হেফাজতে ইসলামের পথচলা ও সতর্কবার্তা -হারুন ইবনে শাহাদাত

বাংলাদেশের মানুষের অন্তরের অতি গভীরে ধর্মের শিকড়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মের জন্য জীবন-মরণপণ করে দ্বিধাহীনচিত্তে। কিন্তু তারা সাম্প্রদায়িকতা ও ক্ষুদ্র মানসিকতা গোঁড়ামিমুক্ত। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ এই ভূ-খণ্ডে একসাথে শান্তিতে বসবাস করছে। একজন আরেকজনের বিপদে এগিয়ে আসে মমতা ভরা মনে, ভালোবাসার টানে। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন, এই উদার ও মুক্ত মানসিকতার কারণ ইসলামের সুদূরপ্রসারী প্রভাব। ইসলাম বিশ্বাসের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদার। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, কারো ওপর জোর করে আদর্শ চাপিয়ে দেয়া ইসলামে নিষেধ। ইসলামের এই উদার দর্শনের আকর্ষণেই দলে দলে মানুষ এই আদর্শ গ্রহণ করেছে এবং এখনো করছে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে কোন অঘটন যেন না ঘটে। এই জন্যই মুসলমানদেরকে অন্য ধর্মের কোন অনুষঙ্গ গ্রহণ করতে কিংবা তার অনুসরণ করতে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। একজন মানুষ যা বিশ্বাস করে না, অথচ অন্যরা তা ধর্মজ্ঞান করে পালন করে, বিশ্বাসহীনভাবে তার অনুসরণ তাদেরকে ব্যঙ্গ করার শামিল। যেমন ধরুন, কারো বড় বোন চোখে কাজল কিংবা ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে গিয়ে চোখ বড় বড়, ঠোঁট প্রসারিত করছে, আয়নার পিছনে দাঁড়িয়ে তার আদরের দুষ্ট ছোট ভাইটি যদি হাতে কাজল ও লিপস্টিক ছাড়াই অনুরূপ অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে, বিষয়টি কেমন হবে? বড় বোনের মেজাজ খারাপ হবে কি না? কোন ধর্মে বিশ্বাসী না হয়েও তাদের অনুকরণও ঠিক তেমনি। এতে শুধু নিজের বিশ্বাসের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয় না, অন্যকেও বিদ্রƒপ করা হয়। এর প্রভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। একজন মুসলমান যেমন কামনা করেন না, তাদের ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠানে অনাহূতভাবে অন্য ধর্মে বিশ্বাসী কোন আগন্তুক প্রবেশ করুক, একজন ধর্মনিষ্ঠ হিন্দু খ্রিস্টান বৌদ্ধও তা চান না। তারপরও নিজেকে প্রগতিশীল, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করার জন্য কিছু জ্ঞানপাপী এমন অনধিকার চর্চা করতে গিয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।

দেশে বর্তমানে এমন একটা সঙ্কট চলছে। দেশের আলেম সমাজ, সরকার ও তথাকথিত প্রগতিশীলতার ধারক ও বাহকরা শুধু নিজেদের ধর্মীয় স্বকীয়তাই বিসর্জন দিচ্ছে না। ধর্মনিষ্ঠ মানুষদেরকে তাদের কাতারে শামিল হতে বাধ্য করছে। যারাই এমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে তাদের ওপর নেমে আসছে অত্যাচার নির্যাতনের খড়গ। এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। ঔপনিবেশিক যুগে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে এদেশের মুসলমানদের। সেই সময় হাজী শরীয়তুল্লাহ শুরু করেছিলেন ফারায়েজি আন্দোলন। তার ধারাবাহিকতায় আলেমসমাজ বিভিন্ন নামে যুগে যুগে সংগঠিত হয়েছেন। অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যানারেও সংগঠিত হয়েছেন, যেমন: মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামী ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবার আলোচনায় হেফাজতে ইসলাম
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশের মানুষের মাঝে ইসলামের সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দেয়া এবং শাসকদেরকে দিকনিদের্শনার প্রত্যয়ে কাজ করছে হেফাজতে ইসলাম নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। সময়ে সময়ে সংগঠনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। ২০১৩ সালের ৫ মে’র শাপলা চত্বর ঘটনার পর অনেক দিন কোন বড় কর্মসূচি নেয়নি সংগঠনটি। তবে বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলাম। এ ছাড়া এর আগে ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর এবং গত ১৩ ডিসেম্বর হেফাজতের নবনির্বাচিত মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর ইন্তেকাল (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) সংগঠনটির জন্য উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতে হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও চরমোনাই পীর সৈয়দ ফয়জুল করিমের বিরুদ্ধে গত ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর মামলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে ঢাকার মহানগর আদালতে। রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে দায়ের করা মামলা দুটি আমলে নিয়েছে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত। আদালত মামলা তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবি আইকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

কেন এই মামলা?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করা এবং ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়ায় হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও চরমোনাই পীর সৈয়দ ফয়জুল করিমের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে ঢাকার মহানগর আদালতে। রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে দায়ের করা মামলা দুটি আমলে নিয়েছেন ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত। আদালত মামলা তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবি আইকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
এ দিকে ভাস্কর্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সব ধরনের ভাস্কর্যের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অতিরিক্ত সদস্য। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। নাশকতার আশঙ্কায় সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। ভাস্কর্য স্থাপনের পক্ষে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেছে আওয়ামী লীগসহ দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
গত ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর সোমবার সকালে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট মশিউর মালেক ঢাকা মহানগর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে মাওলানা মামুনুল হককে। ঐদিনই আরেকটি মামলাও ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে দায়ের করা হয়। এ মামলার বাদি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এ মামলার আসামি মামুনুল হক, সৈয়দ ফয়জুল করিম ও জুনায়েদ বাবুনগরী।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ১৩ নভেম্বর বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন) মিলনায়তনে বাংলাদেশ যুব খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগর শাখা সমাবেশ করে। সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করা হয়। ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে আসামি মামুনুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য গড়তে দেয়া হবে না। প্রয়োজনে লাশের পর লাশ পড়বে। আবার শাপলা চত্বর হবে। প্রসঙ্গত, হেফাজতে ইসলামের মতিঝিলের শাপলা চত্বর প্রসঙ্গের ইঙ্গিত দেন।
মামুনুল হকের বক্তব্যের পর একটি শ্রেণী বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে একের পর এক বক্তব্য দিচ্ছে। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণে বিরোধিতা করে উত্তেজনাকর বক্তব্য দেয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়।

আমিনুল ইসলাম বুলবুলের মামলায় অভিযোগ করা হয়, আসামিরা ভীরু, মিথ্যুক, জ্ঞানপাপী, ধর্মের অপব্যবহারকারী, রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্টকারী, বিদেশী জায়নবাদী শক্তির দালাল চক্র বটে। যারা তাদের অর্জিত জ্ঞানকে বাতিলের পথে পরিচালিত করে পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেদেরকে ধর্মগুরু হিসেবে আখ্যা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও সংবিধান সম্পর্কে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে পরস্পর যোগসাজশে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। একইদিন আসামি সৈয়দ ফয়জুল করিম ধোলাইখালের নিকটে গেন্ডারিয়ায় তার নসিহত শুনতে আসা সাধারণ মুসলমানদের হাত উঁচু করে শপথ পড়ান। যারা শপথ নেন, তাদের বলানো হয় ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করব, সংগ্রাম করব, জিহাদ করব। রক্ত দিতে চাই না, দেয়া শুরু করলে বন্ধ করব না। রাশিয়ার লেনিনের ৭২ ফুট উঁচু মূর্তি যদি ক্রেন দিয়ে তুলে সাগরে নিক্ষেপ করতে পারে, তাহলে আমি মনে করি শেখ সাহেবের এই মূর্তি আজকে হোক, কালকে হোক খুলে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপ করবে।

এছাড়া আসামি মোহাম্মদ জুনায়েদ ওরফে জুনায়েদ বাবুনগরী হাটহাজারীতে বলেন, মদিনা সনদে যদি দেশ চলে তাহলে কোন ভাস্কর্য থাকতে পারে না। তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি করে বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সরে না দাঁড়ালে তিনি আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটাবেন এবং ওই ভাস্কর্য ছুড়ে ফেলবেন।
গত ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সত্যব্রত শিকদারের আদালতে মামলা দুটি দায়ের হয়। আদালত মামলা আমলে নেয়। পরে বিচারক দুই মামলার বাদির জবানবন্দী গ্রহণ করেন। জবানবন্দী শেষে বিচারক নথি পর্যালোচনায় আদেশ পরে দেবেন বলে জানান। ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রত শিকদারের আদালত মামলা দুটি আমলে নেন। পিবি আইকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি আগামী ৭ জানুয়ারি পিবি আইকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
এদিকে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে এবং ভাস্কর্য স্থাপনের পক্ষে ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছে আওয়ামী লীগসহ দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতারা। এ ছাড়া বিভিন্ন কথিত প্রগতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং সরকারদলীয় সমর্থক সরকারি কর্মচারীরাও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে।

আলেমদের আত্মপক্ষ সমর্থন
আলেমদের বক্তব্য হলো তারা ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠতার বিরোধিতা করছেন, কারণ এটা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে তারা ভাস্কর্য বা মূর্তি ভাঙার পক্ষে নয়। সরকারকে ইসলামের নির্দেশনা জানানো তাদের ঈমানী দায়িত্ব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কারো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার সরকার কিংবা কোন দলের নেই। অতীতে আলেমরা অনেক স্বৈরাচারী রাজা-বাদশাহদের বিরুদ্ধে হককথা বলে নির্যাতিত হয়েছেন। তারা আশা করেন, বর্তমান সরকার যেহেতু নিজেরকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তাই ইসলামের সত্যভাষণ প্রচারে বাধা দিবে না। তারা মূর্তি ও ভাস্কর্য হারাম এ কথা বলবেন, কারণ তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানা না মানা সরকারের ইচ্ছে, তবে তারা অনুরোধ করেছেন, সরকার যেন দাবি না করে এটা ইসলাম সম্মত বৈধ কাজ।
মামলার পরদিন গত ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ বলেন, ‘এ বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ। তাই আলেমরা ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। তিনি তার (মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম), হেফাজত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাকে মিথ্যা আখ্যায়িত করে এ মামলা প্রত্যাহারের দাবি করেন।

ভাস্কর্য নিয়ে বিরাজমান পরিস্থিতিকে দেশবিরোধী অপশক্তির চক্রান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেন চরমোনাই পীর বলেন, চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশের মানুষের ঐক্য বিনষ্ট করে ভিনদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে সামাজিক ও ধর্মীয় অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চায়। একটি সুবিধাভোগী মহল সাধারণ মুসলিম জনতার উত্থাপিত মতামতকে কেন্দ্র করে দেশে হুমকি-ধমকি দিয়ে বিশৃংখলা তৈরির অপচেষ্টা করছে। তাদের পেছনে বাংলাদেশের অর্জন, উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বিনাশে কর্মরত কিছু দেশী-বিদেশী চক্রেরও ইন্ধন রয়েছে বলে ধারণা করছি।’
হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টিকে ‘সৌভাগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এটাই আমাদের নাজাতের উছিলা হবে। এটাই আমাদের সৌভাগ্য। বাবুনগরীর একান্ত সচিব ইনামুল হাসান ফারুকী হেফাজত আমিরের বরাত দিয়ে জানান, কিছুক্ষণ আগে আমার প্রাণপ্রিয় শায়েখ ও মুরশিদ কায়েদে আজম শাইখুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে যখন বললাম, ভাস্কর্য ইস্যুতে আপনাকেসহ আল্লামা মামুনুল হক ও আল্লামা ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। হুজুর হেসে বললেন, কুরআন-হাদিসের বাণী পৌঁছাতে গিয়ে ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় আমাদের নামে মামলা হয়েছে। এটাই নাজাতের উছিলা হবে, আর এটাই আমাদের সৌভাগ্য।

হেফাজতের যুগ্মমহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক গত ৭ ডিসেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে বলেন, আমরা মদিনা সনদে দেশ চালানোর কথা বললে যদি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মদিনা সনদে দেশ চালানোর কথা বলেছেন। এ জন্য এ মামলা শুধু হেফাজতের বিরুদ্ধে নয়, আমরা মনে করি এটি দেশ ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। হয়তো একদিন এ কুচক্রী মহল প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিতে পারে। এ জন্য আমরা স্তম্ভিত। ষড়যন্ত্র কত গভীরে তা আওয়ামী লীগ নেতাদের বুঝতে হবে। এ ব্যাপারে তাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে ভুঁইফোঁড় সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভাস্কর্য নিয়ে আলেমরা ফতোয়া দিয়েছেন। এ নিয়ে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু ভাস্কর্য বিরোধিতাকে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা হিসেবে প্রচার করে তারা আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। এটা কখনো কাম্য হতে পারে না। এখনই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে না থামালে অদূর ভবিষ্যতে দেশে আরো বড় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী বলেন, আমরা মনে করছি মামলাটি সাজানো। পরিকল্পিতভাবে এ মামলা দেয়া হয়েছে। আমরা এখন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি বলেন, আলেমরা ফতোয়া দিয়েছেন, যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় সভা করে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করার অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে এ মামলা দেয়া হলো। আমরা এখন দেখব সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়। সরকারের গতি-প্রকৃতি দেখে আমরা আমাদের গতি-প্রকৃতি ঠিক করব। আমরা আশা করি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ভালো কোনো সমাধান আসবে; যাতে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে সরকার সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে। দেশে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে সরকার সেদিকে যাবে বলেই আমরা মনে করি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র ও যুগ্মমহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘এ মামলার কোনো ভিত্তি নেই। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, মাওলানা মামুনুল হক ও মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম কেউই বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙতে বলেননি। মূর্তি ভাঙ্গা আলেমদের কাজ নয়। শীর্ষ আলেমরা একটি ফতোয়া দিয়ে দেশের সব মূর্তি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা মনে করছি ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পরিকল্পিতভাবে আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হচ্ছে। এটি দুঃখজনক। মামলাটি পিবিআইতে তদন্তের জন্য দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি তাদের তদন্তে এ মামলাটি টিকবে না।’

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ একটি অরাজনৈতিক গঠন। মুসলিম জনসাধারণের ঈমান-আকিদা, তাহজিব-তমদ্দুন হেফাজতের লক্ষ্যে এদেশের সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম নিজেদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অর্পিত ঈমানী দায়িত্ব পূরণের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি এশিয়ার বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সম্মানিত পরিচালক সর্বজন শ্রদ্ধেয়, বুজুর্গ, আলেমেদ্বীন, হযরত মাদানী রহ.-এর সুযোগ্য খলিফা শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেব (দামাত বারাকাতুহুম) এর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ গঠন করেন।

মূলনীতি : ১. আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ২. খতবে নবুয়াতের প্রতি পূর্ণ আস্থা ৩. কুরআন ও সুন্নাহ, খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম (রাজিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুম) অনুসরণে তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ্ এর নির্ধারিত পথ অনুসরণ ৪. আমর বিল মা’রুফ নাহি আনিল্ মুনকারের মাধ্যমে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে তৎপরতা সৃষ্টি, সমাজ গঠন ও সংরক্ষণ এবং শিরক, বিদআত ও কুফরি তৎপরতার বিরুদ্ধে সংশোধন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। ৫. আত্মশুদ্ধিমূলক মুসলিম ভ্রাতৃত্বই হেফাজতের অন্যতম মূলনীতি।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : ১. মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। ২. কুরআন-হাদীস অনুসারে জীবন যাপনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা। ৩. আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ।

কর্মসূচি : ১. দাওয়াত ও তাবলিগ: মুসলিম সমাজে ইসলাম তথা কুরআন-হাদীস ও উলামায়ে কেরামের ঐতিহ্যবাহী অনুসৃত পথে নির্ভেজাল ইসলাম চর্চার পথে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা। ২. আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে নফ্স: ইসলামী আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়ায়ে নফ্সের শর্ত পূরণে কার্যক্রম গ্রহণ।

৩. খিদমাতে খালক্ বা আল্লাহর সৃষ্টির সেবা : সমাজে পরার্থে আত্মত্যাগের মহান রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং মানবতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা। ৪. ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন চর্চা: সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি সমাজ সদস্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিবেক সৃষ্টি করত চর্চার রীতি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম পরিচালনা করা। ৫. আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল্ মুন্কার: সৎকাজে আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থার পূর্বশর্ত। পবিত্র কুরআন নির্দেশিত এই দায়িত্ব বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা।

হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি : তেরো দফা দাবি নিয়ে কোনো কোনো মহল থেকে উত্থাপিত সমালোচনা ও বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলামের আমির দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, হেফাজতে ইসলাম উত্থাপিত ১৩ দফা দাবি নিয়ে কোনরূপ বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের সুযোগ নেই। আমরা গত ৯ মার্চ জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী নেতা ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এই দফা-দাবি প্রণয়ন করেছি। আমাদের সব দাবি মুসলমানদের ঈমান-আকিদার সংরক্ষণ এবং দেশের স্বাধীনতা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ বিবেকের কোনো নাগরিকই আমাদের কোনো দাবির বিরোধিতা করতে পারেন না।

দাবিসমূহ :
১. সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করতে হবে।
২. আল্লাহ, রাসূল সা. ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে।
৩. তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কতিপয় ব্লগার, নাস্তিক-মুরতাদ ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপতৎপরতা ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে এবং যেসব নাস্তিক-মুরতাদ ও ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তি-সংগঠন যে কোনো মাধ্যমে আল্লাহ-রাসূল সা., ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করত দেশের ৯০% মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, তাদেরকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারীজাতির সার্বিক উন্নতির বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে তাদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মস্থল, সম্মানজনক জীবিকা এবং কর্মজীবী নারীদের ন্যায্য পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে নারীদের ইজ্জত-আব্রু, যৌন হয়রানি থেকে বেঁচে থাকার সহায়ক হিসেবে পোশাক ও বেশভূষায় শালীনতা প্রকাশ এবং হিজাব পালনে উদ্বুদ্ধকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; এবং একই লক্ষ্যে নারী-পুরুষের সব ধরনের বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে অবাধ ও অশালীন মেলামেশা, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার সহিংসতা, যৌতুক প্রথাসহ যাবতীয় নারী নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
৫. নারীনীতি ও শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারা ও বিষয়গুলো বিলুপ্ত করতে হবে এবং শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামের মৌলিক শিক্ষা মুসলিম ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৬. ভাস্কযের্র নামে মূর্তিস্থাপন, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলনের নামে শির্ক সংস্কৃতিসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
৭. রেডিও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে।
৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘেœ নামাজ আদায়ে বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করতে হবে।
৯. দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ঈমান ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
১০. কাদিয়ানিদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
১১. রাসূলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র, মসজিদের ইমাম-খতিব ও তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
১২. অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদরাসার ছাত্র, ইমাম-খতিব ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
১৩. বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

সরকারের বিরোধিতার সীমা :
ইসলামী চিন্তাবিদরা মনে করেন, প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সরকারকে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখলের কোনো নিয়ম বা প্রচেষ্টা ইসলাম অনুমোদন করেন না। তবে জনমত গঠনের মাধ্যমে বৈধপন্থায় সরকার পরিবর্তনে কোন বাধা নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলিম সরকারের ইসলামবিরোধী কাজের গঠনমূলক সমালোচনা সবসময় ছিল। অতীতের স্বৈরাচারী শাসকরাও সরকার বিরোধিতাকে বিদ্রোহ গণ্য করতো। অতীতে অনেক আলেমকে অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। অনেকের মৃত্যু হয়েছে জালেম শাসকদের কারাগারে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা ও বিরোধিতার সুযোগ আছে। জনগণের মতামত নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগও আছে। তারপরও অত্যাচার নির্যাতন বন্ধ হয়নি।

উবায়দুর রহমান খান নদভী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইসলামে দীনি কাজের পদ্ধতি, বিশাল ও গভীর। রাজনীতির প্রকৃত রূপও অনুরূপ। যা সাময়িক দখল বা নিয়ন্ত্রণ নয়। ইসলাম চায় চিরস্থায়ী পরিবর্তন। যে ধরনের রাজনীতি করেছেন এদেশে আগত লাখো মুবাল্লিগ পীর আউলিয়া ও সুফি দরবেশ। মুঘল বাদশাহ আকবরের ভ্রান্ত মতবাদ দীনে ইলাহির বিরুদ্ধে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানি আহমদ সরহিন্দির আন্দোলনের ধরন ছিল ঠিক এমনই। বাংলাদেশে হাজার বছরের উলামা মাশায়েখ ও ইসলামী আন্দোলনকারীদের কাজ পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, তাদের উদ্দেশ্যও ছিল মানুষ তৈরি ও সমাজগঠন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, হেফাজতে ইসলামের মতো অরাজনৈতিক গঠনকে উল্লিখিত বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। তাদের সংগঠন অরাজনৈতিক কিন্তু অনেক ইসলামপন্থী দলের নেতাই এর বড় বড় পদে আসীন। কিন্তু দেশের মূল ধারার সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলটিকে তারা মাইনাস করে পথ চলছে। এই সঙ্কীর্ণতামুক্ত হয়ে ইসলামপন্থীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে কোন অরাজনৈতিক সংগঠনই রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া বেশি দূর যেতে পারে না। তবে একথাও ঠিক অরাজনৈতিক চরিত্র বিসর্জন দেয়াও হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী। তাই কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে। তাহলে শাপলা চত্বরের মতো আমানত বিনষ্টকারী কোন ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply