স্মৃতিতে বিরাশি সালের এগারোই মার্চ -অধ্যাপক মো: তাসনীম আলম

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইতিহাসে যে কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ মার্চের হত্যাকান্ড তার মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীতে অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে আরো অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেকে শাহাদাত বরণ করেছেন। কিন্তু ’৮২ সালের ১১ মার্চের ঘটনা ছিল শিবিরের ইতিহাসে প্রথম শাহাদাতের ঘটনা। তাই এ ঘটনাটি একদিকে যেমন শিবিরকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়, অন্য দিকে ইসলামবিরোধী শক্তির পৈশাচিকতা ও  বর্বরতার সাক্ষ্য দেয়।
আজ থেকে প্রায় ২৯ বছর আগের ঘটনা। স্বাভাবিকভাবে সব কিছু মনে থাকার কথা নয়। তবে স্মৃতিতে যতটুকু আছে তারই ভিত্তিতে লেখার দুঃসাহস করছি। ঐ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সভাপতি ছিলেন সিরাজুল ইসলাম ভাই। বর্তমানে খুব সম্ভব খুলনায় বসবাস করেন। আর আমি ছিলাম রাজশাহী শহরের সভাপতি। তখন রাজশাহী মেট্রোপলিটন শহর ছিল না। ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবির প্রশাসনিক ভবনের পশ্চিম চত্বরে এক নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চাকসুর তদানীন্তন ভিপি, শিবিরের কার্যকরী পরিষদের সদস্য জনাব জসিম উদ্দিন সরকার। কিন্তু জসিম ভাই বিশেষ কারণে আসতে পারছেন না জেনে আমরা অনেকটা হতাশ হলাম। বিষয়টি নিয়ে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি এনামুল হক মঞ্জু ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়। শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হয় ১০ মার্চ পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের নবীনবরণে তদানীন্তন সেক্রেটারি জেনারেল সাইফুল আলম খান মিলন ভাই যাবেন। সেখান থেকে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণে যোগদান করবেন এবং প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। ১০ তারিখ ’৮২ জনাব মিলন ভাইকে আনার জন্য আমি পাবনা যাই এবং এডওয়ার্ড কলেজের প্রোগ্রাম শেষে সন্ধ্যার দিকে (খুব সম্ভব) মিলন ভাইকে নিয়ে রাজশাহী শহরে পৌঁছি। এখনকার মত নিজস্ব কোনো গাড়ি ছিল না। বাসে চড়েই আমরা দু’জন রাজশাহী পৌঁছলাম। সে বাসও এখনকার মতো উন্নত নয়, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা।
মিলন ভাইকে রাজশাহী শহরের সেক্রেটারি ডা: জাহাঙ্গীর ভাইয়ের বাসায় (তখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলেন) রেখে আমি হাতেম খাঁস্থ অফিসে এলাম। এসে দেখি রাজশাহী কলেজের ছাত্র (১১ মার্চ শহীদ হন) আইয়ুব ভাই লাল কালি দিয়ে সাদা কাগজের ওপর পোস্টার লিখছেন। আইয়ুব ভাইয়ের হাতের লেখা বেশ ভালো ছিল এবং ভালো পোস্টার লিখতে পারতেন। এখনকার কর্মীদের জানা দরকার ঐ সময় আমরা অধিকাংশ পোস্টার হাতে লিখতাম, পোস্টার কমই ছাপানো হতো। তা ছাড়া আর্থিক সঙ্কটও ছিল। অফিস থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জোহা হলে গেলাম। সেখানে দায়িত্বশীলদের বৈঠক চলছে। বৈঠকে হাজির হয়ে জানতে পারলাম পরিস্থিতি খুব উত্তপ্ত। আগামীকাল প্রোগ্রামে আক্রমণ হতে পারে।
ইতোমধ্যেই নবীনবরণের হ্যান্ডবিল বিলি করতে গিয়ে ১০ মার্চ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রীসহ বাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ছাত্রসংগঠনের সাথে হাতাহাতি হয়েছে। আমরা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিলাম যেকোনো মূল্যে প্রোগ্রাম করতে হবে। প্রোগ্রাম বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। পরদিন সকাল ১০টায় নবীনবরণ অনুষ্ঠান। পরিস্থিতির কারণে আমরা আমাদের কর্মীদেরকে কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে একত্রিত হতে বললাম। উদ্দেশ্য ওখান থেকে আমরা একত্রে অনুষ্ঠানে যাবো। সকাল ১০টার আগেই ফেস্টুনসহকারে আমাদের ভাইয়েরা জড়ো হতে থাকলো। অপর দিকে সামান্য দূরে শহীদ মিনারে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা গেল। তাদের হাতে লাঠি ও অস্ত্রশস্ত্র দেখা যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করলো। আমাদের ভাইয়েরাও সাধ্যমতো প্রতিরোধ করা শুরু করলো। একপর্যায়ে তারা পিছু হটলে আমরা প্রোগ্রামস্থলে হাজির হলাম এবং প্রোগ্রাম শুরু করার চেষ্টা করলাম। ইতোমধ্যে তারা আরো সংগঠিত হয়ে আমাদের ওপর চারিদিক থেকে ইট, পাটকেল ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু করলো। শহর থেকে তারা অছাত্র গুন্ডাবাহিনী নিয়ে এসেছে। তারাও একযোগে আক্রমণ করলো। আমাদের কর্মীরা একের পর এক আহত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ ডাকা হচ্ছে না। শহর থেকে আমাদের ভাইদের কেউ কেউ ভাইস চ্যান্সেলরকে অনুরোধ করেন পুলিশ ডাকার জন্য কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি। আমাদের শুভাকাক্সক্ষী শিক্ষকরাও ভাইস চ্যান্সেলরকে অনুরোধ করেন পুলিশ ডাকার জন্য। কিন্তু এত অনুরোধ আর শিবিরকর্মীদের রক্ত ভাইস চ্যান্সেলরের মন গলাতে পারেনি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যাপক আক্রমণের মুখে আমাদের ভাইয়েরা পিছু হটে এক গ্রুপ মেইন গেট দিয়ে পার্শ্ববর্তী বিনোদপুর এলাকায় আশ্রয় নেয় আর এক গ্রুপ বিএনসিসির চত্বরে ঢুকে পড়ে। এখানেই নরপিশাচরা নিরীহ শিবিরকর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। এখানেই সাব্বিরের বুকে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে হত্যা করে। আ: হামিদের মাথা একটি ইটের ওপর রেখে অন্য ইট দিয়ে থেঁতলে দেয়। এ ঘটনায় আইয়ুব ভাইও শাহাদাতবরণ করেন। অর্ধশতাধিক ভাই মারাত্মকভাবে আহত হন। এর মধ্যে পরবর্তীতে আ: জাব্বার ভাই শাহাদাতবরণ করেন। গুরুতর আহত জয়পুরহাটের ছেলে মামুন ভাইয়ের মাথা ও শরীরে দুর্বৃত্তরা এমনভাবেই আঘাত করে যে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ঢাকা থেকে জামায়াত নেতৃবৃন্দ সরকারের সাথে যোগাযোগ করে বহু কষ্টে একটি হেলিকপ্টার জোগাড় করেন এবং সেই হেলিকপ্টারে করে মামুনকে ঢাকায় আনা হয়। মামুন ভাইয়ের ১৫ দিন পর্যন্ত কোনো জ্ঞান ছিল না এবং কোন কিছু স্মরণ করতে পারতেন না। বর্তমানে তিনি সুস্থ রয়েছেন এবং চাকরি করছেন।
মিলন ভাই প্রোগ্রামের উদ্দেশে শহর থেকে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১০টার আগেই সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারেননি। তিনি শহর অফিসে চলে আসেন। আমরাও বিনোদপুর থেকে বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে শহর অফিসে এসে জড়ো হই। শিবিরকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তারা রুম ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
ঘটনা এতই ভয়াবহ ছিল যে, আমাদের অনেক দায়িত্বশীল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কিন্তু সেক্রেটারি জেনারেল মিলন ভাই ও জামায়াত নেতৃবৃন্দের সান্ত¡নামূলক বক্তব্য শুনে আবার সবাই যার যার কর্তব্য কাজে লেগে যাই। শহীদদের জানাজা শেষে তাদের বাড়িতে পাঠানো, আহতদের সুচিকিৎসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করাসহ নানাবিধ কাজ ভাগ করে নিয়ে করার চেষ্টা করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রাম থাকলেও প্রধান অতিথি সেক্রেটারি জেনারেল থাকায় ঐ প্রোগ্রামে যোগদানের জন্য শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল। কিন্তু নরঘাতকরা কাউকে ছাড়েনি। তাদের অস্ত্রের আঘাতে অনেকেই আহত ও পঙ্গু হয়ে যায়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রীসহ বাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অনুসারী) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত শিবিরকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। শুধু তাই নয়, অনেকের ছাত্রজীবন নষ্ট হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে ক্লাস করতে গিয়ে মার খেতে হয়েছে। শিবির সন্দেহ হলেই তার ওপর আক্রমণ চালাত এসব দুর্বৃত্ত। ১১ মার্চের ঘটনার সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অথচ প্রশাসন চিহ্নিত খুনিদের গ্রেফতার করে শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে জেনারেল এরশাদ (এরশাদ তখন ক্ষমতায়) খুনিদের মাফ করে দেন। উল্লেখ্য, সামরিক আদালতে খুনিদের কিছু সাজা হয়েছিল।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা শ্লোগান দেয় ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না।’ সত্যিই ১১ মার্চের শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারের সবুজ চত্বরে প্রতি ফোঁটা রক্তের প্রতিদান আল্লাহপাক দিয়েছেন। ১১ মার্চের পর শিবিরকর্মীদের অনেক ত্যাগ ও কোরবানি পেশ করতে হয়েছে কিন্তু শিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত শিবিরের কর্মকান্ড ছড়িয়ে পড়ে। ওরা চেয়েছিল খুন করে শিবিরকর্মীদের দাবিয়ে দিতে কিন্তু ওরা ব্যর্থ হয়েছে। শিবিরের সংগঠন অনেক বিস্তৃতি লাভ করেছে। ওদের গুলি, বোমা আমাদের ভাইদের গতিকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি বরং আরো বেগবান হয়েছে। তাই কুরআনের চিরন্তন সেই বাণীর কথা স্মরণ করতে হয়- “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না, তারা জীবিত কিন্তু তোমরা বুঝতে পার না।”

SHARE

Leave a Reply