হৃদেয়র আরশিতে শহীদ জাহাঙ্গীর

তৌহিদুর রহমান সুইট

সুরভি ছড়ানোর আগেই যে ফুল ঝরে যায়, নীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলার সাথে বিস্তৃত ডানা মেলে উড়ার আগেই যে পাখি প্রাণ হারায়, হয়তো ফুল ও পাখি হিসেবে তারা সার্থক কিন্তু আমরা বঞ্চিত হই ফুলের সেই মিষ্টি সৌরভ আর পাখা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখির সেই নয়নাভিরাম মনোরম দৃশ্য থেকে। দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়দীপ্ত কাফেলা ছাত্রশিবিরের যাত্রালগ্ন  থেকে এ পর্যন্ত বাতিলদের আঘাতে আমরা হারিয়েছি এ রকম শতাধিক ফুল আর পাখিকে, যারা তাদের সৌরভ থেকে আমাদের বঞ্চিত করে চলে গেছেন মহান প্রভুর কাছে না ফেরার দেশে। তাদের আমরা ফিরে পাবো না আর কোনো দিন কিন্তু আমাদের হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে তারা থাকবেন চিরকাল, প্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে তারা পথ  দেখাবেন আর হতাশার মাঝে জাগাবেন নতুন আশা।
শাহাদাতের তীব্র আকাক্সক্ষা প্রত্যেকটি ঈমানদার ব্যক্তিরই কিন্তু সকলেই কি সে সৌভাগ্য লাভ করতে পারে? আহা, কতই না সৌভাগ্যবান তারা যারা তাদের জীবনের সেই চাওয়াকে পূর্ণ করতে পেরেছেন। এমনই একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ১১৩তম শহীদ আমাদের প্রিয় জাহাঙ্গীর আলম ভাই। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার দারুশা ইউনিয়নে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। জাহাঙ্গীর ভাই পড়াশোনা করতেন রাজশাহী সরকারি কলেজে গণিত বিভাগে। পড়াশোনার জন্যই তিনি শহরে তার ফুফুর বাসায় থাকতেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এমন একজন মানুষের সাথে একসঙ্গে কাজ করার। জাহাঙ্গীর ভাই আর আমি একই থানার জনশক্তি ছিলাম, রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া উত্তর থানায় আমরা এক সাথে কাজ করতাম। তাকে দেখতাম ছোট একটি লাল সাইকেল নিয়ে সারাদিন ছোটাছুটি করতেন। কখনো ক্লান্তির ছাপ দেখতাম না তার চেহারায়। সবসময় হাসতেন আর হাত তুলে আগে সালাম দিতেন। জান্নাতের যাত্রী বলেই হয়তো তার মধ্যে আলাদা শক্তি ছিল অন্যকে খুব সহজে কাছে টেনে নেয়ার। চলাফেরায় অতি সাধারণ আর অকৃত্রিম সরলতায় ছিল তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। পাতলা কণ্ঠে মিছিলে শ্লোগান দিতেন, তার সেই  তেজোদীপ্ত শ্লোগান ধ্বনি আজও কানে ভাসে।
আমরা যখন এক সঙ্গে থাকতাম তখন অনেক গল্প করতেন তিনি। সমাজের নানা অসঙ্গতি আর যুবসমাজের অবক্ষয়ের কথা বলতেন, কিভাবে যুবসমাজকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসা যায় তা নিয়ে ভাবতেন। ছাত্রশিবিরের প্রথম শহীদ সাব্বির ভাইয়ের শাহাদাত বার্ষিকীতে যখন আমরা একসঙ্গে কুরআনখানি ও কবর জিয়ারতে যেতাম তখন তিনি বলতেন, “কত সৌভাগ্যবান সাব্বির ভাই, যাকে আমরা কখনো দেখিনি কিন্তু তার জন্য আমরা শত শত মানুষ চোখের পানি ফেলছি। এর চেয়ে ভালো মৃত্যু আর কী হতে পারে?” মুনাজাতের সময় দেখতাম জাহাঙ্গীর ভাই অঝোরে কাঁদছেন আর বলছেন, “হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এমন মৃত্যুই দান কর, তোমার কাছে আমি আর কিছুই চাই না। তোমার কাছে এটিই আমার একমাত্র চাওয়া।” মনে হয় আল্লাহ তার সেই আকুতি কবুল করেছিলেন, তাই তাকে শহীদ হিসেবে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রা কখনো ফুল শোভিত ছিল না বরং যারাই এ আন্দোলনের পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের প্রত্যককেই জুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। যত বেশি নির্যাতন হয়েছে এই কাফেলার সাথীরা ততবেশি সাহসিকতা আর ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার জমিনে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়াতে আর কুরআনের আলোয় আলোকিত একটি সুন্দর সমাজ গড়তে ১৩৮ জন ভাই তাদের বুকের তাজা খুন দিয়ে এই কাফেলাকে তার মন্জিলে পৌঁছাতে অনুপ্রাণিত করেছেন। বাতিলেরা ভেবেছিল খুন করে আর রক্ত ঝরিয়ে এই কাফেলার অগ্রযাত্রাকে রুখে দেবে কিন্তু তাদের সে ধারণা ভুল। হযরত বেলাল (রা), হামজা (রা) ও খাব্বাব (রা) এর মত নির্যাতন সহ্য করে হাসি মুখে এগিয়ে  গেছেন এই কাফেলার নির্ভীক সাথীরা, বারবার গর্জে উঠেছেন বাতিলদের বিরুদ্ধে। শহীদের কফিন দেখে যে কাফেলার সাথীরা শহীদ হওয়ার জন্য রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে, দুনিয়ার কোনো মোহ কি তাদের কখনো রুখতে পারে? যেন সব কিছুর বিনিময়ে তারা খোদার সন্তোষ আর জান্নাত লাভের জন্য ছুটে গেছেন সম্মুখে। তাইতো জাহাঙ্গীর ভাইকে দেখতাম যে  কোনো টেনশন মুহূর্তে সবসময় সবার আগে উপস্থিত হতেন আর সবার সামনে থাকতেন। আমাদের টিসিগুলোতে দেখতাম পানি-স্যানিটেশন বিভাগ, খাদ্য বিভাগ আর শৃঙ্খলা বিভাগের মতো কঠিন কাজগুলো সবসময় তিনি করতেন।
জাহাঙ্গীর ভাই ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করেছিলেন। আমার খুব মনে পড়ে, তার বিয়ের কয়েকদিন পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খালেক ভিসির অপসারণের জন্য আন্দোলন শুরু হয়। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল শেষ করে আসার সময় জাহাঙ্গীর ভাইকে বলছিলাম, ভাই আপনিতো বিয়ে করেছেন তারপরও এই টেনশন মুহূর্তগুলোতে মিছিল-মিটিংয়ে যান কেন? তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সংগঠনের এরকম কোনো সংবাদ শুনলে আমি থাকতে পারি না, মনে হয় কেউ যেন আমাকে খুব সুন্দর করে নাম ধরে ডাকছে আর আমি সেই ডাকে সাড়া দিচ্ছি।’ জাহাঙ্গীর ভাই সূরা তওবার ২৪ নম্বর আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন যার অর্থÑ
“বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পতœী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, সেই ব্যবসা যা তোমরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর তা যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা) ও আল্লাহর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত।”
আর বললেন, আমার ভয় হয় দুনিয়ার এই আকর্ষণ আমাকে যদি দুর্বল ঈমানদার বানিয়ে  ফেলে, তাই আমি সবসময় আগে আসার চেষ্টা করি।
আমাদের শব্বেদারি প্রোগ্রামগুলোতে দেখতাম সবাই বিশ্রাম নিলেও জাহাঙ্গীর ভাই নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন অথবা কুরআন পড়ছেন। তার প্রেরণা আর সাহচর্যেই আজ সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথ নিতে উজ্জীবিত হয়েছি। তিনি সবসময় বলতেন, ‘ভাই আপনারা স্থানীয় আর সাংগঠনিক পরিবারের সন্তান, আপনারা যদি এগিয়ে না আসেন তাহলে আমরা কিভাবে ইসলামের বিজয় আনবো।’
জাহাঙ্গীর ভাই আহত হয়েছিলেন ২০০১ সালের ১৭ এপ্রিল আর শাহাদাত বরণ করেন ১৯ এপ্রিল। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে আহত হয়েছিলেন সে সময় মহানগরীর আরও কয়েকজন দায়িত্বশীল ভাই। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের কাছে শুনেছি তাকে আহত অবস্থায় যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তিনি বারবার বলছিলেন তাকে রেখে সেই দায়িত্বশীল ভাইদেরকে আগে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আশ্চর্য হয়েছিলাম সেই কথা শুনে আর মনে মনে ভাবছিলাম শহীদেরা নাকি মৃত্যুযন্ত্রণা বুঝতে পারে না, তবে কি তিনি জান্নাতের সুগন্ধি পেয়েছিলেন বলেই এমন কথা বলতে পেরেছিলেন? হয়তো বা তাই হবে তাছাড়া কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এমন কথা বলা সম্ভব নয়।
কুরআনের আলো জ্বালানোর স্বপ্ন ছিল যার চোখে, মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যয় ছিল যার বুকে, পৃথিবীর সকল চাওয়া পাওয়াকে তুচ্ছ করে মহান প্রভুর কাছে চলে গেছেন আমাদের প্রিয় সেই জাহাঙ্গীর ভাই। যে শহীদি মৃত্যু তিনি চাইতেন সবসময় আল্লাহর কাছে, আল্লাহ তাকে  সেই মৃত্যুই দিয়েছেন, সফলতা তার পদ ছুঁয়েছে। তিনি হয়েছেন অমর, অক্ষয়, তিনি না থেকেও বেঁচে থাকবেন এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের বুকে। কোনো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
আন্দেলনের চলার পথে কোন সময় যদি হতাশা এসে যায়, কিছুটা অলসতা চলে আসে তখন বারবার জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, মনে হয় যেন তিনি পাশে থেকে সেই কথাগুলো বারবার বলছেন। ঠিক তখনই সজাগ হয়ে উঠি, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেককে দংশন করে বারবার, লজ্জিত আর অনুতপ্ত হই নিজে নিজেই। মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই নিজের শত দুর্বলতার জন্য। শহীদ জাহাঙ্গীর ভাইসহ ১৩৮ জন ভাইকে আমরা হারিয়েছি। তাদের আমরা আর কখনো ফিরে পাবো না, তারা থাকবে আমাদের হৃদয়ে। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব আমাদের, প্রতি ফোঁটা রক্তের বিনিময়ে বাংলার যতটুকু জমিনকে তারা উর্বর করেছেন সেখানে ফসল ফলানো ও রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। শহীদের পিতা-মাতা, ভাই-বোনেরা আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কবে এ দেশে ইসলামের বিজয় নিশান উড়বে আর তারা তাদের প্রিয়জন হারানোর বিচার পাবেন।
লেখক : কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply