ইসলাম এবং জগন্নাথ হলের সহ-সম্পাদক শাশ^ত কুমার ঘোষ। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি জালিয়াতির জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ সৌরভকে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ তে গ্রেফতার করে পুলিশ। সৌরভ ৬০ জন শিক্ষার্থীকে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য জনপ্রতি ৩ লাখ টাকা করে নিয়েছিল। ২০ অক্টোবর ২০১৭ তে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি ‘ঘ’ ইউনিটের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা চলাকালীন সময় ডিজিটাল জালিয়াতের অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ ১৫ জনকে আটক করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। ১২ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩ মাসের কারাদণ্ড ও বাকি ৩ জনের বিরুদ্ধে সিআইডি শাহবাগ থানায় মামলা করে।

রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। গত ১৩ এপ্রিল ২০১৪ তে রাজধানীর কবি নজরুল কলেজ শাখা ছাত্রলীগ মেধা তালিকার বাহিরে গিয়ে একটি বিশাল অংশ ছাত্রকে ভর্তি করতে বাধ্য করে কলেজ কর্তৃপক্ষকে। একই দৃশ্য দেখা যায় ঢাকা কলেজ, বাঙলা কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজসহ দেশের অধিকাংশ কলেজসমূহে। ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর যশোর শিক্ষা বোর্ড খুলনার এমএম সিটি কলেজের মেধা তালিকার বাইরে ভর্তি হওয়া ৪৭৩ শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে। একটি জাতীয় দৈনিকের ২০১৪ সালের ১১ জুলাই প্রকাশিত অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে এসেছে একাদশে ভর্তির সময় সারাদেশে ছাত্রলীগ ব্যাপক ভর্তি বাণিজ্য করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। যার অধিকাংশ ঘটে সরকারি কলেজগুলোতে। ফলশ্রুতিতে প্রকৃত মেধাবীরা পছন্দসই কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের অন্যায় ভর্তি বাণিজ্যেরে আবদার কলেজ অধ্যক্ষ মেনে না নেয়ায় ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আজ আর কোন গৌরবের নাম নয়। বরং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যেন একটি আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি আজ ছাত্রলীগের আতঙ্কে আতঙ্কিত। আজ সার্চ ইঞ্জিন গুগুলে ‘ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড’ লিখে সন্ধান করলে কয়েক হাজার শিরোনাম ও ছবি আসে। যার অধিকাংশ ছাত্রলীগের সুনামের বদলে তার দুষ্কৃতি কর্মকাণ্ড তুলে ধরে। সেখানে থাকে ছাত্রলীগের হাতে মেধাবী হত্যার শিরোনাম। রামদা-চাপাতি-কুড়াল দিয়ে প্রতিপক্ষকে রক্তাক্ত করার শিরোনাম। হাতুড়ি-রড-লাঠি দিয়ে পেটানোর শিরোনাম। স্কুলছাত্রদের পেটানো হেলমেট বাহিনীর শিরোনাম। বহুতল ভবন থেকে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীকে ফেলে দেওয়ার শিরোনাম। বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহযোদ্ধাকে মেরে ছয় তলা থেকে ফেলে দেওয়ার শিরোনাম। চলন্ত ট্রেন থেকে প্রতিপক্ষ সংগঠনের কর্মীকে ফেলে দিয়ে হত্যার শিরোনাম। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া কিংবা টেনে হিঁচড়ে পুকুরে ফেলে দেওয়ার শিরোনাম। পরীক্ষায় নকল করতে না দেয়ার অপরাধে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার, শিক্ষকের বুকে ধাক্কা দেওয়া, শার্টের পকেট ছিঁড়ে ফেলা, প্রতিবাদী শিক্ষককে অস্ত্রের হুমকি, নারী শিক্ষককে লাঞ্ছিত, ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের তো ভূরিভূরি শিরোনাম আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে না থেকে বরং তাদের আন্দোলন দমিয়ে দিতে অস্ত্রসহ ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনার অভাব নেই।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ছাত্রলীগ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কোথায় নেই ছাত্রলীগ? সাধারণ শিক্ষার্থী কিংবা ভিন্ন মতের ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের দমনের নামে মারধর, রক্তাক্ত এবং হত্যা করতে আজ ছাত্রলীগের হৃদয় কাঁপে না। স্কুল, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী হতে গৃহবধূ ধর্ষণ করতে তাদের বিবেক বাধা দেয় না। পিতৃতুল্য শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতে দ্বিধা লাগে না। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই করতে গিয়ে মনে হয় না এইগুলো তাদের কাজ না। মাদকের নেশায় বুঁদ থাকতে ভুলে যায় পিতা-মাতার স্বপ্নিল স্বপ্নগুলো। ক্যাম্পাসের সহপাঠীদের তুচ্ছ ঘটনায় মারধর করার সময় ভুলে যায় এরাও তাদের বন্ধু। একদল নষ্ট রাজনীতিবিদ ও আদর্শহীন লেজুড়বৃত্তি ছাত্ররাজনীতির খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিলীন হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের এত এত অপকর্ম সত্ত্বেও তাদের কোন বিচার হয়নি। বরং সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে চলছে এই জাতিবিনাশী কর্মকাণ্ড। এমতাবস্থায় দেশের সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিকরা প্রশ্ন তুলেছেন কার স্বার্থে ছাত্রলীগকে এত আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে? জাতির মেধাবী সন্তানদের রক্ষা ও একটি সুশৃঙ্খল জাতি গড়ে তুলতে তারা ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের জোর দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সন্তান হারা মা-বাবা, ধর্ষিত নারী এবং সাধারণ জনতা এখনই ছাত্রলীগের অপকর্ম রুখে দাঁড়াতে জাতিকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply