স্বাধীনতা রক্ষা আমাদের জাতীয় কর্তব্য -এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

মানুষ মাত্রই স্বাধীনতাপ্রিয়। কিন্তু কোনো স্বাধীনতাই সহজলভ্য নয়। বহু কষ্ট ও সংগ্রামের ফলে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়। স্বাধীনতা লাভ করা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের ব্যাপার। তবে স্বাধীনতা রক্ষায় অধিক সতর্ক, সচেতন এবং সৃষ্টিশীল হতে হয়।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। স্বাধীনতা অর্জন করা যেকোনো পরাধীন জাতির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কাজ। এ অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো কঠিন কাজ। স্বাধীনতা অর্জন করতে শক্তি, সাহস, সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং বহু রক্তপাতের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, শক্তিমান শাসকগোষ্ঠী পদানত জাতিকে কখনোই স্বাধীনতা দান করে না; বহু ত্যাগ ও রক্তপাতের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হয়। তবে স্বাধীনতা অর্জিত হলেই চিরস্থায়ী হয় না। তা যে কোনো সময় হরণ হতে পারে। তাই স্বাধীনতা অর্জনই মূল উদ্দেশ্য নয়। একে সমুন্নত রাখাই মুখ্য উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালে ৯ মাসের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন অস্তিত্ব লাভ করেছে। এর আগে এ অঞ্চলটি ছিল পাকিস্তানের অংশ-পূর্ব পাকিস্তান। তারও আগে (১৯৪৭ সালের আগে) এ অঞ্চলটি পূর্ববঙ্গ হিসেবে খ্যাত ছিল এবং বৃহত্তর ব্রিটিশ উপনিবেশ পাক-ভারত উপমহাদেশের অংশ ছিল। এ জন্যই বলা হয়, এ অঞ্চলটি গত আটষট্টি বছরে দু’ দুইবার স্বাধীন হয়েছে। একবার ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে, আরেকবার যুক্ত পাকিস্তানের কাঠামো থেকে। শেষোক্ত অর্জনকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয় স্বাধীনতা অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় হিসেবেও এ পর্বটিকেই বিবেচনা করা হয়।
এ বিজয় বা অর্জনের পর এরই মধ্যে পঁয়তাল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই পঁয়তাল্লিশ বছরে আমাদের স্বাধীনতার স্বরূপ ও মূল অবয়ব কতটা অক্ষুণœ আছে কিংবা স্বাধীনতার সাফল্য কতটুকু বজায় রয়েছে-তার একটি পরিমাপ করা এবং রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্বকে শঙ্কামুক্ত করতে আরও সতর্ক হওয়ার বিষয়টি নানা কারণে এখন বেশি গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের পর তার নানামাত্রিক আবেদন ও দাবি ধারণ করতে না পারলে প্রকৃত স্বাধীনতা টিকে থাকে না; বরং স্বাধীনতার নামে একটা মোড়ক শুধু অবশিষ্ট থাকে। ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রের হৃদয় ও আত্মায় পরাধীনতার সব আলামত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভূগোল ঠিক রেখেও স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব খোকলা করে দেয়া যায়। একটি রাষ্ট্রের মানচিত্রে বড় রকম আঘাত না করেও তার পানি, ভূমি, পরিবেশ, অর্থ, ব্যবসা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও চেতনায় পরাধীনতার বিষ ছড়িয়ে দেয়া যায়। বহু সূক্ষ্ম ও পরিণামদর্শী মানুষের বিবেচনায় আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে এখন সেই বিষয়টি বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে দিচ্ছে বা দেয়া হচ্ছে ভিনদেশ থেকে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। সংবিধান, নীতি-ধারা ও চর্চায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অটুটই আছে। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তার স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্বের যেসব সূচক ও উপাদান থাকে তার সবকটিই এখনো অক্ষুণœ আছে কি নাÑ এ প্রশ্নটি আজ বেশির ভাগ নাগরিকের মনে উঁকি দিচ্ছে।
স্বাধীনতা বিঘিœত ও অরক্ষিত হওয়ার প্রধান সূচক হচ্ছে মানচিত্রে আঘাত আসা। যে আঘাত আমাদের প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত আসছে। ইতোমধ্যে তাদের দ্বারা সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এবং একতরফা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটছে। আর স্বাধীনতার সুরক্ষা বাধাগ্রস্ত করে এমন একটি দিক হচ্ছে অপর দেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক নদীপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে পানি আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে বিপর্যস্ত করে তোলা। ভারত সত্তরের দশক থেকে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের নদীগুলোকে পানিশূন্য করে দিচ্ছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক আগ্রাসন, বাণিজ্য বৈষম্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও চেতনাগত আগ্রাসনেও এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে প্রতিবেশী বড় দেশটি।
উন্নয়নশীল মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর ওপর এখন বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী শক্তির কুনজরও সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এ জন্য মুসলিমবিরোধী আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও তারা উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সাম্প্রতিক চিত্র এ ক্ষেত্রে বড় রকম উদাহরণ। এসব দিক বিবেচনায় নিলে সহসাই আমাদের স্বাধীনতার নিñিদ্র নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য নিরন্তর প্রয়াসের প্রয়োজনটা সামনে চলে আসে। তাই অর্থ-বাণিজ্য, খনিজসম্পদ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, পানি ও ভূমিসহ সবক্ষেত্রেই প্রকৃত স্বাধীন একটি অবয়ব ও অস্তিত্ব ধারণ করতে না পারলে এ দেশের অর্জিত স্বাধীনতা বিপণœ হতে পারে যে কোনো সময়।
দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্যের অবক্ষয়ে ডুবে গেলে ছোট শত্রুও ‘বড় ভূমিকা’ রাখার সুযোগ পেয়ে যায়। যার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক ও ব্যাংক ডাকাতির মাধ্যমে।
ক্ষমতাহীন দলগুলো সংবিধানে এ পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী অনেক সংশোধনী এনেছে। সংবিধানের মূল চেহারা ও সংশোধিত চেহারা নিয়ে এখন বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলা অনেক তুঙ্গে। এতে করে জাতীয় ঐক্যের ভিত তো ফেটে চৌচির হচ্ছেই উল্টো অনৈক্য ও পারস্পরিক বিরাগভাজনে গোটা দেশের নাগরিক সমাজ প্রচন্ডভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। স্বাধীনতা সুরক্ষার ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতিটা মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই স্বাধীনতা অর্জন ও বিজয়ের প্রাণ অক্ষুণœ রাখতে চাইলে দেশের সব মহলের ওপর-নিচ সব পর্যায়ে সজাগ, সতর্ক, ঐক্যবদ্ধ ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
আজকাল স্বাধীনতার অর্থ বা তার স্বাদ অনেকেই নিজ ইচ্ছানুযায়ী গ্রহণ করছেন। অনেকে মনে করেন, আমার মন যা চায়, তাই আমি করবো এটাই স্বাধীনতা। আমি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তাই দেশের সব সম্পদ আমিই ভোগ করবো। আমি মুক্তিযোদ্ধা, আমার সন্তানরাই ভালো সরকারি চাকরি করবে। স্বাধীনতা মানে আমার দেশের সম্পদ অন্যরা লুটে নেবে কেন? আমিই সব লুটেপুটে খাবো। স্বাধীনতা মানে আমার যেমন ইচ্ছে তেমনই চলবো। স্বাধীনতা মানে আমার মুখ দিয়ে যা আসবে তাই বলবো, তাই করবো। স্বাধীনতা মানে যেমন খুশি তেমন করে নিজের স্বার্থ ও স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করবো। এটাই যদি হয় স্বাধীনতা তা হলে পরাধীনতা কাকে বলবো? বলতে গেলে কোন সভ্য মানুষ যার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ রয়েছে সে কখনো এ ধরনের স্বাধীনতা কামনা করতে পারে না।
বাংলাদেশের মানুষ তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করেছে যে, স্বাধীনতার নামে বাগাড়ম্বরে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয় না। জনগণকে উন্নত জীবন উপহার দিতে হলে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রয়োজন, এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বোধোদয় এখনো জাগ্রত হয়নি। মূল বিষয়ে কোনো উপলব্ধি না ঘটলে শুধুই ক্ষমতা পরিবর্তনের অর্থহীন রাজনীতিতে জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ কখনো ভোগ করতে পারবে না।
স্বাধীনতা অর্জনের বহু বছর পরও অনেকের কাছে স্বাধীনতা আজ বিস্বাদের বিষয়। সারি সারি লাশ উদ্ধার যেন এখনকার বাংলাদেশে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। লাশ পাওয়া যাচ্ছে নদী, পুকুর ও খাল-বিলে। কখনো তা অজ্ঞাত, আবার কখনো পরিচিত। এদের সবারই মৃত্যু হচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে।
যে বাংলাদেশীরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছিল। যখন দেশ স্বাধীন হলো তখন সেই ঐক্যবদ্ধ গোষ্ঠীই এক ভাষাভাষী ও এক বর্ণের হওয়ার পরও এখন বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে জিঘাংসায় মেতে উঠেছে।
স্বাধীনতার দীর্ঘপথ পেরিয়ে আসার পরও অগ্রগতির ধারা থেকে ক্রমেই যেন আমরা ছিটকে পড়ছি। দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের মানমর্যাদা ক্রমেই যেন ধোঁয়াটে হয়ে উঠছে। একটি স্থিতিশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতির পরিবর্তে আমরা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে যেন দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছি।
আমাদের মধ্যে বিরোধ, হানাহানি ও মতপার্থক্য দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আমরা সমঝোতা, উদারতা ও সহনশীলতার পথ পরিহার করে ভয়ানক অসহনশীল হয়ে উঠছি। রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও হানাহানি তারই প্রমাণ। অথচ আমাদের দেশে সাধারণ জনগণ নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়। তারা কেউ সঙ্ঘাত চায় না। সবাই শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। সবাই মিলেমিশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাস করতে চায়। রাজনীতির হীনতা ও দীনতা কারো কাম্য নয়। রাজনীতিবিদদের উদগ্র লোভ ও লিপ্সা থেকে জাতি মুক্তি চায়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তাই এ দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ভিত্তি হতে হবে ঈমান ও আমানতদারি। ঈমান, ইসলাম ও মুসলিমবিনাশী শক্তির আগ্রাসনের মুখে কোনো দেশের মুসলমানই ঈমান থেকে দূরে সরে গিয়ে বাঁচতে পারেনি। শত্রুরা তাদের রেহাই দেয়নি। এ জন্যই মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রধান অবলম্বন ঈমান। পূর্ণাঙ্গ মুমিনের জীবন ও চেতনা ধারণ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষা হবে না। নাগরিকদের আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ চেতনা গড়ে ওঠার জন্য সর্বব্যাপী ঈমানের বলে বলীয়ান শক্তির প্রয়োজন সর্বাধিক। আর প্রয়োজন আমানতদারির। বান্দার প্রতি আল্লাহর আমানত ও মানুষের প্রতি মানুষের আমানত এই দুই আমানতের যথাযথ মর্যাদা দিলে ইনশাআল্লাহ স্বাধীনতা সুরক্ষা পাবে।
স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য বেশি প্রয়োজন সংগ্রাম ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে আরো প্রয়োজন প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য ও ন্যায়বোধ। এ ছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা ও সদ্বিবেচনাকে কাজে লাগানো একান্ত অপরিহার্য। মূলত যথেষ্ট সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হয় এবং সদা সতর্ক থাকতে হয়। তাই স্বাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য মনে করা উচিত। হ
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply