হাশরের মাঠে আরশের ছায়া পাবেন যারা -মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ :”سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللهُ فِىْ ظِلِّهِ، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ : الإِمَامُ العَادِلُ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِىْ عِبَادَةِ رَبِّهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِىْ المَسَاجِدِ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِىْ اللهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ، فَقَالَ : إِنِّىْ أَخَافُ اللهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ، أَخْفَى حَتّٰى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِيْنُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ”.
অনুবাদ : আবু হুরাইরাহ্ রা. হতে বর্ণিত। নবী সা. বলেছেন : যেদিন আল্লাহ তায়ালার (রহমতের) ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত (শ্রেণীর) ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন- ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক বা নেতা। ২. ঐ যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার রবের ইবাদতের মধ্যে। ৩. এমন (নামাজি) ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদগুলোর সাথে লটকানো থাকে (অর্থাৎ মসজিদ থেকে বের হলে পুনরায় প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত ব্যাকুল থাকে)। ৪. এমন দু’ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে শুধুমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে, তারা একত্র হয় আল্লাহর জন্য আবার পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য। ৫. সে ব্যক্তি যাকে উচ্চবংশীয় কোনো রূপসী-সুন্দরী রমণী তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আহ্বান করে, কিন্তু সে (যুবক) এ কথা বলে রমণীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ ৬. সে ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে তা বাম হাত জানে না। ৭. সে ব্যক্তি যে একান্ত নির্জনে আল্লাহর স্মরণে চোখের অশ্রু প্রবাহিত করে। (সহীহ আল বুখারি-৬৬০)

রাবী পরিচিতি : আবু হুরাইরাহ্ তাঁর উপাধি। তার আসল নাম আবদুল্লাহ বা আবদুর রহমান। ইসলামপূর্ব নাম ছিল আবদুশ শামস। তিনি দক্ষিণ আরবের আযদ গোত্রের সুলায়ম ইবন ফাহাম বংশোদ্ভূত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম সাখর এবং মাতার নাম উম্মিয়া বিনতে সফীহ মতান্তরে মায়মুনা। তিনি হিজরি পূর্বকালে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন হযরত আবু হুরাইরা রা. জামার আস্তিনের নিচে একটি বিড়াল ছানা নিয়ে রাসূল সা.-এর দরবারে উপস্থিত হন। বিড়ালটি হঠাৎ সকলের সামনে বেরিয়ে পড়ল। এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. তাঁকে রসিকতা করে- ‘হে বিড়ালের পিতা’! বলে সম্বোধন করলেন। এরপর থেকে তিনি আবু হুরাইরা নামে খ্যাতি লাভ করেন। তাকে আবু তুরাব নামেও ডাকা হতো। একদিন তিনি মাটিতে শুয়ে আছেন দেখে রাসূল সা. বললেন কিহে, আবু তুরাব মাটিতে শুয়ে আছ কেন? এরপর থেকে তার নাম আবু তুরাব হয়। এ নামেও তিনি পরিচিত। তিনি ৬২৯ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক সপ্তম হিজরিতে মুহাররম মাসে খয়বার যুদ্ধের প্রাক্কালে মদিনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ত্রিশ বছরের মতো। ইসলাম গ্রহণের পর হতে তিনি ইসলামের সকল যুদ্ধে রাসূল সা.-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। সাহাবীদের মাঝে তিনিই সর্বাধিক হাদিস বর্ণনা করেন। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা মোট ৫৩৭৪টি। এ কারণে তাকে রাবীদের নেতা বলা হয়। ইমাম বুখারীর মতে, আট শতাধিক রাবী তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি আসহাবে সুফ্ফা এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
৫৭ মতান্তরে ৫৮ বা ৫৯ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।
ব্যাখ্যা : কিয়ামতের দিন। হাশরের ময়দান লোকে লোকারণ্য। তিল ধরার ঠাঁই নেই। লোকদের দাঁড়ানোর জায়গা হবে অতি সঙ্কীর্ণ। সেখানে চল্লিশ হাজার বছর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। দশ হাজার বছরে বিচার করা হবে। তারা এর মধ্যে কোনো কথা বলতে পারবে না। (তাফসীরে ইবনু কাসির ১৮/৮৩) সেদিন সূর্য থাকবে মাত্র এক মাইল উপরে। ওর তাপ এত তীব্র ও প্রকট হবে যে, মাথার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে, যেমন চুলার উপর রাখা হাঁড়ির পানি ফুটতে থাকে প্রচ- তাপের কারণে। তাদের শরীরের ঘাম তাদের পাপ অনুপাতে ঢেকে ফেলবে। ঘাম কারো পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছবে, কারো গিরা বা কোমর পর্যন্ত। আবার কারো ঘাম তার লাগাম হয়ে যাবে। অর্থাৎ একেবারে তার নাক পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (মুসনাদে আহমাদ) সেই দিন সকল মানুষ নগ্নপায়ে, নগ্নদেহে খাতনাবিহীন অবস্থায় সমবেত হবে। সেই দিন হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন, নানা বিপদ-বিভীষিকাময় আপদে পরিপূর্ণ। এমন মহাবিপদসঙ্কুল দিবসে সূর্যের তীব্র ও প্রখর তাপ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ছায়া খুঁজবে কিন্তু কোনোই লাভ হবে না। তবে মহান আল্লাহ মাত্র সাত শ্রেণীর মানুষকে তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন।
প্রথম শ্রেণী : الامام الْعَادِلُ “ন্যায়পরায়ণ নেতা বা শাসক”। হাশরের কঠিন মুসিবতের সেই বিশাল মাঠ, যেখানটায় মাথার খুব কাছে সূর্য উত্তাপ বিকিরণ ছড়াবে, মাঠের কোথাও মহান আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না, সেই রহমতের ছায়ায় সাত প্রকার ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়পরায়ণ শাসকের স্থান হবে বলে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন। ন্যায়পরায়ণ শাসক হলো, যারা জনগণের প্রতি বিনম্র হয়, জনগণের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর হিফাজত করেন, দেশের আলেম-ওলামা ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শন করেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ করেন। যিনি নামাজ কায়েম করেন, জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করেন, মানুষকে চরিত্রবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নিমিত্তে ভালো ও কল্যাণকর কাজগুলো চালু করেন এবং অন্যায় ও অনিষ্টকর কাজগুলো বন্ধ করেন। নিজেকে মনে করবে জনগণের খাদেম। যিনি তার পুরো নেতৃত্ব বা শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবেন কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে। নিজকে ভাববেন আল্লাহর জমিনের খলিফাহ। ‘তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে’ এ কথা স্মরণ রাখবেন। যেমন- নবী সা. বলেছেন :
্রأَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِগ্ধ.
“সাবধান! তোমরা প্রতেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। ইমাম, নেতা বা শাসক তার অধীনস্থ ব্যক্তিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন।” (সহিহ বুখারি-৭১৩৮)
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে আমার ঘরেই বলতে শুনেছি: ‘হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোনো কাজের তত্ত্বাবধায়ক হয়, অতঃপর সে তাদের প্রতি কঠোরতা করলে তুমিও তার প্রতি কঠোরতা করো। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোনো কাজের তত্ত্বাবধায়ক হয়, অতঃপর সে তাদের প্রতি নরম ও কোমল আচরণ করে তুমিও তার প্রতি কোমল আচরণ করো।’ (মুসলিম) আয়েজ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে উপস্থিত হয়ে বলেন, হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি: ‘নিকৃষ্ট শাসক সেই ব্যক্তি যে জনগণের প্রতি কঠোর ও অত্যাচারী। কাজেই সতর্ক থেকো তুমি যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হও।’ (বুখারি ও মুসলিম) মোটকথা, নবী সা.-এর তরিকা অবলম্বনকারী নেতা বা শাসকই আল্লাহর আরশের ছায়া পাবেন।
দ্বিতীয় শ্রেণী : وشاب نشا فى عبادة ربه অর্থাৎ যে যুবক তার জীবন ও যৌবনকে অতিবাহিত করে একমাত্র মহান রবের ইবাদতে। যুবক বয়সের অধিকাংশ নারী-পুরুষই দুনিয়া অর্জন তথা ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি ও চাকচিক্যময় জীবন-যাপন নিয়েই ব্যস্ত থাকে। পরকালের কথা বেমালুম ভুলে থাকে। আল্লাহর বিধান ও পরকালের সীমাহীন জীবনের সুখ-শান্তির কথা মনে থাকে না।
মানুষের প্রকাশ্য দুশমন বিতাড়িত শয়তান দুনিয়াতে তরুণ-তরুণীকে পরস্পরের সামনে সুমিষ্ট ও সুশোভিত করে তুলে। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও বিধানের ব্যাপারে এভাবে অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় যে, আল্লাহর বিধান যৌবনে পালনের জন্য নয়; তা পালন করবে বৃদ্ধাবস্থায়। শয়তান মানুষের সামনে দুনিয়ার চাকচিক্য প্রকাশের মাধ্যমে এ চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে রাখতে যাবতীয় কৌশল অবলম্বন করে।
মানুষ যেন কোনোভাবেই পথভ্রষ্ট না হয়, সে কারণেই আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিম নাজিল করেছেন। প্রিয়নবী হাদিসে যৌবন বয়সের ইবাদতের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরেছেন।
আবু বারযাহ আসলামি রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কিয়ামত দিবসে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সরতে পারবে না তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে তা অতিবাহিত করেছে; তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে তা ব্যয় করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে এবং তা কোন্ কোন্ খাতে খরচ করেছে এবং কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল, সে মোতাবেক কতটুকু আমল করেছে।’ (তিরমিজি, আস-সুনান-২৪১৭)
আবু বকর রা. বলেন, ‘যৌবনের ইবাদত বৃদ্ধ বয়সের ইবাদতের চেয়ে অনেক বেশি দামি। আবার বৃদ্ধ বয়সের পাপ যৌবনের পাপের চেয়ে অনেক বেশি জঘন্য।’ শেখ সাদী (রহ.) বলেছেন, ‘দুনিয়া ও পরকালের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা এ যৌবনকালেই সংগ্রহ করো।’ বর্তমান সময়ে যুবসমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের বড় কারণ হলো- সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার যথাযথ তদারকির অভাব। সমাজের অনেক পিতা-মাতা, নিজ সন্তানের চলাফেরা ও গতিবিধির প্রতি লক্ষ্যই রাখেন না। তা ছাড়া, ছোটবেলা থেকে নৈতিক শিক্ষা, নামাজ, রোজা ও কুরআন-সুন্নাহর বিধিবিধানের প্রতি উদাসীন থাকা সন্তানকে যুবক বয়সে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে গাফেল রাখে। যে যুবক শয়তানি কর্মকা- থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিজের জীবনকে অতিবাহিত করবে, সেই সফলকাম। সেই মুক্তিপ্রাপ্ত। সেই যুবকই উত্তপ্ত হাশরের ময়দানে পাবে আল্লাহর আরশের ছায়া।
তৃতীয় শ্রেণী : ورجل قلبه معلق فى المساجد অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদগুলোর সাথে লটকানো থাকে। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। কিন্তু ইসলামের অন্যতম রুকন সালাত এর প্রতি মানুষের আগ্রহ নিতান্তই কম। মানুষ কর্ম অবলম্বন শুধু মানবিক প্রয়োজনই নয়, হালাল পন্থায় হালাল কর্ম অবলম্বন ইসলামের এক ফরয বিধান। এই কর্মব্যস্ততার মধ্যেও যদি মসজিদের সাথে অন্তরের সম্পৃক্ততা থাকে, তবে তা অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। মসজিদের সাথে অন্তর সম্পৃক্ত থাকার অর্থ, সে নামাযের সময়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। সময় মতো মসজিদে গমন করে। নামাযের পর যখন মসজিদ থেকে বের হয়ে পরবর্তী নামাযের প্রতীক্ষায় থাকে। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই সে স্বাচ্ছন্দ্যে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে সক্ষম হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতুম অন্ধ সাহাবী। তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। তার জন্য মসজিদে জামায়াত ধরা খুবই কষ্টকর। কিন্তু তিনি আযান শুনতে পেতেন। রাসূল সা. তাকেও মসজিদে জামায়াতে অনুপস্থিতির অনুমতি দেননি। মসজিদে সালাতের গুরুত্ব এর থেকেই প্রতীয়মান হয়। তাই যে ব্যক্তি মসজিদে জামায়াতে সালাত আদায় করবে এবং পরবর্তী সালাতের জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকবে, সময় হলে বিলম্ব করবে না, তার অবস্থা এমন যে, শরীর মসজিদের বাহিরে, হাট-বাজারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে থাকলেও মন রয়েছে মসজিদে। তাইতো নবী সা. এ শ্রেণীর ব্যক্তিকে সুসংবাদ দিলেন যে, এরা কিয়ামতের ময়দানে আরশের ছায়ায় স্থান পাবে।
৪র্থ শ্রেণী : وَرَجُلان تَحابَّا فِى اللهِ اجتمعا عليه وتفرقا عليه এমন দু’ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে শুধুমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে, তারা একত্র হয় আল্লাহর জন্য আবার পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য।
আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসার অর্থ হলো, কোনো দীনদার বা আল্লাহ ওয়ালাকে তার দীনদারির কারণে ভালোবাসা। অনুরূপ আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে ঘৃণা করার অর্থ হলো, আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সা.-এর আনুগত্য বর্জন এবং তার মাঝে প্রিয়নবী সা.-এর প্রেম না থাকার কারণে ঘৃণা করা। এটাই ঈমানের দাবি। যারা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পরস্পরে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হবে, এতে তাদের পার্থিব কোনো স্বার্থ জড়িত থাকবে না; এরূপ ব্যক্তিদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের কঠিন সময়ে তার রহমাতের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত: রাসূল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোন ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাস। অতঃপর জিবরাইল (আ) তাকে ভালোবাসতে থাকেন। তারপর আকাশবাসীকে বলে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। অতএব তোমরা তাকে ভালোবাস। তখন আকাশের সকল ফেরেশতা তাকে ভালোবাসতে থাকেন। অতঃপর সে ব্যক্তির জন্য জমিনেও জনপ্রিয়তা দান করা হয়। আর আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ঘৃণা করেন তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করি, তুমিও তাকে ঘৃণা কর। তখন জিবরাইলও তাকে ঘৃণা করেন। এরপর আকাশবাসীকে বলে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, তোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তখন আকাশবাসীরা তাকে ঘৃণা করতে থাকে। অতঃপর তার জন্য যমিনেও মানুষের মনে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়।’ (মুসলিম, মিশকাত-৫০০৫) মোটকথা, যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরকে ভালোবাসবে, এতে কোন পার্থিব স্বার্থ থাকবে না। তাদের জন্যই রয়েছে হাশরের ময়দানে সুমহান মর্যাদা। আল্লাহ তায়ালা এ শ্রেণীর লোকদের আহ্বান করবেন এভাবে-
্রأَيْنَ الْمُتَحَابُّوْنَ بِجَلَالِىْ، الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِىْ ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّيগ্ধ.
আমার গৌরব ও মহত্ত্বের খাতিরে যারা পরস্পরকে ভালোবাসত তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়াতলে স্থান দেবো। আজ তো আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই। (সহীহ মুসলিম-২৫৬৬)
পঞ্চম শ্রেণী : وَرَجُلٌ طلبثه امر أة ذات منصب وجمال فقال انى أخاف الله. সে ব্যক্তি যাকে উচ্চবংশীয় কোন রূপসী-সুন্দরী রমণী তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আহ্বান করে, কিন্তু সে (যুবক) এ কথা বলে রমণীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ শয়তান মানুষকে বিপথগামী করার জন্য যেসব অস্ত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তার মধ্যে অন্যতম হলো সুন্দরী রমণী। তা যদি আবার উচ্চবংশীয় হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। মানুষকে অর্থ যতটা নষ্ট না করতে পারে তার চেয়ে অনেক অনেকগুণ বেশি পারে সুন্দরী রমণী। যখন কোন সুন্দরী রমণী কুকর্মের জন্য আহ্বান জানায় তখন শয়তান পুরুষদেরকে অন্ধ করে ফেলে। তখন সে অসৎ মোহে বিমোহিত হয়ে পড়ে। জ্ঞান লোপ পায়। কিন্তু যে মানুষ শয়তানি ফাঁদকে ডিঙ্গিয়ে সুন্দরী রমণীর আহ্বানে সাড়া দেয় না বরং এ কুপ্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে বলে انى أخاف الله ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’। এই মানুষই সফলকাম। সে হাশরের ময়দানে পাবে আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয়।
ষষ্ঠ শ্রেণী : وَرَجلٌ تَصَدَّقَ اخْفَاءَ حَتّٰى لاتَعْلمْ شِمَالهُ مَا تنْفِقُ يَمِيْنَه সে ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে তা বাম হাত জানে না। অধিকাংশ মানুষ তোষামোদপ্রিয়। সে চায়, যা সে দান করে তা মানুষ দেখুক, বলুক ‘অমুক দানবীর’। যারা এ শ্রেণীর লোকদেখানো দানে বিশ্বাসী এবং এতেই সন্তুষ্ট- এ ধরনের নিয়্যাতে দান করলে ফলাফল উল্টো হবে। দানের ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি লোকদেখানো দানে বিশ্বাসী না, অত্যন্ত গোপনে দান করে, দান শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে থাকে, তারাই সুমহান মর্যাদার অধিকারী। গোপনে দান করা হলে তার মর্যাদা অনেক বেশি, যেখানে বর্তমানে বেশির ভাগ দানেই দেখা যাচ্ছে আত্মপ্রচারই মূল উদ্দেশ্য। তবে যে দান লোকদেখানোর জন্য করা হয় বা মানুষের প্রশংসা বা বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, তা সৎ দান নয়। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে ও তা গোপন রাখে এবং গ্রহীতাকে এ জন্য খোঁটা ও কষ্ট দেয় না, তারা পুরস্কৃত হবে। তাদের কোনো ভয় ও দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। (সূরা বাকারা : ২৬৩)
রাসূল সা. বলেছেন: ্রإِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوْبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْগ্ধ.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক আকার-আকৃতি বা ধন-মালের দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না। বরং তিনি দৃষ্টিপাত করবেন মনের অবস্থা ও কাজ কর্মের দিকে।” (সহিহ মুসলিম- হা: ৩৪/২৫৬৪)
সুতরাং যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে গোপনে এমনভাবে ডান হাতে দান করে, যেন বাম হাত বুঝতেই পারে না- তারাই সফলকাম এবং কিয়ামতে আরশের ছায়ায় স্থান পাবে।
সপ্তম শ্রেণী : ذكر الله خاليا ففاضت عيناه.। সে ব্যক্তি যে একান্ত নির্জনে আল্লাহর স্মরণে চোখের অশ্রু প্রবাহিত করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: ﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ﴾
“আমি জিন্ ও মানবম-লীকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি। ইবাদতকারীদের মধ্যে সেরা ইবাদতকারী তো ঐ ব্যক্তিই, যে নির্জনে, নিভৃতে, একাকী আল্লাহকে স্মরণ করে।” (সূরা আয্ যারিয়াত : ৫৬)
আল্লাহর ভয়ে যারা কান্নাকাটি করে, দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে- এ শ্রেণী সম্পর্কেই রাসূল সা. সুসংবাদ দিয়েছেন। তারা আরশের ছায়ায় ঠাঁই পাবে। রাসূল সা. বলেছেন: “عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ : عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ، وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ”.
“দু’প্রকার চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না। প্রথমত: যে চোখ আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে। দ্বিতীয়ত: ঐ চোখ, যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।” (সহিহ আল বুখারি)
হজরত উসমান রা.-এর মুক্ত দাস হানি বলেন, ‘উসমান রা. কোন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত বেশি কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা করলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ কবর দর্শনে এত বেশি কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আখেরাতের মনযিলগুলোর মধ্যে কবর হলো প্রথম মনযিল। এখান থেকে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর এখান থেকে মুক্তি না পেলে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো আরো বেশি কঠিন হবে।’ উসমান রা. বলেন, রাসূল সা. আরো বলেন, ‘আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি।’(ইবনু মাজাহ-৪২৬৭) উমাইয়া খলিফা ওমর বিন আব্দুল আযীয ইসলামের ইতিহাসে অধিক ক্রন্দনকারী হিসাবে খ্যাত। তাঁর পুণ্যময় জীবনের বিস্ময়কর একটি ঘটনা হচ্ছে, ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেক কেঁদে কেঁদে তাঁর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল করে ফেলল। অতঃপর তাঁর ভাই মাসলামা ও হিশাম তাঁর নিকট এসে বলল, কোন জিনিসটি তোমাকে এভাবে কাঁদাচ্ছে? তোমার যদি দুনিয়ার কোন কিছু হারায় তাহলে আমাদের সম্পদ ও পরিজন দ্বারা তোমাকে আমরা সাহায্য করব। তাদের জবাবে ফাতেমা বললেন, ওমরের কোন কিছুর জন্য আমি দুঃখ করছি না। কিন্তু আল্লাহর কসম! গত রাত্রে দেখা একটি দৃশ্য আমার ক্রন্দনের কারণ। অতঃপর ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেক বললেন, আমি গত রাত্রে ওমর বিন আব্দুল আযীযকে সালাতরত অবস্থায় দেখেছি। অতঃপর তিনি আল্লাহর বাণী, ‘যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মত’ (সূরা কারিআহ : ৪-৫) এই আয়াত পাঠ করে চিৎকার করে উঠলেন এবং মাটিতে পড়ে গেলেন। অতঃপর কঠিনভাবে চিৎকার করতে থাকলে আমার মনে হলো তাঁর রূহ বের হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি থামলে আমার মনে হলো তিনি হয়তো মারা গেছেন। এরপর তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে ফরিয়াদ করে বলতে লাগলেন, হায়! মন্দ সকাল! এরপর তিনি লাফিয়ে উঠে ঘরের মধ্যে ঘুরতে থাকলেন আর বলতে লাগলেন, ‘হায়! আমার জন্য দুর্ভোগ। সেদিন কোন লোক হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো এবং পর্বতমালা হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো?’ (জামালুদ্দীন আল-জাওযী, আল-মুনতাযাম ফি তারিখিল উমাম ওয়াল মুলুক, তাহকিক : মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির ও মোস্তফা আব্দুল কাদির (বৈরুত : দারুল কুতুবুল ইলমিয়াহ, প্রথম সংস্করণ, ১৪১২ হি:/১৯৯২ খ্রি:), ৭/৭২)

শিক্ষণীয় বিষয়-
 যে কোন দায়িত্ব নিজের কাঁধে এলে তা ন্যায় ও ইনসাফের সাথে পালন করতে হবে।
 যৌবনকাল আল্লাহর দীনের কাজে ব্যয় করতে হবে। মসজিদের জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করতে হবে।
 ভালোবাসা ও ঘৃণা করা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হতে হবে। কোনো রমণীর কুপ্রস্তাবে সাড়া দেয়া যাবে না। হোক না সে সুন্দরী, উচ্চবংশীয়।
 দান করতে হবে গোপনে আর এটাই উত্তম। প্রকাশ্যে দান করলেও তা যেন রিয়া তথা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়।
আল্লাহকে স্মরণ করে ইবাদত করতে হবে এবং দু’ চোখে অশ্রু ঝরাতে হবে।
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ; প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা

SHARE

Leave a Reply