সড়ক যেন মৃত্যুর ফাঁদ, কার্যকর পদক্ষেপ নেই কর্তৃপক্ষের -সৈয়দ খালিদ হোসেন

মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হচ্ছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। কেউবা ফুটফুটে শিশুসন্তান হারিয়ে হন নির্বাক। আর দেশ হারায় তার মেধাবী নাগরিককে। কোনো কোনো দুর্ঘটনা গোটা জাতিকে মর্মাহত করছে। দুর্ঘটনায় হাজার হাজার পরিবার পথে বসছে। এরকমই ঘটছে প্রতিনিয়ত।
দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সরকারের উদ্যোগ যথাযথ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাতাল ও মূর্খ চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেই এতো দুর্ঘটনা ঘটছে, এ বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। আর দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে এর জন্য কঠোর কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায়  চালকদের জবাবদিহির মানসিকতা বাড়ছে না। একটি দুর্ঘটনা যে  সারা জীবনের কান্না  এই অনুভূতিটুকু আজো চালকদের হৃদয়ে আঘাত করতে পারেনি। ফলে সড়কে  দুর্ঘটনার মিছিল দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনা
গত শুক্রবার (২১ এপ্রিল) রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পাঁচ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ৭১ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৬২৪ জন প্রাণ হারালেন বলে ২৩ এপ্রিল খবর প্রকাশ করেছে দেশের একটি প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক।
শুক্রবার কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২ এবং বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে নিহত হয়েছেন একজন করে। তার আগে বুধবার (১৯ এপ্রিল) ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন নিহত ও আহত হয়েছেন ৪০ জন। এর মধ্যে পাবনায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস উল্টে তিনজন নিহত ও ৪০ জন আহত হন। এছাড়া মাগুরা, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঝিনাইদহ ও চট্টগ্রামে মারা গেছেন একজন করে।

কেন এত প্রাণহানি?
প্রতি বছরের শুরুতেই চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) এবং এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরিপে সড়ক দুর্ঘটনার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয় বলে এসব সংগঠন বা সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। কিন্তু প্রকৃত চিত্র এর চাইতেও ভয়াবহ হয়ে থাকে। প্রতিবছর সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রচার প্রচারণা চালানো হয় যাতে সড়কে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে একেক জনের একেক ব্যাখ্যা রয়েছে। গণপরিবহনগুলোর মালিক ও শ্রমিক পক্ষের দাবি রাস্তা ভালো না থাকার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়। কিন্তু যাত্রী ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা দাবি করে আসছেন চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকরাই বেশি দুর্ঘটনা ঘটায়। ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোই ঘাতকে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে নেশাগ্রস্ত ও মাতালরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার মধ্যে ফেলে যাত্রী সাধারণকে।

কিছু পরিসংখ্যান
সড়কে প্রতিদিন যতো দুর্ঘটনা হয় এবং এতে যতো প্রাণহানি ও অন্যান্য ক্ষতি হয় তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের উপর ভিত্তি করে কিছু পরিসংখ্যান তৈরি হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৩১২টি। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ হাজার ৫৫ জন। আর আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯১৪ জন। চলতি ৪ জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ২০১৬ প্রকাশ করে সংগঠনটি। সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে হাত-পা বা অন্য অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে ৯২৩ জন। তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে এক হাজার ৬৩টি বাস, এক হাজার ১৮৭টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৫৯৭টি হিউম্যান হলার ৬৪৯টি কার জিপ মাইক্রোবাস ৯৭৩টি অটোরিকশা এক হাজার ৪৪৯টি মোটরসাইকেল, এক হাজার ১৯০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা ৮৬৩টি নছিমন করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
এদিকে কিছুটা ভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। সংগঠনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, নিসচা ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিসচা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে জানানো হয়, ২০১৬ সালে সারা দেশে দুই হাজার ৩১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ১৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হন পাঁচ হাজার ২২৫ জন।সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য ও আঞ্চলিক শাখা সংগঠনের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তবে আঞ্চলিক অনেক দুর্ঘটনার খবর এই প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।
তবে জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২১ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৩২ শতাংশ পথচারী। অবশ্য এই হিসাব ২০১২ সালের। বিশ্ব নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তায় আগের চেয়ে অগ্রগতি হয়েছে। এরপরও প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা নিহত হয় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষ।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে, ১৯৯৪ সালে নিহত ৩০১৩ আহত ২৭৩৫ জন, ১৯৯৫ সালে নিহত ১৬৫৩, আহত ২৮৬৪ জন, ১৯৯৬ সালে নিহত ২০৪১, আহত ৪০৭৬ জন, ১৯৯৭ সালে নিহত ৩১৬২, আহত ৩৯৯৭, ১৯৯৮ সালে নিহত ৩০৮৫, আহত ৩৪৫৩, ১৯৯৯ সালে নিহত ৩৩১৪, আহত ১৯১১, ২০০০ সালে নিহত ৩৪৩০, আহত ৩১৭২, ২০০১ সালে নিহত ৩১০৯, আহত ৩৬০৭, ২০০২ সালে নিহত ৩৩৯৮, আহত ৩০৭০, ২০০৩ সালে নিহত ৩৩৮৯, আহত ৩৮১৮, ২০০৪ সালে নিহত ২৯৬৮, আহত ২৭৫২, ২০০৫ সালে নিহত ৩১৮৭, আহত ৩৭৫৫, ২০০৬ সালে নিহত ৩১৯৩, আহত ২৪০৯, ২০০৭ সালে নিহত ৩৭৪৯, আহত ৩২৭৩, ২০০৮ সালে নিহত ৩৭৬৫, আহত ৩২৮৪, ২০০৯ সালে নিহত ২৯৫৮, আহত ২৬৮৬, ২০১০ সালে নিহত ৩১৯৫, আহত ২৫৫৭ ও ২০১১ সালে নিহত ৩৭৯৫ আহত ২৪৯৫ জন।

যে কারণে থামছে না দুর্ঘটনা
চালকদের অদক্ষতা কিংবা যানবাহনের ত্রুটি যেটিকেই বড় করে দেখা হোক না কেন মৃত্যুর সে অশুভ মিছিল থামছে না। ক্ষয়ক্ষতি কিংবা স্বজনদের আহাজারি ছাপিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুসংখ্যা বাড়ছেই। কোনো হিসাবেই মেলানো যাচ্ছে না অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোর রক্তঋণ। একজন চালক স্টিয়ারিংয়ে বসার আগে নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছেন না। এক্সিলেটরে চেপে হাওয়ার বেগে এমনভাবে ছুটেছে গাড়িগুলো দেখে যেনো মনে হবে যুদ্ধে নামা দুরন্ত ঘোড়সওয়ার হয়েছে তারা। অথচ ড্রাইভিং সিটে চেপে বসার আগে লক্কড়-ঝক্কড়মার্কা গাড়িটির কলকব্জা দেখে নেয়ার দরকার ছিল তাদের! কিন্তু এসবে কোনো তোয়াক্কা নেই। ফলে সড়ক দুর্ঘটনাকে আমাদের অসাবধানতায় সংরক্ষিত অনাকাক্সিক্ষত ঐতিহ্য বলেও বলা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালিকদের লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তা থেকে সরানো এবং চালকদের (অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে) মাথা ঠাণ্ডা করতে না পারলে দুর্ঘটনা অব্যাহতই থাকবে।
সরকারি-বেসরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, প্রভাবশালী পরিবহনগুলোর চালকরা বিপজ্জনক গতিতে গাড়ি চালান বেশি। অনেক নিয়ম-কানুন মানতে চান না তারা। সরকারি এক প্রতিবেদনেই দেখা গেছে, নামি কোম্পানির গাড়ির চালকরা সড়কের নিয়ম না মেনে গাড়ি চালান। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ওভারটেক। দেশের অধিকাংশ রাস্তা ওভারটেকিংয়ের উপযোগী নয়। তাছাড়া প্রশিক্ষণবিহীন চালকের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি খাদে পড়ার ঘটনাও কম নেই এ দেশে। আইন না মানার প্রবণতার কারণে ঠিক কি পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটছে দেশে, তার পরিসংখ্যান মেলে না। একই সঙ্গে পাওয়া যায় না চালকের দক্ষতা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে কারো শাস্তি বা জরিমানা না করায় বাড়ছে দুর্ঘটনার প্রবণতা। আইনের অভাব নেই দেশে। দুর্ঘটনার জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা কঠিন নয়। মহাসড়কের পাশে বাড়ি, বাজার, স্কুল গড়ে ওঠায়ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। চলন্ত গাড়ির নিচে পড়ছে স্কুলগামী শিশুরা। ব্যস্ত সড়ক পারাপার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে না পারাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে সড়ক দুর্ঘটনার যেসব কারণ এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে, তা দূরীকরণে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া আবশ্যক। আমরা জানি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ কমিটি রয়েছে। তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি দক্ষ চালক তৈরি ও মানসম্পন্ন গাড়ি নিশ্চিতের বিষয়টি এক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার জন্য চালকের পাশাপাশি মালিকসহ দায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পরিবহন মালিক ও চালকের দৌরাত্ম্য বন্ধে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি। সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আলোচিত কিছু দুর্ঘটনা
উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নাটোরের বড়াইগ্রাম; দ্রুতগামী কেয়া পরিবহনের সঙ্গে অথৈ পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ; ফলাফল মুহূর্তে ৩৩ জনের প্রাণহানি। তখন প্রত্যক্ষদর্শীরা বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই মারা গেছেন অন্তত ২০ জন, যাদের নিথর দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আশপাশে। তারপর বাকিরা মারা গেছেন হাসপাতালে নেয়ার পথে কিংবা চিকিৎসারত অবস্থায়। যে কয়জন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন, তার প্রায় সকলেই এখন পঙ্গু। বছর তিনেক আগে অক্টোবর মাসের ২১ তারিখের ঘটনা। এ ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। এর আগে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াজুড়ি এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ আর টেলিভিশন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মিশুক মুনীর। এ দুর্ঘটনায় নিহত হন আরও তিনজন। তারা হলেন তারেক মাসুদের সহকারী ওয়াসিম, জামাল ও মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজ। গুরুতর আহত হন ঢালী আল-মামুন ও তাঁর স্ত্রী চিত্রশিল্পী দিলারা বেগম জলি।
কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল মিরসরাইয়ে ট্র্যাজেডি। যেখানে সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে ৪৪টি ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরকে। একসাথে এত কিশোরের লাশ এর আগে কারও চোখে পড়েনি। লাশের সারি দেখে শোকপ্রকাশের ভাষাও যেন হারিয়ে গেছে সবার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে স্মরণকালের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ স্কুলছাত্র নিহত হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি ওই পরিবারগুলোর মধ্যে কী দাঁড়াতে পারে? ১১ জুন দুপুরে মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে ফুটবল খেলা দেখে এলাকায় ফেরার পথে ছাত্রদের বহনকারী একটি মিনি ট্রাক আবু তোরাব বাজারের কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খাদে উল্টে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই মারা যায় ৪১ ছাত্র। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। অভিযোগ ওঠে, চালক তখন মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। ট্রাকটি উল্টে ছাত্রদের ওপর পড়ায় এর ভেতরে চাপা পড়ে ও দম বন্ধ হয়ে ছাত্ররা মারা যায়। এদের বেশিরভাগই আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আবু তোরাব উচ্চবিদ্যালয় এবং আবু তোরাব কলেজের শিক্ষার্থী। একসাথে এতজন সহপাঠীকে হারিয়ে অভিভাবকদের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীরাও যেন নির্বাক। এখনও তাদের অনেকে স্বাভাবিক হতে পারেনি।
একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের একমাত্র ছেলে সায়েমুর রহমান সায়েম। একই বছর বগুড়ায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৮ জন। এই ক্ষত না শুকাতেই মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে নরসিংদীতে দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৬ জন। সিলেটের জৈন্তাপুরে ৯ জন নিহত হয়। সিলেটের বেগমপুরে ৯ জনের মৃত্যু হয়। এভাবেই প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু প্রতিকারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঝরে গেল আরো একটি সম্ভাবনাময় জীবন। রাজধানীর বংশাল থানার নর্থসাউথ রোড এলাকায় ২৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে সড়ক দুর্ঘটনায় সাদিয়া হাসান (২২) নামে এক মেডিক্যাল ছাত্রী নিহত হয়েছেন। সাদিয়া ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। সাদিয়া ও তাঁর মা রাজশাহী থেকে ট্রেনে কমলাপুর স্টেশনে আসেন। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে তাঁরা সাদিয়ার হোস্টেলে যাচ্ছিলেন। হাসপাতালে সাদিয়ার মা শাহীনা জানান, আল রাজ্জাক হোটেলের সামনে যাত্রীবাহী একটি বাস অটোরিকশায় ধাক্কা দেয়। আহত অবস্থায় মা-মেয়েকে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভের পর চালক গ্রেফতারও হয়। কিন্তু এই ইস্যু এখন আর হয়তো কারো মনে নেই।
ঘাতক বাসের চালক ও মালিকের দায়
“চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনকে হত্যার দায়ে সব ঝড় যেন চালক জামিরের ওপর দিয়েই যাচ্ছে। এমনকি তাঁকে দণ্ডিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যা ঘটল, তাতেও শ্রমিকেরাই অপরিণামদর্শী ও দয়ামায়াহীন পেশাজীবী হিসেবে কিছুটা হলেও চিহ্নিত হলেন। কিন্তু তাঁদের স্বার্থরক্ষার নামে ধনিকশ্রেণির স্বার্থই রক্ষা করা হলো। যে শ্রেণি শ্রমিককে স্বল্পমূল্যে উদয়াস্ত খাটাতে বাধ্য করে, তাদের প্রতিভূ হিসেবে মন্ত্রীপ্রবর অবশ্য সেরা রসিকতাটাই করলেন। বললেন, ওরা ‘স্বেচ্ছায় অবসরে’ গেছে। আসলে মালিকেরাই অবসরে যান, শ্রমিকেরা কখনো নয়!
প্রায় প্রতিদিনই যাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, তাঁরা গাড়িচালক। কেউ আমরা উদ্বিগ্ন নই যে ইদানীং ভ্রাম্যমাণ আদালত বসলেই চালকেরা জেলে যান। অথচ সংবিধানমতে এই আদালত, আদালত নয়। একটা কারসাজি। এটা চালকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যন্ত্রবিশেষ। ২ মার্চ ১৪ জন, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৫ জন এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯ জন চালক লাইসেন্স-সংক্রান্ত অনিয়মের দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। এভাবে দণ্ডিত হওয়া চালকের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অথচ অবৈধ লাইসেন্সধারী বা লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তিদের হাতে যাঁরা গাড়ি ছেড়ে দেন, তাঁদের কেউ জবাবদিহির আওতায় আসছেন না।
রাষ্ট্র বনাম চালক জামির হোসেনের মামলার ৫৫ পৃষ্ঠার রায়ের কোথাও মালিকপক্ষের কোনো ফৌজদারি দায়ের কথা বলা নেই। এমনকি মালিকের নামটি পর্যন্ত রায়ে মুদ্রিত হয়নি। অথচ দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটির যেসব ত্রুটি চিহ্নিত করে চালককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তাতে দুর্ঘটনা সংঘটন ছাড়া আর সব ক’টি অপরাধের ফৌজদারি দায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মালিকপক্ষের ওপর বর্তায়। চালক জামির দরিদ্রশ্রেণির মানুষ। তিনি মালিকশ্রেণির কেউ নন বলেই শুনানি শুরুর ১৭ মাসের মধ্যে বিচার পাওয়া সম্ভব হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর যদি অনেক টাকাপয়সা থাকত, তাহলে তিনি বিভিন্ন স্তরে অন্তর্র্বর্তী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতেন। তাঁর একটা মূল উদ্দেশ্য থাকত বিচারপ্রক্রিয়াকে যথাসম্ভব বিলম্বিত করা। আমরা নিশ্চিত, এই মামলায় পুলিশ মালিককে না জড়িয়ে এর দ্রুত বিচারের গতিকে বেগবান করেছে। আমরা ভদ্রলোকেরা সন্তুষ্ট যে, এই রাষ্ট্র তার শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের হত্যার বিচার করেই তবে ছাড়ে! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের ধনী, অবস্থাপন্ন বা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যেভাবে ‘আইনি লড়াই’ চালানোর সামর্থ্য রাখেন, তা দরিদ্র মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। বিআরটিএর জন্ম ১৯৮৭ সালে। আমরা ভাবতেও পারিনি, ৫ মার্চ রোববার অপরাহ্নে সংস্থাটির সচিব (যুগ্মসচিব) মো. শওকত আলী নিশ্চিত করবেন যে, গাড়ির মালিকেরা কখনো জেল খাটেননি।
এসব কথাগুলো বলেছেন প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান। এর আগে তিনি বলেছেন, বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে নরহত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন রায় দেয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা হতে পারে। আদালত এ ঘটনাকে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ বলেননি। বরং আসামিপক্ষ এ ঘটনাকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছিল। আদালতের পরিভাষায় এটা হলো ‘কালপাবল হোমিসাইড নট অ্যামাউন্টিং টু মার্ডার।’ এর মানে হলো, ‘দন্ডনীয় নরহত্যা, কিন্তু খুন নয়।’ এ ঘটনা আমাদের চেনা-জানা অর্থে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়। দণ্ডবিধির যে বিধির আওতায় খুনখারাবির বিচার হয়, সেই ধারাটিই এবার প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে। এর মূল কারণ হলো আদালতে বাদিপক্ষ প্রমাণ করেছে যে কোনো ঘাতক যখন বন্দুক হাতে কাউকে গুলি করে হত্যা করে, সেভাবে ঘাতক বাসটির চালক (জমির) তাঁর বাসটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বন্দুক দিয়ে মানুষ মারা যায়। বাস দিয়েও মানুষ মারা যায়। তাই বন্দুক দিয়ে মারলে খুনের সাজা। আবার বাস দিয়ে মারলেও খুনের সাজা। বাসচালক এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে তাঁকে ছুটে যেতেই হবে। সামনে যা-ই পড়ুক, তাতে তাঁর কোনো ভ্রƒক্ষেপ ছিল না। সুতরাং তিনি যা করেছেন, তাতে তাঁর খুনে ‘ইনটেনশন’ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। মানুষ খুন করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য এটাও ছিল যে সামনে মানুষ পড়ুক বা অন্য কোনো জীবজন্তু পড়ুক, কিছুতেই তাঁর কিছু যায়-আসে না, মানুষ পড়লে মরবে, কেউ আহত হলে হবে।
আমাদের সড়কে যে ‘কালপাবল হোমিসাইড’ চলে আসছে, এটা তার লাগাম টানবে কি? এই যুগান্তকারী রায়ের ফলে মালিক ও চালকদের ওপর একটা চিলিং এফেক্ট বা নিস্তেজক প্রভাব আশা করা যায় কি? আমরা এটা ভাবতে পারলে বেশি আশ্বস্ত হতাম যে যাদের বড় কোনো পরিচিতি নেই, যারা অজানা-অচেনা, সেই সব মানুষ, যারা কালপাবল হোমিসাইডের শিকার হয়েছে, তাদের স্বজনেরা নতুন আশায় বুক বাঁধবে। তারা ভাবতে বসবে যে তাদের মামলার বিচারকার্যও বুঝি এবার ত্বরান্বিত হবে। তবে এই রায় যে সড়ক পরিবহন খাতের মুঘলদের এত দিনকার ভাবনাচিন্তায় বিরাট একটা ঝাঁকুনি দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয়

বাংলাদেশে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা এখনো সনাতনী কায়দায় পরিচালিত হয়ে থাকে। যে কোনো বিষয়ে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বিপত্তি ঘটাই স্বাভাবিক। সুতরাং ট্রাফিক আইন ও ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করতে হবে। এতে দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেকাংশই কমে যাবে। আমাদের দেশে শিক্ষার হার আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও সুশিক্ষিত এবং মানবিকতা ও মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা এখনো অনেক কম। ড্রাইভিং পেশাকে এ দেশে এখনো নিম্নমানের পেশা বলেই ধরে নেয়া হয়। একজন চালক প্রতিদিন গড়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৬-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে থাকেন। কিন্তু পরিশ্রম অনুযায়ী তাদের পারিশ্রমিক প্রদান করা হয় না এবং পারিশ্রমিক প্রাপ্তিরও কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এ ছাড়া পরিবার থেকে পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে হয় বলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারা তাদের পেশায় পরিপূর্ণ মনোযোগ প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। আমরা অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে নারাজ। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে বিকল্প যানবাহনের দিকে নজর দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর উদ্দেশ্যে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানোর অনুমতি প্রদান থেকে প্রশাসনকে বিরত থাকতে হবে।
উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ব্যতীত এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত কেউ যেন গাড়ি চালাতে না পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো গাড়িতে যেন ধারণের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা না হয় সে বিষয়ে প্রশাসনকে যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকেও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। কোনো ড্রাইভার যদি নির্ধারিত স্পিডের চেয়ে অতিরিক্ত স্পিডে গাড়ি চালায় তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থদণ্ড কিংবা মানদণ্ড প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া চালককে দ্রুত গাড়ি চালাতে মানসিক চাপ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে।
যাত্রী বহনের অনুপযুক্ত যেসব গাড়ি সেগুলোকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করতে হবে। এতে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দ্রুত হ্রাস করা সম্ভব হবে এবং সাধারণ জনগণও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply