স্মৃতিতে শহীদ রবিউল

মো: রেজাউল করিম

শহীদ রবিউল ইসলাম

পিতা : মরহুম মোসলেম উদ্দীন মিয়া
সাংগঠনিক মান : সদস্য প্রার্থী
সর্বশেষ পড়াশোনা : এমএসসি শেষ বর্ষ পরীক্ষার্থী, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ।
জীবনের লক্ষ্য : অধ্যাপনা
শহীদ হওয়ান স্থান : রাবি, জোহা হলের সামনে।
আঘাতের ধরন : থ্রি নট থ্রি গুলি
কাদের আঘাতে শহীদ : ছাত্রদলের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য
শহীদ হওয়ার তারিখ : ৬ ফেব্রুয়ারি ’৯৩
শহীদ নং : ৫৫
স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম : ছোট নিজামপুর, ডাক : লক্ষণপুর, থানা : শার্শা, জেলা : যশোর
ভাই-বোন : ৬ জন
ভাই-বোনদের মাঝে অবস্থান : তৃতীয়
পরিবারের মোট সদস্য : ৮ জন
শহীদ হওয়ার পূর্বে স্মরণীয় বাণী : শাহাদাতের ২ দিন পূর্বে মাকে লিখেন ‘আমি শহীদ হলে তুমি কেঁদো না মা, তোমার সাথে আমার দেখা হবে জান্নাতের সিঁড়িতে।
শাহাদাতের পর শহীদের মায়ের প্রতিক্রিয়া : ‘তোরা কে কোথায় আছিস বেরিয়ে আয়। আমার রবিউল আর এ পৃথিবীতে নেই।’ এরপর তিনি জ্ঞান হারান।

১৯৭১ সালে পাক সেনাদের গোলাগুলিতে আব্বা মারা যাওয়ার পর রবিউল চাচাদের তত্ত্বাবধানে রাজশাহীর উপশহর স্যাটেলাইট টাউন স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে লেখাপড়া শুরু করে। তারপর নিজামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (শার্শা, যশোর) দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয় এবং এখান থেকেই তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু। তার মেধাশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। বুরজবাগান বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় শার্শা যশোর থেকে ১৯৮২ সালে বিজ্ঞান গ্রুপে তিন বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। রেজাউল, রবিউল ও রফিকুল আমরা তিন ভাই একই সাথে এক সাইকেলে এবং বর্ষার সময় চার মাইল রাস্তা হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করেছি।
তিন ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে তীক্ষèবুদ্ধিসম্পন্ন। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি ক্লাসে তার ফলাফল প্রথম অথবা দ্বিতীয় হতো। তিন ভাইয়ের মধ্যে তার ফলাফল ভালো বিধায় মা সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে ভালো কলেজে লেখাপড়া করাবেন। এ জন্য প্রথমে কলেজে ভর্তির জন্য ঢাকায় যায়, খরচ খুব বেশি বিধায় বাড়ি চলে আসে এবং শহীদ মশিউর রহমান ডিগ্রি কলেজ, ঝিকরগাছা, যশোরে ভর্তি হয়। মাস তিনেক কলেজ করার পর চাচাদের নিয়ন্ত্রণে রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে স্থানান্তরিত হয়ে সেখানে লেখাপড়া করে আর উপশহরে চাচাদের বাসায় থাকে। এই কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে দুই বিষয়ে লেটার মার্কসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। মায়ের স্বপ্নসাধ তার এই ছেলে ডাক্তারি অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। কিন্তু সেই বছর তার আশা পূরণ হলো না। তাই মনের দুঃখে পূর্ব বাসাবো, ঢাকায় এক ভদ্রলোকের বাসায় লজিং হিসেবে থাকে। এখান থেকেই সে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করে এবং ১৯৮৬ সালে আবার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর আমার অনুরোধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয়। আমরা তিন ভাই একই বাসায় একই রুমে অবস্থান করে রাজশাহীর হাজারা পুকুর নিউ কলোনিতে থেকে লেখাপড়া করতাম।
প্রথমে সে ছাত্রলীগ করতো। পরে ছাত্রশিবিরের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তার চরিত্র ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও পবিত্র। আমার জানা মতে আমি কখনো তার চরিত্রে এতটুকু ত্রুটি খুঁজে পাইনি। সর্বদা কুরআন-হাদিসের আলোকে, কথাবার্তা বলার চেষ্টা করতো। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) বিধিবিধান মেনে চলার জন্য মানুষকে তাগিদ দিতো। সে খুবই সদালাপী ও স্পষ্টভাষী ছিল। অন্যের সমস্যা সমাধানে সহযোগী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতো। সর্বোপরি মা, ভাই-বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা, মায়ামমতা তার মধ্যে ছিল বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রতি শুক্রবার রোজা রাখতো। পায়খানা-প্রস্রাবের পরপরই ওজু করে পাক পবিত্র থাকতো।
মানুষের সমস্যা দেখলে সে স্থির থাকতে পারতো না। তাই আমি দেখেছি যখনই কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিতো সেখানে সে এগিয়ে যেত। যেমন বন্যার সময় অসহায় মানুষের জন্য খাদ্য ও বস্ত্র সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে বিতরণ, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখতো। গরিব, দুঃখী এবং অসহায় মানুষ কখনই বাসায় এলে খালি হাতে ফিরে যেতো না। হাদিস-কুরআন পড়া এবং সুযোগ পেলেই তা অন্যকে তরজমা করে বুঝানো তার একটা অভ্যাস ছিল। তার দৈনন্দিন কাজকর্ম ছিল সম্পূর্ণ রুটিনমাফিক। পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আমি তাকে সব সময় দেখেছি। প্রতি শক্রবার শহীদ সাব্বির অঞ্চলের ছেলেদের নিয়ে আমাদের বাসায় কুরআন শিক্ষার অনুষ্ঠান করতো। সে তখন সাব্বির অঞ্চলের কুরআন শিক্ষার আসরের দায়িত্বে ছিল।
রাজনৈতিক জীবনে তাকে বহুবার নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার জানা মতে একবার রমজান মাসে ছাত্রঐক্য পরিষদের সাথে শিবিরের দ্বন্দ্বে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সমস্ত হল বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু শহীদ রবিউল ইসলামকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশেষে তার সংগঠনের ভাইয়েরা শেরেবাংলা হলের এক রুমে তাকে তালাবদ্ধ অবস্থায় পায়। তিন দিন না খেয়ে রোজা রেখেছে সেখানে। তারপর ১৯৯২ সালের দিকে তিন মাস রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ৮৬ জনের সাথে একত্রে সে আটক ছিল।
তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধা। পাঞ্জাবি-পাজামা আর ফুলপ্যান্ট ও ফুলশার্ট ছিল তার প্রধান পোশাক-পরিচ্ছদ। বিলাসিতা সে মোটেই পছন্দ করতো না। তার জীবনে আরাম আয়েশ আমি দেখিনি।
১৯৯৩ সালের ঘটনা : জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নিজ বাড়িতে আসার পর মা, ভাই-বোনদের আহাজারি, ‘তোমাকে আর রাজশাহী যেতে দেবো না, লেখাপড়া আমাদের প্রয়োজন নেই, কবে কখন আমরা শুনবো তুমি মরে গেছ।’ মা, ভাই-বোনদের এ কথার উত্তরে সে বলেছে, মা তোমার ছেলে কি কোন খারাপ কাজ করে? নাকি কোনো চুরি-ডাকাতি করে? তোমার ছেলে যদি মারা যায় তবে কফিনে করে তোমার ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। সুতরাং মা তুমি আমার জন্য চিন্তা করবে না, তুমি শুধু আমার জন্য দোয় করো।
আর একটি কথা সে বলেছে, মা তোমরা শুধু ভাবছ আমি সংগঠন করি বলে মরে যাবো। কিন্তু আমি তো বাড়িতে আসার পথেও বাস দুর্ঘটনায় মরে যেতে পারি। সুতরাং আমি জ্বর-সর্দিতে কিংবা শিয়াল-কুকুরের মতো ঘরে বসে মরতে চাই না। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের কথা বলতে গিয়ে যদি আমার মৃত্যু হয় তবে আমি মনে করবো এটাই আমার জন্য শ্রেয়। এভাবে বিভিন্ন উদাহরণ আর কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে আবার রাজশাহীতে চলে যায়।
১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনা : শহীদ রবিউল ইসলাম থাকতো আমার ফুফুর বাসায়। ফুফুর মুখ থেকে শোনা এই বক্তব্য। ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে ভোরে উঠে গোসল করে ফজরের নামাজ আদায় করে। তারপর ঘণ্টাখানেক কুরআন তেলাওয়াত করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জন্য বাইরে যায়। তারপর বাসায় ফিরে দেখে এখনও নাশতা তৈরি হয়নি। তখন এক দোকান থেকে বিস্কুট চানাচুর এনে খেয়ে ছাত্রছাত্রী পড়াতে যায়। ছাত্রছাত্রীরা আবদার জানালোÑ স্যার, আজকে পড়বো না। শবেবরাতের জন্য আমরা দুই দিন পড়বো না। তাই বাসায় এসে সাইকেল নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে রওনা হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর সাইকেল নষ্ট হয়ে যায়। তাই বাসায় ফিরে আসে। ফুফু বললেন, সামনে তোমার পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ যাওয়ার প্রয়োজন নেই, বাসায় বসে পড়াশোনা কর। তখন বাসায় বসে বসে সে কী যেন চিন্তা করছিল। তার কিছুক্ষণ পর তার এক বন্ধু মোটরসাইকেলে এসে তাকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ফুফুর কাছে বলে যায়, ফুফু, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি। সারাদিন বাসায় না আসার কারণে বিকেল ৫টার দিকে তার সন্ধানে ফুফা বাজারে যান এবং তার শাহাদাতের সংবাদ জানতে পারেন।
পরদিন বিকেল ৪টার সময় মা রবিউলের শাহাদাতের সংবাদ জানতে পারেন। মা, ভাই-বোনদের করুণ আহাজারি ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। জীবনে এমন শোকে শোকাভিভূত আর কখনও আমরা হইনি।
লেখক : শহীদের বড় ভাই

SHARE

Leave a Reply