সড়ক দুর্ঘটনা মহামারী আকারে বাড়ছে প্রতিদিন ১০ বছরের নিহত প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ -জসিম উদ্দীন সিকদার

বাংলাদেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। অদক্ষ চালক, ভাঙাচুরা রাস্তাঘাট, যান্ত্রিক ত্রুটি সর্বোপরি জনগণের অসচেতনতার কারণেও ঘটতে পারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক-সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারালেও কারো টনক নড়ছে না। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে এক একটি দুর্ঘটনার বীভৎস চিত্র দেখে গা শিহরিত হয়ে ওঠে। পথে বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে কি না তার কোনো ভরসা পাওয়া যায় না। সবচাইতে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে হাইওয়ে ও জেলা সড়কগুলোতে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ সেন্টারের (এআরসি) গবেষণা অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৩৫ হাজার। অন্য দিকে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতি দশ হাজার যানবাহনে মৃত্যুর হার ৮৫ দশমিক ৬। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছাড়াও আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণের হারও কম নয়। এই সমস্যা একটি সোশ্যাল বা সামাজিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। দেশে নগরায়ন ও যানবাহনের যান্ত্রিকীকরণের হার যত বাড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি তথ্য থেকে জানা যায়, জাতীয়, হাইওয়ে ও জেলার প্রধান সড়কগুলির ৪০% ভালো আছে। বাকি ৬০ ভাগ রাস্তাই খারাপ। তাছাড়া লক্কড়ঝক্কর মার্কা যানবাহন, অননুমোদিত যানবাহন এবং অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অদক্ষ তথা লাইসেন্সধারী নয় এমন চালকের সংখ্যাই বেশি এই দেশে। এই যখন অবস্থা, তখন সড়ক দুর্ঘটনা না ঘটাটাই যেন অস্বাভাবিক।
সড়ক দুর্ঘটনায় জানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হয় এক কথায় তা অপূরণীয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ২-৩%। নিয়মিত রাস্তাঘাট সংস্কার, সম্প্রসারণ, ডিভাইডার তৈরি, চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ওভারলোডেড ও দ্রুতগামী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক পুলিশসহ সকলের জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক নিরাপত্তাজনিত শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করবার মাধ্যমে এর প্রতিকার করা যেতে পারে। sorok2
তা ছাড়া, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন করতে গেলেই পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকে সবকিছু অচল করে দেয়। এদের শেল্টার দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন মন্ত্রীর ব্যাপারেও শক্ত অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিক নেতা হিসেবে অহরহ কথা শুনা যায় সেই মন্ত্রীর ব্যাপারে, সমালোচনাও হচ্ছে; কিন্তু তার হাত এত শক্তিশালী যে অনেক সিদ্ধান্তই আর আলোর মুখ দেখে না তার কারণে।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সারাদেশে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৪৬ হাজার ৯৯১ মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সড়কে ৪৪ হাজার ৭৯টি দুর্ঘটনায় ৭০ হাজার ৯০৮ জন মানুষ আহত হয়েছেন। এ সকল দুর্ঘটনার প্রধান তিনটি কারণ নির্ধারণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা- ড্রাইভারের গাফিলতি, ভাঙাচুরা সড়ক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এ ছাড়া হাইওয়ে পুলিশের গাফিলতি ও পরিবহন সেক্টরের রাজনীতিকে দায়ী করেন অনেকেই। কিন্তু এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে সরকারের কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না কখনো। সড়ক-মহাসড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চলছে। কোন নিয়মনীতি না মেনে ড্রাইভাররা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা। মহাসড়কগুলোকে চার লেন ছয় লেন করা হচ্ছে। কিন্তু লোকাল যানবাহন চলাচলের জন্য সড়ক বিভাজন না করলে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়বে বৈ কমবে না। তাই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়ক-মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নতির প্রয়োজন। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পরামর্শও রয়েছে যাত্রী সাধারণের।sorok3
এ ছাড়া ২০১৪ সালে পাঁচ হাজার ৯৯৭টি দুর্ঘটনায় আট হাজার ৭৯৮ জন নিহত ও ১৮ হাজার ১১৩ জন আহত হয়েছেন। ২০১৩ সালে চার হাজার ৭৫৬টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ছয় হাজার ৮১৩ জন; ওইসব দুর্ঘটনায় ১১ হাজার ৫২৮ জন আহত হয়েছেন। চার হাজার ৮১৭টি দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৯৫৪ জন নিহত ও ১২ হাজার ৯০৮ জন আহত হয়েছেন ২০১২ সালে। ২০১১ সালে ঘটেছে চার হাজার ৯৫৯টি দুর্ঘটনা; যেখানে নিহত ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৯২৮ ও ১১ হাজার ৪৩০। তিন হাজার ১০৭টি দুর্ঘটনায় ২০১০ সালে দুই হাজার ৬৪৬ জন নিহত ও এক হাজার ৮০৩ জন আহত হয়েছেন। ২০০৯ সালে তিন হাজার ৫৬টি দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন যথাক্রমে দুই হাজার ৯৫৮ ও তিন হাজার ৪৫৬ জন। চার হাজার ৮৬৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০০৮ সালে; ওই বছর তিন হাজার ৭৬৫ জন নিহত ও তিন হাজার ২৩৩ জন আহত হয়েছেন। ২০০৭ সালে সংঘটিত চার হাজার ৭৬৯টি দুর্ঘটনায় তিন হাজার ৭৪৯ জনের প্রাণহানি ঘটে; এ সময় আহত হন তিন হাজার ২৭৩ জন। তিন হাজার ৭৯৪টি দুর্ঘটনায় তিন হাজার ১৯৩ জন নিহত ও দুই হাজার ৪০৯ জন আহত হন ২০০৬ সালে। ২০০৫ সালে তিন হাজার ৯৫৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে তিন হাজার ১৮৭ ও দুই হাজার ৭৫৫ জন। বেসরকারি সংস্থা যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের (সিপিপিআরবি) গবেষণায় এই তথ্য জানা যায়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের গাফিলতির কারণে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কারণ যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। এ ছাড়া কোন সরকার একটি সিদ্ধান্ত নিলে কিছুদিন পরে তা থেকে সরে আসে। তাই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রধান কারণ হলো ড্রাইভারের গাফিলতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও ভাঙাচুরা সড়ক। তার মতে, বর্তমান সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তিনি এক এক সময় এক এক কথা বলেন। হঠাৎ করেই বললেন আজ থেকে মহাসড়কে সিএনজি চলাচল বন্ধ। কিন্তু এই সিএনজির যখন লাইসেন্স দেয়া হয় তখন থেকেই মহাসড়কে সিএনজি চলাচল নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা থাকে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা কেউ মানে না।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় না। বিশেষ করে আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ভটভটি ও ইজিবাইকের মতো ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে প্রায় এক দশক ধরে।
rorok1
হাইওয়ে পুলিশের গাফিলতি
পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত গত সাত মাসে প্রধান প্রধান মহাসড়কে মোট ৮৩৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮৮৩ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১ হাজার ৫২৯ জন। দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৩৯টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হাইওয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ২০১টি গাড়ির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৫টি ঘটনার ক্ষেত্রে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগ ছিল বলে পুলিশ সূত্র জানায়।
এ ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে চালকদের সচেতন করা, গতিনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া, চালকের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সড়কে সিসি ক্যামেরা বসানো, অতিরিক্ত ওজন বহন রোধ করা, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত করা, ত্রুটিমুক্ত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা, সড়কের দুই পাশ থেকে বাজার উচ্ছেদ করা, ধীরগতির গাড়ি মহাসড়কে চলতে না দেওয়া ছিল অন্যতম সুপারিশ। কিন্তু সব মহল থেকে এসব নিয়ে নানা কথা বলা হলেও সুপারিশ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের ২০৯টি স্থানকে দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করে একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে তিন বছর আগে সড়ক নির্দেশনা বোর্ড লাগিয়েছিল পুলিশ। এতে এক-চতুর্থাংশ দুর্ঘটনা কমে যায় বলে দাবি করছে পুলিশ। কিন্তু রোদ-বৃষ্টিতে বোর্ডগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, এরপর কেউ সেসব আর মেরামত করেনি।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে গাড়িচালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সড়কের ওপর যত্রতত্র গড়ে ওঠা বাজার আর চলাফেরায় অসাবধানতার কারণেই দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। বড় কারণ হলো, পথচারীর অসতর্কতা। দ্বিতীয় কারণ হলো রাস্তাঘাট ও দোকানপাট।
যাত্রীদের বক্তব্য, সাধারণত দিনে চলাচলকারী বাসগুলোর চালকেরা একটু বেশি বেপরোয়া থাকেন। তবে দূরপাল্লার চেয়ে আঞ্চলিক রুটের চালকেরা দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী। যখন ডে-কোচে যাই তখন ভয় লাগে। গাড়িগুলোর গতি দেখে মনে হয়, কেউই আইন মানেন না।
বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য মোটর আইনের ১৪২ ও ১৪৩ ধারায় জরিমানা মাত্র ৩০০ টাকা। অথচ সিঙ্গাপুরে জরিমানা পাঁচ হাজার ডলার। জরিমানা কম হওয়ার কারণে কোনো চালক ভ্রুক্ষেপ করেন না। বেশি জরিমানার বিধান থাকলে সড়কে নেমেই চালকেরা আগে গাড়ির গতি নিয়ে ভাবতেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জরিমানার অঙ্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে সড়ক বা মহাসড়কের ওপর তৈরি হওয়া বাসস্ট্যান্ডগুলোতেই। দুর্ঘটনার জন্য যেসব কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ও যানবাহন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা।

ফিটনেসবেহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালক
গাড়ির ফিটনেস ও দক্ষ চলক তৈরিতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অভাব রয়েছে। দেশে চালকের লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে পেশাদার চালকের লাইসেন্স প্রায় আট লাখ। বাকিরা অপেশাদার। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে এক লাখ ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা-অটোটেম্পো চলাচল করছে। ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ৪১ হাজার। এমন বাস-মিনিবাস রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। বাকিগুলো অন্যান্য যানবাহন।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল এবং এগুলোর ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। আর কিছু যানবাহন অকেজো হয়ে গেছে। অবশ্য ফিটনেস সনদ থাকা না-থাকা প্রায় সমানই। বাস-ট্রাকের যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, এগুলোর বেশির ভাগই বিআরটিএ কার্যালয়ে না গিয়েই সনদ নিয়ে থাকে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন একদিকে যেমন সড়ক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তেমনি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, একটা যানবাহনের ফিটনেস দিতে ৪২টি পরীক্ষা করার নিয়ম। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিতেও ঘাটতি আছে। তার মতে, সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরা এই কাজ পারছে না। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোটরযান আইনটিও দায়ী। এটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগও গতি পাচ্ছে না ওই প্রভাবের কারণে। এই অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনের সংস্কার ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

ফাইলবন্দী সড়ক দুর্ঘটনার মামলা
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মোট ১৪ হাজার ৩৭১টি মামলা হয়েছে। এ মামলাগুলোর আসামির সংখ্যা ১৪ হাজার ৩০৩। কিন্তু এসব মামলা শুধু কাগজপত্রেই রয়ে গেছে। শুধু সংখ্যা বেড়েছে আসামিদের।
উল্লিখিত পাঁচ বছরে মাত্র ২ হাজার ২৩৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা যেমন কমছে না তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা।

রাজনীতিমুক্ত হতে হবে পরিবহন সেক্টর
দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। এবার ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঈদের পরদিন সিরাজগঞ্জে দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ১৭ জনের। এর মধ্যে একটি বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। গত বছরের অক্টোবরে নাটোরে দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জন প্রাণ হারায়। ওই বাসের ফিটনেস সনদ ছিল না। এ জন্য তদন্ত কমিটি মালিকদের দায়ী করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৪ সালে মারা গেছে সাড়ে আট হাজার মানুষ। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজার ৬৭। সড়ক নিরাপত্তার মূল পাঁচটি বিষয় হচ্ছে- ত্রুটিমুক্ত যান ও সড়ক, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া লাইসেন্সধারী দক্ষচালক, সড়কের পরিবেশ এবং আইনের প্রয়োগ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো উপেক্ষিত। দেশে ত্রুটিমুক্ত সড়ক ও যানবাহন এবং যথাযথ পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। মোটরযান-সংক্রান্ত আইন হালনাগাদ করাও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু কোনোটাই সঠিকভাবে হচ্ছে না। বরং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নৌ-মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠনের চাপ ও সুপারিশকে প্রাধান্য দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৮ জুলাই ২০১৫ দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সড়কে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সড়ক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বৈঠকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নেন তিনি। সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয় না। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইন মানা এবং সড়ক ত্রুটিমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। মোটরযান আইন পরিবর্তনের জন্য করা খসড়াটিও দুই বছর ধরে ঝুলে আছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ত্রুটিপূর্ণ যান ও যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে চালক নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। বর্তমানে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এর কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। শাজাহান খানের পরিবারের বাসের ব্যবসাও আছে। আর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান। সমিতির নেতাদের বেশির ভাগই সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জ?ড়ত। তাই অনেক সিদ্ধান্ত নিলে রাজনৈতিক চাপে তা প্রত্যাহার করতে হয়। তাই দেশের পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে বলে মনে করেন সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply