হজরত মুহাম্মদ সা:-এর শিক্ষাপদ্ধতি ও নেতৃত্বের গুণাবলি । মোবারক হোসাইন

“ইকরা বিসমি রাব্বি কাল্লাজি খালাক”

হজরত-মুহাম্মদ-সাএর-শিক্ষাপদ্ধতি-ও-নেতৃত্বের-গুণাবলি2পড়! তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নবুয়াত জীবনের সূচনা হয়েছিল “পড়” এই শব্দটির মাধ্যমে। শিক্ষার প্রধান উপায় হলো পড়া। রাসূল (সা:) আল্লাহর বাণীসমূহ তথা কুরআনের শিক্ষাগ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তৎকালীন আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের অবসান ঘটিয়েছিলেন। পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদমকে (আ:) আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক সর্বপ্রথম সবকিছুর সারসত্তা শিক্ষা দেয়ার মধ্য দিয়েই মানবসৃষ্টির প্রাক্কালে শিক্ষার সূচনা ঘটে। রূহ জগতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল রূহের নিকট জানতে চেয়েছিলেন যে, আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তখন আদম সন্তানগণ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, হ্যাঁ আপনি আমাদের প্রভু। এর মধ্য দিয়েই আদম (আ:)-এর উত্তরাধিকারী বংশধরদের অন্তঃকরণে সূচিত হয় জ্ঞানের আলো। ইসলামী জীবনাদর্শে জ্ঞানচর্চাকে করা হয়েছে আবশ্যক। হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেন, “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞান অনুসন্ধান করা আবশ্যক বা ফরজ।” জ্ঞানের বাহন বা মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই শিক্ষা মানবজীবনের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

শিক্ষা কী?
বাংলা ‘শিক্ষা’ শব্দটি এসেছে ‘সাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। আরবি ভাষায় শিক্ষার সংজ্ঞায়নে তিনটি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়: প্রথমত, তা’লিম যা আলিমা থেকে উৎপত্তি হয়েছে, যার অর্থ জ্ঞান অন্বেষণ অথবা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, তা’দিব যা আদাবা থেকে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ পরিমার্জিত, পরিশীলিত। তৃতীয়ত, তারবিয়াহ যা মূল শব্দ রাবা থেকে এসেছে। যার অর্থ জন্মানো, বৃদ্ধি করা, লালন করা প্রভৃতি।
আবার শিক্ষার ইংরেজি Education যার সাধারণ আভিধানিক অর্থ হলো : শিক্ষাদান ও প্রতিপালন। Joseph T. Shipley তার Dictionary of word Origins-এ লিখেছেন, Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Edex এবং Ducer-Duc শব্দগুলো থেকে। এ শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ হলো যথাক্রমে বের করা, পথ প্রদর্শন করা। Education শব্দের ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীর মধ্যকার ঘুমন্ত প্রতিভা বা সম্ভাবনার পথনির্দেশক। সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন-ই হলো শিক্ষা।
শিক্ষা সম্পর্কে বিভিন্ন দার্শনিক যে মতামত দিয়েছেন তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো: অধ্যাপক গোলাম আযমের মতে, “যে শিক্ষা আত্মা ও দেহকে এক সুন্দর সামঞ্জস্যতাময় পরিণতিতে পৌঁছিয়ে এ জগতের রূপ-রস-গন্ধকে নৈতিকতার সীমার মধ্যে উপভোগ করার যোগ্যতা দান করে সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা।” জন মিল্টন বলেন, “Education is the harmonious development of mind, body and soul.” একই কথা বলেছেন অ্যারিস্টটলও, তাঁর মতে “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।” কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল বলেছেন, “মানুষের খুদির বা রূহের উন্নয়নই আসল শিক্ষা।” আবার সক্রেটিসের ভাষায় “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন হারম্যান হর্ন, “শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে মুক্ত সচেতন মানবসত্তাকে সৃষ্টিকর্তার সাথে উন্নত যোগসূত্র রচনা করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া।” “শিশুর নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী দেহমনের পরিপূর্ণ ও সার্বিক বিকাশ সাধনই হলো শিক্ষা”- প্লেটো। “সু-অভ্যাস গঠনের নামই হলো শিক্ষা”- রুশো। “সুন্দর, বিশ্বস্ত এবং পবিত্র জীবনের উপলব্ধিই হলো শিক্ষা”- এফ ফ্রয়েবল। জীবনের প্রস্তুতি নয় জীবনের উপলব্ধিই হলো শিক্ষা।


অধ্যাপক গোলাম আযমের মতে, “যে শিক্ষা আত্মা ও দেহকে এক সুন্দর সামঞ্জস্যতাময় পরিণতিতে পৌঁছিয়ে এ জগতের রূপ-রস-গন্ধকে নৈতিকতার সীমার মধ্যে উপভোগ করার যোগ্যতা দান করে সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা।” জন মিল্টন বলেন, “Education is the harmonious development of mind, body and soul.” একই কথা বলেছেন অ্যারিস্টটলও, তাঁর মতে “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।” কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল বলেছেন, “মানুষের খুদির বা রূহের উন্নয়নই আসল শিক্ষা।” আবার সক্রেটিসের ভাষায় “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন হারম্যান হর্ন, “শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে মুক্ত সচেতন মানবসত্তাকে সৃষ্টিকর্তার সাথে উন্নত যোগসূত্র রচনা করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া।” “শিশুর নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী দেহমনের পরিপূর্ণ ও সার্বিক বিকাশ সাধনই হলো শিক্ষা”- প্লেটো। “সু-অভ্যাস গঠনের নামই হলো শিক্ষা”- রুশো। “সুন্দর, বিশ্বস্ত এবং পবিত্র জীবনের উপলব্ধিই হলো শিক্ষা”- এফ ফ্রয়েবল। জীবনের প্রস্তুতি নয় জীবনের উপলব্ধিই হলো শিক্ষা।


শিক্ষার গুরুত্ব ও মর্যাদা
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রত্যেক যুগেই মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবী-রাসূল। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আমি এভাবে তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের কাছে আমার আয়াত পড়ে শোনাবেন, তোমাদের (জীবন) পরিশুদ্ধ করবেন, আর তোমাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও তাঁর তত্ত্বজ্ঞান এবং শিক্ষা দেবেন এমন বিষয় যা কখনো তোমরা জানতে না।” (সূরা আল বাকারা : ১৫১) রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দীনের ব্যুৎপত্তি ও গভীর জ্ঞান দান করেন। (ইবন মাজাহ ৬১৫) তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের উদ্দেশ্যে কিছু পথ অতিক্রম করে আল্লাহ তার বিনিময়ে তার জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি ঘরে যখন কোন একটি সম্প্রদায় বা দল সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং পরস্পর পাঠ করে শোনায় ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে ঘিরে রাখে, তাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়। দয়া অনুগ্রহ তাঁদেরকে আচ্ছাদিত করে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর পাশে যাঁরা আছেন তাঁদের নিকট এর বিষয় আলোচনা করেন। (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯) তিনি আরো বলেন, ফেরেস্তাকুল শিক্ষার্থীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য নিজেদের ডানা মেলে দেয়, আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে সকলে, এমনকি পানির মধ্যে মাছও জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আবিদ ব্যক্তির ওপর আলিম ব্যক্তির মর্যাদা এমন অত্যুজ্জ্বল যেমন নক্ষত্ররাজির ওপর চাঁদের অত্যুজ্জ্বল মর্যাদা। আলিমগণ আম্বিয়্যায়ে কিরামের ওয়ারিশ তথা উত্তরাধিকারী (আবু দাউদ ৩৬৪১, তিরমিযি ২৮৬৩) এ সকল হাদিস ইলম তথা জ্ঞানের অত্যুচ্চ মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছে। আল কুরআনের বহু আয়াতের পাশাপাশি উল্লিখিত হাদিসগুলোর মত বহু হাদিস বিদ্যমান আছে যা রাসূল (সা:)-এর সাহাবীগণ, তাবি’ঈন, তাবি তাবি’ঈন তথা মুসলিম উম্মাহকে যুগ যুগ ধরে জ্ঞান ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সেবা ও পৃষ্ঠপোষক হতে যেমন উৎসাহিত করেছে তেমনি জ্ঞান অন্বেষণে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ এবং মূর্খতার গ্লানি থেকে সতর্ক করেছে। উমার ইবন আল খাত্তাব রা. বলতেন। ওহে জনমণ্ডলী! আপনাদের জ্ঞানার্জন করা কর্তব্য। কারণ, আল্লাহর প্রেম ভালোবাসার একটি চাদর আছে। যে ব্যক্তি জ্ঞানের কোন একটি অধ্যায় অর্জন করবে, আল্লাহ তার দেহে সেই চাদর পেঁচিয়ে দেবেন। (ইবনু আবদিল বার, জামিই বায়ন আর ইলম খ. ১. পৃ. ৭০)
একবার এক ব্যক্তি ইবন আব্বাস রা. এর নিকট জিহাদ সম্পর্কে জানতে চান। লোকটি বলেন, আমি কি তোমাকে জিহাদ থেকেও উত্তম জিনিসের কথা বলবো? তুমি একটি মসজিদ বানাবে এবং সেখানে (মানুষ) আল কুরআন, এর সুন্নাহ ও দীনের ফিক্হ (বিধি বিধান) শিক্ষা দেবে। (প্রাগুক্ত খ. ১. পৃ. ৭৩, ৭৪) আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রা.কে প্রশ্ন করা হলো; মানুষ কারা? বললেন : আলিমগণ আবার প্রশ্ন করা হলো রাজা-বাদশাহ কারা? বললেন: যাহিদ তথা দুনিয়ার ভোগ বিলাস বিমুখ ব্যক্তিগণ। (ইমাম আল-গাযালী, ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দীন, খ. ১, পৃ. ৭) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন, খাদ্য ও পানীয়ের চেয়ে মানুষের বেশি প্রয়োজন জ্ঞানের। (আর রাসূলু ওয়াল ইলম, পৃ. ১৫)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন।” (সূরা মুজাদালা : ১১) রাসূল (সা:) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।” (সহিহ বুখারি ২/৭৫২) রাসূল (সা:) বলেন, “আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির চেহারা উজ্জ্বল করে দিন, যে আমার কোনো হাদিস শুনেছে। অতঃপর অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।” (সুনানে আবু দাউদ ২/৫১৫) রাসূলে করিম (সা:) বলেছেন, “যে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিদ্যান্বেষণ করে এবং তাতে তার মৃত্যু হয়, তার এবং নবীদের মধ্যে বেহেশতে একটি ধাপ মাত্র পার্থক্য থাকবে।” (দারিমি) রাসূলে করিম (সা:) বলেছেন, “রাত্রির এক ঘণ্টাকাল বিদ্যান্বেষণ সমস্ত রাত্রি জাগরণ থেকে উত্তম।” (দারিমি)

প্রশিক্ষণের গুরুত্ব
প্রশিক্ষণ হচ্ছে একটি পরিকল্পিত কার্যক্রম। প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা হয়। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন ব্যক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন করে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে তার যোগ্যতার উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধন করা। প্রশিক্ষণ সাধারণত মানুষের তিনটি জিনিসের বিশেষ পরিবর্তন সাধন করে। যেমন: জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভাব।
ইসলামে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রশিক্ষণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন তাদের কওম বা জাতিকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য। সূরা যুমার ৯ নং আয়াতে এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “হে নবী! আপনি বলে দিন, যারা জানে, আর যারা জানে না তারা উভয়েই কি কখনো সমান হতে পারে? বুদ্ধিমান লোকেরাইতো নসিহত গ্রহণ করে থাকে।” সূরা আল-বাকারায় ১২৯ নং আয়াতে তিনি আরও বলেন, “হে রব! তাদের প্রতি তাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদেরকে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষাদান করবেন এবং তাদের বাস্তব জীবনকে পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করবেন। নিশ্চয়ই তুমি বড় শক্তিমান ও বিজ্ঞ।” ইমাম বুখারী (রহ) বলেন, “কথা ও কাজের পূর্বে বিদ্যার স্থান।”
তিন বছরব্যাপী ইসলাম গ্রহণকারী নব-মুুসলিমরা আল আরকাম নামে এক সাহাবীর বাড়িতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো প্রক্রিয়াতে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন জীবন রীতিতে অভ্যস্ত হওয়ার ব্যাপারটা চর্চার সাথে আসে। লেকচার আর লেসনের মাধ্যমে না। আব্বাসি শাহজাদা যখন আল আরকামের বাড়িকে অনেক পরে মসজিদ বানান তখন থেকে এটি আল খুযায়রানের বাড়ি নামে পরিচিত হয়। বায়তুল্লাহর সীমানা বাড়ানোর কারণে এখন আর এটি নেই।
আল আরকামের বাড়িতে ৪০ জন পর্যন্ত মানুষ একত্র হতে পারত। তারা সেখানে রাসূল (সা:)-এর কাছ থেকে শিখতেন, ইবাদত করতেন, নতুন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিতেন। প্রশিক্ষণ মানে যা শিখছি তা চর্চা করা। শেখা ও চর্চা দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২১ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ শুধু শেখা না, যা শিখছি তা চর্চা করাও। শুধু শিখে আসল পরিবর্তন আসে না। আসে প্রশিক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে। প্রশিক্ষণের মধ্যে আছে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ সেশনে উপস্থিত হওয়া।

রাসূল (সা:)-এর শিক্ষাব্যবস্থা
কুরআন ও হাদিসের রূপ ও আকৃতিতে নবীর শিক্ষাসমূহের এত বিশাল ভাণ্ডার আমাদের কাছে বিদ্যমান আছে যে তার বিপরীতে পৃথিবীর অন্যসকল ধর্ম ও মতবাদ একান্তই নিঃস্ব ও তুচ্ছ মনে হয়। মূলত রাসূল (সা:)-এর পবিত্র সত্তাই ছিলো চলমান শিক্ষাকেন্দ্র। ইসলামের প্রথমদিকে সাহাবা কেরাম রা. চুপিসারে রাসূল (সা:)-এর নিকট কুরআনের শিক্ষা নিতেন। এ সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি পরিস্থিতি অনুযায়ী কুরআনের শিক্ষা চালু রাখেন। পবিত্র মক্কা ও মদিনার শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর নিন্মোক্ত কেন্দ্রগুলোতে সাহাবা কেরাম রা. শিক্ষাগ্রহণ করতেন :
মসজিদে আবু বকর রা. : ইসলামের প্রথম পর্বে মক্কায় যখন মুসলমানদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তখন অনেকের মত আবু বকর রা. হাবশায় হিজরতে উদ্দেশ্যে পাঁচ রাত্রির দূরত্বের পথ, মতান্তরে ইয়েমেনের ‘বারাক আল-গিমাদ’ পর্যন্ত গেলে আল-কারা গোত্রের নেতা ইবনু আদ-দাগিন্না তাঁকে ফিরিয়ে কুরাইশদের নিকট নিয়ে আসেন এবং আশ্রয়দানের ঘোষণা দেন। কুরাইশরা আবু বকর রা.কে আশ্রয়দানের ঘোষণা দেন এবং কিছু শর্তারোপ করেন। “হে আবু দাগিন্না! আপনি তাকে বলুন, তিনি যেন তাঁর বাড়ির ভিতরে ইবাদত করেন এবং যা ইচ্ছা তা পাঠ করেন। তাঁর কাজ যেন জোরে জোরে না করেন। কারণ আমরা ভয় পাচ্ছি আমাদের নারী ও সন্তানগণ যেন বিভ্রান্ত না হয়ে পড়ে।” উল্লেখ্য, এ মসজিদটি ছিল মক্কার কুরআন তিলাওয়াতের প্রথম কেন্দ্র।
ফাতিমা বিনতে খাত্তাব রা. এর শিক্ষাকেন্দ্র : ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ইবনুল নুফাইল ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাবের বোন। ইসলামের সূচনাপর্বে তিনি স্বামী সাঈদ ইবনে যায়েদ রা. এর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। উমর রা. এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বোনের বাসায় গিয়ে দেখেন বোন ও ভগ্নিপতি দু’জনই খাব্বাব রা.-এর নিকট থেকে কুরআন শিখছেন। উমর রা. তাঁদেরকে সূরা ত্বহা পড়তে শুনেন এবং ঈমান আনার ব্যাপারে মানসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
দারুল আরকামের শিক্ষাকেন্দ্র : আল-আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রা. মক্কার প্রথম পর্বে দশজনের পর ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। মক্কায় তাঁর বাড়িটি ছিল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে। দারুল আরকামের শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়ার ব্যাপারে দুইজন করে সচ্ছল মুসলিমকে দায়িত্ব দেয়া হতো। একবার রাসূল (সা:) এখানে এক মাস থেকে সাহাবাদের মধ্যে দাওয়াত ও প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। উমর রা.-এর ইসলাম গ্রহণ এ বাড়িতেই হয় এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরে মুসলিমগণ প্রকাশ্যে কাবার চত্বরে প্রকাশ্যে সালাত আদায় করতে থাকেন।
মসজিদে বানু যুরাইক: মদিনার ৩টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বপ্রথম মসজিদে যুরাইকে কুরআনের তালিমের ব্যবস্থা করা হয়। এ শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক ছিলেন রাফি ইবনে মালিক রা.। রাসূল (সা:) এর মদিনা আগমনের পর রাফি ইবনে মালিক রা.-এর শিক্ষাকার্যক্রম দেখে তিনি খুব খুশি হন।
মসজিদে কুবা : মদিনার ২য় শিক্ষাকেন্দ্র মসজিদে কুবা ছিল মদিনার দক্ষিণে কুবা পল্লীতে। সালিম মাওলা আবি হুজাইফা রা. সেখানকার শিক্ষক ও ইমাম ছিলেন।
সা’দ ইবনে যুরারা রা. এর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্র : তৃতীয় শিক্ষাকেন্দ্রটি ছিল মদিনার কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় এক মাইল উত্তরে আসআ’দ ইবনে যুরারা রা. এর ঘরে। এখানকার শিক্ষক ছিলেন মুস’আব ইবনে উমায়ের। মদিনায় শিক্ষক হিসেবে প্রেরণের পূর্বে রাসূল (সা:) তাকে ৩টি উপদেশ দেন। এক: মানুষকে কুরআন পড়াবে, দুই: ইসলামের তালিম দিবে, তিন: দ্বীনের তথ্য-জ্ঞানে পারদর্শী বানাবে। মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের নেতারা এখানে শিক্ষাগ্রহণ করতেন।
মসজিদে নববী কেন্দ্রীয় মাদরাসা: রাসূল (সা:) মদিনায় আগমনের পরে মসজিদে নববীতে কেন্দ্রীয় মাদরাসা চালু হয়। মসজিদের ভেতরে রাসূল (সা:) এর দিকে মুখ করে সাহাবাগণ বৃত্তাকারে বসে যেতেন। সাহাবারা কেউ কুরআন শিখতেন, কেউ ফারায়েজ বিষয়ে আবার কেউ স্বপ্নের তাবির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন।
আসহাবে সুফ্ফা : আবু হুরাইরা রা. এর মতে আসহাবে সুফ্ফার সংখ্যা ৭০ জন। তারা ব্যাপক হারে কুরআন হাদিস অধ্যয়ন ও গবেষণা করতেন। এর প্রত্যেকটি সাহাবি ছিলেন একেকজন একেকটা চলন্ত বিশ্বকোষের মত।
শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধদের জন্য বিশেষ শিক্ষা: রাসূল (সা:) শিশু-কিশোরদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাদেরকে তিনি ভীষণ আদর-স্নেহ করতেন, জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। তিনি বলেন, “যে তরুণ জ্ঞানার্জন ও ইবাদতের মাধ্যে প্রতিপালিত হয়, এমনকি সেই অবস্থায় বেড়ে ওঠে আল্লাহ তাকে চল্লিশজন সিদ্দিকের প্রতিদান দেন।” পাশাপাশি রাসূল (সা:) এর শিক্ষার মজলিসের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছিলেন বয়স্ক।
পারিবারিক শিক্ষালয় : রাসূল (সা:) মদিনায় হিজরতের পরে ঘরে ঘরে কুরআন শিক্ষার প্রচলন ও পারিবারিক মক্তব চালু হয়। ফলে সাহাবাগণ তাঁদের স্ত্রী, সন্তান, পৌত্রগণকে কুরআনের শিক্ষায় আলোকিত করে তোলেন।
মহিলা সাহাবগণের শিক্ষা : রাসূল (সা:) এর সময় মহিলা সাহাবিদের উপযোগী তা’লিমের ব্যবস্থা ছিলো।

রাসূল (সা:)-এর শিক্ষাপদ্ধতিরাসূল (সা:)-এর শিক্ষাপদ্ধতি
হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর শিক্ষা মিশন সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা কুরআনে কারিমে বলেন, “তিনিই সেই পবিত্র সত্তা, যিনি নিরক্ষর লোকদের মধ্য থেকে একজনকে নবী করে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদেরকে তার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনাবেন, তাদেরকে পবিত্র করবেন, তাদের শিক্ষা দেবেন কিতাব ও প্রজ্ঞা। যদিও ইতঃপূর্বে তারা ভ্রান্তিতে (অজ্ঞতায়) মগ্ন ছিলো।” (সূরা জুমা : ২) সুনানে ইবনে মাজাহর ২২৯ নং হাদিসে উল্লেখ আছে রাসূল (সা:) বলেন, “নিশ্চয় আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।” সহিহ মুসলিমে উল্লেখ আছে রাসূল (সা:) সম্পর্কে হযরত মুয়াবিয়া রা. বলেন, “তার জন্য আমার বাবা ও মা উৎসর্গিত হোক। আমি তার পূর্বে ও পরে তার চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক দেখিনি। আল্লাহর শপথ! তিনি কখনো কঠোরতা করেননি, কখনো প্রহার করেননি, কখনো গালমন্দ করেননি।” তার অনুপম শিক্ষানীতি ও পদ্ধতিতে মুগ্ধ ছিলেন তার পুণ্যাত্মা সাহাবি ও শিষ্যগণ। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তাকে সর্বোত্তম শিক্ষা ও শিষ্টাচার শিখিয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাফল্যের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। নিম্নে রাসূল (সা:)-এর অনুসৃত কয়েকটি শিক্ষাপদ্ধতি তুলে ধরা হলো:
সুন্দর আচরণ ও মহৎ চরিত্রের মাধ্যমে শিক্ষাদান : রাসূল (সা:) যেসকল পদ্ধতিতে মানুষকে শিক্ষাপ্রদান করতেন তার মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধিক স্পষ্ট পদ্ধতি হলো বাস্তব কাজের মাধ্যমে, চমৎকার স্বভাব-চরিত্রের মাধ্যমে শিক্ষাদান করা।
যথাযথ পরিবেশে শিক্ষাদান: উপযুক্ত পরিবেশ শিক্ষাদানের জন্য অপরিহার্য। রাসূল (সা:) শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের অপেক্ষা করতেন। হযরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। “নিশ্চয় বিদায় হজের সময় রাসূল (সা:) তাকে বলেন, মানুষকে চুপ করতে বল। অতঃপর তিনি বলেন, আমার পর তোমরা কুফরিতে ফিরে যেয়ো না।” (সহিহ বুখারি: ৭০৮০) অর্থাৎ রাসূল (সা:) শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থির হওয়ার এবং মনঃসংযোগ স্থাপনের সুযোগ দিতেন। অতঃপর উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে শিক্ষাদান শুরু করতেন।
থেমে থেমে পাঠদান: রাসূল (সা:) পাঠদানের সময় থেমে থেমে কথা বলতেন যেনো তা গ্রহণ করা শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হয়। খুব দ্রুত কথা বলতেন না যেনো শিক্ষার্থীরা ঠিক বুঝে উঠতে না পারে আবার এত ধীরেও বলতেন না যাতে কথার ছন্দ হারিয়ে যায়। বরং তিনি মধ্যম গতিতে থেমে থেমে পাঠ দান করতেন। হযরত আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা:) বলেন, “তোমরা কি জানো- আজ কোন দিন? …এটি কোন মাস? …এটি কী জিলহজ নয়? …এটি কোন শহর?” (সহিহ বুখারি : ১৭৪১)
ভাষা ও দেহভঙ্গির সমন্বয়: রাসূল (সা:) কোনো বিষয়ে আলোচনা করলে, তার দেহাবয়বেও তার প্রভাব প্রতিফলিত হতো। তিনি দেহ-মনের সমন্বিত ভাষায় পাঠ দান করতেন। কারণ, এতে বিষয়ের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে শ্রোতা শিক্ষার্থীগণ সঠিক ধারণা লাভে সক্ষম হয় এবং বিষয়টি তার অন্তরে গেঁথে যায়। যেমন, তিনি যখন জান্নাতের কথা বলতেন, তখন তার দেহে আনন্দের স্ফুরণ দেখা যেতো। জাহান্নামের কথা বললে ভয়ে চেহারার রঙ বদলে যেতো। যখন কোনো অন্যায় ও অবিচার সম্পর্কে বলতেন, তার চেহারায় ক্রোধ প্রকাশ পেতো এবং কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে যেতো।
কৌতুক ও রসিকতার মাধ্যমে শিক্ষাদান: রাসূল (সা:) মাঝে মধ্যে সঙ্গী-সাথীদের সাথে কৌতুক-রসিকতাও করতেন। তবে এর মধ্যে সত্য ছাড়া কিছুই উচ্চারণ করতেন না। আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূল (সা:) এর নিকট বাহন চাইলো। রাসূল (সা:) তাকে বললেন, আমি তোমাকে উষ্ট্রী শাবকের ওপর চড়াবো। লোকটি বললো, ইয়া রাসূল (সা:) আমি উষ্ট্রী শাবক দিয়ে কী করবো? রাসূল (সা:) বললেন, উটকে উষ্ট্রীই জন্ম দেয়।” (তিরমিযী)
শিক্ষার্থীর নিকট প্রশ্ন করা: রাসূল (সা:) পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীদের নিকট প্রশ্ন করতেন। যেনো তারা প্রশ্ন করতে এবং তার উত্তর খুঁজতে অভ্যস্ত হয়। কেননা নিত্যনতুন প্রশ্ন শিক্ষার্থীকে নিত্যনতুন জ্ঞান অনুসন্ধানে উৎসাহী করে। হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) জিজ্ঞেস করেন, হে মুয়াজ! তুমি কি জানো বান্দার নিকট আল্লাহর অধিকার কী? তিনি বলেন, আল্লাহ ও তার রাসূল ভালো জানেন। রাসূল (সা:) বলেন, তার ইবাদত করা এবং তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করা।’ (সহিহ বুখারি : ৭৩৭৩)
বিষয়বস্তুর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা: বিষয়বস্তুর গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকলে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে অনেক বেশি মনোযোগী হয়। একাগ্র হয়ে শিক্ষকের আলোচনা শোনে। রাসূল (সা:) পাঠদানের সময় বিষয়বস্তুর গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতেন। হযরত সাঈদ ইবনে মুয়াল্লা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা:) তাকে বলেন, “মসজিদ থেকে বের হওয়ার পূর্বে আমি তোমাদেরকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সূরাটি শিক্ষা দেবো। তিনি বলেন, আমি যখন বের হওয়ার ইচ্ছে করলাম রাসূল (সা:) আমার হাত ধরে বললেন, তোমাকে বলিনি! মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে তোমাকে কুরআনে সবচেয়ে মহান সূরা শিক্ষা দেবো। অতঃপর তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।” (সহিহ বুখারি : ৪৪৭৪)
আগ্রহী শিক্ষার্থী নির্বাচন: রাসূল (সা:) বিশেষ বিশেষ শিক্ষাদানের জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থী নির্বাচন করতেন যেন শেখানো বিষয়টি দ্রুত ও ভালোভাবে বাস্তবায়িত হয়। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা:) বলেন, “আমার উম্মতের মধ্য থেকে কে পাঁচটি গুণ ধারণ করবে এবং তার ওপর আমল করবে? তিনি বলেন, আমি বলি, আমি হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি আমার হাত ধরলেন এবং হাতে পাঁচটি বিষয় গণনা করলেন।” (মুসনাদে আহমদ : ৮০৯৫)
উপমা ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শিক্ষাদান: নবী করিম (সা:) অনেক সময় কোনো বিষয় স্পষ্ট করার জন্য উপমা ও উদাহরণ পেশ করতেন। কেননা উপমা ও উদাহরণ দিলে যে কোনো বিষয় বোঝা সহজ হয়ে যায়। হযরত সাহাল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, “আমি ও এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করবো। হযরত সাহাল রা. বলেন, রাসূল (সা:) তার শাহাদত ও মধ্যমা আঙুলের প্রতি ইঙ্গিত করেন।” (সহিহ বুখারি : ৬০০৫)
শিক্ষার্থীর প্রশ্ন গ্রহণ এবং প্রশ্নের জন্য প্রশংসা করা: শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের আলোচনা শুনে শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। রাসূল (সা:) শিক্ষাদানের সময় শিক্ষার্থীর প্রশ্ন গ্রহণ করতেন এবং প্রশ্ন করার জন্য কখনো কখনো প্রশ্নকারীর প্রশংসাও করতেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. থেকে বর্ণিত ‘এক ব্যক্তি রাসূল (সা:)কে প্রশ্ন করে, আমাকে বলুন! কোন জিনিস আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করে দিবে এবং কোন জিনিস জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে নিবে। নবী করিম (সা:) থামলেন এবং তার সাহাবাদের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন, তাকে তওফিক দেয়া হয়েছে বা তাকে হেদায়েত দেয়া হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম : ১২) লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূল (সা:) প্রশ্নটি শুনেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেননি। বরং তিনি চুপ থাকেন এবং সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রশ্নকারীর প্রশংসা করেন।
আমলের মাধ্যমে শিক্ষাদান: শিক্ষার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো প্রাক্টিক্যাল বা প্রায়োগিক শিক্ষা। রাসূল (সা:) অধিকাংশ বিষয় নিজে আমল করে সাহাবিদের শেখাতেন। শেখাতেন হাতে-কলমে। এ জন্য হযরত আয়েশা রা. বলেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন। রাসূল (সা:) বলেন, “তোমরা নামাজ আদায় কর, যেমন আমাকে আদায় করতে দেখো।” (সুনানে বায়হাকি : ৩৬৭২)
রেখাচিত্রের সাহায্যে স্পষ্ট করা: কখনো কখনো কোনো বিষয়কে স্পষ্ট করার জন্য রাসূল (সা:) রেখাচিত্র ও অঙ্কনের সাহায্য নিতেন যেন শ্রোতা ও শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে তা রেখাপাত করে। হযরত আবু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল (সা:) একটি চারকোনা দাগ দিলেন, তার মাঝ বরাবর দাগ দিলেন যা তা থেকে বের হয়ে গেছে। বের হয়ে যাওয়া দাগটির পাশে এবং চতুষ্কোণের ভেতরে ছোট ছোট কিছু দাগ দিলেন। তিনি বললেন, এটি মানুষ। চতুষ্কোণের ভেতরের অংশ তার জীবন এবং দাগের যে অংশ বের হয়ে গেছে সেটি তার আশা।” (সহিহ বুখারি : ৬৪১৭)
বার বার পাঠে উদ্বুদ্ধকরণ: রাসূলে আকরাম (সা:) শিক্ষার্থীদের মেধা ও স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর না করে বার বার পাঠ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন; বরং বার বার পাঠ করে কঠিন বিষয়কে আয়ত্ত করতে বলতেন। হযরত আবু আইয়ুব আনসারি রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা:) বলেন, “তোমরা কুরআনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হও। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন তা উটের চেয়ে দ্রুত স্মৃতি থেকে পলায়ন করে।” (সহিহ বুখারি : ৫০৩৩)
পারস্পরিক সংলাপের মাধ্যমে শিক্ষাদান: রাসূল (সা:) এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপদ্ধতি হলো সংলাপ ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষাদান। যেমন- আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, “তোমাদের কারোর বাড়ির দরজায় যদি নদী থাকে, আর সেখানে যদি সে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে, তোমরা কি মনে কর তার শরীরে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকে? সাহাবগণ জবাব দিলেন, তার শরীরে কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকে না। তখন রাসূল (সা:) বললেন, তদ্রুপ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সকল ভুল-ত্রুটি ও পাপ মুছে ফেলেন।”


আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, “তোমাদের কারোর বাড়ির দরজায় যদি নদী থাকে, আর সেখানে যদি সে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে, তোমরা কি মনে কর তার শরীরে কোন ময়লা অবশিষ্ট থাকে? সাহাবগণ জবাব দিলেন, তার শরীরে কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকে না। তখন রাসূল (সা:) বললেন, তদ্রুপ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সকল ভুল-ত্রুটি ও পাপ মুছে ফেলেন।”


অতীত ঘটনা ও কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে শিক্ষাদান : রাসূল (সা:) অনেক সময় সাহাবীগণকে অতীতের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর বাস্তব ও সত্য ঘটনা ও ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। আল্লাহ নিজেই এই পদ্ধতিতে তাঁর রাসূলকে শিক্ষা দিয়েছেন।
মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষাদান : মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে বহু জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয় সহজ হয়ে যায় এবং উত্তম সমাধান পাওয়া যায়। রাসূল (সা:)ও বহু বিষয় মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতেন। সমাধান বের করতেন। যেমন- হুনায়নের যুদ্ধের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন নিয়ে আনসার সাহাবায়ে কেরামের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিলে রাসূল (সা:) তাদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনা করেন। একইভাবে বদর যুদ্ধের বন্দিদের ব্যাপারে সাহাবিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
গুরুত্বপূর্ণ কথার পুনরাবৃত্তি : রাসূল (সা:) তার পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিন বার পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি করতেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “রাসূল (সা:) তার কথাকে তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন যেনো তা ভালোভাবে বোঝা যায়।” (শামায়েলে তিরমিজি : ২২২)
ভুল সংশোধনের মাধ্যমে শিক্ষাদান: রাসূল (সা:) ভুল সংশোধনের মাধ্যমে শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেন। হযরত আবু মাসউদ আনসারি রা. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূল (সা:)-এর নিকট অভিযোগ করে যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারি না। কারণ অমুক ব্যক্তি নামাজ দীর্ঘায়িত করে ফেলে। আমি উপদেশ বক্তৃতায় রাসূল (সা:)কে সেদিনের তুলনায় আর কোনোদিন বেশি রাগ হতে দেখিনি। রাসূল (সা:) বলেন, “হে লোক সকল! নিশ্চয় তোমরা অনীহা সৃষ্টিকারী। সুতরাং যে মানুষ নিয়ে (জামাতে) নামাজ আদায় করবে, সে তা যেনো হালকা করে (দীর্ঘ না করে)। কেননা তাদের মধ্যে অসুস্থ, দুর্বল ও জুল-হাজাহ (ব্যস্ত) মানুষ রয়েছে।” (সহিহ বুখারি : ৯০)
শাস্তিদানের মাধ্যমে সংশোধন: গুরুতর অপরাধের জন্য রাসূল (সা:) কখনো তার শিষ্য ও শিক্ষার্থীদের শাস্তি প্রদান করে সংশোধন করতেন। তবে রাসূল (সা:) অধিকাংশ সময় শারীরিক শাস্তি এড়িয়ে যেতেন। ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেন। যেমন- উপযুক্ত কারণ ব্যতীত তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করায় হযরত কাব ইবনে মালেক রা.সহ কয়েকজনের সঙ্গে রাসূল (সা:) কথা বলা বন্ধ করে দেন, যা শারীরিক শাস্তির তুলনায় অনেক বেশি ফলপ্রসূ ছিলো।

শিক্ষাদান পদ্ধতিতে রাসূল (সা:)-এর সাফল্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত থেকে। তাহলো, ‘স্মরণ করো! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সঞ্চার করলেন। তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাইয়ে পরিণত হলে। প্রকৃতার্থে তোমরা অবস্থান করছিলে অগ্নিকুণ্ডের প্রান্ত সীমায়। অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করলেন। এভাবে আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য তার নিদর্শন স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সঠিক পথের সন্ধান পাও। (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)
যুগে যুগে মানবসমাজে রাসূলগণ আল্লাহর বান্দাদের জন্য শিক্ষার ধারা অব্যাহত রাখেন। এ শিক্ষা লাভের মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হতে সক্ষম হয়। আর মানুষ সেই আমানত বহন করার দায়িত্ব গ্রহণ করে যা গ্রহণ করতে আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা খাঁটি ইবাদত হিসেবে গণ্য। এরশাদ হচ্ছে: “নিশ্চয়ই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টিতে এবং দিবারাত্রির আবর্তনে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। (সূরা আলে ইমরান : ১৯০-১৯১) ইসলাম যেমন সার্বজনীন, ইসলাম অনুমোদিত শিক্ষাব্যবস্থাও তেমনি সার্বজনীন। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শন ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান- এর আলোকে বিন্যস্ত। ফলে তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, খিলাফত, ইখওয়াত, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, সৎকাজে আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, সামাজিক বিকাশ, টেকসই উন্নয়ন, প্রকৃতি বিজ্ঞান সবই ইসলামী শিক্ষার উপজীব্য। বিজ্ঞানের যত শাখা অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় নির্ণয় করা হয়েছে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায়ও তা যথাযথ রয়েছে। রসায়ন, জীব, পদার্থ, নৃতত্ত্ব, চিকিৎসা, গণিত, তড়িৎ, যন্ত্র, স্থাপত্য বিদ্যাসহ বিজ্ঞানের সকল শাখার বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মানুষের সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে পরিচালনার জন্য কলা ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনা ইসলামী শিক্ষায় যথাযর্থ ভাবে আলোচিত হয়েছে। ৮৩০ সালে খলিফা আল মামুনের প্রতিষ্ঠিত বায়তুল হিকমা সমগ্র দুনিয়ার জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছিল। প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞান আরবিতে এখানেই পাওয়া যায়। নিজামুল মুলক প্রতিষ্ঠিত বাগদাদের নেজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ছিল। ইউরোপের ছাত্ররা কেউ এখান থেকে পড়ে গেলে চতুপার্শ্বের লোকজন তাকে দেখতে আসত। তিনি শিক্ষাদীক্ষাকে উৎসাহিত করেন। নিরক্ষরতা দূর করার জন্য যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেন। তারা মদিনার শিশুদের লিখতে পড়তে শেখাতেন।

রাসূল (সা:)-এর শিক্ষাক্রমের সাফল্যের কারণ
শিক্ষাক্রমের সুস্পষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, যা ছিল মহান, শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকামী।
শিক্ষা ছিল সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, তা হচ্ছে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় জগতে সমগ্র মানবতার কল্যাণ সাধন।
শিক্ষকের নিষ্ঠা, ইখলাস ও জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি তার বিনয় এবং শিক্ষাদানকে মহান আল্লাহর ইবাদাত হিসেবে গ্রহণ করা।
উম্মতের বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়ের সাথে শিখন বিষয়সমূহ ও ঈড়হঃবহঃং-এর সমন্বয় ও সঙ্গতি সাধন।
শিক্ষাক্রমের সাথে জড়িত সকলের সাংস্কৃতিক ও আকিদাগত অভিন্নতা।
জ্ঞানসমৃদ্ধ স্বাধীন বিবেকবান সত্তা ও জাতিরূপে গড়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টা ও সাধনা।


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিবেন।” (সূরা মুজাদালা : ১১) রাসূল (সা:) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।”
(সহিহ বুখারি ২/৭৫২)


 

মুহাম্মদ (সা:)-এর নেতৃত্ব
হযরত মুহাম্মদ (সা:) বিশ্ববাসীর জন্য নেতৃত্বের এক অনন্য নিদর্শন। ঊনবিংশ শতকের বিশিষ্ট জার্মান লেখক, কবি ও রাজনীতিবিদ গ্যাটে বিশ্বনবীর (সা:) অসাধারণ নানা সাফল্য ও মর্যাদার প্রাচুর্যে বিমুগ্ধ হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেছেন, “আমরা ইউরোপীয়রা আমাদের সব ধ্যান-ধারণা নিয়েও এখনও সেইসব বিষয় অর্জন করতে পারিনি যা অর্জন করেছেন মুহাম্মদ এবং কেউই তাঁকে কখনও অতিক্রম করতে পারবে না। আমি ইতিহাসে অনুকরণীয় মানুষের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত খুঁজতে গিয়ে এক্ষেত্রে কেবল নবী মুহাম্মদকেই খুঁজে পেয়েছি; আর এভাবেই সত্য অবশ্যই বিজয়ী হবে ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করবে। কারণ, মুহাম্মদ (সা:) সারা বিশ্বকে বশ করেছেন স্বর্গীয় বা ঐশী একত্ববাদের বাণীর মাধ্যমে। এরকম গুণাবলি সে সময় মক্কাবাসীর মাঝে বিরল ছিল। এইসরল প্রকৃতির যুবকের সুন্দর চরিত্র, সদাচরণ তার স্বদেশবাসীর প্রশংসা অর্জন করে এবং তিনি সর্বসম্মতিক্রমে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি পান।” বিশ্বখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, “যদি আগামী একশ বছরের মধ্যে শুধু ইংল্যান্ড নয়, সারা ইউরোপকে শাসন করার সম্ভাবনা কোনো ধর্মের থেকে থাকে, তাহলে সে ধর্ম হবে শুধু ইসলাম।”
অধ্যাপক জাওয়াদ আলী বলেন, “তখন তিন ধরনের নেতৃত্ব ছিল বা পারিবারিক প্রধানত্ব গোত্রীয় প্রধানত্ব, রাষ্ট্রপ্রধানত্ব। কি রাসূল (সা) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর আরবে এমন কোনো নেতৃত্বের অবস্থা রাখেননি। তিনি নবধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ শুরু করেন। মহানবী মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য যে সমস্ত কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন তার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান। সেগুলো হলো- ১) গণতন্ত্রের সমন্বয়, ২) রাষ্ট্রনীতি, ৩) সমরনীতি, ৪) স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ৫) পররাষ্ট্রনীতি, ৬) কূটনীতি, ৭) অমুসলিমদের প্রতি আচরণ, ৮) শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি।
মুহাম্মদ (সা) হলেন নেতৃত্বের মডেল : রাসূল (সা:) হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের মডেল। তার মাধ্যমে নেতৃত্বের সমস্ত বৈশিষ্ট্যাবলির সমাবেশ ঘটেছিল। একজন অমুসলিম গবেষক মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্র্রভাবশালী ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য খ্র্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দ থেকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সমগ্র্র মানবসভ্যতার বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা করেন। তার সেই নিরপেক্ষ গবেষণায় দেখা যায় যে, ষষ্ঠ শতকের দিকে একজন আশ্চর্যজনক ব্যক্তিত্ব¡ মানবসভ্যতার নেতৃত্বে¡র প্র্রদান করেন। যার নেতৃত্ব¡ প্রদানের কোনো প্র্রকার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি জনগণকে তার নেতৃত্ব¡ দ্বারা উৎসাহিত করতেন এবং যিনি সভ্যতার ইতিহাসে একের পর এক বিস্ময়কর বিজয়ের সূচনা ঘটান। ভারত উপমহাদেশের সীমান্ত থেকে শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এই বিশাল সাম্রাজ্য তিনি শাসন করেছেন। ধর্মীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও, তিনি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তার এই নেতৃত্বে¡র দক্ষতা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে স্বীকৃতি দেয়। নেতা হিসেবে তার অনন্য সাধারণ কিছু গুণাবলি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। যেমন- ১. অধস্তনদের প্রতি দয়াপরশ, ২.ক্ষমাকারী, ৩. পরামর্শকারী, ৪. আল্লাহর ওপর ভরসাকারী। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, রাসূলকে তিনি পাঠিয়েছেন- ১. সত্যের সাক্ষ্যপ্রদানকারী ২. সুসংবাদ প্রদানকারী, ৩.ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। (সূরা আহযাব : ৪৫, ৪৬)
তার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যে সহযোগীদের প্রতি কোমলতা ও বাতিলের প্রতি দৃঢ়তার পরিচয় পাই আমরা পবিত্র কুরআনের সূরা ফাতহ এর ২৯ নং আয়াতে। মোদ্দাকথা, ইসলামি নেতৃত্বের ৫টি অপরিহার্য গুণাবলির উত্তম ও পরিপূর্ণ আধার ছিলেন প্রিয়নবী সা:। গুণগুলো হলো- ১) সততা, ২) ধৈর্য, ৩) উৎসাহব্যঞ্জকতা, ৪) জ্ঞান এবং ৫) বাগ্মিতা তথা বাকপটুতা।
যদিও রাসূল (সা:)-এর বিশ্বসেরা নেতৃত্বের অসাধারণ গুণাবলিকে কোনো কাগজের ফ্রেমে আবদ্ধ করা অসম্ভব, তবুও তার নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ হচ্ছে :
মীমাংসার ক্ষেত্রে অনন্য : হাজরে আসওয়াদ সংস্থাপন নিয়ে যখন মক্কার গোত্রসমূহ বিবাদে লিপ্ত হয়েছিল, কিশোর বয়সেই নবী (সা:) নিজ হাতে চাদর বিছিয়ে সে জটিলতার সুষ্ঠু সমাধান করে তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
রাষ্ট্রগঠনে নেতৃত্ব: আমরা যদি সিরাতে পাককে (সা:) যথাযথ মূল্যায়ন করতে চাই, তবে যেমন আমাদের দেখতে হবে যে, মাত্র সাড়ে সাত থেকে আট বছর সময়কালের মধ্যে হুজুর আকরাম (সা:) এমন একটি বিশাল রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, যার আয়তন ছিল আমাদের বাংলাদেশের মতো অন্তত ১৬টি দেশের সমান। এত স্বল্প সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি স্রোতের বিপরীতে একদল জনশক্তি গড়ে তুলে একটি সফল ও কল্যাণ রাষ্ট্রগঠন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এটি তার কালজয়ী নেতৃত্বের উদাহরণ।
বিচারব্যবস্থার নেতৃত্ব: একজন পূর্ণাঙ্গ মহামানব হিসেবে তিনি ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক, সাথে সাথে তিনি ন্যায়পরায়ণ প্রধান বিচারপতিও ছিলেন। তার জীবদ্দশায় আল্লাহর বিধান অনুযায়ী অনেক বিচার ফয়সালা করেছেন। তিনি ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে কোনদিন নিজের আহাল, আত্মীয়-পরিজন ও জলিল-কদর কোনো সাহাবির পক্ষও অবলম্বন করেননি। তিনি বলতেন, ‘যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করে, তবে আমি তার বেলায়ও হাত কাটার নির্দেশ দিবো।’ এ জন্য তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠতর মহামানবের সাথে সাথে একজন শ্রেষ্ঠ প্রধান বিচারপতিও বটে।
শিক্ষাব্যবস্থার নেতৃত্ব: তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর তৈরি একজন আদর্শ শিক্ষক। ইসলামের শিক্ষার আদি কেন্দ্র হলো মসজিদ। বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে করীম (সা) নবুওয়ত লাভের পরে ক্বাবা শরিফকে প্রথমে শিক্ষাকেন্দ্র রূপে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, মক্কা নগরীতে তিনি ‘দারুল আরকাম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন। পরে তিনি মদিনায় হিযরত করলে প্রথমে কুবা নামক স্থানে সর্বপ্রথম একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে তিনি মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আসরের নামাজের পরে অধিকাংশ সময় এই মসজিদে শিক্ষাদানে রত থাকতেন।
সাম্য ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব: তাঁর আবির্ভাবে প্রবাহিত হলো মানবসমাজে শান্তি, সততা ও মমতার শীতল হাওয়া। গড়ে উঠল মানুষে মানুষে সাম্য, মৈত্রী, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের মহান বন্ধন। ‘ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে (আরোহীর অভাবে) বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা), হযরত আলী (রা), হযরত আবু লুবাবা (রা) তিনজনই পালাক্রমে একটি উটের ওপর আরোহণ করে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে যখন রাসূল (সা)-এর উট টানার পালা আসত, তখন রাসূল (সা)-এর হুকুমে সাহাবি হযরত আলী ও আবু লুবাবা উটে আরোহণ করতেন। অতঃপর হযরত আলী ও আবু লুবাবা উট টানলে রাসূল (সা) উটে আরোহণ করতেন।’ (তাবকাতে ইবনে সা’দ- ২/২১)
সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা:)-এর নেতৃত্ব: মহানবী (সা:) তার সততা অনুপম চরিত্রমাধুর্য এবং অসাধারণ দেশপ্রেমিক সময়ের চাহিদানুসারে মানবতার কল্যাণে যথার্থ কর্মসূচি বিশ্বের ইতিহাসে প্রদীপ্ত ভাস্কর হয়ে রয়েছেন। তার এ মহৎ গুণাবলির দ্বারা আরব জাতিকে একটি সুশৃঙ্খল নীতিবান ও সুসভ্য জাতিতে পরিণত করেছিল।
অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে নেতৃত্ব: প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা:) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ছিলেন। একজন যোগ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে একটি সুন্দর ভারসাম্য অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়ন করে গেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, রাসূল (সা:)-এর অতুলনীয় নেতৃত্বের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যে কারণে মদিনার লোকেরা সাগ্রহে তাঁর নেতৃত্ব বরণ করে নিয়েছিল। তারা তাঁর যোগ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তা করেছিল। ভয় কিংবা জোরজবরদস্তিতে না। নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা না; বরং অন্যের অনুসরণের জন্য নজির তৈরি করে দেয়া। ‘দ্যা লিডারশিপ অফ মুহাম্মাদ’ বইতে জন আদাইর বলেছেন, ‘শ্রম, বিপদ ও কঠিনতায় লোকদের সাথে ভাগাভাগি করার মাধ্যমে মুহাম্মাদ ভালো নেতৃত্বের এক সার্বজনীন মূলনীতি দেখিয়েছেন। মানুষ মনে মনে আসলে তাদের নেতাদের কাছ থেকে এটাই চায়। যখন তা হয় না, তখন বিরূপ মন্তব্য আসে’। ‘Leadership & The New Science’ বইতে মার্গারেট হুইটলি বলেছেন, ‘চিরাচরিত নেতারা নজর দেন ভূমিকা আর দায়িত্বের ওপর। নতুন নেতারা মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যেটা হয়ে উঠে সাফল্যের আসল শক্তি।’


স্মরণ করো! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সঞ্চার করলেন। তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাইয়ে পরিণত হলে। প্রকৃতার্থে তোমরা অবস্থান করছিলে অগ্নিকুণ্ডের প্রান্ত সীমায়। অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করলেন। এভাবে আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য তার নিদর্শন স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সঠিক পথের সন্ধান পাও। (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)


 

উপসংহার
রাসূল (সা:)-এর অতুলনীয় শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পতনোন্মুখ একটি জাতিকে সোনালি যুগের মানুষরূপে গড়ে তুলেছিলেন। তার শিক্ষা ও সাফল্য শুধু ইহকালীন সাফল্য বয়ে আনেনি; বরং তার পরিব্যাপ্তি ছিলো পরকালীন জীবন পর্যন্ত। সুতরাং মুসলিম উম্মাহকে যদি তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে হয় এবং উভয় জগতের সাফল্য অর্জন করতে হয়, তবে অবশ্যই রাসূল (সা:)-এর শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা:)-এর শ্রেষ্ঠ, সুন্দর ও চির আধুনিক সফল শিক্ষাক্রম থেকে আমাদের শেখার ও নেয়ার অনেক কিছুই আছে। যদি আমরা তার শিক্ষাক্রমকে সামনে রেখে আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রমকে ঢেলে সাজাতে পারি তাহলেই আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটবে।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply