হেরা গুহায় মহানবী সা:-এর সাধনা

hera-guha

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান#

মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির শান্তির জন্য, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আজীবন সাধনা করে গেছেন। তিনি  মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর উপলব্ধি জাগানো এবং মানুষকে কুফর ও শিরক  থেকে মুক্ত করার ভাবনায় নিমজ্জিত থাকতেন সদাসর্বদা। তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নিজ বাসস্থান থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে পবিত্র হেরা গুহায় একাকী নির্জনে থাকতেন। আর ডুবে থাকতেন ধ্যানেমগ্নে। যে পাহাড়ে এই গুহার অবস্থান তার নাম জাবালুন নূর বা আলোকিত পাহাড়। হেরা গুহা ও জাবালুন নূর এ দুটোই মুসলমানদের কাছে খুবই প্রিয়।
ইবনে ইসহাক রহ:-এর বর্ণনা মতে জানা যায়, প্রত্যেক বছরই মহানবী সা: এক মাস হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। মাসটি অতিক্রান্ত হলে তিনি নির্জনবাস পরিত্যাগ করে বাড়িতে ফেরার আগে প্রথমে সাতবার বা আল্লাহ যতবার চাইতেন ততবার কাবা শরীফ তাওয়াফ করতেন। এরপর তিনি নিজের বাড়ি ফিরে যেতেন। সঙ্গে যেতেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা। খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা কখনো তাঁর গুহার নিকটবর্তী কোথাও অবস্থান করতেন আবার কখনো বাড়ি ফিরে আসতেন।
এ দিকে বছরের পর বছর ধ্যান করার পর মহানবী সা:-এর বয়স যখন চল্লিশে পৌঁছলেন তখন অন্তরের প্রদীপ্ত চেতনায় অধীর হয়ে ঘরে-বাইরে  ছোটাছুটি করতে লাগলেন। একটা শঙ্কা, একটা ভীতি, একটা অস্বস্তি, একটা উদ্বেগ, সঙ্গে সঙ্গে অজানাকে জানবার জন্য একটা দুর্জয় কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা তাঁকে অস্থির করে তোলে। তাই তিনি আবারো সমাজ-সংসারের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে মক্কার অনতিদূরে হেরা গুহায় আশ্রয় নেন।
রমজান মাস। মহানবী সা: রোজা রেখে নিশিদিন ইবাদাত-বন্দেগি করেন। হেরার নিভৃত গুহায় সারারাত জেগে থাকেন। রজনী গভীর। মহানবী সা: ধ্যানমগ্ন। এমন সময় মহানবী সা: দেখতে পান জ্যোতির্ময় ফেরেশতা তাঁর সামনে দন্ডায়মান। তাঁর জ্যোতিতে হেরা গুহা আলোকিত। তিনি আর কেউ নন; আল্লাহর বাণীবাহক ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম। জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবী সা:কে বললেন, ‘ইকরা’ (পড়ুন)। মহানবী সা: ভীতগলায় বললেন, “আমি পড়তে জানি না।”  জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবী সা:কে আলিঙ্গন করলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম পুনরায় তাঁকে বললেন, ‘ইকরা’ (পড়ুন)। মহানবী সা: এবারও উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে পারি না।” জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবী সা:কে আবার আলিঙ্গন করলেন।
ফেরেশতা এরূপ তিনবার তাঁকে আলিঙ্গন করলেন। এরপর মহানবী সা: পড়তে শুরু করলেন। প্রথমে জিবরাইল আলাইহিস সালাম সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত পড়ে শোনান।
জিবরাইল আলাইহিস সালাম চলে গেলে মহানবী সা: বাড়ি ফিরে এসে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “আমায় কম্বল দ্বারা আবৃত কর! আমায় কম্বল দ্বারা আবৃত কর! আমার বড় ভয় হচ্ছে।” স্ত্রী খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা তা-ই করলেন এবং বললেন, আপনার কোনো ভয় নেই। আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কখনও অপদস্থ করবেন না।” এরপর খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফলের নিকট নিয়ে যান মহানবী সা:কে। ওরাকা বিন নওফল তৎকালীন আরবের একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। সব ঘটনা শুনে ওরাকা বিন নওফল বলে ওঠেন, ‘কুদ্দুসুন! কুদ্দুসুন! পবিত্র! পবিত্র! মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট যে নামুস-ই-আকবর (মহান নিদর্শন) এসেছিল, ইহা সেই নামুস! খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা আনন্দিত হলেন এবং মহানবী সা:কে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
মহানবী সা: নবুওয়াত লাভের পর তাঁর উম্মতদের শিক্ষা দিলেন আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ কিংবা মাবুদ নেই। ইবাদাত করতে হবে একমাত্র তাঁরই জন্য। তিনি এক অদ্বিতীয় এবং তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি আরো শিক্ষা দিলেন, আসমান-জমিন, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সব কিছুর মালিক মহান আল্লাহ। তিনি এসব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকারী ও রিজিকদাতা। তিনি আমাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক।  তিনি শিক্ষা দিলেন, তোমরা ফিরে এসো সত্যের পথে, ন্যায় ও কল্যাণের পথে। তিনি আরো অনেক কিছুই শিক্ষা দিয়েছেন আমাদেরকে। তিনি বলেছেন, এ জীবন-ই শেষ নয়; মৃত্যুর পর আরো একটি জীবন রয়েছে। তার নাম পরকাল। সে কালে আল্লাহর কাছে দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে।

SHARE

Leave a Reply