‘হাইলি ডিস্টার্বড’ ও ‘দ্য হিন্দু’ -সৈয়দা আফিয়া আজাদ

ক্ষমতার উন্মত্ততায় সরকার বোধ হয় ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। এমনিতেই দেশে গণমাধ্যম ও গণমানুষের অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করা হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিবেক ও বিশ্বজনমতকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে চরমভাবে। গত ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের পক্ষে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারবিষয়ে যে বিবৃতিকে সরকার ‘হাইলি ডিস্টার্বড’ বলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। যেকোন বিষয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু তার ভাষা হওয়া উচিত মার্জিত। বিশেষ করে তা যদি কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিষয়ক হয় তাহলে তো শব্দ চয়নে তো অধিক সতর্ক হওয়া উচিত। কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়াকে ‘উৎপাত’ এর মতো গর্হিত মন্তব্য করা কতখানি যুক্তিযুক্ত তা বোদ্ধা মহলের ওপর ছেড়ে দেয়া-ই যুক্তিযুক্ত মনে করছি।
জাতিসংঘের পক্ষে মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেছিলেন, বিচারে সুষ্ঠুতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমরা সতর্ক করছি যে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে না মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা। ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল পলিটিক্যাল রাইটসের শর্তানুযায়ীও ওই বিচার করা হয়নি। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা একটি দেশ বাংলাদেশ। যেকোন পরিস্থিতিতে, এমনকি সবচেয়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদন্ডের বিরোধী জাতিসংঘ।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে শুধু জাতিসংঘ নয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশী-বিদেশী সংস্থা, আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞগণ এই বিচারের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়াকেই সরকার স্বাভাবিক হিসেবে নেয়নি বরং এসব মন্তব্যকে সরকার তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে সরকারের পক্ষে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান তো এই আন্তর্জাতিক সংস্থাকে রীতিমত ‘ঝাঁটা পেটা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা বোধ হয় ক্রমেই বিশ্বদরবারে অসহিষ্ণু ও অশিষ্টাচারী জাতি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছি।
সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। অভিজ্ঞমহল বলছেন, বিচারের আন্তর্জাতিক মানদন্ড তো রক্ষা করা হয়-ই নি বরং এই বিচারের দেশীয় মানও উপেক্ষিত হয়েছে। দন্ডপ্রাপ্তদের রিভিউ পিটিশন আপিল বিভাগে খারিজ হওয়ার পর দৃশ্যত তাদের আইনি প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু দন্ডিতরা, তাদের পরিবার-পরিজন ও দলের পক্ষ থেকে এ বিচারের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মক আপত্তি উত্থাপিত হয়। কিন্তু এতে অভিযুক্তরা কোন সুবিধাই করতে পারেননি। করুণ পরিণতিই বরণ করতে হয়েছে তাদেরকে।
মূলত রিভিউ পিটিশন খারিজ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার শুধুমাত্র একটি পথই অভিযুক্তদের জন্য খোলা ছিল। কিন্তু অতীতের ধারাবাহিকতা ও অভিযুক্তদের অবস্থান প্রাণভিক্ষার অনুকূলে ছিল না। দেশবাসী ধরেই নিয়েছিলেন যে, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। যদিও তারা উভয়েই আইনজীবীদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ তাদেরকে দেয়া হয়নি।
কাকতালীয়ভাবে ২১ নভেম্বর গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তাদের কৃত অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন। দেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পত্রিকাগুলো ফলাও করে এই খবরটি প্রচার করে। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো উভয় পরিবারই ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। কিন্তু গণমাধ্যমগুলো তা মোটেই আমলে নেয়নি।
প্রাণভিক্ষার কথিত আবেদন নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রচারের ব্যাপকতা দেখে অনেকে মেনেই নিয়েছেন যে, হয়তো প্রাণ বাঁচানোর শেষ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা এই আবেদন করেছেন। অপর পক্ষ অবশ্য বিষয়টি যৌক্তিক বলে মনে করেনি। জামায়াতের পক্ষে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে কথিত ‘প্রাণভিক্ষার আবেদন’কে অপপ্রচার ও গুজব হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। দন্ডিতদের পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে, উভয়ই রাষ্ট্রপতির কাছে একটি করে আবেদন করেছেন। কিন্তু সেগুলো মোটেই প্রাণভিক্ষার আবেদন ছিল না।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চান জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। এ জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে দন্ডকার্যকর স্থগিত রাখার আবেদন করা হবে বলে তারা জানিয়েছেন এবং শেষ সাক্ষাতে মুজাহিদ তার পরিবারের সদস্যদের কাছে এই কথাই বলেছেন। ফলে কথিত সে আবেদনটি কোন অবস্থাতেই প্রাণভিক্ষার আবেদন ছিল বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর পরিবারের পক্ষে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে ন্যায়বিচার চেয়ে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে চিঠি দেয়ার চেষ্টা করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার। পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতে একই কথা-ই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। মূলত এটিও প্রাণভিক্ষার কোন আবেদন ছিল বলে মনে হয় না।
এ দিকে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি-না তা জানার জন্য দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ২১ নভেম্বর সকাল ৯টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ এবং বেলা ৩টায় কারাগার ত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তারা যখন কারা ফটক ত্যাগ করেন তখন তারা গণমাধ্যমের সাথে কোন কথা-ই বলেননি। তারপরও কারা কর্তৃপক্ষের বরাতে প্রচার করা হয় যে, দন্ডিতরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। আইনমন্ত্রীও এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তাদের সে আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটু কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি প্রথমে বলেন, শুনেছি কিন্তু দেখিনি। পরে অবশ্য তিনি তা স্বীকার করেন।
সরকার পক্ষের দাবি আর পবিরারের পক্ষে প্রত্যাখ্যানের মধ্যেও গণমাধ্যমগুলো নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে পারেনি। মিডিয়াগুলো সরকার পক্ষের দাবি ফলাও করে প্রচার করলে প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি তারা গোচরেই আনেননি। এ ব্যাপারে অবশ্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, আইনি সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর এখন আসামিদের কাছে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন ছাড়া অন্য কোনো আবেদনের সুযোগ নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আমাদের সংবিধানে প্রাণভিক্ষা বা প্রাণভিক্ষার আবেদন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদই নেই বলে জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
‘প্রাণ ভিক্ষা’ আবেদন বিষয়ক সরকারের দাবির কোন ধারাবাহিকতা ছিল না। রাত ৮টার দিকে জামায়াত নেতা মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের পক্ষে জানানো হয়েছে, তাদেরকে জেলকর্তা ফোন করে দেখা করতে যেতে বলেছেন। ধারণা করা হচ্ছে এটাই জীবনের শেষ দেখা। ঐদিকে রাত পৌনে ১০টায় মিডিয়াগুলো ব্রেকিং দেয়, প্রেসিডেন্ট প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করেছেন। এরও অনেক পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত্যুদন্ড কার্যকর সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করেছেন। কথা হচ্ছে, যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ বা আবেদন নাকচ করার আগেই কারা কর্তৃপক্ষ ‘শেষ দেখার’ কথা জানালেন কোন আইনে বা যুক্তিতে? মূলত মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদেরের ক্ষেত্রে প্রচলিত কোন নিয়ম, কারাবিধি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা অনুসরণ করা হয়নি। বরং রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত জানার আগেই ঐ দিন রাতে ফাঁসি কার্যকরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। সে প্রস্তুতির অংশ হিসাবেই আসামিদের পরিবারগুলো কারাগারে ডাকা হয় রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত জানার দুই ঘণ্টার চেয়েও বেশি আগে রাত ৮টার আগে!
নিয়মানুযায়ী, রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রাপ্তির পর দন্ড কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কারণ তিনি কী সিদ্ধান্ত দেবেন সে একক এখতিয়ার সংবিধান তাকে দিয়েছে। যদিও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক রহমান একটি অভিনব সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার কোনো এখতিয়ার নেই। দন্ডিত ব্যক্তি আবেদন করলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মতামতসহ রাষ্ট্রপতি বরাবর অগ্রায়ন করতে হবে। আর এসব মতামতের বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর মতামতের বাইরে এখতিয়ার যদি মাননীয় রাষ্ট্রপতির না থাকে তাহলে সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের সংশোধনী এনে তা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করায় শ্রেয়তর। যদিও সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের একথার সত্যতা পাওয়া যায় না।
আসলে আমাদের দেশের সংবিধানে প্রাণভিক্ষার আবেদন বলে কিছু নেই। সংবিধানের ৪৯ অনুচেছদ অনুযায়ী কোন দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ The President shall have power to grant pardon, reprieves and respites and to remit, suspend or commute any sentence passed by any court, tribunal or other authority.’

অর্থাৎ কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্যকোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোন দন্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে-কোন দন্ড মওকুফ, স্থগিত ও হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য হলো ৪৯ অনুচ্ছেদের অধীনে যেকোন আবেদনই অপরাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন। কিন্তু এই অনুচ্ছেদের অধীনে কোন আবেদন করলেই সেটা প্রাণভিক্ষার আবেদন হবে কি না জানতে চাইলে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদিন মালিক বলেন, ‘আইনে প্রাণভিক্ষা বলে কিছু নেই। আসামি প্রাণভিক্ষা চাইবে কেন?’
আইনগতভাবে কেউ প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন না। আবার রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষা দেয়ারও মালিক না। তিনি আরও বলেন, কেউ প্রাণভিক্ষা না চাইলে সেটা প্রাণভিক্ষার আবেদন হবে কেন? আবেদনে কী চাচ্ছে সেটা দেখতে হবে। আবেদনে আসামি যদি পুনঃবিচার চায়, তাহলে সেটা তো প্রাণভিক্ষার আবেদন হলো না।
দন্ড কমানোর জন্য দরখাস্ত যে কেউ করতে পারেন। কারো যদি ১৪ বছরের জেল হয় তাহলে সে ৩ বছর খাটার পরে দরখাস্ত করতে পারে। যাবজ্জীবনের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের পরেও দরখাস্ত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ১০ বছর সাজা খাটার পর বাকি ১০ বছর মাফ করে দিয়েছেন। (দৈনিক যুগান্তর- ২২ নভেম্বর )
সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৪৯ ধারা অনুযায়ী দন্ডিতকে অপরাধ স্বীকারপূর্বক রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হবে। কিন্তু সংবিধানে একথার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছেন না সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। মূলত সংবিধানের এ ধারার সাথে দোষ স্বীকার করার কোনো প্রশ্ন জড়িত নয়। এখন যদি বলা হয়, তারা দরখাস্ত করেছে মানে দোষ স্বীকার করেছে, তাহলে যারা দরখাস্ত করেনি অথচ ফাঁসি হয়ে গেছে তারা কি নির্দোষ? সংবিধানে সুস্পষ্ট যে, কাউকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। এটা কখনো বলা যাবে না যে, তুমি দোষ স্বীকার না করলে তুমি এটা (দরখাস্ত) করতে পারবে না। মূলত সরকারের অবস্থানই সংবিধান পরিপন্থী।
মুজাহিদ ও সালাহউিদ্দন কাদের চৌধুরীর প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য স্তিমিত হলেও এখনও শেষ নয়। উভয় পরিবার শেষ সাক্ষাতের বরাত দিয়ে বিষয়টি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করার পর আইনমন্ত্রী বলেছেন, দুই পরিবার এ বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই করার প্রতিধ্বনি করেছেন। গণমাধ্যমকর্মীরা প্রাণভিক্ষার আবেদন দেখতে চাইলে উভয় মন্ত্রীই বলেছেন, এসব নাকি রাষ্ট্রীয় গোপনীয় দলিল। তাই তা দেখানো যাবে না। মুজাহিদ পরিবার তো সরকারের প্রতি এ ব্যাপারে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এ কথা বোধগম্য নয় যে, কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত আবেদন রাষ্ট্রীয় গোপনীয় দলিল হলো কী করে? এ বিষয়ে কী কোন আইন আছে? না সরকার নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য কল্পকাহিনী প্রচার করছে? উভয় পরিবার যদি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাহলে রাষ্ট্র কেন বিভ্রান্তি নিরসনে এগিয়ে আসছে না? আসল রহস্য তো এখানেই।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দন্ড কার্যকর নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা সমালোচনা চলছেই। পিছিয়ে নেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও। ভারতের প্রভাবশালী ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ওই বিয়োগান্তক ঘটনায় সরকার ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়ে এ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে পারে। জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর নিয়ে বুধবার ‘ক্রাইম অ্যান্ড পেনাল্টি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে সম্পাদকীয়টি ছাপা হয়।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধাপরাধের বিচারের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ‘দ্য হিন্দু’ সম্পাদকীয়তেও সে কথার সত্যতা মিলেছে। কারণ, এতে দন্ড দেয়ার বিষয়টি আদালতের বা ট্রাইব্যুনালের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি বরং তা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিচার নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যশীল।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্তর্জাতিক মান, দন্ডকার্যকরের প্রক্রিয়া, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ এবং আগামী দিনে এর সর্বব্যাপী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। জাতিসংঘের দাবি অনুযায়ী ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল পলিটিক্যাল রাইটসের শর্তানুযায়ীও ওই বিচার হয়নি। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা একটি দেশ বাংলাদেশ। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে ও দন্ডকার্যকরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুন তো অনুসরণ করা হয়-ই নি বরং আন্তর্জাতিক চুক্তিও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
ভারতের কতিপয় গণমাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দন্ডকার্যকরকে সরকারের ‘ক্ষণস্থায়ী’ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে, যে ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় বিচার করে ‘হেভি ওয়েট’ বিরোধী দলের নেতাদের প্রাণদন্ড কার্যকর করা হলো তা আগামী দিনে বিরোধীদের দমনে ‘সাপে বর’ হয়ে দেখা দিতে পারে। আর সরকারের জন্য হতে পারে আত্মঘাতী।

SHARE

Leave a Reply