স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শীতের সবজি এবং ফল -উম্মে নাজিয়াহ

আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং পুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। তাই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টির চাহিদা পরিবর্তিত হয় এবং সেই অনুযায়ী খাবার গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। শীতকাল আমাদের ঋতুবৈচিত্র্যের একটি মাস। ফসল উৎপাদনের জন্য একটি বিশেষ সময়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ ঋতুতে প্রয়োজন হয় বিশেষ কিছু খাবার এবং পুষ্টির। শীতকালে কম তাপমাত্রার আমাদের দেশে প্রচুর শাকসবজি উৎপাদিত হয়ে থাকে। নানা রঙ এবং স্বাদে বৈচিত্র্যের এসব সবজির পুষ্টিমূল্য অতুলনীয়। এ সময় আমাদের দেশের ফলের প্রাপ্যতা কম, বাজারে বিদেশী ফলের সমারোহ দেখা যায়। অনেকাংশেই এই সব ফল দীর্ঘদিন আগে বাগান থেকে উঠানো হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে থাকে প্রচুর কেমিক্যালস যা ফল সংরক্ষণ এবং পচনরোধে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলো পুষ্টি জোগানোর চেয়ে ক্ষতিকরই বেশি। দেশী ফলের মধ্যে পেঁপে, পেয়ারা, জলপাই, কামরাঙা, নারকেল, কলা, কমলা, বরই ইত্যাদি পাওয়া যায়। শীতের সময়টাতে কম তাপমাত্রা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে মানুষের ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়। শীতে রয়েছে বিশেষ কিছু রোগব্যাধি। এ সময়টাতে শরীরের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার এবং মিনারেল। টক জাতীয় ফল যেমন- কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, জলপাই, কামরাঙা, বরই, ডালিম প্রভৃতি ফলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, ফ্লেভানয়েডস, ক্যালসিয়াম (পধ), পটাসিয়াম (শ)। এতে আরো রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট যা দাঁতের এবং ত্বকের সুরক্ষা দেয়। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হার্টকে সুস্থ রাখে। এই ফল নিয়মিত খেলে ডায়াবেটিস, কলেরা, চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থেকে সুরক্ষা দেয়, পার্কিনসন রোগ এবং অ্যালজাইমার্স রোগ প্রতিরোধ করে।
শীতের দিনে বিদেশী ফল ডালিম পাওয়া যায়, রুবি বর্ণের ডালিম ফলের দানাগুলো এন্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর যা আপনার পুরো হার্ট সিস্টেমকে শক্তিশালী করবে। এক কথায় বলা যায় ডালিম আপনার হার্টের সুরক্ষার জন্যই। শীতে ফলের প্রাপ্যতা কম, সে কারণে আমাদের দেশী ফলের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হতে হবে।
শীতের সবজি আমাদের দেশে প্রচুর হয়ে থাকে। বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, পালংশাক, মুলা, মটরশুঁটি, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, আলু, বিট, ফ্রেন্সবিন, শিম, পেঁয়াজ পাতা, রসুন পাতা, ধনেপাতা, লেটুস, বেগুন, টমেটো, স্ট্রবেরি, ব্রোকলি, স্কোয়াস ইত্যাদি।
এটা কোনো গোপনীয় বিষয় নয়, সবাই এ কথা জানেন যে নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার সুন্দর স্বাস্থ্যের মূল বিষয়। প্রতিদিনের শারীরিক এবং ব্রেনের কাজের জন্য শক্তি জোগায় এই খাবার। খাবার যথাযথ না হলে মানুষ তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, অসুস্থ হয়ে যায়। সঠিকভাবে খাদ্য রান্না করা এবং খাবার নিয়মও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শীতের এই নানা রকম সবজি আমাদের পুষ্টির অত্যন্ত মূল্যবান উৎস। কম কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ সবজি যেমনÑ বাঁধাকপি, লেটুস, ব্রোকলি, রসুন, পেঁয়াজ পাতা এবং টকজাতীয় ফলমূল মুখগহ্বর, গলা এবং গলবিলের ফুসফুস, পাকস্থলীর ক্যান্সারের আশঙ্কা কমিয়ে দেয়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় গবেষকগণ দেখেছেন, যেসব লোক সবজি, ফলমূল এবং পাতাজাতীয় সবজি বেশি খায় তাদের হার্ট ভালো থাকে এবং ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কম। যারা দুর্বল, অপুষ্টিতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নিম্নরক্তচাপের মানুষের জন্য খুবই উপকারী আলুতে রয়েছে প্রচুর এন্টি অক্সিডেন্ট। এই শীতে বেশি করে আলু খেয়ে আমরা ভাতের চাহিদা কমাতে পারি। আলুর রুটি, আলুর পরটা, আলুর খিচুরি আমাদের দেশের অগণিত অপুষ্ট শিশুর জন্য আদর্শ খাবার। এ মৌসুমে দামে সস্তা আলুর বহুল ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তার একটি উৎস। মিষ্টি আলুতে রয়েছে বি- ক্যারোটিন। ইদানীং আমাদের দেশে থাইল্যান্ডের হলুদ এবং কমলা রংয়ের মিষ্টি আলুর চাষ হচ্ছে, যা উচ্চ মাত্রার বি-ক্যারোটিনে সমৃদ্ধ।
মুলা, বিট সবজির মধ্যে প্রচুর এলানিন এবং ফাইবার রয়েছে। এই সবজিতে আরো রয়েছে প্রচুর পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং এন্টি অক্সিডেন্ট। এ ছাড়া শাকের মধ্যে লালশাক, লাউশাক, পালংশাক, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, মুলাশাক, সরিষা শাক অত্যন্ত পুষ্টিকর। লাউশাকে রয়েছে প্রোটিন, ফ্যাট, ফাইবার, অলিয়েট, নিয়াসিন, প্যানথেটিক এসিড, পাইরোওফ্রিন, রিবোফ্ল্যাবিন, থায়ামিন, ভিটামিন অ, ঈ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, সেলেনিয়াম এবং জিংক। লাউয়ের চেয়ে লাউয়ের ডগা, খোসা বেশি পুষ্টিকর।
এ সময়ের সবজিগুলোর মধ্যে অন্যতম মিষ্টি কুমড়া। মিষ্টি কুমড়া এবং কুমড়ার বীজ অত্যন্ত পুষ্টিকর। এতে রয়েছে প্রোটিন, ফলিয়েট, নিয়াসিন, প্যানথেটিক এসিড, পাইরিডক্সিন, রিবোফ্ল্যাবিন, থায়ামিন, ভিটামিন অ, ঈ, ঊ, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, জিঙ্ক, সেলিনিয়াম, বিটা-ক্যারোটিন ক্রিপটোজ্যান্থথিন, লুটেইন অত্যন্ত পুষ্টিকর এই সবজিটি চোখের সুরক্ষা দেয়, অপুষ্টি দূর করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
পালংশাকে রয়েছে প্রোটিন, ফলিয়েট, থায়ামিন , সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, জিঙ্ক, সেলিনিয়াম, জিংক, প্যানথেটিক এসিড, পাইরিডক্সিন, রিবোফ্ল্যাবিন। পালংশাককে ব্রেন ফুড বলা হয়।
শীতে শুষ্কতা সুরক্ষার জন্য প্রচুর পানি পান করা উচিত। জাউভাত, স্যুপ, খাওয়া উচিত। বৃদ্ধদের শীতের একটি উপকারী খাবার সালাদ, লেটুস, ধনেপাতা, টমেটো, শসা, পেঁয়াজ পাতা, রসুন পাতা, পুদিনা পাতা, আমড়া, পেয়ারা, পেঁপে, মটরশুঁটি, কাঁচা মুলা একসঙ্গে সালাদ হিসেবে খাওয়া উপকারী। এতে শরীরের ভিটামিনের ঘাটতি পূরণসহ ত্বকের সুরক্ষা হয়।
শীতে বাড়ন্ত শিশু, কিশোরদের জন্য ঘরে তৈরি দই, পনির বাদাম, ঘি, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, মধু, কলে ভাঙানো গমের আটা, নারকেল, যব, তিল, ঘি, সামুদ্রিক মাছ, শিম, ভুট্টা, মাশরুম, কলিজা খাওয়া উচিত।
পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে বছরব্যাপী। প্রত্যেক মৌসুমের বিশেষ কিছু ফল এবং সবজি রয়েছে, যেগুলো ঐ সময়ে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এবং বছরের অন্য সময় পাওয়া যায় না। সে কারণে শীতকালে কম তাপমাত্রায় উৎপাদিত ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল এবং সবজি নিয়মিত খাওয়া উচিত, তবে খাবার হতে হবে অতিরিক্ত কীটনাশক এবং রাসায়নিক সারমুক্ত।

SHARE