হবে বনাম হবে না অজানা শঙ্কা ও ভাবনা

মাহমুদুর রহমান দিলওয়ার

এক লোক সিঙ্গাপুরের রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। একটা সিগন্যাল অতিক্রম করার সময় সে দেখল, রাস্তার পাশে রাখা ক্যামেরা তার ছবি তুলেছে। লোকটা তড়িঘড়ি করে স্পিডমিটার চেক করল। কিন্তু না, সবই ঠিক আছে। তাহলে ছবি তুলল কেন? লোকটার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। সে ভাবল, কোথাও কোনো সমস্যা আছে। তাই সে বিষয়টা আরেকটু পরীক্ষা করার জন্য একটু ঘুরে আবার রাস্তায় এল। আবারও ক্যামেরা তার ছবি তুলল। এবার গাড়ির গতি আগের চেয়ে কম ছিল। তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সে ভাবল, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো বড় রকমের ঝামেলা হয়েছে। এভাবে সে আরও তিনবার একই সিগন্যাল অতিক্রম করল। প্রতিবার গতি আগেরবারের চেয়ে কমিয়ে দিয়ে। কিন্তু ক্যামেরা প্রতিবারই তার ছবি তুলল। এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর লোকটার ঠিকানায় তার নামে পাঁচটা চিঠি এল।  সিটবেল্ট না বেঁধে ড্রাইভিং করার অপরাধে পাঁচটা চিঠিতেই তাকে জরিমানা করা হয়েছে!
গল্পটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা অনেক সময় ভুল পথে পা বাড়াই। অজানা ভুল আমাদের মহাবিপদের দিকে ঠেলে দেয়। অসতর্কতা কিংবা অদূরদর্শিতার কারণে আমাদের অনেক মাশুল দিতে হয়। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভুল সংশোধন না করে আমরা অনেক ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে অগ্রসর হই। যা কখনও কল্যাণকর নয়। আমাদের বোধোদয় হয়; কিন্তু বড্ড বিলম্বে। আমাদের আত্মপর্যালোচনায় ত্র“টি উপলব্ধিতে এলে সংশোধন করার চেষ্টা করি। কিন্তু বিলম্ব হওয়ায় তা অমঙ্গলকর হয়ে যায়। দেশীয় রাজনীতিতে এই চর্চা খুব বেশি হচ্ছে। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি-সংঘাত আর ভেদাভেদেই এ দেশের রাজনীতি ডুবে আছে। প্রতিহিংসার চর্চা রাজনীতিকে কলুষিত করছে। যার ফলে আমাদের রাজনীতি ক্রমশ সংকটের মুখোমুখি!
২৭ সেপ্টেম্বর। রাজধানীর নয়া পল্টনে ৪ দলীয় ঐক্যজোটের জনসভায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে নির্বাচন হবে না, হবে না, হবে না।’ খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই দেশে নির্বাচন হবে, হবে, হবে। জনগণ নির্বাচন করবে, করবে। রাজনীতি করলে খালেদা জিয়াকে সেই নির্বাচনে আসতেই হবে।’ আবার প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপি নেতারা বলেছেন, ‘আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচন হবে না। আমরা এই দাবিতে বহাল আছি। সেটা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না, হবে না, হবে না।’ সম্প্রতি বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দ্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। মাথা ছাড়া মানুষের  দেহের যেমন মূল্য নেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অস্তিত্ব এ রকমই। মৃত গাছে ফুল ফোটানোর আশা করে লাভ নেই।’ যদিও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিচর্যা করে মরা গাছে ফুল  ফোটানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা দাবি বাস্তবায়নের আশা জাগিয়ে রাখছেন।
‘হবে’ বনাম ‘হবে না’ পরস্পর বিরোধী অবস্থানে সাধারণ মানুষেরা রাজনীতিতে সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন। দেশের বিশিষ্ট চিন্তাশীল ও বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সরকারের মনে রাখা উচিত এ ব্যবস্থা তাদেরই আন্দোলনে চালু হয়। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচন ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্র“য়ারির নির্বাচনের ন্যায় প্রত্যাখ্যাত হবে।
রাজনীতিতে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি দল মনে করে দেশ সুন্দরভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মতে, দেশের মানুষ শান্তিতেই আছে। বিরোধীদল অযৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছে। দেশে হরতালের মতো কর্মসূচি দেয়ার পরিবেশ নেই। অপর দিকে বিরোধীদল  ভিন্নমত পোষণ করছে। তারা মনে করে, দেশে শান্তি ও স্বস্তি নেই। তারা মনে করেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির তীব্র সঙ্কট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শেয়ারবাজারে বিপর্যয়, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা রাস্তাঘাটের বেহাল দশা সরকারের চরম ব্যর্থতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিগত দশ বছরের হিসাবে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। যদিও অনেকেই বিষয়টি মানতে নারাজ।  আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাম্প্রতিক বক্তব্য : ‘দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো নয়। নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও নেই। ১৬ কোটি মানুষের জন্য কোনো প্রশাসন নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো; পুলিশের মহাপরিদর্শক যিনি টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী স্কুলে পড়েছেন, তিনি বলেছেন, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি খুবই উন্নত। এ ধরনের মানবিক চেতনাহীনদের চেতনা তো জাগ্রত করা যাবে না। তারপরও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যেটুকু আছে, তা আল্লাহর রহমত, সরকারের কোনো দক্ষতায় নয়।’
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিরোধীদলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকার সহনশীল আচরণ করবে।’ সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, ‘আমরা রাজপথে নামতে চাইনি। এই মুহূর্তে রোডমার্চ, জনসভার কর্মসূচিও দিতে চাইনি। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ আমাদেরকে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করছে।’ অপরদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর এক বক্তব্যে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার বক্তব্য দেশের সচেতন মহলকে অবাক করেছে। যা জাতীয় দৈনিকে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে পুলিশ প্রশাসনের দরকার নেই। তাদের দমনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরাই যথেষ্ট।’
সরকার ও বিরোধীদল মুখোমুখি অবস্থানে। ক্ষোভ, উত্তেজনা ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধীদলের আন্দোলনের হুমকি আর সরকার কর্তৃক প্রতিরোধের ঘোষণা প্রিয় মাতৃভূমিকে অজানা শঙ্কার দিতে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। বাংলাভিশনের লাইভ টকশোতে সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর বিরাজমান সঙ্কট উত্তরণের পথ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘মুক্তির পথ সহনশীলতা।’  দেশের সার্বিক কল্যাণ নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের বিকল্প নেই। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে পাহারাদারের ভূমিকা রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।  রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা কলহের কারণে প্রিয় দেশ মহাসঙ্কটের দিকে যেন ধাবিত না হয়। আমাদের দ্বন্দ্ব কিংবা দ্বিধাবিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে অন্য কোনো শক্তির উত্থান যেন না হয়। কোনো পরাশক্তি যাতে আমাদের মানচিত্রের দিকে কুদৃষ্টি না রাখে, আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যেন হুমকির মুখে না পড়ে, বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। চলমান রাজনীতিতে অদৃশ্য কোনো শক্তি বিভেদের দেয়াল তৈরি করছে কিনা তাও ভাবতে হবে! শিক্ষণীয় একটি গল্পের মাধ্যমেই লেখাটির ইতি টানছি।
এক মাসে বাসার ফোন বিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি এল। বাসায় জরুরি মিটিং বসল। বাবা বললেন, ‘আমি গত মাসে বাসার ফোনটা একবারও ধরিনি। আমি সব ফোন করেছি অফিসের ফোন থেকে।’ তখন মা এসে বললেন, ‘আমিও গত মাসে কোনো ফোন বাসা থেকে করেছি বলে মনে হয় না। আমার সমিতির অফিসের ফোনটাই আমি ব্যবহার করি।’ একমাত্র ছেলে এসে বলল, ‘আমার তো বাসা থেকে ফোন করার প্রশ্নই আসে না। কোম্পানি আমাকে মোবাইল বিল দেয়। আমি অফিসের সেই মোবাইল ব্যবহার করি।’ এরপর বাসার কাজের মেয়ে এসে বলল, ‘তাহলে তো কোনো সমস্যাই দেখি না। আমরা সবাই যার যার অফিসের ফোন ব্যবহার করি!’
লেখক : সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, সিলেট মহানগরী

SHARE

Leave a Reply