২০১৮-১৯ অর্থবছরের বিশাল বাজেট পাস নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পিঠে বিশাল বোঝা -হারুন ইবনে শাহাদাত

বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। এ বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকরও হয়েছে। বাজেট পাসের আগে জাতীয় সংসদে প্রায় ৪৫ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। সংসদ সূত্রে প্রকাশ, গত ২৮ জুন বৃহস্পতিবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ও বিরোধী দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে বাজেট প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বাজেট পেশ করেছিলেন। প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে পাস হওয়া বাজেটের তেমন পার্থক্য নেই। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ও পঞ্চম বাজেট এটি। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা এ বাজেটকে ভোটারতুষ্টির লুটপাটের বাজেট বলে সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু সরকারের দাবি ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবং উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীরা সংশ্লি¬ষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এই মঞ্জুরি দাবিগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয়। বর্তমান সংসদের গৃহপালিত প্রধান বিরোধীদল আলোচনায় অংশ নিয়েছে। মঞ্জুরি দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধীদলের ৯ জন সংসদ সদস্য মোট ৪৪৮টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর মধ্যে ৫টি মঞ্জুরি দাবিতে আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনা করেন। পরে কণ্ঠভোটে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো নাকচ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পঞ্চম বাজেট। আর এটি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পেশ করা ১২তম বাজেট এবং এক নাগাড়ে ১০ম বাজেট। এদিকে গত ১০ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও অন্যান্য মন্ত্রীসহ সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা মূল বাজেট ও সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া, এনবিআর বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০.৪ শতাংশ। কর বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ। বাজেটে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১.৫ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
বাজেটে সার্বিক বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৭ শতাংশ এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটের উন্নয়নের লক্ষ্য ও কৌশল হচ্ছে টেকসই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন।
এ দিকে বাজেটে সামাজিক অবকাঠামোগত খাতে মোট বরাদ্দের ২৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যার মধ্যে মানবসম্পদ খাতে- শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে ২৪.৩৭ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে ৩০.৯৯ শতাংশ- যার মধ্যে রয়েছে সার্বিক কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ১২.৬৮ শতাংশ, বৃহত্তর যোগাযোগ খাতে ১১.৪৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৫.৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া সাধারণ সেবা খাতে ২৫.৩০ শতাংশ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয় বাবদ ৪.৭৮ শতাংশ। এ ছাড়া সুদ পরিশোধ বাবদ ১১.০৫ শতাংশ। নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে অবশিষ্ট ০.৫৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ, সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
এদিকে মঞ্জুরি দাবিগুলোর মধ্যে অর্থ বিভাগে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ১৫৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা, তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৯ হাজার ৬৬ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, চতুর্থ সর্বোচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা, পঞ্চম সর্বোচ্চ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ২৪ হাজার ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগে ২২ হাজার ৯৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগে ২১ হাজার ৪২৬ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ১৮ হাজার ১৬৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৪ হাজার ৬৩৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ১৬ হাজার ২৩ কোটি ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ১৩ হাজার ৯১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে ১৩ হাজার ৭১৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১২ হাজার ২শ’ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মঞ্জুর করা হয়।

সংসদে তোপের মুখে অর্থমন্ত্রী
ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনা ও লুটপাট নিয়ে বাজেট আলোচনায় সংসদে তোপের মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ব্যাংক লুটকারী ও অর্থ পাচারকারীদের ধরতে না পারায় এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে না পারায় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা তার কঠোর সমালোচনা করেন।
জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা শুরু করেন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি অধ্যাপক আলী আশরাফ। এরপর আলোচনায় তাল মেলান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশিদ, স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফরাজীসহ বেশ কয়েকজন এমপি। অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আনা দরকার। এ খাতে শৃঙ্খলা আনতে না পারলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। কিছু মানুষ ব্যাংকিং খাতে লুটপাট করবে, বিদেশে অর্থ পাচার করবে, এটা হতে পারে না। ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের আপনি ধরেন। ‘ব্যাংকের লুটপাট থেকে বেরিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে না।’
এ ছাড়া তিনি বলেন, করের আওতা বাড়াতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কর অফিস করেন। বিমান চলছে না, বিদেশিরা এসে বিমানে উঠলে মনে করে যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। সর্বত্র ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা চলছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে যে লুটপাট হয়েছে তা ভারতের সমনাথ মন্দিরের লুটপাটের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তখন সমনাথ মন্দির আক্রমণ করে ২০ বিলিয়ন ডলার লুটপাট করা হয়েছিল। বাংলাদেশে ব্যাংক লুটপাটের আগ পর্যন্ত এত বড় লুটপাটের ঘটনা আর ঘটেনি। সামনে নির্বাচন, নির্বাচনের আগে এই ব্যাংক মালিক লুটপাটকারীরা দেশে থাকবে না, তাদের খুঁজেও পাবেন না। তারা বিদেশে পালিয়ে যাবে, এরই মধ্যে ভিসা লাগিয়ে ফেলেছে।’ অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খেলাপি কারা? এটা কি আপনি জানেন না? কেন তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন না। এরা ২৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এসব ভুয়া বাজেট দিয়ে কাজ হবে না। এই বাজেটের মধ্যে কিছু নেই। ধনীকে খুশি, গরিবকে নিঃস্ব আর ব্যাংক ডাকাতদের উৎসাহিত করেছেন এই বাজেটে।’ ব্যাংকে আমানত রাখতে মানুষ এখন ভয় পায় মন্তব্য করে স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা রাখে মানুষ নিরাপত্তার জন্য। মানুষ ভীত হয়ে গেছে। টাকা পাচার হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঋণখেলাপিরা টাকা দেশেও রাখে না, বিদেশে পাচার করে। এরা ব্যাংকের কিছু আর রাখবে না। যারা ব্যাংকে লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। লুটপাটকারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার জন্য কী করা যেতে পারে, সেটা অর্থমন্ত্রীকে ভাবতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে এই টাকা আদায়ে কী করা যায় করেন, তাহলে জনগণ আস্থা ফিরে পাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনে চলছে অনিয়ম। বেতন বাড়ানো হল, তারপরও কর্মকর্তারা ঘুষ খায়। তারা বেতন নিলে ঘুষ বন্ধ করতে হবে। আর ঘুষ নিলে বেতন বন্ধ করতে হবে। একসঙ্গে দুটো চলবে না।’
বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পীর ফজলুর রহমান বলেন, বড় বাজেট নিয়ে আত্মতুষ্টির কিছু নেই। কারণ গড় মাথাপিছু আয় ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে এক হাজার ৭০০ ডলার হলেও সুনামগঞ্জের সাধারণ মানুষের আয় কত? তাদের আয় কমেছে। মানুষে মানুষে বৈষম্য বেড়েছে। অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। ধনী ও বিত্তশালীরা ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছেন। গরিব আরও গরিব হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকারি তদন্তে ব্যাংক লুটপাটকারীদের নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বাজেট বরাদ্দের সুবিধা প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, দারিদ্র্যের হার কমলেও এখনও বাংলাদেশে ৪ কোটি লোক দরিদ্র। ২ কোটি লোক অভুক্ত থাকে। পুষ্টি ঠিকভাবে পায় না। তার চেয়ে বড় কথা দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে বিপুলভাবে। ২০০৯-১০ সালের বাজেট বক্তৃতায় আমি ওই বাজেটকে ‘প্রো-পুত্তর’ প্রো-পিপল বলেছিলাম। কিন্তু তারপর প্রতি বছরই বাজেট বড়লোকদের দিকে হেলে পড়েছে। এবার আরও বেশি। তাদের জন্য বড় বড় ছাড় দেয়া হয়েছে। গরিব-মধ্যবিত্তের সঞ্চয়কে টান দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মালিকরা সবচেয়ে সুবিধা পেয়েছে। অথচ এই ব্যাংক সেক্টরে চলছে অবাধ লুটপাট। অর্থপাচারের মহোৎসব। আর এই লুটপাটের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের মানুষের। করের টাকা থেকে ব্যাংক ঘাটতি মূলধন পূরণ করা হচ্ছে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আয় বৃদ্ধির জন্য নেয়া পদক্ষেপের কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণী চাপে পড়বে। ৫টি মৌলিক চাহিদার ৩টিতেই কোনো না কোনোভাবে কর বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে যেসব উদ্যোগ মধ্যবিত্তকে চাপে ফেলবে এর মধ্যে আছে- করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানো, ছোট ফ্ল্যাটে ভ্যাট বৃদ্ধি, ফার্নিচারের উৎপাদন ও বিপণন কর, পোশাকে ভ্যাট বাড়ানো এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ভ্যাট বৃদ্ধি। এ ছাড়া পুরো বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, যা ভোক্তা শ্রেণীর ব্যয় বাড়াবে। বাজেটে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ও নিম্ন-আয়ের মানুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। এসব কারণে ভোটের আগেই প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-যাত্রার ব্যয় বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অর্থনীতির সাম্যনীতির পরিপন্থী। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রভাবে এবারের বাজেটে মধ্যবিত্তরা চাপে পড়বে। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা ভোটের কারণে নিম্ন-বিত্তদের গুরুত্ব দেন। কিন্তু তাদের সুবিধা অসুবিধা খুব একটা বিবেচনায় নেন না। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আয়-ব্যয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তাতেও উচ্চবিত্তরা সুবিধা পেলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থার সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সামগ্রিক বিবেচনায় তাদের মনে হয়েছে নবীন বাংলাদেশের জন্য একটি প্রবীণ বাজেট তৈরি করা হয়েছে।
বাজেটের এই লক্ষ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় বলেন, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বাজেটে বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা পূরণ করতে হলে ১১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগবে, যা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। আর তাতে করে ‘পুঁজির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ধরা হয়েছে যে মূল্যস্ফীতির হার ৫.৬ শতাংশ থাকবে, আমরা অবশ্যই এটার ব্যাপারে গভীর সংশয় প্রকাশ করছি। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির যে পরিস্থিতি এবং দেশের ভেতরে যে প্রবণতা সেটা এটাই বলছে। তিনি বলেন, আমরা বারবার বলেছি যে, বিড়াল বড় হতে পারে, বিড়াল ছোট হতে পারে কিন্তু তাকে ইঁদুর ধরতে হবে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার উঁচু হতে পারে, প্রবৃদ্ধির হার নিচু হতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে গরিব মানুষের দারিদ্র্যবিমোচন হতে হবে, তাদের বেশি পেতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে পূর্ব-পশ্চিম ভাগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা; অপর দিকে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী। একদিকে উন্নততর বাংলাদেশ, আরেকদিকে দরিদ্রতর বাংলাদেশ। আমরা দেখছি, সম্পদ, ভোগ এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। যারা সবচেয়ে গরিব, গত পাঁচ বছরে তাদের ৬০ শতাংশ আয় কমেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ মানুষের ৫৭.৪ শতাংশ আয় বৃদ্ধি ঘটেছে। এখানে যার পুঁজি আছে, তারা আয় করার বেশি সুযোগ পাচ্ছে যার শ্রম ও উদ্যোগ আছে তার তুলনায়। শ্রম ও উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি এবং সম্পদকে বেশি পুরস্কৃত করছেন। এটা মেধাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ভালো খবর বলে মনে হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ এখনও স্থবির হয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার এবং গরিবের আয় বৃদ্ধির হার দুর্বল, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের গুণগতমান দুর্বল। এ কারণ বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর বিরোধিতা করে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো বলেন, ব্যাংক খাতে যে ধরনের নৈরাজ্য চলছে, সেটা সমাধান না করে এ ধরনের সুবিধা দেয়া আগে যেভাবে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেটাকে ধরে রাখা হয়েছে। এর ফলে তারল্য বাড়বে না বলেই আমাদের সন্দেহ। বাজেটে ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানোয় হতাশা প্রকাশ করে দেবপ্রিয় বলেন, আনুতোষিক ব্যয়ে ৭৫ লাখ টাকা সুবিধা দেয়া হয়েছে। সেটা উচ্চবিত্তের মানুষ পাবেন। এটা আমাদের কাছে বৈষম্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যখন নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে সুবিধা দিলাম না, কিন্তু উচ্চবিত্তকে আনুতোষিক ব্যয়ে সুবিধা দিচ্ছি, এটা অর্থনীতির সাম্যনীতিতে ঠিক হলো না।
সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে প্রত্যক্ষ করের (আয়কর) তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। পরোক্ষ করের চাপ নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ায়। ফলে সাম্যভিত্তিক করের দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

প্রকৃত বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেটকে প্রত্যাখ্যান করেন বলেন, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ও আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের সঙ্গে সরকারের বিরাট অংকের ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি ১৫ শতাংশ ভ্যাটের হার কমিয়ে ‘সহনীয় পর্যায়ে আনা’ এবং ব্যাংক আমানতের ওপর বর্ধিত হারে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানান। তিনি বলেন, বাজেটে উপেক্ষিত থেকেছে মানবসম্পদ খাত, এমনকি কৃষিও। প্রাধান্য পেয়েছে চোখধাঁধানো কিছু মেগা প্রকল্প। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় ও জনকল্যাণমূলক খাতসমূহকে অবহেলা করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এটা নিছক বিরাট অংকের প্রচারণার ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। এটা মানুষকে বোকা বানানোর বাজেট। এটা প্রতারণার বাজেট। ফখরুল বলেন, বাজেট দেখে তার মনে হয়েছে, কল্যাণমুখী লক্ষ্যগুলো অর্থমন্ত্রীর বিবেচনায় আসেনি। এই কারণে আমরা আশাহত ও ক্ষুব্ধ। জনগণের কাছে সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই বলেই এই বঞ্চনার বাজেট জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই বাজেট আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঝুঁকির শঙ্কা প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, বাজেটের কিছু কিছু প্রস্তাব দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তিনি বলেন, লোকের চোখে দৃশ্যমান উন্নয়ন করতে গিয়ে, দ্বিগুণ চারগুণ অর্থ ব্যয় করে একদিকে সম্পদের অপচয় ঘটানো হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। প্রকল্প গ্রহণের স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে না। প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা নেই, ব্যয়ের গুণগত মান বজায় রাখা হচ্ছে না। এই বাজেটে ব্যয়ের গুণগত মান বাড়ানোর কোনো দিক নির্দেশনা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লক্ষ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বিরাট অংকের যে বাজেট পেশ করেছেন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেই অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন। পেশকৃত বাজেট অদূরদর্শী, উচ্চাকাক্সক্ষী, কল্পনাবিলাসী ও নির্বাচনমুখী। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ৯ বছরে আমরা লক্ষ্য করে আসছি যে, সরকার প্রায় প্রতি বছরই মোটা অংকের বাজেট পেশ করলেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও নানা বিশৃঙ্খলার কারণে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়। সদ্য পেশ করা বাজেটের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ মনে করেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের জনগণকে প্রভাবিত করার হীন উদ্দেশ্যেই সরকার এ উচ্চাকাক্সক্ষী কল্পনাবিলাসী বাজেট পেশ করেছে। দেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত ও হতাশ জনগণকে আশান্বিত করার উদ্দেশ্যেই সরকার তাদের সামনে কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে আশা-আকাংক্ষার মুলো ঝুলিয়েছে। ব্যর্থ সরকারের উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব-কৌশলী বাজেট দেশের দরিদ্র জনগণকে আরো হতাশ করবে। তিনি আরো বলেন, বাজেট পেশ করার পূর্বেই চাল, ডাল, তরিতরকারি, মাছ, গোশতসহ সকল প্রকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়ার ফলে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র জনগণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫.৬ শতাংশ। বিরাট অংকের বাজেট পেশ করার ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত দরিদ্র জনগণের দুর্ভোগ আরো বেড়ে চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৩৯ হাজার ২শত ৮০ কোটি টাকা, এনবিআর থেকে আয় ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণের জন্য বিদেশী ও দেশী উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রয় করা থেকে আয় করার কথা বলা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ১০৬ কোটি টাকা এবং দেশীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রয় করা থেকে আয় ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ১শত ৯৭ কোটি টাকা। এ থেকে দেখা যায় পেশকৃত বাজেট অনেকাংশে বিদেশী ও দেশী ঋণনির্ভর। করমুক্ত আয়ের সীমা গত কয়েক বছর যাবৎই ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা রাখা হচ্ছে। অথচ করমুক্ত আয়ের সীমা আরো অন্তত ১ লক্ষ টাকা বৃদ্ধি করে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা উচিত ছিল। এ বাজেট দুর্নীতি আরো বৃদ্ধি করবে এবং সরকারের দলীয় লোকদের স্বার্থ হাসিল হবে। কিন্তু জনগণের কোন কল্যাণ হবে না। অবাস্তব কল্পনাবিলাসিতা বাদ দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের উপযোগী করে, বাস্তবমুখী করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

শিক্ষা খাত উপেক্ষিত
বিগত দু’টি অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারো শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দ কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ খাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ হিসাবে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১০ দশমিক ২ শতাংশ। বরাদ্দের দিক থেকে শিক্ষা খাত সবসময় উচ্চ ও সর্বাধিক অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এলেও প্রস্তাবিত বাজেটে তা নেই। বাজেটে বরাদ্দের অনুপাতে এবার শিক্ষা খাত শীর্ষ অবস্থান হারিয়েছে। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল বরাদ্দ ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। গত দু’টি অর্থবছরেই শিক্ষা খাতে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ কমেছে। জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৪ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা নিয়ে শিক্ষক নেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ-বিপিসির সভাপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ মোটেই প্রত্যাশিত হয়নি। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বিগত বছরের চেয়ে বেশি দেখানো হলেও, শতাংশের হিসেবে বিগত অর্থবছরের চেয়ে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটি কাম্য ছিল না। শিক্ষকদের দাবি ও বর্তমান চাহিদা অনুসারে বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
এ ছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, বাম ফ্রন্ট, ছাত্রসমাজ, ছাত্র মজলিশসহ ছাত্রসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বাজেটে শিক্ষা উপেক্ষিত মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

কর ও ঋণ নির্ভর ঘাটতি বাজেট
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, তাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করেছেন মুহিত। যা অসম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মোট জিডিপির সঙ্গে আয়কর ঘাটতিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভে অব এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পার্থক্য সাড়ে সাত শতাংশ। বাংলাদেশের পরে এই অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পার্থক্য ভুটানের। তাদের রাজস্ব আয় ও জিডিপির পার্থক্য ৬.৭ শতাংশ। এরপর আফগানিস্তানের ৬ শতাংশ। সর্বনিম্ন পার্থক্য মালয়েশিয়ার (১.৩%)। ২০১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে রাজস্বের হার ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। বাজেট অনুযায়ী হওয়ার কথা ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।

বাজেটের আকার বাড়ছে কিন্তু বাস্তবায়নের হার কমছে
প্রতি বছর বিশাল বিশাল বাজেট দিয়ে সরকার বাহাবা নিলেও অর্থবছর শেষে দেখা যাচ্ছে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ২০১২ সালের পর থেকেই জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের হার কমছে। প্রতি বছর বাস্তবায়ন হার কমায় বাজেটের আকার বড় করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গুণগত মানসম্পন্ন বাজেট না হওয়ায় তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বছরের শুরুতে আশার সঞ্চার করেও বছর শেষে হতাশ হতে হচ্ছে।
গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুমোদন পাওয়া বাজেটের ৯৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়। সর্বশেষ হিসাবে তা ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছর বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুুল মুহিত। আর্থিক হিসাবে ব্যয়ের হার কমে আসার পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নের গুণগত মানও কমে আসছে। প্রত্যাশিত হারে বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়াকে দেশের উন্নয়নের জন্য অশনিসঙ্কেত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টিকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। সম্প্রতি এক বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নের হার কমে আসা সরকারের জন্য একটা খারাপ সঙ্কেত।’ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯৩ শতাংশ ছিল। ওই বছরে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে আসে। এর পর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৮৪ দশমিক ৫৯, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮১ দশমিক ৫৯ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঘোষিত বাজেটের ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এদিকে গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরো বছরের বাস্তবায়নচিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর বড় আকারের বাজেট দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ২০১২ সাল থেকে বাজেট বাস্তবায়ন ক্রমেই কমে আসছে। আশার সঞ্চার করে শেষ পর্যন্ত তা পূরণ হচ্ছে না। এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে আর্থিক ভ্রম থাকে। বাজেটের মধ্যে ‘পানি’ থাকে। ব্যয় বেশি দেখানোর চেষ্টা করা হয়। গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আয় খাত থেকে ব্যাপক হারে ঘাটতি থাকায় শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয় না। এ ছাড়া বড় বড় প্রকল্প নানা কারণে সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। এ ছাড়া বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। যথাযথভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ না করেই বাজেট করা হয়। এ জন্য বাস্তবায়ন হয় না। এই অবস্থা থেকে বের হতে হবে। তা না হলে বিশাল বাজেট জনগণের বোঝাই শুধু বাড়াবে, কল্যাণে আসবে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply