স্মৃতির পাতায় শহীদ হাফেজ নাজমুস -শাহাদাত রুবেল রাহমাতে রাব্বি মাজেদ

পরিচয়
হাফেজ নাজমুস শাহাদাত রুবেল; যিনি হাফেজ রুবেল নামেই সুপরিচিত ছিলেন। মৃত, বশির উল্যা মেম্বারের ৬ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শহীদ নাজমুস শাহাদাত রুবেল। চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত ফরিদগঞ্জ থানাধীন দক্ষিণ চরমান্দারীর বিখ্যাত পরিবার ভোলা গাজী বেপারী বাড়িতে ১৫ মার্চ ১৯৯২ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের সাহেবগঞ্জে আলী নূর হোসাইনিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসায় তিনি ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। এরপর ঢাকার একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে ক্বারিয়ানা ও হিফজে কুরআন সম্পন্ন করে ২০১০ সালে পার্শ^বর্তী লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানাধীন রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০১৩ সালে তৎকালীন সাথী শাখা সভাপতি আবু হানিফ ভাইয়ের মাধ্যমে সংগঠনে এসে কর্মী মানে উন্নীত হন। তিনি সদা ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে সাংগঠনিক জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে যেতেন। যিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। ২০১৪ সালে দাখিল পরীক্ষার্থী অবস্থায় মহান আল্লাহর মনোনীত শহীদের তালিকায় স্থান করে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন।

শাহাদাতের ঘটনাক্রম
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি রোববার সকাল থেকেই আমাদের শাখার তৎকালীন সভাপতি আবু হানিফ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের শাখার কিছু জনশক্তি স্থানীয় বর্ডার বাজারে ১৮ দলীয় জোটের হরতাল শান্তিপূর্ণ পালন করি। আমাদের চাঁদপুর-৪ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরকারদলীয় প্রার্থী জয় লাভ করে। কিন্তু এরই মধ্যে হরতাল পালনকারীদের কাছে খবর এলো পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্র জনগণ দখল করে ব্যালট বাক্স নিয়ে গেছে, শুধু রামগঞ্জের মাছিমপুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে এখনো কিছু হয়নি। এ খবর শুনে শহীদ রুবেল ভাই বারবার থানা সভাপতিকে অনুরোধ করতে থাকেন ‘ভাই আমাদের মাছিমপুর কেন্দ্রে যাওয়ার অনুমতি দিন। কেন্দ্রটি আমাদের অতি নিকটে, ইচ্ছে করলে আমরা প্রহসনের নির্বাচন প্রতিহত করতে পারি।’ কিন্তু থানা সভাপতি অনুমতি দেয় নাই। তারপরও রুবেল বারবার অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু থানা সভাপতি বলেন, আমরা ভিন্ন জেলার জনশক্তি আমাদের আরেক জেলায় যাওয়ার অনুমতি নেই। শহীদ রুবেল তখন বলেন, ভাই, তাহলে আমি লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতির অনুমতি নিয়ে যাবো ও প্রহসনের নির্বাচন প্রতিহত করবোই। তখন তারা লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতির সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ না পেয়ে শহীদ রুবেল ভাই, ইমাম হোসেন ভাই, হাফেজ ইমরান ভাইসহ ২০-২৫ জনের একটি গ্রুপ রামগঞ্জের মাছিমপুর কেন্দ্রে যায়। ইমাম হোসেন ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারি যে, পুলিশের সহযোগিতায় স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা অবৈধভাবে ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোট দিচ্ছে। সেখানে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকজন এই অবৈধ ভোট প্রদান বন্ধ করতে গেলে পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে।

কিন্তু সেখানে যাওয়া কোনো ভাই এক পা-ও পিছু হটে নাই। ইমাম ভাই আরো বলেন, আমার মনে হয় যারা মাছিমপুর কেন্দ্রে গিয়েছে তাদের ঈমানি শক্তি ছিল অনেক বেশি। শহীদ রুবেল ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি করা হলে প্রথম গুলিটি উনার কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। দ্বিতীয় গুলিটি উনার মাথায় লাগে। সাথে সাথে তিনি মাটিতে পড়ে যান। সে সময় তিনি একটু পরিমাণও ছটফট করেননি বা কাতরাননি। মনে হয়েছিল তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিকভাবেই শুয়ে আছেন। পক্ষান্তরে, সেখানকার সভাপতি ফয়েজ ভাই আমাদের থানা সভাপতি আবু হানিফ ভাইকে এ খবর দেন। এরপর দ্রুত চিকিৎসার জন্য শহীদ রুবেল ভাইকে সেখানকার স্থানীয় রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলা সভাপতিকে বলেন, প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে। তখন রায়পুর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়ার পথে অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয় এবং মাথার এক অংশ দিয়ে মগজ বেরিয়ে আসে। যখন অ্যাম্বুলেন্স চাঁদপুর পৌঁছায় তখন শহীদ রুবেল ভাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে চলে যান। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। থানা সভাপতি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায়, তৎকালীন জেলা সেক্রেটারি ও সাবেক জেলা সভাপতি ইমরান ভাইসহ বাকিরা তাঁর নিথর দেহ বাড়ি নিয়ে আসেন। এতে শহীদের মা ও আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে যায়।

সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা
তিনি সব সময় সকল কাজে সংগঠনকে প্রাধান্য দিতেন। সংগঠনের বিভিন্ন প্রকাশনা সামগ্রী বিতরণ যেমন- রমজানের ক্যালেন্ডার কিংবা অন্য কোনো সাংগঠনিক কাজে তিনি ব্যক্তিগত শত ব্যস্ততার মাঝেও যেমন- প্রাইভেট টিউশনি করা অবস্থায় এমনকি নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায়ও তিনি সবকিছু ফেলে রেখে দায়িত্বশীলগণকে সময় দিতেন। দায়িত্বশীলগণের নিরাপত্তা প্রদান এবং দায়িত্বশীলগণের আপ্যায়নে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সবসময় মনে হতো সাংগঠনিক যেকোনো ব্যাপারে তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল এবং সদা প্রস্তুত।

শহীদ রুবেলের প্রতিভা
মহান আল্লাহর নেয়ামতে তার আল কুরআন তিলাওয়াত এতটাই মধুর ছিল যে, লোকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তিলাওয়াত শুনতো। আমার মনে হয় রমজান মাসে রেডিওতে টিভিতে যে ধরনের তিলাওয়াত শুনা যায় তার তিলাওয়াত এর চেয়েও অধিক শুদ্ধ, স্পষ্ট, মধুর ও হৃদয়গ্রাহী ছিল। তিনি পরিবার, বাড়ি, প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজনের খুব আস্থাভাজন ছিলেন। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের ভালোবাসায় তাঁর কোনো ঘাটতি ছিল না। লোকজনকে সর্বদা নামাজের জন্য ডাকতেন। সালাত কায়েমে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। তাঁর শাদাতের পর লোকজন বলাবলি করে, ‘এখন আমাদের নামাজের জন্য কে ডাকবে।’

আজও স্বপ্ন দেখেন শহীদের মা
আমার প্রতি তার ভালোবাসার কমতি ছিল না। ঘরে প্রবেশের পূর্বে আমাকে সালাম দিতো। ঘরের বাইরে গেলে আমি জানতে চাইলে বলতো মা, আপনি চিন্তা করবেন না। তার একটি খুবই অদ্ভুত গুণ ছিলো তা হলো আমার কখন কী চাহিদা তা না বলা সত্ত্বেও আমার সামনে নিয়ে আসতো। আমি বুঝতেই পারতাম না সে কিভাবে আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারতো। (এ কথা বলার সময় শহীদের মা আরো বেশি কান্না করেন)।আমার গরুর কলিজা খেতে পছন্দ সে বেতন পাওয়া/হাতে টাকা আছে বা নাই, সে দিকে লক্ষ্য না করে আমার জন্য গরুর কলিজা নিয়ে আসতো। বলতাম, তুই যে এগুলো সপ্তায়-সপ্তায় আনস টাকা পাবি কই। আর বউ আসলে আমার খোঁজ-খবরতো রাখবি না। সে বলতো মা আপনি এগুলো চিন্তা করেন কেন, আপনি খান, আর বউ থাকলে থাকবে, না থাকলে না থাকবে, আপনি মাথায় চাপ নিয়েন না। সে নামাজে যাওয়ার সময় বাড়িতে ছোট-বড় সবাইকে ডাকতো। আর আমার রুবেল আসবে না, মা বলে আর ডাকবে না। তার কোনো অন্যায় না থাকা সত্ত্বেও তাকে যারা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে আল্লাহ তাদের উচিত বিচার করুক। আর আমার ছেলের মৃত্যুকে শহিদী মৃত্যু হিসেবে কবুল করে জান্নাতের সর্বোচ্চ জায়গায় বসবাসের তাওফিক দিন। (আমিন)।

প্রিয় বন্ধু মাহফুজুর রহমান
সে খুবই নম্র ও ভদ্র ছিল। কেউ তাকে আঘাত করলে সে নম্রতার পরিচয় দিতো। সে ইসলামী সঙ্গীতেও খুব পারদর্শী ছিল। সর্বশেষ বলবো তার যদি কোনো গুনাহ থেকেও থাকে আল্লাহ যেন তা মাফ করে তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করে (আমিন)।

প্রিয় বন্ধু মোহছেনুর রহমান শাওন
সে অত্যন্ত ভালো হৃদয়ের অধিকারী ছিল। ক্লাসের কারো সাথে তার মনোমালিন্য হয় নাই। সে আপ্যায়ন-প্রিয় ছিল। নিজের বাড়িতে বন্ধুদের নিয়ে যেতো। তাদের ফল গাছ থেকে আমরা সবাই মিলে বিভিন্ন ফল পেড়ে খেতাম ও অনেক মজা করতাম। সে অত্যন্ত মিশুক ছিল। আমাদের বাড়িতে এসে নিজের ঘরের মতো নিজ হাতে খেতো। আমার মাকেও সে তার আচরণ দিয়ে আপন করে নিয়েছে। আমার মাও তাকে সন্তানতুল্য মনে করতেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন (আমিন)।

শহীদের স্বপ্ন
শহীদ ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল তিনি দাখিল পরীক্ষার পর বিদেশ গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের মধ্যে বড় ব্যবসা দিবেন। আর হাফেজ হিসেবে কুরআনের খেদমত করে যাবেন।

জানাজা
জোহরের নামাজের পর জানাজার সময় নির্ধারণ করা হয়। তাদের বাড়ির মসজিদে জোহরের সালাতের বেশ কয়েকটি জামায়াত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাড়িতে এতো লোকের স্থান হবে না দেখে জানাজার জন্য লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পাশর্^বর্তী বর্ডার বাজারের পাশে বড় মাঠে (বর্তমানে বিজি মডেল একাডেমি ও হাফেজি মাদ্রাসার মাঠে)। হরতালের মধ্যেও হাজার হাজার লোকের সমাগম হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন শহীদের শিক্ষকবৃন্দ, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, তার প্রিয় সহপাঠী, এলাকাবাসী, শুভাকাক্সক্ষী, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার জামায়াত-শিবির ও ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, আমজনতাসহ প্রায় ১০-১২ হাজার তাওহিদি জনতা।

জানাজা ২.৩০ ঘটিকায় অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা পড়ান তার প্রিয় হুজুর-ওস্তাদ মাওলানা আবুল ফারাহ মো: আবু হানিফ। তিনি কান্নাজড়িতকণ্ঠে জানাজায় উপস্থিত হাজার হাজার লোকের সামনে বলেন, সে আমার ছাত্র ছিলো। হাফেজ নাজমুস শাহাদাত রুবেলের মতো ছাত্র পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ওস্তাদদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও সম্মানের কোনো কমতি ছিল না। কাউকে কখনো খারাপ ভাষায় কথা বলতো না। তার একটি ভালো গুণ হচ্ছে তার তিলাওয়াত এতো মধুর ও হৃদয়গ্রাহী ছিল যে সে থাকলে আমি তাকে সবসময় তারাবির নামাজের শেষ দশ রাকাত পড়াতে বলতাম। এতে করে তিলাওয়াতের মধুরতায় মুসল্লিদের আর ঘুম আসতো না। আপনারা সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।
জানাজার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে শহীদ রুবেল ভাইকে চিরদিনের জন্য দাফন করা হয়।

SHARE

Leave a Reply