post

হেরার পথের সাহসী জনস্রোত

রাজিবুর রহমান

১৩ জুলাই ২০২৩

ভূমিকা

পলাশীর প্রান্তরে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা-র্সূয অস্তমিত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে উপমহাদেশের রাজনীতিতে ক্রমশ নতুন মাত্রা ও অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। একদিকে ইউরোপীয় শাসকদের সীমাহীন লুটপাট, শোষণ ও বঞ্চনা; অন্যদিকে পশ্চিমা আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভারতবর্ষের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে এ সময়টুকু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একশো নব্বই বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামলে অবিসংবাদিতভাবে বেশি পিছিয়ে পড়েছে মুসলমানরাই। সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতিপক্ষ কেবল ব্রিটিশরাজই ছিল না, বরং স্বদেশী ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের বিরোধিতাও মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ ভূমির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শুরু হয় পাকিস্তান আন্দোলন। সময়ের আবর্তনে এই আন্দোলন সফল হলে মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে ‘পাকিস্তান’ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। 


শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনা

খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের নামে মুসলমানদের ওপর দীর্ঘকাল চলে আসা শোষণ ও জুলুমের সমাপ্তি হবে। কিন্তু এ আশাবাদ খুব দ্রুতই ভুল প্রমাণিত হয়ে যায়। রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের পরপরই পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা চলে যায় জেনারেলদের হাতে। ফলে পার্শ্ববর্তী ভারতে যখন ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করছিল, তখন একের পর এক রাজনৈতিক টানাপোড়েনে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছিল পাকিস্তান। এর প্রভাব থেকে গেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি সর্বস্তরের জনতার যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা উবে যেতে সময় লাগেনি। গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ সামরিক জান্তার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় আওয়ামী লুটেরাদের হস্তগত হয়।

১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ শাসন করতে থাকে। একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে যেভাবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত করা দরকার ছিল, সেটি তো করা হয়ইনি; উল্টো দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লুটপাট, দুর্নীতি, মতপ্রকাশের অধিকার হরণ, আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের বিশৃঙ্খলা, দলীয় নেতাকর্মীদের অসহনীয় দৌরাত্ম্য, একদলীয় শাসনব্যবস্থার বাস্তবায়ন প্রভৃতি নৈরাজ্য অবাধে চলতে থাকে। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের উদ্ভূত পরিস্থিতির ফলে দেশের শাসনক্ষমতা থেকে ২১ বছর দূরে থাকে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তার পিতার রাজনৈতিক দর্শন অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করতে থাকেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে পার করে পাঁচ বছরের শাসনামল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে আওয়ামী লীগ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিনা ভোটের নির্বাচনের মাধ্যমে অতীতের সমস্ত অরাজকতার রেকর্ড ভেঙে দেয়।

 

আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক অরাজকতার সংক্ষিপ্ত চিত্র 

ক্ষমতায় এসেই তারা নিজেদের শাসনকে চিরস্থায়ী করতে আঘাত হানে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনপদ্ধতি তুলে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা চালু করে। এর ফলাফলও খুব দ্রুতই পরিলক্ষিত হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচন বলতেই বোঝায় ভোটারবিহীন, কারচুপিপূর্ণ, একদলীয়, ভোঠ ডাকাতি ও লোকদেখানো নির্বাচন। আওয়ামী লীগ কখনো তাদের পোষা সন্ত্রাসীদের দিয়ে কেন্দ্র দখল করে ভোট দিয়েছে, কখনো ভোট গ্রহণের আগেই প্রিজাইডিং অফিসারদের দিয়ে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে ফেলেছে। মোটকথা, এদেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে তারা।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন নির্বাচন। এই পাতানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোটের আগেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৫৪টি আসনে নির্বাচনের প্রয়োজনই হয়নি। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বয়কট করে। ২০১৮ সালে নির্বাচনী প্রহসনের নতুন রূপ দেখতে হয় জাতিকে। নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাওভাবে প্রচারিত হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নিলে দেশের মানুষ আশান্বিত হয়। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ সরকার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে পুনরায় ঠেলে দেয় অন্ধকারের দিকে। 

শুরু থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নব্য বাকশাল কায়েম করতে বিরোধীদল নির্মূলের ঘৃণ্য মিশন শুরু করে। দফায় দফায় মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সকল শীর্ষ নেতাকর্মীকে দূরে ঠেলে দেয় রাজনীতির ময়দান থেকে। জামায়াতের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দকে বিচার নামক প্রহসনের মাধ্যমে হত্যা করে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ও ঠুনকো মামলায় সাজা দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিরোধী দলের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করার পাশাপাশি সরকারকে মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি না করতে বারবার আহ্বান জানিয়েছে। নাগরিক সমাজ ও বিদেশী কূটনীতিকরাও সরকারের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা জনবিমুখ সরকার কোনো কিছুই গ্রাহ্য করেনি। অত্যাচার-নিষ্পেষণের মাত্রা সমানতালে অব্যাহত রেখেছে।

বিগত বছরগুলোতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রগুলোতে দলীয়করণ চলতে থাকায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে মাঠ প্রশাসনে। বিগত দশ বছরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই, দখলদারিত্ব, খুনের মতো গুরুতর অপরাধ বেড়েছে পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়ে। সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় অনেক সময় পুলিশও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। নারীর প্রতি সহিংসতাও বৃদ্ধি পেয়েছে এ সময়। ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা প্রায়ই ধর্ষণ-ইভটিজিংয়ের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গৃহবধূকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গণধর্ষণ, কলেজছাত্রী খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কোপানো কিংবা বগুড়ার তুফান সরকার কর্তৃক মা ও মেয়েকে ধর্ষণ করে ন্যাড়া করে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম রীতিমতো হার মানিয়েছে দুঃস্বপ্নকেও।

স্বৈরশাসকরা জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করার সবগুলো পথ বন্ধ করে দেয়, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে বিধিনিষেধ চালিয়ে বিরোধী দলকে দুর্বল করার মাধ্যমে নিজেদেরকে ক্রমশ করে তোলে অপ্রতিরোধ্য। যে কারণে দুর্নীতি ও অপশাসন বেড়ে যায় জ্যামিতিক হারে। আর এর জন্য চড়া মাশুল দিতে হয় দেশের সাধারণ মানুষকে।


আওয়ামী সন্ত্রাসের কবলে দেশ

২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নিজেদের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়। শুরু হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি কালো অধ্যায়। শেখ হাসিনা যে শুধু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেন তা নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে তাদের ওপর শুরু করেন দমন-পীড়ন। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের ওপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়। জামায়াত-বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় সারা দেশে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল, প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে নেতাকর্মীদের ওপর দমন-নীতির প্রয়োগ করেন। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ আবদুল কাদের মোল্লা ও বিশ্বনন্দিত আলেমে দ্বীন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রায়ের পর সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শুধুমাত্র আল্লামা সাঈদীর রায়ের পরের দুই দিনেই প্রায় ৮০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। একই বছর সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, গ্রেফতার করা হয়, বুলডোজার দিয়ে তাদের বাড়িগুলোকে মিশিয়ে দেওয়া হয় মাটির সাথে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় পাঁচ জামায়াত নেতা-কর্মীর বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও মালামাল লুট এবং অন্তত ২০টি বসতঘর পুড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা। তাদের অপরাজনীতির শিকার হয় এদেশের সংখালঘু সম্প্রদায়। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপিয়ে বিরোধী মত দমনের অপচেষ্টা চালায়।  

ছাত্রশিবিরের সাবেক দুইজন কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও বিশেষ করে ২০১৩ সালের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন ভাইকে ৪৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে তারা। একই বছর ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী সাহিত্য সম্পাদক মেধাবী ছাত্র ইবনুল ইসলাম পারভেজ ভাইকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা যেন এসব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৬১৯ জন গুম এবং ২৬৫৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।


ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের কবলে শিক্ষাঙ্গন 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশ্রয়ে তাদেরই অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে। হত্যা, সন্ত্রাস, ছিনতাই, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, হল দখল, বিরোধী ছাত্রসংগঠনকে নির্মূল করাই ছাত্রলীগের দলীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়। ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনা করায় শিবির উৎখাতে উঠে পড়ে লেগে যায় ছাত্রলীগ। ছাত্রশিবির বরাবরই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও উদারনীতি পালন করার চেষ্টা করে। অহেতুক তর্কে জড়ানো, আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে সর্বদাই।

আওয়ামী লীগ সরকারের এতসব অপকর্মে যারা বাধা দিয়েছে, তাদেরকেই কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির এ জন্যই সবচেয়ে বেশি অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদের হাতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের নৈরাজ্যের সরব প্রতিবাদ করার কারণে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নামে শত শত মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অভিযানের নাম করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাত্রাবাস ও হলগুলো থেকে গ্রেফতার করেছে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের। কুরআন, হাদিস ও ইসলামী বইগুলোকে জিহাদি বই আখ্যা দিয়ে ছাত্রত্ব বাতিল করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। শিবির সন্দেহ হলে ডেকে এনে নির্যাতন করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া আজকাল বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ২০১৯ সালে বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রায়শই এ ধরনের জুলুমের শিকার হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সিরাজুল ইসলাম ভাই বুয়েটে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। নির্যাতনের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াতে তাঁকে; তবুও তিনি এর সঠিক বিচার পাননি।

এ পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের ২৩৪ জন জনশক্তি শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলেই শতাধিক জনশক্তিকে নির্দয়ভাবে খুন করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেধাবী ছাত্রদেরকে। শহীদ ও গুমের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের প্রতিও বিভিন্নভাবে সীমাহীন নিপীড়ন চালানো হয়েছে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যৌথ হামলা কিংবা পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির নির্যাতনের কারণে পঙ্গু হয়েছেন অন্তত ৫৪ জন নিরপরাধ ছাত্র। মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি নির্যাতনের কারণে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়েছেন অন্তত ৫ জন।


জুলুম নির্যাতন মাড়িয়ে এগিয়ে চলছে ছাত্রশিবির

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ইসলামী ছাত্রশিবির আজ এক বিশালাকার জনস্রোতের নাম। এ পথচলায় ছাত্রশিবিরকে মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক অনাকাক্সিক্ষত পরিবেশ-পরিস্থিতি ও বিপদসঙ্কুল অবস্থার। নানা ঘটনা-রটনা, অপপ্রচার ও অপশক্তির নৃশংসতা এবং নিষ্ঠুরতা উপেক্ষা করে আজ এ সুন্দর মিছিল পৌঁছেছে এক গর্বিত আঙিনায়। এ দীর্ঘ পথ অঙ্কিত হয়েছে শহীদি রক্ত আর আহত-পঙ্গুত্ববরণকারীদের আহাজারি এবং মজলুমের বিনিদ্র রজনীর চোখের পানিতে। এ পথ একটি সাহসী পদভারের উজ্জ্বলতায় চিহ্নিত। সকল বিপত্তির মোকাবিলায় এ কাফেলার দৃষ্টি জান্নাতের দিকে। 

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি আদর্শিক আন্দোলন ও মেধাবী ছাত্রদের সাহসী ঠিকানার নাম, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। অন্যায়, অসত্য ও জীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড এক বিদ্রোহ। মেধা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকারে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম। এই সাহসীরা হতাশার গুহায় আশার আলো জ্বালিয়ে নির্ভেজাল করে আগামীর রাজপথ। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রদের সংগঠন হলেও সূচনালগ্ন থেকেই সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্রসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ভাঙা-গড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাহসী ও উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে ছাত্রশিবির।

পাহাড়সম জুলুম মোকাবেলা করে ছাত্রসমাজকে নৈতিক পদস্খলন থেকে রক্ষা করে খোদাভীরু, চরিত্রবান, মেধাবী ও সুনাগরিক করার যে প্রয়াস ছাত্রশিবির চালিয়ে আসছে, তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছে ছাত্ররা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন যখন মাদকাসক্তি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে; সেখানে ছাত্রশিবিরের গঠনমূলক কাজ ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এ কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রশিবির একটি ইতিবাচক নাম, আস্থার জায়গা। এছাড়া ছাত্রসমাজের দাবি আদায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান, ছাত্রদের নানা সুবিধা আদায়ের সংগ্রামে শিবির ছিল সদাসচেতন ও তৎপর। ছাত্রদের সহযোগিতার জন্য টিউশনের ব্যবস্থা করা, স্টাইপেন্ড, লেন্ডিং লাইব্রেরির ব্যবস্থা করা ছাড়াও ছাত্রশিবির অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রমগুলোতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। বিভিন্ন আপৎকালীন সময়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ফ্রি ব্লাড গ্রুপিংসহ নানাবিধ জনমুখী কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রেখেছে।

আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকালে শিবিরকে প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের মোকাবিলা করতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বক্তৃতা-বিবৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে শিবিরকে যেমন হয়রানি ও অবদমনের অপচেষ্টা চলেছে, তেমনি বারুদের নির্মমতা ব্যবহার করে শত্রুপক্ষ থামিয়ে দিতে চেয়েছে এ সাহসী পথচলা। এসবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিবির এক স্বর্ণালি ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছে, যে ইতিহাস প্রেরণা জোগায় ভবিষ্যতের পথচলায়। এদেশের মাটি ও মানুষ ইসলামের জন্য বরাবরই অবারিত ও নিবেদিত। অসংখ্য মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক ইসলামী ছাত্রশিবির। শহীদের পিতা-মাতা, ভাই-বোনের বিনিদ্র রজনীর চোখের পানি ও দেশবাসীর ভালোবাসাই ছাত্রশিবিরের প্রেরণা।


ছাত্রশিবির একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার মেধা, মনন ও প্রতিভা বিকাশের যাবতীয় উপকরণ পেয়ে থাকে। শিক্ষার যে মূল লক্ষ্য- Harmonious Development of Body, Mind and Soul; এর সব শর্তই শিবিরের কর্মসূচি, পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে এ কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার- জাতিকে এর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ও ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিকাশ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া শিবিরের বিভিন্ন কর্মসূচি ও কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সিলেবাসভিত্তিক নিয়মিত অধ্যয়ন, পাঠচক্র, সামষ্টিক পাঠ, স্টাডি সার্কেল, স্টাডি ক্লাস প্রভৃতি। মেধা ও নৈতিকতার আলোকে একটি সমন্বিত সিলেবাসের মাধ্যমে নৈতিক ও জাগতিক দিক থেকে উন্নত মানুষ তৈরি করতে পারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনেক বড় অর্জন। নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি ব্যতীত একটি সুন্দর আদর্শ সমাজ কল্পনা করা যায় না। নবী করীম সা. বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়, যার চরিত্র সর্বোৎকৃষ্ট।’ (সহিহ বুখারি : ৩৫৫৯)

ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে পারে; শিবির এ দৃষ্টান্ত স্থাপনে চমৎকার সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। আদর্শিক মোটিভেশনই যে এর প্রধান কারণ, অনেকেই তা উপলব্ধি করেছেন এবং এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের আদর্শিক প্রতিপক্ষও কখনো এ সংগঠনের সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করে না। প্রতিদিন ব্যক্তিগত অধ্যয়নের মাধ্যমে প্রতিটি কর্মকে জ্ঞান ও আমলের দিক থেকে উন্নত করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপযোগী করা, নৈতিক ও আত্মিক দিকসহ সকল দিক থেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এ সংগঠনের প্রত্যেক জনশক্তি নিয়মিত ব্যক্তিগত রিপোর্ট সংরক্ষণ করেন। আল্লাহর দেওয়া ‘সময়’ নামক নিয়ামতকে কাজে লাগাতে এই সংগঠনের সকল জনশক্তি সদা তৎপর।

আমাদের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক ছাত্র প্রতিদিন নিজেই নিজের সমালোচনা করে থাকে। মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিদিনের ত্রুটির জন্য সে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, ক্ষমাপ্রার্থনা করে। পরবর্তী দিনগুলো যেন আরো সুন্দর হয়, সেজন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এভাবে প্রতিনিয়তই সে নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে পরিশুদ্ধ করে তোলে। আত্মগঠন, চরিত্র গঠন, পড়ালেখায় যত্নবান হওয়া, ইসলামী আদর্শের অনুশীলন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা এবং সহনশীলতা ও সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে শিবির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজদের প্রতি সাধারণ ছাত্রসমাজের অনীহা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা হ্রাস পাওয়ার এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

কুরআন-সুন্নাহ ও যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এ যুগের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক পাঁচ দফা কর্মসূচি নিয়ে ছাত্রশিবির তার লক্ষ্যপাণে এগিয়ে চলছে। শিবিরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ জান্নাতি পরিবেশ। এদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, সংঘাত, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একজন ছাত্র আরেকজন ছাত্রকে নির্দ্বিধায় আঘাত করতে দ্বিধাবোধ করে না। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মাঝে রয়েছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস, প্রেরণা ও উৎসাহ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা, শুভাকাক্সক্ষা ও ভালোবাসা। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কাক্সিক্ষত মানের হওয়া উচিত। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সে প্রত্যাশিত সম্পর্ক নেই। প্রতিনিয়ত যখন শিক্ষক-শিক্ষিকা লাঞ্ছিত হচ্ছেন, সেখানে ছাত্রশিবির শিক্ষকদেরকে বানিয়েছে সম্মানের মুকুট।

শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে দেশে কোনো শিক্ষানীতি প্রণীত হয়নি, বরং ধর্মহীন শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিবির এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতাকে সচেতন করে জনমত সংগ্রহের জন্য জাতীয় শিক্ষা সেমিনারের আয়োজন, স্থানীয় সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল বৈঠক, বুকলেট প্রকাশ, পুস্তিকা প্রকাশ, শিক্ষা স্মরণিকা প্রকাশ ও বিতরণ ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ছাত্রদের নকলপ্রবণতা থেকে বিরত  থাকতে উৎসাহিত করে ছাত্রশিবির। শিবিরের সাথী ও সদস্য কেউ নকল করলে তার সাথী বা সদস্য পদ বাতিল করা হয়। কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিলেও শিবির তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির জন্য এবং কর্মীদের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য লিডারশিপ ট্রেনিং ক্যাম্পসহ বহুবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় শিবিরের উদ্যোগে। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য চাটুকারিতা, গ্রুপিং-লবিং আর অভ্যন্তরীণ সংঘাত আজ ছাত্ররাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী ছাত্রশিবির তা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। ইসলামী আন্দোলনে নেতার আদেশ এবং কর্মীর হক আদায় ও মর্যাদা দানকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নেতৃত্ব ও আনুগত্যের ভারসাম্য ইসলামী সংগঠনের বৈশিষ্ট্য। এটি ইসলামী ছাত্রশিবির অনুসরণ করে থাকে। অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং সৎকর্মের ক্ষেত্রে আনুগত্য। ব্যক্তির পরিবর্তনে আনুগত্যের পরিবর্তন এখানে হয় না। এটি শিবিরের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।

ছাত্রশিবিরের রয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী নির্বাচনপদ্ধতি। এখানে কোনো প্রার্থী থাকে না; সবাই ভোটার, সবাই প্রার্থী। কারো পক্ষে বা বিপক্ষে গ্রুপ সৃষ্টি করা যায় না। কারো জন্য ভোট চাওয়া যায় না। নিজেকে ভোট দেওয়া যায় না, নিজের জন্য চাওয়াও যায় না। এ ধরনের নির্বাচনপদ্ধতি প্রচলিত রাজনীতিতে অনন্য। রাসূল সা.-এর নির্দেশ অনুযায়ী পদের আকাক্সক্ষী ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া যায় না। প্রচলিত রাজনীতিতে অনেকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে কাউকে কিছু বলতে ভয় পায়। কিন্তু ইসলাম গঠনমূলক সমালোচনাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। একসাথে কাজ করলে ভুল-ত্রুটি হতে পারে। তাই একে অপরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। এ সংগঠনে প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা থাকে। সংগঠনের জনশক্তি, সম্পদ, সংগঠনের মর্যাদা ইত্যাদি আমানত। সে আমানতের খেয়ানত যেন না হয়, সেজন্য দায়িত্বশীলগণও জবাবদিহিতার চেতনা নিয়েই দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

আধুনিক রুচিসম্মত তথ্যবহুল দাওয়াতি কার্যক্রম, উপহার আদান-প্রদান এবং সুস্থ বিনোদন চর্চায় শিবিরের প্রকাশনাসামগ্রী অনন্য। নববর্ষের ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, ভিউকার্ড, স্টিকার, পোস্টার, ওয়ার্ডকার্ড, কোটপিন, চাবির রিং, দাওয়াতি টি-শার্ট ইত্যাদি প্রকাশনীর মাধ্যমে ছাত্র আন্দোলনের মাঝে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। তথ্যবহুল, গবেষণালব্ধ আকর্ষণীয় ডিজাইনের ৬ পৃষ্ঠার ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি দেশ ও বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। মাসিক প্রেরণাসহ কিশোর-তরুণদের জন্য ছাত্রশিবির প্রকাশিত সাময়িকীসমূহ ইতোমধ্যেই পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের শিক্ষার্থীদের পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানের ওপর রেফারেন্স বই ও চার্ট পেপার। বহুরঙা ও দ্বিমাত্রিক চিত্রসহ উচ্চমানের এ বইগুলো বাংলা ভাষায় ইতঃপূর্বে প্রকাশিত হয়নি। ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ, প্রয়োজন এবং অ্যাকাডেমিক শিক্ষার যথার্থ তথ্য-উপকরণ দিয়েই এ Understanding Science Series প্রকাশিত হয়েছে।

একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। অপসংস্কৃতির সয়লাব থেকে ছাত্র ও যুবসমাজকে রক্ষা করে তাদের ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে হলে প্রয়োজন পরিশীলিত সংস্কৃতির আয়োজন। সাহিত্য, সংস্কৃতি মানেই অশ্লীলতা-বেহায়াপনা এবং পাশ্চাত্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্ধ অনুকরণ; এই ধারণার পরিবর্তন করতে শিবির বদ্ধপরিকর। ইসলামী সংস্কৃতির ধারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। গান, কবিতা, নাটক রচনা ও সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলছে শিবির। 

জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ সময়ের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জনশক্তি সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন পেশার এবং চিকিৎসা ও সমাজসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক একদল দক্ষ লোক তৈরিতে শিবির অবদান রেখেছে। এ ব্যক্তিবর্গ নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে সততা ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। উচ্চশিক্ষিত পর্যায়ে সৎ মানুষের অভাবের এ দেশে, সৎ মানুষ উপহার দিতে পারা ছাত্রশিবিরের সব থেকে বড় কৃতিত্ব বলা যায়। সমাজে আজ যে দুর্নীতি, তার উৎস সাধারণ নিরক্ষর মানুষগুলো নয়। সমাজের ওপরের স্তরে শিক্ষিত দুর্নীতিবাজ আছে বলেই দুর্নীতি এক সর্বগ্রাসী রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। 

শিবির ত্যাগ ও কুরবানির এক অনুপম নজরানা পেশ করছে। ত্যাগ ও কুরবানির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়। মহান রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘তোমরা কি এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে অথচ তোমাদের পরীক্ষা করা হবে না কারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে আর কারা ধৈর্য ধারণ করেছে?’ (সূরা আল-ইমরান : ১৪২)। জুলুম-নির্যাতন, নিষ্পেষণ, হত্যা শিবিরকে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে। জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে শিবির গঠনমুখী এক দৃঢ় ভূমিকা পালনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশের প্রতিটি সঙ্কট, গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতীয় নির্বাচনকে সফল করে তোলার ক্ষেত্রে শিবির পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা। আওয়ামী দুঃশাসনের মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলসমূহের আন্দোলনকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে ছাত্রশিবির। ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক ভূমিকা তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিবিরের সরব ভূমিকা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।


উপসংহার 

রাসূল সা.-এর আদর্শবাহী এ কাফেলা এগিয়ে চলছে স্রোতের গতিতে আর আঘাত হানছে এ দেশের প্রতিটি কিশোর, তরুণ ও যুবকের মনের গহিনে। যে আঘাতে এক দিকে ভেঙে চুরমার হচ্ছে মানবরচিত মতবাদের ধারক-বাহকেরা, অপর দিকে গড়ে উঠছে ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সুউচ্চ মিনার। সে মিনারের ইট হচ্ছে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলিসম্পন্ন একদল সাহসী তরুণ। এ তরুণদের শিবির-ই একদিন গড়বে সত্যিকারের সোনার বাংলা আর সোনার মানুষ। সমৃদ্ধ এক সোনার বাংলাদেশ ও নির্মল পৃথিবী বিনির্মাণে ছাত্রশিবিরের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। কারণ, এই শিবিরই যে আগামী দিনের উজ্জ্বল সূর্যের বারতা!

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির