হীদ আবদুল মালেক এক বিরল প্রতিভা -প্রকৌশলী মোমতাজুল করিম

মেধাবী ছাত্রগণ সকল ছাত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে। তেমনি একজন ছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। তখন ঢাকা কলেজে পড়ি। আমাদের কলেজের সাব-ইউনিটের প্রোগ্রামেও তিনি আসতেন। সংগঠনের ইউনিট সংখ্যা ছিল সীমিত। তখন ঢাকা শহরে খুব বেশি শাখা ছিল না। এমনি এক প্রোগ্রামে তিনি সম্ভবত ‘সত্যের সাক্ষ্য’ এই বিষয়ে বক্তৃতা করলেন। এত প্রাঞ্জল ও প্রাণবন্ত আলোচনা যে তন্ময় হয়ে শুনেছিলাম। তখনো তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়নি। তবে একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন জেনে একটা ভক্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছিল মনে।
ক্রমান্বয়ে বুয়েটে ভর্তি হলাম এবং তাঁর আরো কাছে এলাম। যখন আমার ৩য় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা চলছিল তখনি সেই দুর্ঘটনা ঘটল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসির সেমিনারে যেতে পারিনি পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা হল থেকে বের হয়েই খবরটা পেলাম আর দৌড়ে মেডিক্যালে গেলাম। মালেক ভাইয়ের মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ ফোলা, অজ্ঞান। ওরা তাকে শুধু মাথায় মেরেছে। তার মাথা অর্থাৎ মেধাটাই দুশমনের টার্গেট ছিল। কারণ এই মেধার কাছেই ওরা যুক্তিতে হেরে গিয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তাঁর মতামতকে তারা যুক্তি দিয়ে ঠেকাতে না পেরে শক্তির আশ্রয় নিয়েছিল। করাচি থেকে ডা: জুমা খান এলেন, কিন্তু কিছু করা গেল না। তারা তাঁকে মরণ আঘাতই করেছিল, তাই বাঁচার আশা পূরণ হলো না।
সংগঠনের কাজের অজুহাতে মাঝে মাঝে ক্লাস মিস হয়ে যেত। মাঝে মাঝে কোন সাবজেক্টে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে হতো। মালেক ভাইয়ের সাথে দেখা হলেই বলতেন, ‘পরীক্ষা পাস হবে তো’? তার শাহাদাতের পর তাঁর কিছু লেখা নিয়ে আলোচনা হতো। একটা আদর্শের জন্য ক্যারিয়ারের চেয়ে তিনি আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরতে ধরতেন। প্রয়োজনে ক্যারিয়ার সেক্রিফাইসের কথা বলেছেন। কিন্তু পড়াশোনায় ঢিলেমি তিনি সমর্থন করেন নাই, যেটা আগেই তুলে ধরেছি।
এমনও হয়েছে, আমাদের কর্মীসংখ্যা কম থাকাতে এশার নামাজের পর পোস্টারিংয়ে বের হলে তিনি নিজেও আমাদের সাথে থাকতেন। সারা দিন নানা ব্যস্ততা ও দায়িত্ব পালনের পরও আমরা যেন কোন ভুল না করি তিনি ক্লান্ত শরীর নিয়েও আমাদের সাথে যোগ দিতেন। কোন একটা স্পটে পোস্টারগুলো লাগাতে বলে তিনি দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিতেন। কাজ শেষ করে ডাক দিতাম, মালেক ভাই, ওঠেন। এক ডাকেই উঠে যেতেন, আবার আমাদের সাথে অন্য স্পটে যেতেন আর কতটুকু উচ্চতায়, কোন্খানে পোস্টার লাগাতে হবে দেখিয়ে দিতেন। এভাবে ঢাকা মেডিক্যাল হোস্টেল থেকে বের হয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি, কার্জন হল, ঢাকা হল, ফজলুল হক হল ও বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার লাগানো ও চিকা মারতে সারা রাতই শেষ হয়ে যেত। আলিয়া মাদ্রাসার মসজিদে ফজর নামাজ পড়ে এসে ডিলাইট বা পপুলার রেস্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে তিনি আমাদেরকে বিদায় দিতেন আর বলে দিতেন হলে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে ক্লাসে যেতে।
ঐ সময় অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের মধ্যেও নেতৃস্থানীয় অনেককে ছাত্রজীবনে একটানা বহু বছর থাকতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু তিনি সেটা সমর্থন করেননি। বলে রাখা ভালো, শহীদ হওয়ার সময়েও তিনি অনার্স ফাইনালের পরীক্ষার্থী ছিলেন, তিনিও লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কাজ করার পক্ষে ছিলেন না।
তিনি চাইতেন আমরা ভালো পড়াশোনা করি, ভালো রেজাল্ট করি। তিনি বুঝেছিলেন, নিজের মেধার সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ারকে ডেভেলপ করা হোক, সাদামাটা ধরনের লেখাপড়ার মান নিয়ে কেউ ভার্সিটি থেকে বের না হোক। কারণ দেশ ও জাতি তাদের কাছ থেকেই কিছু পেতে পারে যারা তাদের মেধাকে সর্বোচ্চ বিকশিত করতে পারে আর কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত অবদান রাখতে পারে। তবে তিনি এটাও বুঝেছেন যে আদর্শের খাতিরে নিজের জীবন, সম্পদ সব কিছুকেই এক সময় ত্যাগ করতে হতে পারে।
আমরা রাসূল সা.-এর জীবনে কী দেখতে পাই। তিনি মক্কার সমাজে সবচেয়ে মেধাবী, বিশ্বস্ত, আমানতদার ও দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি আল্লাহর নবী পদে বরিত হলেন তখন তাঁর দাওয়াতের দাবি পূরণ করতে গিয়ে তাঁকে সম্মান, সম্পদ ও নেতৃত্ব হারাতে হয়েছে, তাঁর ‘আল- আমিন’ উপাধি তাঁকে অত্যাচার-নির্যাতন-অবরোধ থেকে বাঁচাতে পারেনি, দেশ ও সহায়-সম্পদ ত্যাগ করে দূর মদিনায় হিজরত করতে হয়েছে।
তার পরের যুগেও যারাই সমাজের মধ্যমণি, সৎ, যোগ্য ও আমানতদার বলে সকলে একবাক্যে স্বীকার করত তাদেরকেও দ্বীন বুঝা ও দাওয়াতের দায়িত্ব পালনের কারণে মিথ্যা অজুহাতে দেশান্তরিত, কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত অথবা ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করতে হয়েছে। এই দেশেও আমরা একই দৃষ্টান্ত দেখতে পেয়েছি। তাই ক্যারিয়ার ডেমেজ নয় বরং উপযুক্ত ক্যারিয়ার গঠনই ছিল শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের কামনা আর যেহেতু সবার ওপরে অগ্রাধিকার হচ্ছে আদর্শের তাই ইসলামী আদর্শের জন্য চূড়ান্ত সেক্রিফাইস অর্থাৎ জীবন দেয়ার জন্যও তৈরি থাকা- এই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
আমাদের এই জমিনেই আমরা অনেক ছাত্র যুবক ও তরুণ শহীদের জীবন কোরবানি দেখেছি। তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের জীবন-কাহিনীতে আছে তাঁরা কোন ব্যাক বেঞ্চার ছিলেন না। ভালো ছাত্র, পরোপকারী, সৎ ও মিষ্টভাষী, এসব গুণই তাঁদের ছিল। আমাদের মুরুব্বিদের মধ্যেও যারাই শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন, দেখুন তো তাঁদের কাজকর্ম কেমন ছিল। তারা ছিলেন দক্ষ ও মেধাবী প্রশাসক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সমাজদরদি, সমাজসচেতন ও পরোপকারী।
এ বিষয়টির দিকে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, কোনোভাবেই সাদামাটা ক্যারিয়ার গঠন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের লক্ষ্য হতে পারে না। আমাদেরকে অবশ্যই আল্লাহর দেয়া মেধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি আদর্শকে চেনা তথা আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা, রাসূলের সা. সুন্নাহকে জানাও জরুরি। রাসূলের সা. চেয়ে অনেক নামকরা মানুষ থাকতেও বিবি খাদিজা তাঁকেই যোগ্যতার আলোকে বাছাই করে তাঁর ব্যবসার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। তার নবুয়ত-পরবর্তী জীবনের কথা তো আগেই বলেছি।
আজকের বিশ্বে আমরা কী দেখেছি, তুরস্কের নাজমুদ্দিন আরবাকান একজন দক্ষ প্রকৌশলী ছিলেন, যিনি জার্মানিতে ট্রেনিংয়ে গিয়ে সেখানকার নামকরা ইঞ্জিনের ডিজাইনে রদবদল করেছিলেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়েছিল। নিজের দেশে মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে তিনি দেশকে শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। বারবার তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে, ষড়যন্ত্রের মুখে কয়েকবার দলের নাম বদলিয়ে কাজ করতে হয়েছে, তবু বাতিলের সামনে মাথা নত করেননি। মিসরের শহিদ মুরসি ছিলেন একাধারে বহু গুণের অধিকারী, যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব নেতৃবৃন্দ তাঁদের দেশের সর্বোচ্চ খেদমত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাঁদের মেধার বিকাশের মাধ্যমেই। কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে কারো সাথে আপস করেননি।
আজ শহীদ আবদুল মালেকের জীবন থেকে ছাত্র ও যুবসমাজের এই শিক্ষাই নিতে হবে, যেকোনো মূল্যে নিজ ক্যারিয়ার তথা উপযুক্ততা গড়ে তুলতে হবে, সমাজকে কিছু ভালো দেয়ার জন্য নিজেদেরকে মানসম্মত করে গড়ে তুলতে হবে, জনমানুষের আশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে হবে। এর পাশাপাশি আদর্শকে চিনতে হবে, তার আলোকে আদর্শ চরিত্র গঠন করতে হবে। শহীদ আবদুল মালেকের জীবনের দৃষ্টান্ত থেকে আল্লাহর রাহে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্যও তৈরি থাকতে হবে। এটাই আল্লাহর রাসূলের সা. আদর্শ। আল্লাহর কাছে নিজের জীবনের সব কিছু পেশ করার এটি হচ্ছে নমুনা। আল্লাহ আমাদের সকল শহীদের জীবনের বাস্তব সাক্ষ্য ও তাঁর পথে জীবনের কোরবানি কবুল করুন।
লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) বিজেএমসি, ঢাকা

SHARE

Leave a Reply