হার না মানা শহীদ আবিদ বিন ইসলাম

অ্যাডভোকেট মো: মনিরুল ইসলাম

আবিদ বিন ইসলাম- সে নিজেকে পরিচিত করত এভাবে-এটা আবিদ, বাড়ি সম্পীপ (সন্দ্বীপ বলতে পারত না)। পরিণত কৈশোরে এসে নিজেকে দেখিয়ে বলত অনরফ ইরহ ওংষধস। অনরফ- অ তে অনরফ, ই- তে ইরহ, ও- তে – ওংষধস তখন আমি তাকে প্রশ্ন করতাম বাবা ঞযবহ যিধঃ ধনড়ঁঃ ‘উ’? সে তার মায়াবী দৃষ্টি দিয়ে ভুবন ভোলানো এমন হাসি দিত যে বাপ-বেটা দু’জনই হেসে দিতাম। কে জানতো তখন যে উ- তে উবঢ়ধৎঃঁৎব বোঝানোর জন্যই আল্লাহ তাকে ঐ মায়াবী চাহনির অধিকারী করেছিলেন।
১৯৯৫ সালের ৩১ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজে যাবো-কি যাব না এমন অবস্থায় কাছের মসজিদ থেকে নামাজ শেষ করেই ঘরে এসে দেখি প্রশান্ত মায়ের পাশেই অসম্ভব মায়াময় একখানা মুখ। আমাকে দেখে তার মা-ও হাসল। আমি আলহামদুলিল্লাহ পড়ে তার পাশে বসলাম। আমার প্রাণে এমন আনন্দের ঢেউ খেলে গেল যে আমি তার মাকে না জিজ্ঞেস করেই ধরে নিলাম আমি কন্যাসন্তানের পিতা হলাম। আমাদের উভয়েরই প্রত্যাশা ছিল প্রথম ছেলে, এবার মেয়ে পাবো। পরক্ষণেই তার মায়াময় চেহারার রহস্যের কথা মনে হতেই ভালো করে দেখলাম, নাতো এটাও আগেরটারই ছোট কপি। তার মা বলল এটাও বড়টার মতো দেখেছ? আমি শোকর আদায় করলাম আল্লাহর দান সবই সুন্দর। আলহামদুলিল্লাহ।
বড়টার জন্ম ছিল ১৯৯২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। দেখতে মনে হয়েছিল ৩-৪ বছরের বাচ্চা। আর জন্মের সারাটি রাত তার চোখের ওপর আমার চেহারা রাখতে হয়েছিল। সরাতেই কান্না করছিল। কিন্তু আবিদ বেশ দুর্বলই ছিল। জন্মের পর সে বেশ কিছু দিন ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।
আমরা অত্যন্ত সংগ্রামের মধ্যেই চলছিলাম। নবজাতকের একটা নাম রাখতে হয়। আগেরটার নাম রাখতে কাউকে ডাকতে পারিনি। পারিবারিক পরিমণ্ডলে, আমার চাচা মাস্টার মৌলভী ফয়জুল মাওলা যিনি আজকের আবিদকে আবিদ করতে আমাকে অ্যাডভোকেট মনির হওয়ার প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। আমাদের সন্তানদেরকেও সেভাবে মানুষ করার চেষ্টা করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। চাচাকে বললাম আগেরটার সাথে মিল রেখে নাম দিতে যাতে শিরক করার সুযোগ না থাকে এমন একটা নাম ঠিক করেন। তিনি আবিদ বলার সাথে সাথেই আমি আলহামদুলিল্লাহ পড়েছি। কেননা আবিদ শব্দের মূলে আছে আবদ, যার অর্থ বান্দা। বান্দা হওয়ার জন্যই সৃষ্টির আবেদন। আবিদ বিন ইসলাম এই পরিচয়ের জন্য একটু ইতিহাসে যেতে হবে। তুর্কিস্তানের কোন এক উপত্যকার সর্দার পুত্র দেলাওয়ার খান। পিতার সঙ্গে মতপার্থক্য হওয়ায় তার সাথী সৈন্যদের নিয়ে ভাগ্যের অম্বেষণে বের হলেন। যাত্রাপথে সবুজ শ্যামল সাগরকন্যা সন্দ্বীপকেই পছন্দ করলেন। সাথীদের নিয়ে নৌবহর ভেড়ালেন সন্দ্বীপে। মগদের দস্যুতায় তখন স্থানীয়রা অতিষ্ঠ ছিলেন। তাই দেলওয়ার খানকে তারা স্বাগত জানালেন এবং মগদের বন্দী হতে হলো দেলওয়ার খানের হাতে। স্থানটির নাম হয়ে গেল মগধরা। দিলাল রাজার ৪ জন সেনাপতি ছিলেন। একজন আবদুর রশিদ খান দেলোয়ার খান বা দিলাল রাজার ভাগিনা ও কন্যা মুছা বিবির জামাতা দ্বিতীয় বাহাদুর খান এবং আদিল খানসহ নাম না জানা অনেকে। সুবেদার ইসলাম পরবর্তীতে আবদুর রশিদ খানকে হাত করে দেলোয়ার খানকে পরাজিত ও বন্দী করেন। বাকেরগঞ্জের কিছু অঞ্চল, কোম্পানীগঞ্জ ও আরাকানের সীমানা ভেঙে সন্দ্বীপ পরগনাভুক্ত করে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আবদুর রশিদ খানের অধস্তন পুরুষদের একজন হলেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমদ, বর্তমানে বাঁশখালীর অধিবাসী।
দানী বাহাদুর খানের অধস্তন পুরুষরা ইজ্জতপুর এলাকায় কয়েকটি বাড়ি করে বসবাস করেছেন। নদীভাঙনে এখন তারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছেন। দানী বাহাদুরের অধস্তন পুরুষ আজিম মাঝি। যার জাহাজের কারবার ছিল। কোন এক সমুদ্রঝড়ে তিনি নিহত হলে তার দুই পুত্র খবির উদ্দিন ও আবদুল বারী অসহায় হয়ে পড়েন। ছোট ভাই আবদুল বারীকে অন্যত্র লালন পালনের জন্য দিয়ে সহায় সম্পদ খরচ করে তিনি মাওলানা হন। পরে তারাখাঁর বংশের মেয়ে মাওলানা ওয়াজিউল্যাহর বোনকে বিয়ে করেন। স্ত্রী এক কন্যাসন্তান জন্ম দানের সময় মৃত্যুবরণ করেন। কয়দিন পর ঐ কন্যারও মৃত্যু হলে তিনি স্ত্রী ও কন্যার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হন। ভ্রাতা আবদুল বারিককে তার প্রাপ্য অংশে সমান ভাগ দেন এবং শ্বশুরবাড়ির পাশে বাড়ি করেন। মৌলভী খবির উদ্দীনের বড় মেয়ের ছেলে হেডমাস্টার এম এ মজিবুল হক, পুত্র ফজলুল করিম ১৯৭৩ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। তার পুত্রগণের মধ্যে আবদুল্লাহ স্কুল শিক্ষক, মোজাফফর সার্কেল অফিসার, ড. সোলাইমান মেহেদী রিয়াদ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যালের প্রধান ছিলেন, ড. হুমায়ুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। হিসাম উদ্দিন বাখরাবাদের ইঞ্জনিয়ার। অন্য পুত্রদের মধ্যে নজির আহমদ, আবুল খায়ের, মাহমুদ আলম, ওয়াহিদ মিঞা, ফয়েজ উল্যাহ ও ফয়েজ আহমদ তাদের প্রত্যেক বংশধরগণই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আবদুল বারীর দুই পুত্র সেরাজুল হক বিদেশী শিপের টেন্ডল ছিলেন। তিনি বাদুরায় লঞ্চডুবিতে মারা যান। মাস্টার ফখরুল ইসলাম সন্দ্বীপ কাঁপানো শিক্ষকদের একজন, তার দুই ছেলে শিপের ক্যাপ্টেন। আবদুল হকের তিন ছেলের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শফি উল্যাহ বিদেশী শিপের সুকানি ছিলেন। আমার বাবা নুর উল্যাহ সম্পত্তি ও পরিবারের দেখাশোনা করতেন। চাচা মৌলভী ফয়েজ উল্যাহর কথা আগেই বলেছি, তার বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। আমার বড় ভাই বিদেশী শিপের সুকানি হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় আমেরিকায় পাড়ি দেন, মেজভাই মো: রুহুল আমিন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের এজিএম পদে কর্মরত ছিলেন।
আবিদ বিন ইসলাম কাজেকর্মে আল্লাহর বান্দা হিসেবে তার ছোট জীবন অতিবাহিত করেছে। শৈশবে সে মানুষের সাথে গভীর সম্পর্ক যেমন করেছে তেমনি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার দৃঢ়প্রত্যয়ে তার কর্মপরিধি ঠিক করে এতদূর এসেছিল। সে কখনও বড়-ছোট, ধনী-গরিব, দল-ধর্ম যাচাই করেনি। হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়েই আপন করেছিল সমাজের মানুষকে। সেবা করার প্রত্যয়ে কর্মজীবনে একজন নামকরা ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। আল্লাহর সন্তুটি অর্জনই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। আত্মীয়-স্বজন সবারই খোঁজখবর নেয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। শিশুদের মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসত। আমার সাথে কথা হতে দেখেছে এমন কাউকে সে আমার পরিচয় দিয়ে বলত আমি অ্যাডভোকেট মনিরের ছেলে, আবিদ বিন ইসলাম। জ্ঞান অর্জনের জন্য সে পাগলপ্রায় ছিল। কুরআন ও হাদিস বোঝার জন্য তার প্রাণান্তকর চেষ্টায় সে গড়ে তুলেছিল নিজস্ব লাইব্রেরি। তার সংগ্রহশালাও কম সমৃদ্ধ নয়। বিদেশী মুদ্রা ও ডাক টিকেট প্রদর্শনীতে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে সে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও ডাক টিকেট সংগ্রহ করেছে। ফুলকুঁড়ি আসরের সাথে তার ছিল সুগভীর সম্পর্ক। তাই তার সাথে কবি আল মাহমুদেরও সম্পর্ক ছিল। বিচারপতি আবদুর রউফকে সে দাদু সম্বোধন করত। তার কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল । আল্লাহর বন্দনায় সে কবিতা লিখত। ইসলামী সঙ্গীত তার মুখে মুখে ছিল। যে কোন মোবাইল তার পরিচিত জনরা তাকে দিয়েই মেরামত করত। কম্পিউটার ল্যাপটপ ব্যবহারে তার জুড়ি ছিল না। সার্বক্ষণিক তার কাছে যে কোন খবরের আপডেট থাকত। আমার গল্প ছিল তার কাছে অমৃতের সমান। আর তা থেকেই সে তার নিজের মতো করেই শিক্ষা নিয়েছে।
গত কয়েক বছর পর্যন্ত সে শহীদ হওয়ার কথা দৃঢতার সাথে ব্যক্ত করত। একদিন তার মামীকে বলে, মামী এখন কেউ পাপ না করে থাকতে পারে না। একমাত্র উপায় আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া। তাহলেই জান্নাতের প্রত্যাশা করা যায়। সে দিনই শহীদি কাফেলায় শরিক হওয়ার জন্য সে আমার কাছে বলে, ‘আব্বু তুমি আমার জন্য দোয়া কর আমি যেন শহীদ হতে পারি।’ মুখে তাকে কিছু বলতে পারিনি। কিন্তু অন্তর থেকে বলেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ।
আর আল্লাহ আমার ছেলের আরজি কবুল করেছেন। আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া তিনি আমার ছেলের শাহাদাত কবুল করেছেন। আল্লাহ যেন আমার ছেলের অন্তর দিয়ে চাওয়া অভিপ্রায় ইসলামী জিন্দেগি তথা বাস্তবে কুরআন ও সুন্নাহর শাসনব্যবস্থা আমাদেরকে উপহার হিসেবে দেন।
আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক : শহীদ আবিদ বিন ইসলামের গর্বিত পিতা

SHARE

Leave a Reply