১১ মে কুরআন দিবস বৃহত্তর পরিসরে পালন করা উচিত -অধ্যাপক মো: তাসনীম আলম

পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিনিয়তই নানা ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সব ঘটনা কি মানুষ মনে রাখে? মোটেই নয়। তবে এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হয় যা ঐ দেশের মানুষ প্রায় সকলেই মনে রাখে। এমনকি সংঘটিত ঐ ঘটনা সংশ্লিষ্ট দেশ  থেকে  দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ঐ ঘটনা তখন ইতিহাসের অংশ হয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঐ দেশের জাতীয় ঘটনায় পরিণত হয়। ১৯৮৫ সালের ১১ মে কুরআনের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সমাবেশ ও মিছিলে পুলিশের গুলিতে ৮ জনকে হত্যা করার ঘটনাটি এমন একটি ঘটনা যা শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনগণ নয়, বাংলাদেশ, এমনকি সারা দুনিয়ার মুসলমান স্মরণ করে। স্মরণ করে শহীদ পরিবারের লোকেরা তাদের প্রিয়জনদের। ইসলামী ছাত্রশিবির দিনটিকে কুরআন দিবস হিসেবে পালন করে।
পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে দিবসটি ব্যাপকভাবে পালন করা না গেলেও স্বল্প পরিসরে পালন করা হয়। তবে ঘটনাটি কুরআনের অবমাননার সাথে জড়িত হবার কারণে ব্যাপকভাবে সভা-সমাবেশ না হলেও মানুষের অন্তরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। নীরব কান্নায় কুরআনপ্রেমিক মানুষ ভেঙে পড়ে। এ কান্না হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসাহিত হয়। তাই এ কান্না বন্ধ করার শক্তি কারোর নেই। তবে প্রায় বত্রিশ বছর পার হয়ে যাওয়া ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয়, এ দিবসটি আরো ব্যাপকভাবে পালন করা উচিত। বিশেষ করে বাংলাদেশের সকল ইসলামী দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখকে সাথে নিয়ে কমিটি গঠন এবং এ কমিটির উদ্যোগে সারা বাংলাদেশে সভা-সমাবেশ করা উচিত। সাথে সাথে এ দিবসটিকে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এ দাবি আরো জোরদার হওয়া দরকার।
১৯৮৫ সালের ১১ মে’র ঘটনা। ’৮৫ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের দু’জন নাগরিক পদ্মমল চোপরা এবং শীতল শিং কলকাতার হাইকোর্টে কুরআন বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করে। হাইকোর্টের বিচারপতি পদ্ম-খস্তগীর বিচারবিবেচনা না করেই রিট পিটিশনটি গ্রহণ করেন। কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো ঐশী গ্রন্থ হবার কারণে মুসলমানের নিকট প্রাণের চেয়েও প্রিয়। কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় সারা দুনিয়ায় বিক্ষোভ। বাংলাদেশের জনগণ বরাবরই কুরআন ও ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো ঘটনা ঘটলে চুপ করে বসে থাকেনি। এরই অংশ হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কুরআনপ্রেমিক জনতা স্থানীয় আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হোসাইন আহমাদের নেতৃত্বে ১১ই মে বিক্ষোভের আয়োজন করে। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে লোক জড়ো হতে থাকে। ইতোমধ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা প্রিন্সিপাল হোসাইন আহমদসহ কমিটির লোকদের ডেকে সমাবেশ না করার জন্য চাপ দেয়।
সমাবেশের  আহবায়কসহ  সকলেই প্রশাসনকে অনুরোধ জানায় যে, সমাবেশটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হবে। শুধু দোয়া করে আমরা বিদায় নেব। যেহেতু বেশ কিছু মানুষ ইতোমধ্যেই জড়ো হয়েছে তাদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত কথা না বলতে পারলে আরো বেশি সমস্যা হবে। কিন্তু প্রশাসন এতটুকুতেও রাজি হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়- সমাবেশ হবে না। এতে হীতে বিপরীত হয়। জনগণ আরো ক্ষীপ্ত হয়ে পড়ে এবং দলে দলে সমাবেশস্থল ঈদগাহ মাঠে জড়ো হতে থাকে। নেতৃবৃন্দ জনগণের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। মুহুর্মুহু গুলির মুখেও জনতা পিছু না হটে সামনে এগুতো থাকে। ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ৮ জন শহীদ এবং বহুসংখ্যক কুরআনপ্রেমিক জনতা আহত হয়। গুরুতর আহতদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেবার পথে পুলিশ আহতদের উপর আবারও আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত্রে কারফিউ জারি করা হয়। খুনি ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা রাতের আঁধারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ত্যাগ করে। এ সময় জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায়। সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। আত্মস্বীকৃত খুনি ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লাসহ জড়িতদের কোন শাস্তি না দিয়ে বরং পরবর্তীতে তাদের প্রমোশন দেয়া হয়। শহীদ পরিবারকে নামকাওয়াস্তে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। স্বৈরাচারী এরশাদ এভাবে কুরআনপ্রেমিকদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশদাতা ও জড়িত অন্যান্যদের কোন প্রকার শাস্তি না দিয়ে যে কলঙ্কের ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তার জন্য তাকে অবশ্যই দুনিয়াতে না হলেও আখেরাতে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। শহীদ পরিবারসহ দুনিয়ার কুরআনপ্রেমিক জনতা সেই আশায় বুক বেঁধে আছে।
কুরআন অবমাননার ঘটনা ছোট কোনো ঘটনা নয়। এ ঘটনা বাংলাদেশসহ দুনিয়ার মুসলমানদের ঈমান ও আক্বিদার উপর চরম আঘাত হানে। বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে বিচারপতি রিটটি খারিজ করে দেন। তাই এ ঘটনা মুসলমানদের জন্য প্রেরণার উৎস হিসাবে কাজ করে। এ ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য দলমত নির্বিশেষে কুরআনপ্রেমিকদের এগিয়ে আসা উচিত। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এ জমিনে একদিন কুরআনের আইন চালু হবে- এ কামনাই মুসলিম উম্মাহর।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply