স্বাধীনতার ৫০ বছর শোষণ মুক্তির প্রত্যাশা -সালাহউদ্দিন আইউবী

মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুললিত আজান। কবুতরের বাকবাকুম ডাক, পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ, মোরগের ঘুমভাঙানো গান জানান দেয় প্রচ্ছন্ন সকালের। লাল সূর্য উদিত হওয়ার মাঝেই পরিলক্ষিত হয় নব-দিগন্ত। এভাবেই স্বাধীনতাকে উপভোগ করে পৃথিবীর সৃষ্টিকুল। স্বাধীনতার সংজ্ঞায়ন নিয়ে লেখালেখির অন্ত নেই, তবে আমার কাছে স্বাধীনতা হলো- যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তাকে মন খুলে ডাকতে পারা। মনের কথাগুলো মুক্ত আকাশের সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলতে পারা।

মুক্তমনে মায়ের ভাষায় অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা কামনা করে ১৯৫২ সালে রাস্তায় নামে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের হাজারো ছাত্র-জনতা। রফিক, সালাম, বরকত জীবন দিয়ে প্রমাণ করে এই স্বাধীনতার জন্য তারা কতটুকু পাগলপারা ছিলেন। কথা বলার স্বাধীনতাকামী এই ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়েই সূচিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত। রক্তাক্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় নতুন এক সোনালি অধ্যায়। ধরা দেয় প্রত্যাশিত স্বাধীনতা নামক সেই সোনার মুকুট। নির্যাতিত-নিপীড়িত অত্যাচারিত আর অধিকারবঞ্চিত মানবতা স্বপ্ন বুনতে থাকে নতুন এক বাংলাদেশের। বুক ফুলিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারা, হারানো অধিকার ফিরে পাওয়া, নিষ্পেষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তি আর সোনালি এক ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষায় দিন গুনতে থাকে বঞ্চিত জনপদের জনগণ। তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে থাকে। কবে আসবে সেই সুদিন? বাড়তে থাকে অপেক্ষার প্রহর। ফিকে হতে থাকে স্বপ্ন। সার্বজনীন স্বাধীনতা সংগ্রামের সুফল ভোগ করতে থাকে গুটিকয়েক দালাল। শাসন আর শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে রক্তাক্ত জনপদ। অর্থহীন হয়ে যেতে থাকে লাখো জনগোষ্ঠীর পবিত্র রক্ত। সমগ্র জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে ভাগ্যের পরিবর্তন হতে থাকে শুধুমাত্র হাতেগোনা একটি বিশেষ মহলের। রক্তে কেনা স্বাধীনতা বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায় সেই চক্রটি। নতুন এক মায়াজাল আর চক্রে আটকে যায় কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য। অধিকার ফিরে পাওয়ার পরিবর্তে বঞ্চিত আর নিপীড়িত হতে থাকে নতুন কায়দায়। তবুও এক অকৃত্রিম ভালোবাসার চাদরে আবৃত করে প্রিয় মাতৃভূমিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে দেশপ্রেমিক জনগণ। এতসব হতাশার মধ্যেও আশার সঞ্চার করার চেষ্টা করে সকলের মাঝে।

কিন্তু দিন যে ফুরাবার নয়। কিছুদিন পর পর শুধু ক্ষমতার পালাবদল হয় আর নিষ্পেষণের নতুন যন্ত্র নিয়ে হাজির হয় শাসকগোষ্ঠী। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মত নিশ্বাস বন্ধ করে চুপ করে দিন কাটাতে থাকে অসহায় দুর্বল আর ক্ষুধার্ত মানবতা। এভাবে চলতে চলতে ইতোমধ্যে পেরিয়েছে পঞ্চাশটি বছর। একটি গোষ্ঠী বিশেষ এই সময়টিকে গ্রহণ করেছে নিজেদের ভাগ্য বদলের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। কিন্তু দীর্ঘ পথ চলায় স্বাধীনতার ন্যূনতম সুফল কি পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জনগণ? কোথায় এদেশের ছাত্রসমাজের অধিকার, কোথায় কথা বলার স্বাধীনতা, কোথায় মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক অধিকার? আমার পূর্বপুরুষের বীরত্বগাথা সেই ইতিহাস কি পরিবর্তন করতে পেরেছে এই প্রিয় মাতৃভূমিকে? নাকি পাকিস্তানিদের সেই অত্যাচারের পালাবদল হয়েছে মাত্র?
সকালে সূর্য ওঠে বিকালে অস্ত যাচ্ছে, আবার সে সূর্য সকালে উদিত হচ্ছে। রাতের অন্ধকার ফুরিয়ে দিবসের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে প্রিয় মাতৃভূমি। প্রতিটি সূর্যোদয়ের আলোকরশ্মি নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এক শোষণমুক্ত জীবনের।

মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে মূল চালিকাশক্তি ছিল তৎকালীন ছাত্রসমাজ। সেই ছাত্রসমাজকে আজকেও রাস্তায় নেমে গুলি খেতে হচ্ছে, মামলার শিকার হতে হচ্ছে তার অধিকার আদায়ের জন্য। সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও করোনার কারণ দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চলছে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতির জন্য এবং নিয়মিত ক্লাস পরিচালনার আবেদন জানিয়ে রাস্তায় নামা ছাত্রদেরকে নির্বিচারে আহত করছে জনগণের টাকায় বেতন পাওয়া দলীয় পেটোয়া বাহিনী। ছাত্ররাজনীতির নামে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের হিং¯্র বিষফোঁড়া ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তরুণদের বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে নিজেদের ঝুলি ভারী করতে, আর সরকারের পক্ষে ভাঁড়ামি করতে তারা সিদ্ধহস্ত। বুয়েটের আবরার ফাহাদের মতো যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলতে চায় তাদেরকে এই ছাত্র নামক সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মম নির্যাতন করে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিসীমানায় পা রাখতেই একজন সাধারণ ছাত্রের আবাসনসহ তার মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য তাকে পড়তে হয় শাসকদলীয় ছাত্ররাজনীতির গোলকধাঁধায়। ন্যূনতম এই অধিকারের জন্য যদি নির্মম নির্যাতন, অপমান আর লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, তাহলে কোথায় গত পঞ্চাশ বছরে আমার প্রত্যাশিত স্বাধীনতা?

গত পঞ্চাশ বছরের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের অনন্য প্ল্যাটফর্ম ছাত্র সংসদগুলো। দশকের পর দশক ধরে প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের ভরাডুবি হওয়ায় বাতিল করা হয় অন্যান্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা। ছাত্রসমাজের প্রত্যাশা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্মোচিত হোক ছাত্রদের অধিকার আদায়ের এক নতুন দুয়ার। অধিকার আদায় করতে গিয়ে রক্তাক্ত হওয়া সংগ্রামী বিদ্যাপীঠের মাটি উর্বর হয়ে উঠুক আগামী প্রজন্ম ছাত্রসমাজের পদভারে।

আমি আমার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। আমার সেই ভালোবাসাকে হৃদয় দিয়ে ছাত্রসমাজের কাছে তুলে ধরার স্বাধীনতা চাই। আমি ছাত্র, আমি আমার অধিকার ফিরে পেতে চাই। জীবনের বহমান স্রােতে আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন আমার নিরন্তর। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে মানুষরূপী নরপশুদের বাধা-বিপত্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে আমার যাত্রাপথে চলার স্বাধীনতা চাই। মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ আর এভারেস্টের মতো বিশাল প্রতিবন্ধকতা রুখে দিয়ে, বাধার প্রাচীর উপড়ে ফেলে বিজয় নিশান উড়ানোর স্বাধীনতা চাই। হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া দেশ ও জাতির সম্ভাবনাময়ী আগামী প্রজন্ম তরুণদের নৈতিকতা বিকাশে ভূমিকা রাখার সুযোগ চাই। আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের বিচার করার উপযোগী স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চাই। স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সকল ছাত্রের সমান স্বাধীনতা চাই।

লেখক : সংগঠক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply