হঠাৎ গ্যাসের দাম বাড়ায় চাপে পড়বে অর্থনীতি দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণ মানুষের -হারুন ইবনে শাহাদাত

জ্বালানি শুধু জ্বলেই না, অন্যকেও জ্বালায় এবং চালায়। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রাকৃতিক গ্যাস সহজলভ্য ও নিরাপদ আধুনিক জ্বালানি। গ্যাস ছাড়া নাগরিক জীবনের একটি দিনও এখন কল্পনা করা যায় না। গ্যাস জীবনযাপনের এক নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। গ্যাস নিজে জ্বলে এবং অন্যকে জ্বালিয়ে মানবসভ্যতাকে করছে সমৃদ্ধ। তাই বিনা মেঘে ব্রজপাতের মতো গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি দেশের মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছে। কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ প্রদত্ত উপহার প্রাকৃতিক গ্যাস রান্নাঘরের চুলায় অন্ন ফুটিয়ে সচল রেখেছে মানবদেহ। শিল্পকারখানা আর যানবাহনের চাকা সচল রাখতেও চাই গ্যাস। এক কথায় আমাদের জীবনচাকার এই অপরিহার্য উপাদানের দাম বাড়লে এর প্রভাব কোনো এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই টান পড়ে। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়েই সরকারের গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু গত ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জনগণের দাবিকে উপেক্ষা করে দুই ধাপে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ভর্তুকি এবং লোকসান না থাকার পরও বিইআরসির এমন ঘোষণায় কলকারখানার চাকা ঘোরা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও, জনগণের মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। গণমতকে বিবেচনায় নিয়ে আদালত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর ওপর স্থগিত আদেশ দিয়েছেন। প্রথম ধাপের গ্যাসের বর্ধিত মূল্য ১ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।
বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে আবাসিক খাতে গ্যাসে দাম করা হয়েছে, দুই চুলার ক্ষেত্রে ৮০০ এবং এক চুলার ক্ষেত্রে ৭৫০ টাকা। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৯৯ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা, সার খাতে ২ টাকা ৬৪ পয়সা, শিল্পে ৭ টাকা ২৪ পয়সা, চা বাগানে ৬ টাকা ৯৩ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৪ টাকা ২০ পয়সা, সিএনজিতে ৩৮ টাকা এবং গৃহস্থালিতে (মিটারভিত্তিক) ৯ টাকা ১০ পয়সা দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ১ জুন থেকে আবাসিক খাতে গ্যাসে দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই চুলার ক্ষেত্রে ৯৫০ এবং এক চুলার ক্ষেত্রে ৯০০ টাকা। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ঘনমিটার ৩ টাকা ১৬ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, সার খাতে ২ টাকা ৭১ পয়সা, শিল্পে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা, চা বাগানে ৭ টাকা ৪২ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৭ টাকা ৪ পয়সা, সিএনজিতে ৪০ টাকা এবং গৃহস্থালিতে (মিটারভিত্তিক) ১১ টাকা ২০ পয়সা। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি বেশ এগিয়ে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিও বেশ নিয়ন্ত্রণে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসা পরিচালন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে বেড়ে যাবে পণ্যের মূল্য। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দাম বাড়ানোর বিপক্ষে বিশেষজ্ঞরা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, গ্যাসের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, ‘সরকার নিয়ন্ত্রিত সব প্রতিষ্ঠান লাভজনক অবস্থায় থাকলেও শুধুমাত্র দাতাদের পরামর্শে ক্রমাগত জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে, যার ঋণাত্মক চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি।’
প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘চুরি আর লুটপাটকে বৈধতা দেয়ার জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘সরকার মূলত বেসরকারি খাত এবং বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে; তাদের স্বার্থেই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। গত ১০ বছরে সরকার কোনো ধরনের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন না করে গ্যাসের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিতে আগামীতে দেশজ কোনো গ্যাস পাওয়া যাবে না এ রকম ধারণা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চলছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, ‘দেশে গ্যাসসঙ্কট থাকলেও সরকার যেভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাচ্ছে সে রকম নয়। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্স সফল হলেও সরকারি এই সংস্থাকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকটি স্থানে বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সফলতাকে চাপা দিয়ে বাপেক্সের অনুসন্ধান করা গ্যাস ক্ষেত্রগুলো রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে গ্যাজপ্রম কিছু কিছু জায়গায় প্রযুক্তিগত সঙ্কটে পড়ে বাপেক্স প্রকৌশলীদের সহায়তা নিয়েছে।’
তেল-গ্যাস কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘দেশের গ্যাস খাত জাতীয় মালিকানায় বিকাশ করলে সুন্দরবিনাশী প্রকল্প, দেশধ্বংসী রূপপুর প্রকল্প, এলএনজি কোনো কিছুই দরকার হবে না। সরকারের নীতিমালা জনগণ বা দেশের স্বার্থ চিন্তা করে নয়, বরং কতিপয় দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ পরিকল্পনাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য দাঁড় করানো হচ্ছে।’
গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক স্থপতি মুবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘আসলেই কি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল?  গ্যাস ব্যবহার হয় কম কিন্তু চুরি হয় অনেক বেশি। তিনি আরো বলেন, আমরা কিন্তু কথা বলছি গ্যাসের ডমেস্টিক ব্যবহার নিয়ে। কিন্তু বিষয়টি শুধু ডমেস্টিক নয়। গ্যাসের দাম বাড়ার সাথে সাথে তেলভিত্তিক গাড়িরও ভাড়া বাড়বে। কারণ তারা একটা সুযোগ পেয়ে যায়। অপরদিকে দেখা গেছে তেলের দাম কমানোর পরও গাড়ির ভাড়া কমেনি। আমাদের দেশে জ্বালানির চাহিদা প্রচণ্ড।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। এ দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়বে পণ্যের দাম। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ। কারণ আমরা সবসময় দেখি গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুট করে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হয়। বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। বর্তমানে রফতানিতে একটি বিরূপ প্রভাব রয়েছে। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে রফতানি আয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। যদি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে দর কষাকষি করে মূল্য বাড়াতে না পারে তাহলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানোয় অবশ্যই জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। যারা সীমিত আয়ের লোক তাদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে। কারণ ১০০ টাকা বৃদ্ধি কিন্তু কম নয়। এক্ষেত্রে সরকার বিকল্প কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতো। বিশেষ করে গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। কিন্তু গ্যাস ব্যবহারে তেমন কোনো গাইডলাইন নেই। আমরা শুধু ব্যবহারই করে যাচ্ছি।’
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে সবধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত  হবে। ব্যবসা করার খরচ বেড়ে যাবে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়বে। সবধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। গ্যাসের দাম ১ টাকা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বে ২ টাকা। এমন এক সময় গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো, যখন একদিকে অ্যাপারেলের দাম বাড়ছে অন্যদিকে ব্যবসা করার খরচ বাড়ছে। গত বছর অ্যাপারেলের দাম সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে দেশের গার্মেন্টস খাত মারাত্মক চাপে পড়ে যাবে। আমাদের সক্ষমতা কমে যাবে। গ্যাসের এই দাম বাড়ার কারণে পরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সবধরনের পণ্যের দাম বাড়বে।’

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে
অর্থনীতিবিদরা বলেন, নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। এতে অর্থনীতির পাশাপাশি জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এক বছরের মধ্য দুই দফায় এমন করে মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা অনেক দিন ধরেই আলোচনায় ছিল। যার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সব সেক্টরের ওপরই পড়বে। শিল্প খাতের সঙ্গে সঙ্গে সব থেকে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। কারণ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে যদি অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে যায়, তা সাধারণ মানুষের জন্য বিপর্যয়। আর এ কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এ অর্থনীতিবিদের।
তিনি বলেন, আমাদের যখন কিছুর দাম বাড়ে তখনই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কিছুরই দাম বাড়া শুরু করে। তাই এবারের গ্যাসের দাম বাড়লে অন্যান্য পণ্যের দাম কেমন বাড়ছে তা দেখতে হবে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম। তাই গ্যাসের দাম বাড়ায় জনজীবনে যে প্রভাব পড়বে, তা কমাতে সরকার চাইলে তেলের দাম কমাতে পারে।
এদিকে শুনানির সঠিক নিয়মকানুন না মেনেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে অভিযোগ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নতুন সভাপতি গোলাম রহমানের। তিনি বলেন, প্রতি বছরই জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। যখন গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হয়, তখন থেকেই শুনানি চলছিল। শুনানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কেউ এ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে ছিলেন না। নিয়ম না মেনে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। তাই এর বিরুদ্ধে ক্যাব আদালতে যাবে। তিনি বলেন, এর আগেও দেখা গেছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর গাড়ি ভাড়া বেড়ে গেছে।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাতলুব আহমাদ বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গ্যাসের দাম বাড়ালে যে শুধু শিল্প খাত বিপর্যস্ত হবে তা নয়, সাধারণ মানুষের ওপরও তার প্রভাব পড়বে। ফলে সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেকাংশে বেড়ে যাবে। বিশেষ করে পরিবহন খরচ, বাণিজ্যিক উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তা ছাড়া একজন শিল্পমালিকের উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ক্রেতার কাছ থেকে মূল্য না পেলে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর। তাই এ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি একদিকে যেমন শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসবে, তেমনি শ্রমিকদেরও চাপের মধ্যে ফেলে দেবে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, বাণিজ্যিকসহ সব ধরনের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার ফলে দেশের বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তেমনি উৎপাদনের সক্ষমতাও হ্রাস পাবে। আর উৎপাদন হার হ্রাস পেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রফতানিযোগ্য খাতগুলোর বাজার পেতেও প্রতিযোগিতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।

বিরোধী দলের প্রতিবাদ
দেশে এখন নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চলছে। বিরোধী দলের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার আগেও পুলিশের অনুমতি লাগে। এমন অবস্থায় জনগণের প্রতিবাদের ভাষা বলতে গেলে হারিয়ে গেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাধারণত বিরোধী দলগুলো জনগণের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। গণতান্ত্রিক সরকার বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। কিন্তু দেশে এখন যে অবস্থা চলছে, তাতে বিরোধী দলকে সরকার শত্রু বলে গণ্য করে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া দূরের কথা শোনতেও চায় না। গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর পরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কৌশলগত কারণে সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট হরতালের মতো কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। কিন্তু পুলিশের বাধার মধ্যেও রাজপথে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা যৌক্তিক নয়। এখন গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কারণ কোম্পানিগুলো লাভ করছে, আমাদের ট্যাক্সদাতারা টাকা দিচ্ছে। কিন্তু তারা ২২.৭ ভাগ দাম বাড়িয়েছে।’ তিনি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করায় আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের প্রতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের শামিল। সরকারের এ অন্যায় সিদ্ধান্তে দেশের গোটা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়বে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে জনগণ বিক্ষুব্ধ।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আধাবেলা হরতাল আহবান করেছিল। হরতালে টিয়ার শেল ও জলকামান নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ)সহ বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীদের আটক করেছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE